- নিজেকেই নিজে চিনি না, পরকে চেনার মিছে বাহানা -

"বাঙালি, ইয়া মুসলমান?"

০১ লা জুন, ২০০৭ দুপুর ১:১৮

শেয়ার করুন:                   Facebook

'কৌন্ হো তুম-বাঙালি ইয়া মুসলমান'- আজকের দিনে এটা একটা বহুশ্রুত প্রশ্ন, বাংলাদেশের শত্রুকবলিত অঞ্চলগুলোতে এরকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় যে-কোনো বাঙালিকে। প্রশ্নকর্তা হানাদার পাকিস্তানি সৈন্য। এমনি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন চট্টগ্রামের একটি মসজিদের ইমাম সাহেব, ৬০ বছর বয়সী শান্ত সৌম্য বৃদ্ধ হতভাগ্য ইমাম সাহেব, জোহরের জামাত শেষে জায়নামাযে বসে তসবিহ পাঠ করেন কিছুক্ষণ। ততোক্ষণে মুসল্লিরা যার যার ঘরে ফিরে যায়- জামে মসজিদের সিঁড়িতে ভীড় থাকেনা। তখনই নেমে আসছিলেন সিঁড়ি বেয়ে সড়কে। সামনে পড়লো একদল টহলদার পাকিস্তানি সৈন্য, ওদের একজন প্রশ্ন করলোঃ 'এই বুড্ঢা। তুম বাঙালি, ইয়া মুসলমান?' বলে কী! নিশ্চয় আমি বাঙালি, এই বাংলার চায়া-সুনিবিড় এক শান্তির নীড়ে আমি জন্মেছি, মায়ের আদরে বোনের সোহাগে বড়ো হয়েছি। মায়ের মুখের বুলি বাংলাভাষায় কথা বলতে শিখেছি এবং আমি যে আরবি-ফারসি ভাষা ধর্মপুস্তক পাঠ করেছি, তা-এ বাংলা ভাষার মাধ্যমেই। আমার দেশ বাংলাদেশ, দেশের মানুষের ভাষা বাংলা ভাষা। ঘরে-বাইরে যেখানেই যাই, বাংলা ভাষাতে হয় আমাদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা। আমার মা বাঙালি, বাপ বাঙালি, এই যে মসজিদে নমাজের জামাতে শামিল হয় অগণিত মুসল্লি, তাদের কেউ জুম্মার নামাজ- ঈদের নামাজের নিয়ত না জানলে বাংলাতেই তাদেরকে শিখিয়ে দিই নিয়ত পাঠ করার জন্য। এবং নিশ্চয় আমি মুসলমানও। বংশপরম্পরায় আমরা মুসলমান। আমার বাপ-দাদা ছিলেন মুসলমান। আমাকে তাঁরা দীন-ই-ইলম শিক্ষা দিয়েছেন। আমি আজ মুসলমানদের নমাজের জামাতে ইমাম পর্যন্ত হয়েছি। আমি রোজ রোজ মসজিদের মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে নসিহত করে থাকি। নিশ্চয় আমি মুসলমান। জন্মগতভাবে। দেশ-পরিচয়ে আমি একজন অকৃত্রিম বাঙালি এবং আমার ধর্ম পরিচয় আমি মুসলমান। কিন্তু এটা কেমন প্রশ্নঃ বাঙালি না মুসলমান? আমাদের মহানবী(সাঃ) নিজকে জন্মভূমির পরিচয়ে 'আরবীয়' বলতে আনন্দ পেতেন, আমার 'বাঙালি' পরিচয়ও তাই আনন্দদায়ক। বিশেষ করে আজ আমাদের সন্তানেরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে অকাতরে প্রাণপণ করেছে। বৃদ্ধ ইমাম সাহেব জবাব দিলেনঃ 'আমি তো, বাপু, একজন বাঙালি মুসলমান।' তিনি হয়তো আরো কিছু বলতেন। কিন্তু তার আগেই হানাদার দস্যুর বিষাক্ত বেয়নেট বিদ্ধ করে দিয়েছিলো ৬০ বছরের বৃদ্ধের বুক! বৃদ্ধ ইমামের মুখে অন্তিম কলেমা পাঠ শুনেও দুষ্কৃতকারী পাকিস্তানি সৈন্যদের বিচলিত হবার কোনো কারণ ছিলো না। আর এভাবেই তারা হত্যা করেছে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষদের। বাংলাদেশের শত্রুকবলিত এলাকাগুলোকে বাঙালিশূন্য করাই তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু তাদের সে উদ্দেশ্য কোনো দিনই সফল হবে না, কেননা বাংলার আবালবৃদ্ধবিনতা আজ রক্তের বদলে রক্ত নেবার সঙ্কল্পে ঐক্যবদ্ধ। পাকিস্তানি পশুশক্তিকে তারা বাংলার সবুজ মাঠ থেকে উতখাত করবেই। সর্বশেষ রক্তবিন্দুর বিনিময়ে তারা এ সঙ্কল্প থেকি বিচ্যুত হবে না। বাঙালি মুসলমান বৃদ্ধ ইমাম সাহেবের উষ্ণ রক্তকে কিছুতেই তারা দেবে না বৃথা যেতে।

