বর্তমান শেয়ারবাজারকে ‘ফটকা বাজার’ বলে উল্লেখ করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, এখানে শেয়ার হাতবদলের মাধ্যমে কিছু লোককে বড় হওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। কোনো নীতিনৈতিকতার বালাই নেই এখানে। শেয়ারবাজারে কৃত্রিম অবস্খা সৃষ্টির মাধ্যমে রাজনীতিকে কলুষিত করে এক ধরনের ‘যোগসাজশের’ অর্থনীতির সৃষ্টি করা হয়েছে।
বেসরকারি এই গবেষণা সংস্খা বলছে, বর্তমান পুঁজিবাজারের বুকবিল্ডিং পদ্ধতি এখন সম্পদ আহরণ করছে না, সম্পদ তছরুপ করছে। তাই এ অবস্খার সাথে জড়িতদের অবশ্যই শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
চলতি ২০১০-২০১১ অর্থবছরের অর্থনৈতিক পরিস্খিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সিপিডি’র পক্ষ থেকে এ কথাগুলো বলেছেন সিপিডি’র সম্মানিত ফেলো (ডিস্টিংগুইশড ফেলো) অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। গতকাল মঙ্গলবার ধানমন্ডির সিপিডি’র কার্যালয়ে এ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানও এতে বক্তব্য রাখেন। অন্যান্যের মধ্যে সিপিডি’র হেড অব রিসার্চ ড. ফাহমিদা খাতুন, সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমও এ সময় উপস্খিত ছিলেন।
শেয়ারবাজার সম্পর্কে সিপিডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগের অন্য কোনো জায়গা না পেয়ে এখানে মানুষজন বিনিয়োগ করছে। তাই বলে দেশের অর্থনীতির এমন কোনো উন্নয়ন ঘটেনি যাতে শেয়ারবাজার এতটা চাঙ্গা হতে পারে। এখানে বুকবিল্ডিং প্রথা চালু করা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য কোনো রক্ষাকবচের ব্যবস্খা রাখা হয়নি। সিপিডি এই প্রথার বিরোধী নয়, কিন্তু বুকবিল্ডিংয়ের মধ্যে সম্পদ আহরণ হচ্ছে নাকি সম্পদের তছরুপ করা হচ্ছে তা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। বর্তমান পরিস্খিতিতে মার্কেট ক্র্যাশ করবে নাকি সংশোধন হবে তা এখন বিবেচ্য বিষয় নয়। বিবেচ্য হচ্ছে বর্তমান বাজার অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ এখানে সুশাসনের বড় ধরনের অভাব রয়েছে। রয়েছে আর্থিক খাতের সমন্বñয়হীনতা। পাশাপাশি রয়েছে বাজার বিকৃতি ও অ্যাসেট বাবল (সম্পদের বুদবুদ)।
শেয়ারবাজারে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করে সিপিডি’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি কোম্পানি এই পদ্ধতিতে শেয়ার ছেড়ে লেনদেনের প্রথম দিনই বাজার থেকে ৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আরেক কোম্পানির প্লেসমেন্ট শেয়ারধারীরা শেয়ার লেনদেন শুরুর ১৫ দিনের মধ্যে তা বিক্রি করে দিয়ে বাজার থেকে ৮৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা অনেকটা আত্মসাৎ করে নিয়েছেন। তার পর সেই শেয়ারের
সিপিডি’র প্রতিবেদনে ভারতের সাথে শর্তযুক্ত ১০০ কোটি ডলার ঋণচুক্তিকে ‘প্রাগৈতাহাসিক’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ভারতের সাথে যে ঋণচুক্তি করা হয়েছে তা অবশ্যই একটি সরবরাহ ঋণ বা সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট। তাই একে কখনো রেয়াতি ঋণ বলার কোনো কারণ থাকতে পারে না। আর বিশ্বে এ ধরনের শর্তযুক্ত ঋণ এখন আর কেউ নেয় না বললেই চলে। ঋণের শর্ত হিসেবে ৮০ ভাগ পণ্য সংশ্লিষ্ট দেশ থেকেই কিনতে হবে। এখানে আমাদের বলতে হবে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে দাম সঙ্গতি রেখে পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে হবে। ভারত থেকে সরকার যে সরবরাহকারী ঋণ নিতে যাচ্ছে তার শর্তাবলিও দেশের মানুষের কাছে প্রকাশ করা উচিত। তাহলে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবে ভারত আন্তর্জাতিক মূল্যে সরবরাহ ঋণ দিচ্ছে কি না। অথচ এটা অত্যন্ত চড়া সুদের ঋণ। সরবরাহকারী ঋণ অর্থনীতিকে বিকৃত করে। যা একটি প্রাগৈতাহাসিক ঋণও বটে।
অর্থনৈতিক পরিস্খিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সিপিডি’র গবেষণায় বলা হয়, দেশের অর্থনীতি নানামুখী চাপের মুখে রয়েছে। অর্থনীতিকে স্খিতিশীল রাখতে কৃষি ও সেবা খাতের চেয়ে শিল্প খাতকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ শিল্প খাতকে। তা না হলে সরকারের ঘোষিত জিডিপি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না। বর্তমান সরকার চলতি অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তবে তার জন্য বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ শিল্পায়ন করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে।
সিপিডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়েনি। কমেছে বিদেশী সাহায্য। রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে। বিদেশে চাকরি নিয়ে শ্রমিক যাওয়ার সংখ্যাও গত বছরের চেয়ে অনেক হন্সাস পেয়েছে। মালয়েশিয়া ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্য অনেক দেশেও জনশক্তি যাওয়া কমে গেছে। সৌদি আরবে আকামা বা কর্মানুমতি সমস্যা এখনো কাটেনি। ফলে সেসব দেশে নেপাল, পাকিস্তান ও ভারত থেকে শ্রমিক যাচ্ছে। অপর দিকে আমদানি চাহিদা বেড়েছে।
সিপিডি বলেছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে তিন বছরের জন্য যে ঋণ সরকার নিতে যাচ্ছে তা নেয়ার ক্ষেত্রে আরো বিচক্ষণ হতে হবে। ঋণের শর্তাবলি পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। কারণ বিশ্বমন্দার পর আইএমএফ তার শব্দচয়নের ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু চিন্তাচেতনায় এ সংস্খার কোনো পরিবর্তন হয়নি। তারা সব সময় কৃষিতে ভর্তুকি কমানোর কথা বলে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে যা কখনো সম্ভব নয়। যে সরকার এক বছর আগেও বলেছে, তারা আইএমএফ ঋণের বলয় থেকে বেরিয়ে এসেছে। হঠাৎ এখন কী প্রয়োজন পড়ল সংস্খাটির কাছ থেকে ঋণ নেয়ার তা আমাদের বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে শিল্প প্রতিষ্ঠায় তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি উল্লেখ করে সিপিডি’র গবেষণায় বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে ছয় মাসে তেমন কোনো সফলতা আসেনি। ২৩টি প্রকল্প পিপিপি’র অধীনে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও অগ্রগতি হয়েছে মাত্র দু’টির ক্ষেত্রে। এর কারণ পিপিপি অব্যবস্খাপনা। আইনি কাঠামোর দুর্বলতা। এখানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও রয়েছে ব্যাপক।
বিনিয়োগ : সিপিডি বলছে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু কিছু ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাও ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়ছে, কৃষিঋণ বাড়ছে। তবে আমদানি হয়ে যে কাঁচামাল আসছে তার দিকে আমাদের লক্ষ রাখার প্রয়োজন রয়েছে। কী ধরনের মূলধনী যন্ত্রপাতি এখানে আমদানি করে নিয়ে আসা হচ্ছে তা বিশ্লেষণ করে আমরা দেখতে পেয়েছি, এর মধ্যে ৪০ শতাংশই রয়েছে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট। এখানে তেমন কোনো সুবিধা হচ্ছে না।
মূল্যস্ফীতি : সিপিডি’র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি অক্টোবরে ৭ শতাংশের কাছাকাছি ছিল। এর আগে গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা জানি দেশে আমন, আউশ চালের উৎপাদন ভালো হয়েছে। তবে কেন চালের দাম বাড়ল, এ ক্ষেত্রে দু’টি কারণ থাকতে পারে। আমরা চাহিদার ৫ শতাংশ চাল বিদেশ থেকে আমদানি করে থাকি, যা কিনা দেশের অভ্যন্তরীণ চালের বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণ করে। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বেড়েছে বলে এখানে চালের দাম বেড়েছে। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা যায়, আমাদের পরিসংখ্যানগত দুর্বলতা রয়েছে। হয় চালের উৎপাদন আমরা বাড়িয়ে বলি নতুবা এখানকার জনসংখ্যা যা বলা হয় তার চেয়ে জনসংখ্যা এখানে বেশি।
মুদ্রানীতি : মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি একমাত্র ব্যবস্খা নয় উল্লেখ করে সিপিডি বলছে, মুদ্রা সঙ্কোচন করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। টাকা টান দিলেই মূল্যস্ফীতি কমবে এটি যারা ভাবেন তারা বাস্তবতাবিবর্জিত অবস্খায় রয়েছে।
রেশন : সবার জন্য রেশন চালু করা একটি সেকেলে চিন্তাভাবনা বলে মন্তব্য করেছে সিপিডি। বলা হয়েছে, এ ধরনের রেশন দিলে সরকারের সম্পদের অপচয় ঘটাবে। তাই দুস্খ জনগোষ্ঠী ও নিু আয়ের সরকারি কর্মচারীদের রেশন দেয়া যেতে পারে বলে উল্লেখ করেছে সংস্খাটি।
সূত্র: 2011-01-05 daily nayadiganta

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



