প্রথম ১১ই মার্চ ১৯৪৮ দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়া হয় ১৯৪৭ এর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ধারাবাহিকতায়। হরতাল পালন কালে রাজশাহী কলেজের ছাত্ররা মিছিল বের করে। সেই মিছিলেই হামলা করে কিছু নাম না জানা লোক ফায়ার বিগ্রেডের মোড়ে। সেই মিছিলেই কয়েকজন ছাত্রনেতা আহত হন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ফজলুর রহমান, আব্দুল লতিফ, ব্রতীশ ঘোষ এবং অনেকে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, ভাষা আন্দোলনে রাজশাহী কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা কেন এত এগিয়ে ছিল? প্রখ্যাত ধ্বনি বিজ্ঞানী মুহম্মদ আব্দুল হাই, প্রখ্যাত পন্ডিত ও গবেষক ডঃ মুহম্মদ এনামুল হক, প্রখ্যাত পন্ডিত ও গবেষক ডঃ গোলাম মকসুদ হিলালী রাজশাহী কলেজে অধ্যাপনার ফলে এখানকার ভাষা সৈনিকদের তাদের নিকট থেকে সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। আর তাই, ১৯৪৮ সাল থেকেই রাজশাহীর ভাষা আন্দোলন "রাজশাহী কলেজ" কেন্দ্রীক ছিল।
রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে আতাউর রহমান, মুহম্মদ একরামুল হক (১৯৪৮ সালের শেষের দিকে) এবং কাশেম চৌধুরী (পরবর্তীতেগ্রেফতার হন) উল্লেখযোগ্য। হাবিবুর রহমান শেলী ও মুহম্মদ সুলতান পড়া-শুনার জন্য ১৯৪৯ সালে ঢাকায় চলে আসেন। এর ফলে নেতৃত্বে শূন্যতা সৃষ্টি হলে ও এস. এ. বারী, গোলাম আরিফ টিপু, আহমদুল্লাহ চৌধুরী, মোহম্মদ আনসার আলী, মহসীন প্রমাণিক, আবুল কালম চৌধুরী, এস. এম. এ. গাফ্ফার, হাবিবুর রহমান প্রমুখের বলিষ্ঠ ভূমিকায় এ শূন্যতার সমস্যা প্রবল না হয়ে ভাষা আন্দোলনের গতি আরো তীব্র হয়ে ওঠে।
এরপর ৫২'র ২১শে ফেব্রুয়ারী নগরীতে দিনব্যাপী হরতাল পালন করা হয় এবং বিকালের দিকে ভুবন মোহন পার্কে রাজশাহী কলেজের ছাত্র হাবিবুর রহমানের সভাপতিত্বে জনসভা করা হয়। আর সেখানে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন ছাত্রনেতাগণ। এমন সময় খবর আসে ঢাকাতে পুলিশের গুলিতে ভাষা সৈনিকের মৃত্যুর খবর। ঠিক সেই সময় বক্তৃতা করছিলেন ছাত্রনেতা আব্দুস সাত্তার। তার জ্বালাময়ী বক্তৃতায় মুহুর্তেই জ্বলে উঠে পুরো বক্তৃতা মঞ্চ সাথে পুরো জনসভা। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে উপস্থিত সবাই সাথে পুরো ছাত্র সমাজ।
ঠিক একই তারিখে অর্থাৎ ২১ তারিখের দিবাগতরাতে রাজশাহী কলেজের (বর্তমানে যেখানে "নিউ হোষ্টেল" অবস্থিত, হোষ্টেল চত্বরের গেট দিয়ে ঢুকে হাতের বাঁয়ে) হোষ্টেল প্রাঙ্গনে কাদা-মাটি, কুঁড়ানো ইট-পাথর দিয়ে ছাত্র এবং কর্মচারীরা মিলে একটি শহীদ মিনার তৈরী করেন। এই মিনারের গায়ে লেখা হেয়ছিল রবী ঠাকুরের “উদয়ের পথে শুনি কার বানী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তাঁর ক্ষয় নাই”। এবং রাজশাহীর বিভিন্ন ভাষাসৈনিকদের মতে এটিই বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার। এই শহীদ মিনার নির্মাণের পূর্বের উক্ত হোস্টেল প্রাঙ্গণে এক ছাত্র সভায় মেডিকেল স্কুলে (বর্তমানের মেডিকেল কলেজ) ছাত্র এস এম এ গাফফারকে সভাপতি এবং হাবিবুর রহমান ও গোলাম আরিফ টিপুকে যুগ্ম সম্পাদক করে একটি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় । এ পরিষদের কর্মকর্তারাই ছাত্র সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর শহীদ মিনারটি নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো পরদিন সকালবেলায় পুলিশ সেটা ভেঙ্গে দেয়। মাটির সাথে মিশে যায় স্বল্পস্থায়ী প্রথম শহীদ মিনার।
পরদিন ২২ শে ফেব্রুয়ারী সংগ্রাম পরিষদ ঢাকায় নিহত ভাষা সৈনিকদের স্বরণে একটি সভা ডাকে ভুবন মোহন পার্কে। কিন্তু পেটোয়া পুলিশ আগে থেকেই সেটা ঘিরে রাখার জন্য পরবর্তীতে সেই সভা রাজশাহী কলেজ টেনিস কোর্টের প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভা থেকে তাৎক্ষনিক হরতালের ডাক দেয়া হয়। যাতে একাত্বতা প্রকাশ করেন রাজশাহী নগরীর বাসিন্দা, ব্যাবসায়ীরা তথা সর্বস্তরের জনগন। অচল হয়ে পড়ে নগরী।
এসবের ধারাবাহিকতায় ১৯৫৩ সালে ভুবন মোহন পার্কে আরেকটি শহীদ মিনার নির্মান করা হয় এবং অমর একুশে ফেব্রুয়ারী পালন করা হয়।
তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট, স্থানীয় প্রবীন ব্যাক্তিদের সাথে আলাপচারিতা।
ছবি সূত্র: প্রথম স্বল্পস্থায়ী শহীদ মিনারের ছবিটি পাওয়া গেছে এ্যাড. মহসিন প্রমাণিকের সৌজন্যে। যা পরবর্তীতে ইন্টারনেটেও আপ করা হয়। এছাড়াও এই ছবিটি নিয়ে এই ব্লগের কয়েকজন ব্লগার পূর্বে পোষ্ট লিখেছেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মার্চ, ২০১০ বিকাল ৪:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