-
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ০২-০৫-১৯৭১-এ বেলাল মোহাম্মদ কর্তৃক রচিত ও প্রচারিত কথিকা।

 

প্রকাশ করা হয়েছে: ভাঙা বারান্দা  বিভাগে ।

 

  • ৩০ টি মন্তব্য
  • ৪৫১ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ২০ জনের ভাল লেগেছে, ২ জনের ভাল লাগেনি
১. ০১ লা জুন, ২০০৭ দুপুর ১:২৩
comment by: অমি রহমান পিয়াল বলেছেন: এই ল্যাখাটা মানুষ পড়ে না ক্যান?
২. ০১ লা জুন, ২০০৭ দুপুর ১:৩৩
comment by: জ্বিনের বাদশা বলেছেন: ভাল লাগল ... এরকম আরো তুলেন ... ৫
৩. ০১ লা জুন, ২০০৭ দুপুর ১:৩৪
comment by: হাসিব বলেছেন: ৫
৪. ০১ লা জুন, ২০০৭ দুপুর ১:৫৪
comment by: মৃন্ময় আহমেদ বলেছেন: আরো থাকবে। ধীরে ধীরে সবগুলো কথিকাই তুলে ধরবো।

অমি,
আমিও ঠিক ভেবে পাই না।

ধন্যবাদ। সবাইকে।
৫. ০১ লা জুন, ২০০৭ দুপুর ২:০৯
comment by: মৃন্ময় আহমেদ বলেছেন: আর সকল কৃতজ্ঞতা অমি রহমান পিয়ালকে।
৬. ০১ লা জুন, ২০০৭ দুপুর ২:৪৬
comment by: চোর বলেছেন: চমত্কার একটি সত্যবিষয় উঠে এসেছে লিখায়। ধর্মটা (বিকৃত) ওদের কাছে আর কিছু নয়, শুধু শোষণের হাতিয়ার। আজকের বাংলাদেশেও ওদের ছাওপোনারা একইভাবে দেশের বিরুদ্ধে, দেশের মানুষের বিরুদ্ধে, জাতীয় সংহতির বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত।
৭. ০১ লা জুন, ২০০৭ বিকাল ৩:০১
comment by: মৃন্ময় আহমেদ বলেছেন: যথার্থ বলেছেন।
৮. ০১ লা জুন, ২০০৭ বিকাল ৩:২৫
comment by: অ্যালন বলেছেন: ভাল লিখা..
আরো চাই এইরকম লিখা.. :)
৯. ০১ লা জুন, ২০০৭ বিকাল ৪:৫০
comment by: খনড ত বলেছেন: খুব ভালো হইছে. । কথিকাগুলার পর এম আর আখতার মুকুলের চরমপত্র গুলান পড়তে ও শুনতে চাই। কারো সংগ্রহে থাকলে জানাবেন কি?
১০. ০১ লা জুন, ২০০৭ বিকাল ৫:০৬
comment by: মৃন্ময় আহমেদ বলেছেন: অ্যালন, আসবে।

খন্ড ত, অমি রহমানের সাথে কথা বলেন।
১১. ০১ লা জুন, ২০০৭ বিকাল ৫:৪২
comment by: এস্কিমো বলেছেন: ৫
১২. ০১ লা জুন, ২০০৭ রাত ৯:২৯
comment by: সাধারন বলেছেন: বেলাল মোহাম্মদ এখন ম্যানচেষ্টারে।উনাকে আপনার লেখাটার কথা বলেছি।উনি লেখাটার একটা প‌্রিন্ট চেয়েছিলেন।আপনি আমাকে লেখাটা মেইল করতে পারবেন?খুব কৃতজ্গ হব।
১৩. ০১ লা জুন, ২০০৭ রাত ৯:৩৯
comment by: সোনার বাংলা বলেছেন: খুব সুন্দর হয়েছে।
ধন্যবাদ।৫
১৪. ০১ লা জুন, ২০০৭ রাত ১০:২৩
comment by: হেজাব বলেছেন: ৫
চলুক
১৫. ০২ রা জুন, ২০০৭ সকাল ৯:৫৬
comment by: মৃন্ময় আহমেদ বলেছেন: সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

