ব্লগের একটি শিরোনাম দিয়েই শুরু করছি । সোনাব্লগের উম্মে সাবিত নামের আমাদের এক আপু শিরোনাম করেছিলেন যে “হিজাব পরলে , নামাজ পড়লে যদি আমি জামাতী হই তাহলে আমি জামাতী ” । আরেকজন প্রিয় পিচ্চি ব্লগার ও ছোট বোন মুক্তিকন্যা সুমাইয়া এই ক্ষুদ্র কবির কাছে বার্তাযোগে অভিযোগ করেছেন যে হিজাব পরাতে নাকি খারাপ ভাষায় কটাক্ষ করা হয়েছে , জামাতী কন্যা বলে গালি দেয়া হয়েছে , ওর খুব খারাপ লেগেছে । হ্যা খারাপ আমার ও লেগেছে । তবে এগুলো কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় । সচরাচর আমরা এই সমাজে এরকম বহু কচুরিপানাকে দুপাশে ঠেলেই সামনে সাতরে চলছি ।
নিজের একটি ঘটনা এখানে খুব প্রাসঙ্গিক । ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আমি একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকা শুরু করি । হল যেহেতু ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে তাই আমার হলে থাকার ক্ষেত্রে একমাত্র শর্তই হল রক্ত-মাংস , বাক-বিবেক লীগের রঙ্গে রঞ্জিত করতে হবে । আমি সহজ – সরল – সাধারণ মাটির খুব কাছাকাছি বেড়ে উঠা গ্রাম্য যুবক , অতশত না বুঝেই মেনে নিলাম । (হলজীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা অন্য এক্সময় তুলে ধরার ইচ্ছা আছে , এখানে শুধুই শিরোনামে সীমাবদ্ধ থাকার চেষ্টা করব ।)
হলে উঠার তিনদিনের মাথায় আমার ডাক পড়লো গ্রুপের বড় ভাইটির রুমে । আমি সর্বদাই সর্বাঙ্গে সর্বময় আত্মবিশ্বাসী । তাই নির্ভয়ে – নিসংকোচে ততক্ষনাতই গিয়ে হাজির হলাম । বড় ভাই দু এক কথা বলার পরই বললো _________
তোর দাড়ি এইরকম কেন ?
আমি হেসে বললাম এই তো ভাই , ভাল্লাগে না রেগুলার শেভ হতে । আর আমি এম্নিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি ।
তুই কি জানিস তোরে দেখলে শিবির মনে হয় ?
ইয়া আল্লাহ !! কী বলেন ভাই ,আমার বন্ধুরা তো আমারে চে বলেই ডাকে ।
তুই কি বাম রাজনীতি করিস ?
না ভাই , আমি ক্যাম্পাসে কোন রাজনীতির সাথেই জড়িত না ।
তুই কি নামাজ পড়িস ?
এইতো ভাই , চেষ্টা করি , ৫ ওয়াক্ত পড়তে পারি না ।
আচ্ছা তোর বাড়ি কই ?
জ্বী ভাই ?/ কুমিল্লা ।
হুমম -- । ঠিক আছে । যা ।
আর শোন নামাজ যেহেতু পড়িস হয় তাব্লীগের মত দাড়ি রাখবি নয় সবসময় শেভ থাকবি ।
এটুকুই
তারপর নিশব্দে চলে এলাম ।
এর মাঝে বহু ঘটন অঘটন দুর্ঘটনে সময় কেটে যায় ।এর মাঝে আমি কিছুদিন বাসায় থেকে আবার হলে অবস্থান করি । ২০১০ সালের মাঝামাঝি নামে আসে শেষ খড়গটি । কোন পুর্বসতর্কতা ছাড়াই এক ব্রিষ্টিভেজা রাতে প্রায় ২.০০ টার সময় ঘুম থেকে তুলে পিছন ফিরে তাকাবার সুযোগ বঞ্চিত করে ট্রাউজার পরিহিত অবস্থায় জুনিয়র ছেলেপেলে দিয়ে আমাকে হল থেকে বহিস্ক্রিত করা হয় । আমার বিরুদ্ধে চুড়ান্ত অভিযোগ ছিল- আমার গতিবিধি সন্দেহজনক এবং হলের কেউ আমার বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন তথ্য দিতে পারে নি ।
