ক্রিকেট খেলাটা বুঝতে একটু দেরীই হয়ে গেল , দোষটা অবশ্য আমার নয় , দোষটা ক্রিকেট না চেনা পৃথিবীর সে অংশের, যেখানে আমি দীর্ঘদিন কাটিয়েছি ।
ছোটবেলা থেকেই আমি ছিলাম পত্রিকার পোকা , খেলার পাতাগুলি পড়তে পড়তে যেমন উইপোকার মত কাটতাম , তেমনি খেলার রেজাল্ট মুখস্থ করে , খাতায় লিখে বা কাউকে বলে জাবর কাটতাম গরুর মত।
৯৪ সালের কথা , ভোরবেলা ইত্তেফাক আসত , আমি জীবনে প্রথম বাংলা পত্রিকা পড়ছি । ইত্তেফাক বরাবরই খেলার খবরে ফাঁকি দিত , দেশের বাইরের খেলাধুলা নিয়ে যা এক আধটা খবর থাকত সেটাও ক্রিকেট নিয়ে । খবর পড়ে পড়ে ক্রিকেট জ্ঞান বাড়াতে মনযোগ দিলাম ।
স্কোরকার্ড আর রেজাল্ট দেখে ক্রিকেট বুঝা চাট্টিখানি কথা নয় । সবচেয়ে খটকা লেগে যেত রানসংখ্যা দেখে । একদল যদি করে ২০৭ , বেশিরভাগ সময়ই বিপক্ষ দল করে ২০৮ । আমি ভাবি , একি আজিব অলৌকিক সুলেমানী ব্যাপার স্যাপার ? একদল যে স্কোর করে আরেকদল কি করে ঠিক তার এক বেশি স্কোর করে ? বলা দরকার , দু'দল আলাদা করে ব্যাটিং করে সে কথাটা তখনও জানা হয়ে ওঠেনি , ফুটবলের মত ক্রিকেটকেও আমি ভাবতাম ৫/৬ ঘন্টার খেলা , যেখানে দু'দল হাতাহাতি করে সময় সুযোগ বের করে যার যার মত রান বাড়িয়ে নেয় ।
ক্রিকেট-কান্ডের এহেন বেহাল দশা অবশ্য খুব বেশিদিন স্থায়ী হল না । মোটামুটি ৫/৬ মাসের মাঝে ক্রিকেট খেলার অলি-গলি চেনা হল তো বটেই , অলি গলির পক্ষ প্রতিপক্ষ নিয়েও ভাল একটা ধারণা হয়ে গেল ।
৯৪/৯৫ এর সে সময়টায় ক্রিকেট খেলত মোটে ৯ টি দেশ । জিম্বাবুয়ে দলটি তখন ৯ নম্বরে , তাদের কম্ম ছিল সবার কাছে নিয়ম করে হারা । নিয়মিত হারলেও জিম্বাবুয়ে ফেলনা দল ছিল না , গো-হারার বদলে তারা চেষ্টা করত সম্মান রেখে ছাগ-হার হারত । শ্রীলংকা দলটি তখন ৮ নম্বরে । তাদের যত ওস্তাদি , পন্ডিতি মোটামুটি সবই চলত জিম্বাবুয়ের উপরে । বাকি দলগুলি শ্রীলংকাকে খানিক বেশি সমীহ করত বলে জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ছিনিমিনি খেললেও লংকার মানের দিকে খেয়াল রেখে তাদের নিয়ে ছিনিমিনির বদলে কিঞ্চিত সম্মানজনক ছোটখাটো ছেলে-খেলায় মেতে উঠত।
ক্রিকেট খেলার ধাঁচটা তখন অন্যরকম ছিল বটে । কোনদল ২৪০ করলেই বিজয় নিশ্চিত ভেবে গোঁফে তা দিত , কখনও কেউ ভুলে ৩০০ করে ফেললে আমরা বিস্ময়ে ভাষা হারাতাম । আর ২০০ করলে চড়া গলায় বলতাম -- "ফাইটিং স্কোর"
পুরো ৯৪ সালটি জুড়ে আমার ক্রিকেট শেখার পর ৯৫ সালেও শ্রীলংকা-জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দুনিয়ায় দুধ-ভাত টিমই রয়ে গেল । ক্রিকেট বিশ্বের বড় ৭ টি দেশের যত রাগ , যত ক্ষোভ , যত ঝড় যেন এই লংকা আর জিম্বাবুয়ের ওপর । কারও ফর্ম খারাপ হলে ফর্ম ফেরাতে শ্রীলংকা, টানা সিরিজ হারার কষ্ট ভুলতে শ্রীলংকা , আর রেকর্ড করতে চাইলে জিম্বাবুয়ে ।
আমার জীবনের প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ -- ৯৬ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার মাস চারেক আগের ঘটনা । ৯৫ এর অক্টোবরে শারজাহ বসল ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্ট , অংশ নিল পাকিস্তান , শ্রীলংকা আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ । শারজাহকে পাকিস্তান তখন ভাবে মামার বাড়ি , আর শারজাহর কাপগুলি যেন তাদের বাপের বাড়ির সম্পত্তি । টুর্নামেন্টে বাজি ধরার মত কিছু যদি থেকে থাকে , তবে সেটা একটাই -- তিন নম্বর বাচ্চা শ্রীলংকাকে পাকিস্তান ওয়েস্ট ইন্ডিজের কে কত বেশি ধোলাই দেবে।