সাধারণ,
মেইল করার ঠিকানা যে আমার কাছে নাই।
১৬. ০২ রা জুন, ২০০৭ সকাল ১০:২২
comment by: অচেনা বাঙালী বলেছেন: সাধারণ,
পোস্ট টা কপি করে এম এস ওয়র্ডে নিয়ে অথবা ব্রাউজার থেকেই এই পেজ টা প্রিন্ট দিতে পারেন।

অসাধারণ পোস্ট। ধন্যবাদ মৃন্ময়।
১৭. ০২ রা জুন, ২০০৭ দুপুর ১:৩৯
comment by: অহেতুক অকারণ বলেছেন: আপনার কথিকা সংগ্রহ এবং এই ব্লগের মাধ্যমে এর প্রকাশ সফল হোক।
আর স্বাধীনতার এত বছর পর এরকম একটি লেখা পরে খুব খুশি হলাম।
এ রকম আরো কিছু লেখুন............
১৮. ০২ রা জুন, ২০০৭ দুপুর ২:৩৮
comment by: মৃন্ময় আহমেদ বলেছেন: অচেনা বাঙালী
অ অ
ধন্যবাদ। হ্যা এরকম আরো অনেক পাবেন।
১৯. ০২ রা জুন, ২০০৭ রাত ৮:৪৮
comment by: সাধারন বলেছেন: ধন্যবাদ@মৃন্ময়
২০. ০৩ রা জুন, ২০০৭ সন্ধ্যা ৭:৪৮
comment by: এরশাদুল হক বলেছেন: ধন্যবাদ ।
খুব ভাল হয়েছে।
২১. ০৩ রা জুন, ২০০৭ রাত ৮:১৩
comment by: মৃন্ময় আহমেদ বলেছেন: ধন্যবাদ।
২২. ০৩ রা জুন, ২০০৭ রাত ৮:২০
comment by: হাসান মোরশেদ বলেছেন: দরকারী পোষ্ট ।
২৩. ০৩ রা জুন, ২০০৭ রাত ৮:৪০
comment by: মৃন্ময় আহমেদ বলেছেন: ভবিষ্যতে আরো আসবে।
২৪. ০৫ ই জুন, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:৪২
comment by: ধুসর গোধূলি বলেছেন: দিলাম ধাক্কা
২৫. ০৫ ই জুন, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:৪৮
comment by: জল রঙ বলেছেন: ধর্মটা ওদের কাছে ঢাল ছাড়া আর কিছু নয় । দিলাম আরেকটু ধাক্কা ।
২৬. ০৫ ই জুন, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:৫২
comment by: মৃন্ময় আহমেদ বলেছেন: পরবর্তী কথিকাঃ ধর্মনিরপেক্ষ সহঅবস্থান।
২৭. ০৬ ই জুন, ২০০৭ সকাল ১০:৫৬
comment by: মদন বলেছেন: চমতকার লেখা
হৃদয় ছুয়ে যায়...
২৮. ০৭ ই জুন, ২০০৭ সকাল ১০:৪৮
comment by: মৃন্ময় আহমেদ বলেছেন: হু আমিও তাই বলি। সবাইকে ধন্যবাদ। অনুপ্রেরণা দেয়ার জন্য।
২৯. ০৭ ই জুন, ২০০৭ সকাল ১১:০১
comment by: উদাসী স্বপ্ন বলেছেন: রেটিং ৫ কম হইয়া গেল।
কিছু কিছু অশ্রু বিসর্জনেও কোনো দুঃখবোধ থাকে না বরংচ গর্ব হয়।
এসময়ের জন্য এরকম লেখার অনেক প্রয়োজন। দুঃখ শুধু খুব বেশী সংখ্যক ভালো ছায়াছবি নেই।
ধন্যবাদ গুরু। কাল্লু সারওয়ার, ফজুদের পড়া দরকার। কিছুদিন আগে ইনকিলাবীরাও এই প্রশ্নও করেছিলো? হেই বাহাউদ্দি কো?
৩০. ০৭ ই জুন, ২০০৭ সকাল ১১:০৮
comment by: মৃন্ময় আহমেদ বলেছেন: হে গোরে জুস বানাইয়া খাওয়াই দিলেও কোনো কামে আসবো না। হেরা এমনই জাত।

 



 


মা ও মাটি।।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

সর্বমোট হিট

 ৮৯৩৬৭