প্রথমেই বলছি ছবির নাম কি? খোঁজ নাকি দ্য সার্চ? যদি বাংলায় বলি তাহলে খোঁজ আর ইংরেজীতে বললে দ্য সার্চ। হলিউডের মিশেল দেয়া আছে বলেই বাংলা নামের ইংরেজী ভার্সন দেয়া হয়েছে-এটা সহজবোধ্য। কিন্তু খোঁজের ইংরেজী যদি সার্চ হয় তাহলে ছবির নামের মধ্যে খোঁজ- দ্য সার্চ দেয়ার মানে কি? দুটোর অর্থই তো একই, তাই নয় কি? (সেন্সর সার্টিফিকেটের মধ্যেও ছবির নাম খোঁজ-দ্য সার্চ লেখা আছে?)
এক সাংবাদিক তার লেখনির শুরুতেই এই ছবি সম্পর্কে লিখেছিলেন "অনেকটা বিমানের টিকেট কিনে হেঁটে মক্কায় যাওয়ার মত অভিজ্ঞতা। একি দেখছি! কেন দেখছি? ইতিপুর্বে আর কোন ছবি দেখে মনে এত প্রশ্ন এসেছে কি না, মনে পড়লো না। অনেক আশার বিপরীতে প্রাপ্তি যখন শুন্য, তখন হতাশাটাও বেশি কাজ করে।" তাঁর কথার রেশ ধরেই বলছি, তিনি কেন হতাশ হয়েছেন তা অবশ্যই যারা ছবিটা দেখেছেন তারা বুঝতে পেরেছেন। এ ছবিটা নিয়ে প্ল্যান ছিল অন্যরকম। ঢাকার চলচ্চিত্র বদলে যাবে; হলিউড বলিউড না হোক অন্তত ভারতের প্রাদেশিক ছবির পর্যায়ে পৌঁছে যাবে আমাদের চলচ্চিত্রের মান-এফডিসির অনেককেই এভাবে আশায় বুক বাঁধতে দেখা গেছে। ছবি দেখতে বসে প্রথম দৃশ্য থেকেই লুকিয়ে থাকা স্বপ্নগুলো হুড়মুড় করে ভাঙ্গতে শুরু করলো। এতই কী সহজ! প্রসঙ্গত বহুল প্রচলিত একটা প্রবাদ বলতে হয়- "কই আগরতলা আর কই খাটের তলা"। বাস্তবতা বড়ই নিষ্টুর। হলিউড-বলিউড তো দুরের কথা, বন্ধু-বান্ধবদের কাছে গল্প করার জন্য সাধারণ মানের একটা গতানুগতিক ছবির পাশে দাঁড়ানোর মতো যোগ্যতাও এই ছবির নেই। মনে হলো একটা টর্চার সেলে আটকে রেখে পৌনে তিন ঘন্টা কেউ অমানুষিক নির্যাতন করে ছেড়ে দিয়েছে। এই নির্যাতনটা সহ্য করতে হয়েছে এই ভেবে যে, বাংলা ছবির দিনবদলের হাওয়া নাকি এই ছবিতে ফুটে উঠবে, তা দেখার আশায়। (সচরাচর ছবির সমালোচনা করার ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য ধরে বলতে হয়, এটা অলিখিত নিয়ম। দুঃখ প্রকাশ করেই বলতে হয় এ ছবির গল্পের কোন উত্তর-দক্ষিন নাই। তাই চিরচেনা রীতি মেনে চলা সম্ভব হচ্ছেনা)
ছবির প্রযোজক কাম নায়ক আবদুল জলিল অনন্ত। জলিল সাহেব অগাধ টাকার মালিক। এটা দোষের কিছুই নয়। তার দোষ হলো, অভিনয় সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জ্ঞান না থাকা স্বত্ত্বেও প্রযোজক হবার সুবাদে তিনি ছবির নায়ক হয়েছেন। পর্দায় তার হাঁটাচলায় কোনো নায়কোচিত ভাব লক্ষ্য করা যায়নি। তিনি বলতেই পারেন- নিজের টাকায় নিজে নায়ক হয়েছি তাতে কার কী আসে যায়। আমি বলবো আসে যায়। কারণ তিনি ছবিটা বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো, চলচ্চিত্র একটা শিল্প মাধ্যম। টাকা দিয়ে অনেক কিছুর মালিক হওয়া যায়, শিল্প সংস্কৃতির ধারক-বাহক হওয়া যায়না। শুধু অভিনয় করে ভুল করেননি জলিল সাহেব, সবচেয়ে বড় ভুল করেছেন ডাবিং করে। বাংলা, ইংরেজী শব্দের বেশীরভাগই তিনি সঠিকভাবে উচ্চারন করতে পারেননি। অথচ ছবির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ৯০ ভাগ দৃশ্যেই তিনি উপস্থিত। ছবিতে নায়ক চরিত্রে কোন অভিনেতাকে নেয়া হলে অন্তত এই ৯০ ভাগ দৃশ্যে দর্শকের চোখের আরাম হতো। ছবির প্রচারনায় বারবার হলিউডের ছবির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। বিশেষ করে অ্যাকশন দৃশ্য। ছবিতে অ্যাকশন দৃশ্য বলতে কেবলই গোলাগুলি। কেউ যদি বাসায় হলিউডের ম্যাট্রিক্স বা ডাইহার্ট ছবির সিডি নিয়ে দেখেন এবং পাশাপাশি খোঁজ-দ্য সার্চ দেখেন তাহলে তার কাছে এই ছবির অ্যাকশন দৃশ্যগুলোকে ভিডিও গেমসের অ্যাকশন দৃশ্যের মতোই মনে হবে। তাহলে প্রশ্ন জাগে বিশাল বাজেটের এই ছবিতে কোথায় খরচ করেছেন পরিচালক? আমেরিকান দু-একজন পথচারীকে পাসিং শর্টে অভিনয় করিয়ে বলা হলো ছবিতে আমেরিকান অভিনেতা আছে। অন্য দেশের দু-একজন অখ্যাত অভিনেতা অবশ্য ছিলেন। পরিচালক নিজে কামরুল চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অভিনয় দেখে মনে হয়েছে আশে পাশের সবার প্রতি তিনি বিরক্ত। অবশ্য বিরক্তির কারণ জানা যায়নি (এই কারণে ছবির নাম খোঁজ দেয়া হতে পারে)। অভিনেতা জাবেদ দিন বদলের এই ছবিতে অভিনয় করেছেন যথারীতি ঠোঁটে লাল রঙের লিপস্টিক মেখে।
ছবির ভালো কিছু দিক আছে। গানগুলো ভালো হয়েছে। যদিও গল্পের সঙ্গে এইরকম গানের কোন কারণই খুঁজে পাওয়া যায়নি। (সম্ভবত এই কারণেও ছবির নাম খোঁজ দেয়া হয়েছে)। পোষাকের ক্ষেত্রে সবাইকে কম বেশী সচেতন মনে হয়েছে। সোহেল রানা এবং ববির অভিনয় আলোচনা করার মতো।
(লেখাটি ১৫-৩০ এপ্রিল সংখ্যা, "বিনোদোন বিচিত্রা"য় প্রকাশিত)
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মে, ২০১০ সকাল ১১:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



