ফাঁসির কাষ্ঠ প্রস্তুত ছিল । সেটা অসাধারণ কিছু ছিল না, তবু কেন জানি আজ ওটাকে অসাধারণ লাগছে । ফাঁসির আসামী ভীত কিংবা চঞ্চল হয়েও উঠেনি । কেমন যেন নিরুত্তাপ এবং সুখি দেখাচ্ছিল তাকে । তার মত সৌভাগ্য অর্জন করার মত মানুষ পৃথিবীতে কমই আছে । জেলার থেকে শুরু করে সবাই তার ভাগ্যে ঈর্শান্বিত কিংবা ভীত । শুধুমাত্র বিচারক ছিল অটল । বিচারককে সবাই অন্ধ মনে করলেও বিচারক ভেবেছিল এটাই তার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক পথ হয়েছে । ঐ নিরুপদ্রবকারী নপুংশকরা তার ভয়ে কিছু বলতে পারবে না । কারন সে যে এখানের সৃষ্টিকর্তা । তাকে অমান্য করার সাহস সবার নাই । সবাই পারে না । তাই অবৈধ সৃষ্ট অসঙ্খ্য সারমেয়দের চেচামেচি থামাতে তাকে মাংস দিতেই হত ভেবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিচারক । আজ স্বস্তির দিন । আরামের দিন । নিশ্চিন্তে ঘুমানোর দিন ।
সে সারাজীবন নিরুত্তাপ ছিল । গ্রামের সবচেয়ে সুবোধ যুবক ছিল । ছিল ভালবাসার পাত্র । হঠাৎ করেই তার পরিবর্তন । না ! আবার হঠাৎ করেও বলা যায় না । তার পরিবর্তন হয়েছিল তার মায়ের আত্মাহুতির পর । যে মাকে ধর্ষন করেছিল প্রতাপশালিরা , যারা পালিয়েছিল তাদের কার্য উদ্ধারের পরেই । নিজের জীবন বাঁচাতেই । যুবক ঘুরে ফিরেছিল বিচারকদের দ্বারে দ্বারে । কাজ হয়নি বা হতে দেয়নি সেই সব জারজ প্রতাপশালিরা । তখন বিচারক সহমর্মিতা জানায়নি তার জন্য তার মায়ের জন্য । যুবকটি এসবও মেনে নিয়ে মাকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছিল । তার মা প্রায় ভুলে যেতে বসেছিল পুরোনো অধ্যায় । কিন্তু প্রতাপশালিদের ফেলে যাওয়া বির্যে জন্মানো নপুংশকের দল আবার পুরোনো গীত গেয়ে চলছে । তারা পুরোনো ক্ষত আনার প্রচেষ্টায় ছিল । তারা নিজেদের স্বার্থে গুনগান করে যাচ্ছিল সেইসব জারজদের । যাদের কারনে এই নপুংশক গুলো আজ জারজ । হয়ত প্রতাপশালিরা নপুংশকদের বির্য দানের কথা বলেছিল বলে আজ তাদের এত আস্ফালন । সে এটাও মেনে নিয়েছিল অনেক কষ্টে । তার বাঁধ ভাংতে শুরু করে যেদিন থেকে নপুংশকের দল তার মায়ের পিছনে লেগেছিল । তার নতুন রঙ্গিন মাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল আর অবজ্ঞা করে যাচ্ছিল প্রতিনিয়ত তখন সে মেনে নিতে পারে নি মায়ের দুঃখ । কোন সত্যিকারের ছেলে তা পারে না । তাই ধারালো দা নিয়ে ছুটে গিয়েছিল সে । দা'কে রক্ত পান করিয়ে তবেই সে শান্ত হয়েছিল । সে সব কষ্ট মেনে নিতে পারে যেমন সে মেনে নিয়েছিল তার প্রিয় মানুষগুলোর হারানোর ব্যাথা, তবে সে মানতে পারেনি, কখনোই পারবেনা তার মায়ের অপমান ।
এর পরেও সে খারাপ হয়ে যায়নি কারো কাছে বরং তার প্রতি মানুষের ভালবাসা বেড়েছেছিল এবং ভীত হওয়ার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই সুবিধাবাদি নপুংশকদের জন্য । তার প্রতিশোধস্পৃহাকে সাধুবাদ জানিয়েছিল সবাই । তার মত করে করতে পারে না সবাই । পারে না জঞ্জাল সাফ করতে, পারে না স্বর উচ্চকিত করতে । তাই নিরুপদ্রব নপুংশকের দল চুপচাপ সমর্থন দিয়েছিল । তারপরেও সে আজ কাঠগড়ায় । নাহ ! তাকে এসে ধরতে পারেনি বিচারকের লোকজন । সে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পন করেছে তার ভায়ের জন্য, কারন তার ভাই ও যে সুবিধাবাদি নপুংশকের দলে ।
তার মৃত্যুদন্ডের দিনের কথা প্রচার করেনি বিচারক এবং প্রভাবশালিরা । কারন তার ভীত । তারা জানে একটা যুবকের লাশ থেকে কয়েকশ কিংবা হাজারের জন্ম হয় । তারপরেও হাজার হাজার জনতা কিভাবে যেন জেনে গেছে, তারা জেল গেটে অপেক্ষায় আছে যুবকের জন্য । কারন তাদের বিশ্বাস সৎ সাহসী মানুষের মৃত্যু হয় না । তারা বরন করে নিয়ে যেতে এসেছে সেই সৎ নির্ভিক যুবককে । তাদের মনে কোন দুঃখ বা ক্ষোভ ছিলনা, ছিল আত্মবিশ্বাস ।
জেলার এই শীতেও প্রচন্ড ঘামছে । সে জানে না এর পরিনতি । তার ভয় হচ্ছে, অজস্র জনতার বিশ্বাস তার মাঝেও সংক্রমিত হচ্ছে দেখে । যুবক এখনো শান্ত । সে যেন জানে তার ভবিষ্যত । জেলারের ভয় যুবকের আত্মবিশ্বাস দেখেও । সে আসলে বুঝতে পারছেনা কি করবে ।
জেলারের ভীত শঙ্কাকে কাটিয়ে যুবক নিজেই এগিয়ে যায় দৃপ্ত পদে ফাঁসিকাষ্ঠের দিকে । তার মনে আজ শান্তি কাজ করছে । তার প্রতি এবং তার মায়ের প্রতি মানুষের ভালবাসা দেখে । সে জানে এটা মৃত্যু নয়, এটা তার জন্য জন্ম । প্রতিটা মায়ের সন্তান হয়ে ।
উৎসর্গঃ প্রিয় লেখক, ব্লগার এবং মানুষ হাসান মাহবুব এবং রাজসোহান কে ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জুন, ২০১২ রাত ১২:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