লংকাকে আমি তখন ডাকতাম মেহনতী-মুটে-মজুরের দল । মুটে মজুররা ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় করেছিল বলশেভিক বিপ্লব । মেহনতী শ্রীলংকা হয়ত ভাবল এই অক্টোবরে তারাও বিপ্লব করবে । প্রথম ম্যাচেই পাকিস্তানকে হারিয়ে দেয়ার পর খানিক বিস্মিয়ের জন্ম দিল , কিন্তু "সাম টাইম শিট হ্যাপেনস" ভেবে কেউই সেভাবে গুরুত্ব দিল না । ক্রিকেট বিশ্ব তখনও জানে না কি বিস্ময় অপেক্ষা করছে । শ্রীলংকা ইন্ডিজের ম্যাচটিতে মনে হল লংকা-ধোলাইয়ের পুরনো প্রচলিত ইনসাফি নিয়ম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে সময়টায় ৩০০ রান যেখানে প্রবাদ-প্রতীম , শ্রীলংকাকে মেরে ধরে ইন্ডিজ করে ফেলল ৩৩৩ । বিপক্ষ শ্রীলংকা বলে আমরা কেউ অবাক হলাম না । লংকানদের আস্পর্ধা সব সীমা ছাড়িয়ে ৪৯.২ ওভারে পৌঁছে গেল ৩২৯ রানে । ভাগ্য সেদিন অবশ্য সহায় হল না , জিততে জিততেও হেরে গেল তারা। কিন্তু টনিক সেবার পেল শ্রীলংকা স্রষ্টাই জানেন , ফাইনাল সহ পরের দু'টি ম্যাচে পাকিস্তান আর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারল নৃশংস কায়দায় ।
রাবণদের পুনর্জীবন দেখে আমি রীতিমত উল্লসিত হয়ে উঠলাম , শারজাহ-বিস্ময়ে তখন আমার চোখে ঘোর কাটেনি। ক্রিকেট দুনিয়া তখন খানিক নড়ে চড়ে বসলেও ভাবল লংকা-ভেল্কির সেই শেষ , সারাজীবন জিম্বাবুয়েকে হারানো দলটির বেলুন ফুটো হতে কতক্ষণ ?
ডিসেম্বরে শ্রীলংকা গেল অস্ট্রেলিয়ায় , বিতর্কে আর উত্তেজনায় ভরা অনন্য একটি সিরিজের জন্ম। মুরালিধরণের বলে নো ডাকায় শ্রীলংকা মাঠ ছেড়ে শুধু বেরোলই না , অস্ট্রেলিয়াকে ২ ম্যাচে হারিয়ে সিরিজও ড্র করে ফেলল ।
আমি তখন ছোটমানুষ , ক্রিকেটের মারপ্যাঁচ বুঝি না । শুধু বুঝি একটা দল ২/৩ মাসে হঠাৎ আহত বাঘের মত একের পর এক শিকার করে চলেছে । বিপুল জোশে বন্ধুদের বললাম , শ্রীলংকাই চ্যাম্পিয়ন ।
বোদ্ধারা অবশ্য আবেগের লাগাম হারালেন না , শ্রীলংকাকে হিসেবের মাঝে রাখলেন না প্রায় কেউই, স্যার রিচার্ড হ্যাডলি শুধু নিচু স্বরে বললেন -- "ডার্ক হর্স"
উপমহাদেশের মাটিতে ৯৬ বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসছে । হঠাৎ করে অস্ট্রেলিয়ার কি হল , লঙ্কায় যেতে ভয় লাগে , তামিলরা যদি মারে -- এসব হেন-যেন-তেন কারণ দেখিয়ে তারা লংকায় যাবে না বলে ঠিক করল । পরের দিনই তাদের পথ ধরল ওয়েস্ট ইন্ডিজ । গ্রুপ পর্বে শ্রীলংকার বড় ম্যাচ প্রতিপক্ষ বলতে রইল কেবল ভারত ।
ভারতের বিরুদ্ধ খেলাটি হল দিল্লীর ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়ামে । শচীন টেন্ডুলকারের অনবদ্য ১৩৭ রানের উপর ভর করে ভারত সেদিন সংগ্রহ করল ২৭০ রান । ১৯৯৬ সালে , ২৭০ রান চেজ করা রীতিমত অসম্ভবতম কাজগুলির একটি । খেলার মাঝ বিরতির পর টিভি খুলতে খানিক দেরী করে ফেললাম -- যে বিস্ময়কর ঘটনা দেখলাম টি-২০ এর যুগে সেটা বুঝিয়ে বলার সাধ্য নেই আমার । ৪.২ ওভারে শ্রীলংকা ১ উইকেট হারিয়ে ৪৯ রান তুলে ফেলেছে , স্কোর ঠিকমত দেখছি কিনা , সেটা বুঝতে আমার আদতেই দু'চারবার চোখ কচলাতে হল । ২৫ , ৩০ না , একেবারে ৪৯ রান । পাঠকদের অবগতির জন্য বলি , প্রথম ৪ ওভারে ২৫ রান তুললেই তখন ধরা হত স্বপ্নীল সূচনা , ২০ রানকে হলে অনবদ্য ।সে ম্যাচটি জিতেই ছাড়ল শ্রীলংকা , ৭ নম্বরে নামা হাশান তিল্কারত্নে করলেন অপরাজিত ৭০ ।
