বাবা,
কতদিন হল দেখিনা তোমায়! যখনই "মা" বলে ডাকতে যেন রোদে পোড়া শরীরে এক পশলা বৃষ্টির মত স্বস্তি পেতাম আমি। কতদিন হল সে ডাকটা আর শুনিনা। বাবা, তোমার কি মনে আছে কতদিন আমার মাথায় তোমার হাতটা রেখে চুমুর রেখা এঁকে দাওনি তোমার "মামণি" টার কপালে? তুমি কি জানো বাবা ভাঙছি আমি? প্রতিদিন একটু একটু করে? বাবা, সে ভাঙনে কোন শব্দ হয়না। ছোটবেলায় কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলে "মাগো, মানুষ হোস!" মানুষই হতে চেয়েছিলাম। আমি যে "মানুষ" তার একটা সার্টিফিকেটাল প্রুফও আছে বাবা। কিন্তু মাটি দি্যে যে মানুষ সে আমি কোনদিন হতে পারবনা বোধ হয়!
কেমন আছ বাবা? রাতে ঘুমাওনা আমি জানি। আমিও ঘুমাইনা বাবা। স্রেফ মরে যাই। প্রতিটা রাতে কয়েকঘন্টার জন্য মরে যাই আমি! মৃত্যুর পর নরকে যাই। বীভৎস দুঃস্বপ্নরা আসে "যণ্ত্রনা" হয়ে। আর কত শাস্তি পাব আমি? একটু ঘুমুতে চাই বাবা। ছোট্টবেলাটার মত "আয় আয়" বলে ঘুম পাড়িয়ে দাও না বাবা!! কিংবা ঐ গানটা গেয়ে গেয়ে পিঠ চাপড়ে ঘুম এনে দাও
"ওরে পাষানী, আমার চোখের ও পানি
আঁচল দিয়ে মুছে তখন যাস মামণি
তুই সেদিন হবি পর,যেদিন আসবে রে তোর বর
আমার এ ঘর শূন্য করে যাবি পরের ঘর"
বাবা, যাবার আর কি প্রয়োজন আছে? কোথাও যাব না বাবা। জগৎ সংসার টা বড্ড নীষ্ঠুর!
সারাদিন পর ঘরে ফিরে শূন্য ঘরটায় চোখ পড়লে বুকটা হু হু করে ওঠে। সারা ঘরময় যখন কথাটি কইবার কোন মানুষ খুঁজে পাইনা তখন মনে হয় "বেঁচে থাকার চেয়ে বড় শাস্তি আর কি হতে পারে?" তুমিই বলেছিলে "বাঁচার মত বাঁচতে হবে"। আচ্ছা বাবা, বাঁচার মত বাঁচা কাকে বলে? এমনি করে ছন্নছাড়া জীবনের নামই বেঁচে থাকা?!! আমি জানি হয়তবা আজীবনই আমার শুন্য ঘরটা আর ভরে উঠবেনা, কোনদিন না। তুমি যখন থাকবেনা তখন শুন্য ঘরে কাকে উদ্দেশ্য করে চোখের জলে লিখতে বসবো বাবা?
জানো বাবা আজ ভীষণ নির্মম একটা দিন পার করেছি আমি। খুব গোরস্থানে যেতে ইচ্ছে করছিল। একলা কোন কবরের পাশে বসে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছিল খুব। নাহ, এখন আর কবর ভয় পাইনা আমি। সেই যে আমার আরেকটা বাবা আমারই হাতের উপর মরে গেল সেই থেকে মৃত্যু আমাকে আর আড়ষ্ট করতে পারেনা। অনুভূতির "শূন্য(০)" টা কে অনুভব করতে মন চাইছিল আজ! বাবা, এমন কেন হয়? কি যে ভীষণ এক পাবার তীব্র বাসনা প্রতিটি মুহুর্ত তাড়া করে তোমায় বোঝাতে পারব না। আমার সমস্ত স্বত্তা জুড়ে আরেকটি স্বত্তাকে পাবার কামনায় ছটফট করে।! কিন্তু তখনই বুঝতে পারি সূতোটা যে একবারেই ছিঁড়ে গেছে!
জানো বাবা আমি ইদানীং ঘন ঘন "পনিটেল" করি। তুমি না একদমই পছন্দ করতেনা। আর মা চাইত আমি পনিটেল"ই করি। তোমাদের দুজনের দ্বন্দ্বে পড়ে আমি দু'পাশে দুই বেণী দুলিয়ে স্কুলে যেতাম!! আমার আবার মনটা চায় দু'বেণী ঝুলাতে! রং চটে গেছে বলে স্কুল ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলতাম ক'দিন পর পর। "নুতন ব্যাগ কিনে দাও" বলে চিৎকার করতাম। জীবনের রংটাও চটে গেছে আমার। "আমায় একটা নুতন জীবন এনে দাও না বাবা"!! খাইনা একদম! ছোট্টবেলার মত বকা দাও না কেন বাবা? বকা শুনে পেট ভরে খেতে চাই আমি। ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে বাবা!
এত কথার ভীড়ে জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেছি! কেমন আছ বাবা? আমার ভাঙ্গা চোরা জীবনটার কথা মনে হতেই "চোখে যে কি পড়ল" বলে আড়ালে চোখ মুছ খুব, না? তুমি না বললেও বুঝি বাবা। রক্তেও যে স্রোত থাকে!!
আমিও গভীর শূন্যতায় চোখ বুঁজে আছি, কখনও যদি আবার আলো পাই চোখ মেলব বলে..........
তোমার
বুঁচি
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০১০ সকাল ১১:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



