somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দারিদ্র্য সর্ম্পকে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

০৯ ই নভেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৪:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




দারিদ্র্যের দুর্ভোগকে আল কুরআনে স্রষ্টার প্রতি বান্দার আনুগত্যের পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, আল্লাহ বলেছেন,
`আমি তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের য়তি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব। তুমি সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদেরকে।' (সূরা আল বাক্বারাহ : আয়াত-১৫৫)।

এজন্য দেখা যায়, রাসূলের (সা.) এর যুগে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে মুসলমানগণ কঠিন দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করেছেন। এমনকি পরিস্থিতি এতটাই নাজুক ছিল যে, কখনও কখনও আল্লাহর রাসূলের ঘরেও এক নাগারে কয়েকদিন পর্যন্ত চুলো জ্বলেনি। কিন্তু মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর মুসলমানদের অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। এমনকি একদা মহানবী আদী বিন হাতিম তায়ীকে যে আগাম সু সংবাদ দিয়েছিলেন তা সত্যে পরিণত হয়েছিল, বুখারীতে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসের অংশবিশেষে মহানবী (স.) আদীকে বলেলেন, `তুমি যদি দীর্ঘ হায়াত পাও, তবে তোমরা অবশ্যই (পারস্য সম্রাট) কিসরার দন ভান্ডার জয় করবে। তুমি যদি দীর্ঘ হায়াত পাও, দেখবে মুঠো ভর্তি স্বর্ণ-রৌপ্য নিয়ে কেউ বের হবে কিন্তু দান করার জন্য কাউকে খুঁজে পাবে না।' (বুখারী। উদ্ধৃত করেছেন, ড. ইউসুফ আল-কারযাভী: দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলাম: অনুবাদ মাহমুদুল হাসান, সেন্টার ফর রিসার্চ অব দ্যা কুরআন এন্ড সুন্নাহ, চট্টগ্রাম,বাংলাদেশ, ২০০৩, পৃ-১৮৮)। রাসূলুল্লাহ (স.) এর ভবিষ্যত বাণী অনুযায়ী তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানায় সত্যি সত্যিই দারিদ্র্য নির্মূল হয়েছিল। দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) এর খিলাফাতকালেই এই সুফল সুস্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে এবং ওমর ইবনে আব্দুল আযিযের (রা.) শাসন আমলে দারিদ্র্য সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে বস্তুগত সম্পদের ঘাটতির কারণে দারিদ্র্য হয় না, কারণ আল্লাহ তায়ালা বিশ্বের সকল মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ সৃষ্টি করে রেখেছেন, আল্লাহ তায়ালা `পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোন প্রাণী নেই, যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহ নেননি।' (সূরা হুদ : আয়াত-১৫৫)

পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে আল্লাহ তায়ালা নিজেকে `রাব্বুল আলামীন' (সারা বিশ্বের প্রতিপালক) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ যদি পৃথিবীতে দারিদ্র্য দূরীকরণোপযোগী সম্পদ না দিয়ে থাকেন তবে তিনি `রব' (প্রতিপালক) হবেন কিভাবে?

সুতরাং একথা বলার অপো রাখে না যে, পৃথিবীতে সম্পদের অভাবে দারিদ্র্যের সৃষ্টি নয় বরং দারিদ্র্যের সংকট মানুষের তৈরি।

পবিত্র কালামে হাকিমে আল্লাহ একথাই বলেছেন, `জলে ও স্থলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে।' (সূরা আর রূম: আয়াত-৪১)

সমাজের দারিদ্র্য এক শ্রেণীর মানুষের মানবিক দায়িত্বহীনতার পরিণতি। এ জন্য পবিত্র কুরআন অভাবী লোকের দারিদ্র্যকে তাদের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে স্বীকার করেনি, বরং অপোকৃত বিত্তবানদের দায়িত্বহীনতার প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করেছে। পবিত্র কুরআনে এসেছে, `আমরা তোমাদেরকে জমিনে মতা ও এখতিয়ার দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং তোমাদের জন্য এখানে জীবনের সামগ্রী করে দিয়েছি। কিন্তু তোমরা খুব কমই শোকর আদায় কর।' (সূরা আরাফ: আয়াত-১০)
`এবং তাতে জীবিকা সংগ্রহ করে দিয়েছি তোমাদের জন্যও এবং সেই অসংখ্য মাখলুকের জন্য, যাদের রিজিকদাতা তোমরা নও।' (সূরা আল হিজর: আয়াত-২০)

