somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছিল স্বল্পস্থায়ী প্রথম শহীদ মিনারটি

২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ দুপুর ২:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভাষা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে রয়েছে রাজশাহীর গৌবর উজ্জ্বল ইতিহাস। এই ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই ধীরে ধীরে রচিত হয়েছে স্বাধীনতার সংগ্রামের চেতনা। যদিও ৫২'র সেই ভাষা আন্দোলনের উত্তাল ছিল ঢাকা কেন্দ্রীক। কিন্তু আরো যে বিভিন্ন জায়গায় এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল তার মধ্যে রাজশাহী অন্যতম। এই আন্দোলনে একাত্বতা ঘোষনা করেছিলেন সেখানকার বুদ্ধিজীবি, রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র সহ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। তারাও রাস্তায় নেমে এসেছিল। সেইকারণে রাজশাহী শহরের কিছু স্থান যেমন: রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী কলেজ হোষ্টেল চত্বর, ভুবন মোহন পার্ক, ফায়ার ব্রিগেডের মোড়, মেডিকেল কলেজ চত্বর স্বরণীয় হয়ে আছে।

প্রথম ১১ই মার্চ ১৯৪৮ দেশব্যাপী হরতালের ডাক দেয়া হয় ১৯৪৭ এর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ধারাবাহিকতায়। হরতাল পালন কালে রাজশাহী কলেজের ছাত্ররা মিছিল বের করে। সেই মিছিলেই হামলা করে কিছু নাম না জানা লোক ফায়ার বিগ্রেডের মোড়ে। সেই মিছিলেই কয়েকজন ছাত্রনেতা আহত হন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ফজলুর রহমান, আব্দুল লতিফ, ব্রতীশ ঘোষ এবং অনেকে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, ভাষা আন্দোলনে রাজশাহী কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা কেন এত এগিয়ে ছিল? প্রখ্যাত ধ্বনি বিজ্ঞানী মুহম্মদ আব্দুল হাই, প্রখ্যাত পন্ডিত ও গবেষক ডঃ মুহম্মদ এনামুল হক, প্রখ্যাত পন্ডিত ও গবেষক ডঃ গোলাম মকসুদ হিলালী রাজশাহী কলেজে অধ্যাপনার ফলে এখানকার ভাষা সৈনিকদের তাদের নিকট থেকে সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। আর তাই, ১৯৪৮ সাল থেকেই রাজশাহীর ভাষা আন্দোলন "রাজশাহী কলেজ" কেন্দ্রীক ছিল।

রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্বে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে আতাউর রহমান, মুহম্মদ একরামুল হক (১৯৪৮ সালের শেষের দিকে) এবং কাশেম চৌধুরী (পরবর্তীতেগ্রেফতার হন) উল্লেখযোগ্য। হাবিবুর রহমান শেলী ও মুহম্মদ সুলতান পড়া-শুনার জন্য ১৯৪৯ সালে ঢাকায় চলে আসেন। এর ফলে নেতৃত্বে শূন্যতা সৃষ্টি হলে ও এস. এ. বারী, গোলাম আরিফ টিপু, আহমদুল্লাহ চৌধুরী, মোহম্মদ আনসার আলী, মহসীন প্রমাণিক, আবুল কালম চৌধুরী, এস. এম. এ. গাফ্‌ফার, হাবিবুর রহমান প্রমুখের বলিষ্ঠ ভূমিকায় এ শূন্যতার সমস্যা প্রবল না হয়ে ভাষা আন্দোলনের গতি আরো তীব্র হয়ে ওঠে।

এরপর ৫২'র ২১শে ফেব্রুয়ারী নগরীতে দিনব্যাপী হরতাল পালন করা হয় এবং বিকালের দিকে ভুবন মোহন পার্কে রাজশাহী কলেজের ছাত্র হাবিবুর রহমানের সভাপতিত্বে জনসভা করা হয়। আর সেখানে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন ছাত্রনেতাগণ। এমন সময় খবর আসে ঢাকাতে পুলিশের গুলিতে ভাষা সৈনিকের মৃত্যুর খবর। ঠিক সেই সময় বক্তৃতা করছিলেন ছাত্রনেতা আব্দুস সাত্তার। তার জ্বালাময়ী বক্তৃতায় মুহুর্তেই জ্বলে উঠে পুরো বক্তৃতা মঞ্চ সাথে পুরো জনসভা। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে উপস্থিত সবাই সাথে পুরো ছাত্র সমাজ।

ঠিক একই তারিখে অর্থাৎ ২১ তারিখের দিবাগতরাতে রাজশাহী কলেজের (বর্তমানে যেখানে "নিউ হোষ্টেল" অবস্থিত, হোষ্টেল চত্বরের গেট দিয়ে ঢুকে হাতের বাঁয়ে) হোষ্টেল প্রাঙ্গনে কাদা-মাটি, কুঁড়ানো ইট-পাথর দিয়ে ছাত্র এবং কর্মচারীরা মিলে একটি শহীদ মিনার তৈরী করেন। এই মিনারের গায়ে লেখা হেয়ছিল রবী ঠাকুরের “উদয়ের পথে শুনি কার বানী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তাঁর ক্ষয় নাই”। এবং রাজশাহীর বিভিন্ন ভাষাসৈনিকদের মতে এটিই বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার। এই শহীদ মিনার নির্মাণের পূর্বের উক্ত হোস্টেল প্রাঙ্গণে এক ছাত্র সভায় মেডিকেল স্কুলে (বর্তমানের মেডিকেল কলেজ) ছাত্র এস এম এ গাফফারকে সভাপতি এবং হাবিবুর রহমান ও গোলাম আরিফ টিপুকে যুগ্ম সম্পাদক করে একটি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় । এ পরিষদের কর্মকর্তারাই ছাত্র সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর শহীদ মিনারটি নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো পরদিন সকালবেলায় পুলিশ সেটা ভেঙ্গে দেয়। মাটির সাথে মিশে যায় স্বল্পস্থায়ী প্রথম শহীদ মিনার।

পরদিন ২২ শে ফেব্রুয়ারী সংগ্রাম পরিষদ ঢাকায় নিহত ভাষা সৈনিকদের স্বরণে একটি সভা ডাকে ভুবন মোহন পার্কে। কিন্তু পেটোয়া পুলিশ আগে থেকেই সেটা ঘিরে রাখার জন্য পরবর্তীতে সেই সভা রাজশাহী কলেজ টেনিস কোর্টের প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভা থেকে তাৎক্ষনিক হরতালের ডাক দেয়া হয়। যাতে একাত্বতা প্রকাশ করেন রাজশাহী নগরীর বাসিন্দা, ব্যাবসায়ীরা তথা সর্বস্তরের জনগন। অচল হয়ে পড়ে নগরী।

এসবের ধারাবাহিকতায় ১৯৫৩ সালে ভুবন মোহন পার্কে আরেকটি শহীদ মিনার নির্মান করা হয় এবং অমর একুশে ফেব্রুয়ারী পালন করা হয়।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট, স্থানীয় প্রবীন ব্যাক্তিদের সাথে আলাপচারিতা।
ছবি সূত্র: প্রথম স্বল্পস্থায়ী শহীদ মিনারের ছবিটি পাওয়া গেছে এ্যাড. মহসিন প্রমাণিকের সৌজন্যে। যা পরবর্তীতে ইন্টারনেটেও আপ করা হয়। এছাড়াও এই ছবিটি নিয়ে এই ব্লগের কয়েকজন ব্লগার পূর্বে পোষ্ট লিখেছেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা মার্চ, ২০১০ বিকাল ৪:৪৪
৮টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×