যাই হোক , খুব সরলভাবেই আমি ধরে নিই এই ধরণের নিপীড়ন্মুলক আচরণ করে শেষ বিচারে তাদের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি কি ? একজন যদি নামাজ পড়লেই , নিয়মানুবর্তী হলেই , দিনপঞ্জি লিখলেই মদ-গাজাকে পরিহার করলেই , সর্বোপরি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকলেই যদি তাকে জামাতী/শিবির অভিযুক্ত করা হয় তাহলে তো সব ভালোরা , সব আদর্শবাদীরা ক্রমান্বয়ে লীগারদের পরিহারই করবে , সে জামাতকে পছন্দ করুক আর নাই করুক । অন্যদিকে (জামাতের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়েই বলছি) জামাত বিশেষ কোন কাজ না করেও একটি নীরিহ শেনীর সমর্থন ও অনুকম্পা প্যাসিভলিই পাবে ।
জামাতী ভাইরা মনে করতে পারেন , ভালোই তো , লীগাররা যতই পীড়ণ করবে ততই সমর্থন বাড়বে । হ্যা আমিও একমত । এবং আমি এও পর্যবেক্ষণ করি যে আমাদের মত দুর্বল গণতন্ত্রের(যেখানে জনমতের সুস্পষ্ট বিভাজন নেই ) দেশে সরকার নির্যাতন না করলেই , অপকর্ম না করলেই , দুর্ণীতি না করলেই বিরোধী দল অস্বস্তিতে ভোগে । এটা রাজনীতি তথা ক্ষমতার অকাট্য নিয়ম । কিন্তু জামাতীদের সাথে লীগার কিংবা সুশীল কিংবা বামদের আচরণের অন্য একটা ভয়ংকর দিক আছে । জামাত যদি ইসলাম প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করে তাহলে তাদের ও পুণর্বিবেচনার প্রয়োজন থাকতে পারে । জামাত রাজনৈতিক দল এবং ইসলাম একটি ধর্ম পুনশচ জামাত ইসলামী রাজনৈতিক দল । তাই তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মুসলমানদের নিরাপত্তার জন্য রাজনীতি । ভারত বিরোধিতাও চলতে পারে যদি ভারত ইসলামের জন্য হুমকি হয় , অন্য কোন(ঐতিহাসিক) কারণে নয় । ইসলাম যদি ধর্মই হয় এবং রাস্ট্রক্ষমতা যদি মুসল্মান্দের নিরাপত্তার জন্যই হয় তাহলে একজন মুসলিম যিনি নিরাপদভাবে ধর্ম পালন করছেন বলে অনুভব করছেন , তিনি ইসলামী রাজনীতি থেকে দূরে থেকেও প্রক্রিত ইসলাম ও ইমানী বলে উজ্জীবীত থাকতে পারেন । তাই বলা যায় কঠিন বাধার সম্মুখীন না হলে মুসলীম মাত্রেরই ইস্লামী রাজনীতি আবশ্যক নয় । আর এখানেই লীগারদের দ্রিষ্টিভঙ্গীর মুল বিপদ । তারা যদি ইসলাম ও জামাতকে গুলিয়ে ফেলে ও কেউ সত্য কথা উচ্চারিলেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিশেবে যুদ্ধপরাধ ,জামাত ইত্যাদি উচ্চারনে ঢেকে দেয় তাহলে তারা ইসলামের অপুরণীয় ক্ষতি করবেন বলেই মনে করি । কেননা জামাত যদিও ইসলামের আদর্শে প্রতিষ্ঠিত ও ইসলামের মধ্যে অবস্থিত বলে দাবি করে , ইসলাম কিন্তু জামাতেই সীমিত নয় । জামাতকে যদি একটি তরী কল্পনা করা যায় , তাহলে ইসলাম হল একটি খরস্রোতা নদী যেখানে তরীটি স্রোতের অনুকুলে চলছে ।
যে কথাটি বলার জন্য এত ভনিতা তা হল – লীগারদের এহেন ধংসাত্মক দ্রিষ্টিভংগি জামাতকে শক্তিশালী করলেও ইসলামের মুল চেতনা বা বার্তাকে দুর্বল করে । এবং তাই একটা সময় আসে যখন কোন লীগার ধর্মকর্ম প্রক্রিত অর্থেই শুরু করে ও অনুতপ্ত হয় তখন সে হয় জামাতী হয়ে যায় নয় জামাতের বিরোধীতা করতে গিয়ে অবচেতনে ইসলামের বিরোধীতা করে । ‘আর্ট অব ওয়ার’ (অন্য একদিন লিখব) যারা না বুঝবে একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতি তাদের জন্য নয় ।
পুনশ্চ ঃ এই অভিমত সম্পুর্ণ অবধারণ ও প্রাথমিক । আপনাদের সুচিন্তিত যৌক্তিক মতামতের উপর সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