পবিত্র কুরআন বিত্তবানদের প্রতি বার বার সতর্কবাণী উচ্চারণ করে তাদের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে । বলা হয়েছে, `এবং তাদের অর্থ-সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের (অথবা যারা কোন কারণে সাহায্য প্রার্থী হয় না) অধিকার রয়েছে।' (সূরা আয যারিআত: আয়াত-১৯)

সমাজে এমন এক শ্রেণীর লোক রয়েছে যারা দারিদ্র্যকে আল্লাহ প্রদত্ত অনিবার্য নিয়তি অর্থাৎ নিজেদের ভাগ্য বা তাকদির মনে করে এবং নিজের অবস্থার উন্নতির প্রচেষ্টাকে অনৈতিক মনে করে। কিন্তু এ ধারনা ইসলাম প্রত্যাখ্যান করেছে। পবিত্র কুরআন আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, `মানুষ তাই পায় যা সে করে।' (সূরা আন নজম: আয়াত-৩৯)

আল কুরআনে দারিদ্র্যকে নিন্দা করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরা আন আম এর ৪২-৪৩ নং আয়াতে বলেন,
`আর আমি আপনার পূর্বেও বহু জাতির নিকট রাসূল প্রেরণ করেছি; অতপর তাদেরকে দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্ট দ্বারা পীড়িত করেছি, যাতে তারা বিনীত হয়। অতপর আমার শাস্তি যখন তাদের উপর আপতিত হল তখন তারা কেন বিনীত হল না? অধিকন্তু তাদের হৃদয় কঠিণ হয়েছিল এবং তারা যা করছিল শয়তান তা তাদের দৃষ্টিতে শোভন করেছিল।'

দারিদ্র্যের কারণে মানুষ ঋণ গ্রহণ করে। আর ঋণ মানুষের নৈতিকতার উপর বিরূপ ফেলে। মানুষের নৈতিকতার উপর ঋণের কুপ্রভাব সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, `যে লোক ঋণ গ্রহণ করে, সে যখন কথা বলে তখন মিথ্যা বলে আর যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তা ভঙ্গ করে।' (সূত্র: সহীহ আল বুখারী, কিতাবুল ইসতিক্বরাদী ওয়া আদায়িদ দুয়ুন, হাঃ নং-২২২২; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল মাসাজিদি ও মাওয়াদিয়িস সালাত, হাঃ নং-৯২৫, নাসায়ী, কিতাবুস সহু, হাঃ নং১২৯২ এবং আবু দাউদ, কিতাবুস সালাত, হাঃ নং-৭৪৬)।
চরিত্রের উপর দারিদ্রের কু-প্রভাবের প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহর রাসূল (স.) অন্যত্র বলেন, `দান যতণ তা দান থাকে গ্রহণ কর। যখন তা ধর্মের ব্যাপারে ঘুষে পরিণত হয়, তা গ্রহণ করো না। তবে তোমরা তা বর্জন করতে পারবে না, দারিদ্র্য ও অভাব তোমাদেরকে বিরত থাকতে দিবে না।' (বুখারী)

এজন্য মহানবী (স.) দারিদ্র্য থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন:
`হে আল্লাহ!, আমি তোমার কাছে দারিদ্র্য, অভাব ও নীচতা থেকে আশ্রয় চাই।' (আবুদাউদ, কিতাবুস সালাত, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস, হাঃ নং-১৩২০)।

জনাব এম কবীর হাসান এবং এ এইচ দেওয়ান আলমগীর লিখিত একটি প্রবন্ধে তাই যথার্থই মন্তব্য করা হয়েছে, `Islam looks upon poverty as a religious and social problem, which pushes a person to lowliness, sin and crime' (ইসলাম দারিদ্র্যকে ধর্মীয় ও সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে যা মানুষকে নীচতা, পাপাচার ও অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়।)

ইসলাম তাই দারিদ্র্যকে ঘৃণা করে। আল্লামা ইউসুফ আল কারযাভী বলেন, `পবিত্র কুরআনে কোনও একটি আয়াতে বা রাসূলুল্লাহর (স.) এর কোন একটি বিশুদ্ধ বাণীতে দারিদ্র্যের গুণগান করা হয়নি। যেসব হাদিসে দুনিয়া বিমুখ হওয়ার কথা বলা তার অর্থ দরিদ্রতার প্রশংসা করা নয়। কারণ, দুনিয়া হতে বিমুখ হতে হলে দুনিয়া তার কাছে থাকতে হবে। প্রকৃত দুনিয়া বিমুখ হলো সে, যে অর্থের মালিক হয়েও অর্থকে হাতে স্থান দিয়েছে, অন্তরে স্থান দেয়নি।' (ড. ইউসুফ আল কারযাভী : ইসলামে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সৃজন প্রকাশনী লিঃ, ঢাকা, পৃ-২৮)।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×