অস্ট্রেলিয়া-ইন্ডিজের বিরুদ্ধে লংকার রাগটা গিয়ে পড়ল বুঝি কেনিয়ার উপর , কেনিয়া সবে তখন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়েছে , সেসবের কোন তোয়াক্কা করল না লংকানরা । কেনীয়দের চাবকে তুলল তৎকালীন রেকর্ড ৩৯৮ রান ।
ক্রিকেট দুনিয়া তখন একটু নড়ে চড়ে বসেছে ।অন্য দলগুলির কাছে লংকা দলটি তখন হয়ে উঠেছে মহাযন্ত্রণা , দলটির ৮ টি উইকেটের পতন ঘটিয়েও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যায় না , ৯ নম্বরে নামেন কুমারা ধর্মসেনা । ১ থেকে ৯ পর্যন্ত লম্বা সলিড ব্যাটিং লাইন আপ । প্রথম ৫ ওভারে বলকে পিটিয়ে দড়ির ওপারে আছড়ে ফেলে ৫০ রান না তুললে যেন জয়সুরিয়া - কালুভিথারানার মৃত্যু পরোয়ানা জারি হয়।
জয়সুরিয়া শব্দটার মার-দাঙ্গার মিলেমিশে গেছে বিশ্বকাপ শুরুর পরেই , ইংল্যান্ডের সাথে কোয়ার্টার ফাইনালে জয়সুরিয়া শব্দটির অর্থ যেন আরেকবার বদলাল -- ইংল্যান্ডের বোলারদের নাকির পানি , চোখের পানি একাকার করে জয়সুরিয়া বল অন্তত দু'বার বল আছড়ে ফেললেন বিশাল আকৃতির স্টেডিয়ামের ছাদে ।
ফ্যান্টাসীর জগতে বিচরণ করতে থাকা লংকাকে সেমিফাইনালে মাটিতে নামাবার দায়িত্ব নিল ভারত । ইডেন গার্ডেন প্রাঙ্গনে ১ লাখ ১০ হাজার দর্শকের সামনে জয়সুরিয়া-কালুভিথারানা যখন প্যাভিলিয়নের পথ ধরেছেন ,লংকান স্কোরবোর্ডে রান মাত্র ১ । অনেকেই ততক্ষণে , কলম দিয়ে খাতায় লংকা নামটি কেটে দিয়েছেন , কিন্তু পুনর্জন্ম পাওয়া রাবণের ১১ মাথার মোটে তো দু'টো কাটা গিয়েছে । ৩ নম্বরে নেমে অরবিন্দ ডি সিলভা ৬৬ রানের ইনিংসটি কি মোহনীয় ছিল , সেটা লিখে বোঝানো সত্যিই দুষ্কর । আদর্শ ক্রিকেট বুকে স্থান করে নেবার দাবীদার ১৪ টি বাউন্ডারির প্রতিটি যেন ইঞ্চি ইঞ্চি করে মাপা , নিপুণ কারিগের সযতন হাতে মেপে মেপে আঁকা যেন প্রতিটি শট। ২৫১ রানের টার্গেট নিয়ে ভারত যখন নামছে , তখনও কেউ জানেনা কি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য । ২ উইকেটে ৯৯ পর্যন্ত পৌছুল ভারত...
আচমকা ঘুরতে শুরু করল জয়সুরিয়া - মুরালি - ধর্মসেনার বল , এরপর ইডেন গার্ডেনে ঘুর্ণি-ঘূর্ণি-ঘূর্ণিঝড়। ঘোর কাটতে না কাটতেই ভারতবর্ষ দেখল ১২০ রানে ৮ জন ব্যাটসম্যান সাজঘরে ফেরত গেছেন । সম্বিত ফিরে পাওয়া দর্শকদের গ্যালারি থেকে মাঠ বরাবর ছুটে আসল বোতল , পটকা আরও অনেক কিছু । , খেলা শেষ হল না ... , ইডেনের কপালে সেঁটে গেল কলংকের দাগ
লংকান রুপকথার শেষ বাক্যটি লেখা হল তার তিনদিন পর, বিশ্বকাপ ৯৬ এর ফাইনালে , ধ্বংসযজ্ঞের সর্বশেষ শিকারের খাতায় লেখা হল অস্ট্রেলিয়ার নাম...
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা এপ্রিল, ২০১১ রাত ১২:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




