আমার রাঙামাটির সর্বশেষ সফরটি হয়েছিল গত জুন মাসের একেবারে শুরুতে। পত্রিকায় ওখানকার একটা বেসরকারি সংস্থায় চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে সাথে সাথে আবেদন করে ফেলি রাঙামাটি যাওয়ার একটা উপলক্ষ্য বানানোর জন্য। কয়েকদিন পরে ঐ সংস্থার পক্ষ থেকে চিঠির মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানানো হয় ১ জুন তাদের নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার। গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে জাবি (৩১তম ব্যাচ)-র রিপন চাকমা তখন রাঙামাটিতেই ছিলেন। রিপন রাঙামাটি গেলে সমস্যা হলো ওর সাথে যোগাযোগের আর কোন উপায় থাকে না, ও ফোন করলেই কেবল সেটা হয়ে ওঠে। সারাদেশে মোবাইল কোম্পানিগুলো মোবাইল নেটওয়ার্ক কভারেজের প্রতিযোগিতায় নামলেও তিন পার্বত্য জেলার মানুষজন মোবাইল সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে বাধ্য হচ্ছেন আমাদের এই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা (???) নিশ্চিত করতে গিয়ে। যাই হোক ৩১ মে কলাবাগান থেকে রাত ১০.৩০ মি. এর ডলফিন বাসের টিকিট কাটলাম বাস ছাড়ার প্রায় আধাঘন্টা আগে। দশ মিনিট আগে গিয়ে আমার নির্ধারিত সিটে বসার উদ্দেশে বাসে উঠলাম। দেখি আমার পাশের সিটেই একজন আদিবাসী তরুনী বসে আছেন। আমি সিটে বসার কিছুক্ষণ পরই তরুনীটির অস্বস্তি লক্ষ্য করলাম। বাস ছাড়ার ঠিক আগ মুহুর্তে বাসের অন্যান্য আদিবাসী যাত্রীদেরকে (যাদের অধিকাংশ তরুনী-হয়তো ঢাকার বিভিন্ন কলেজ-ভার্সিটির ছাত্র হবেন) পাশে বসা তরুনীকে নিয়ে তাদের কিছুটা উদ্ভিগ্নতা লক্ষ্য করলাম। আমি চুপচাপ বসে আছি। তাদের উদ্ভিগ্ন হবার কারণটা একটাই-আদিবাসী তরুনীটি সারারাত ধরে একা একা একজন বাঙালি যুবকের পাশে বসে যাবে! চাকমা ভাষায় (চাকমা ভাষায় নিজে কথা না বলতে পারলেও কিছু পরিচত চাকমা শব্দ, বাক্য শুনে নিশ্চিত হওয়া আরকি!) নিজেদের মধ্যে অনেকক্ষণ আলাপ সেড়ে একজন তরুনী অবশেষে আমাকে অনুরোধ জানালেন সামনের (ড্রাইভিং সিটের ঠিক পেছনেরটা) একজন চাকমা যুবকের সাথে সিট চেঞ্জ করার জন্য। আমাদের যাত্রাপথে সিট চেঞ্জ সংক্রান্ত বিষয়ে মহিলাদের এমনতর অনুরোধ আসলে নতুন কিছু নয়। কিন্তু এখানকার ব্যাপারটা একটু অন্যরকমই ঠেকল তাদের সকলের একই রকম উদ্ভিগ্নতার ধরণে। আমি কোন কথা না বলে হাসি মুখেই তাদের অনুরোধ রক্ষা করলাম। পরিবর্তিত সিটে বসার পরপরই আমাদের যাত্রা শুরু হলো। ঢাকা শহরের কোলাহল আস্তে আস্তে পেছনে ফেলে বাস ছুটে যেতে লাগল সবুজ পাহাড়ের টানে। শতশত দৃশ্য চোখের পর্দায় আলতো ছোঁয়া দিয়ে দু'পাশে সরে যেতে লাগলেও যাত্রা শুরুর আগের ব্যাপারটা কিছতেই মাথা থেকে মুছতে পারছি না। সত্যি বলছি, আমাকে সিট চেঞ্জ করতে বলার আপাত অযৌক্তিক (?) অনুরোধে আমি বিন্দুমাত্র অপমানিত বোধ করিনি, আদিবাসী তরুনীদের উদ্ভিগ্নতায় কিছু মনে করিনি; বা তাদের কোন আচরণও আমাকে আহত করেনি। তবে হ্যাঁ আমি লজ্জায় মরেছি, পরক্ষণে তাদের উদ্ভিগ্ন হবার পেছনের কারণটা চিন্তা করতে গিয়ে। বিচ্ছিন্নভাবে এই ঘটনাকে অনেকে হয়ত আদিবাসী তরুনীদের উদ্ভিগ্নতায় কিঞ্চিত বাড়াবাড়ি বা অতি মামুলি ব্যাপার এবং আমার বিনা বাক্যব্যয়ে অনুরোধ রক্ষার ব্যাপারটাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। সে যাই হোক না কেন। আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল- একজন অপরিচতি বাঙালি যুবকের পাশে একজন পাহাড়ী আদিবাসী তরুনী কী আসলেই নিরাপদ বোধ করে না? কিন্তু কেন এই আস্থাহীনতা? এই আস্থাহীনতা কী আসলে কোন ব্যক্তিক সীমাবদ্ধতার বিষয় নাকি সামষ্টিক মনস্তত্বের বহি:প্রকাশ ? এরকম নানান সব বিষয় মাথায় ভেতের কিলবিল করেত লাগলো। পরে মনে হলো, না, পাহাড়ী মানুষদের এই আস্থাহীনতা একেবারেই অমূলকভাবে তাদের মনে গেঁড়ে বসেনি। তাদের এই আস্থাহীনতা ব্যাপারটা কী আমরাই ঢুকিয়ে দেইনি? ৭১' সালের ১৬ ডিসেম্বর এই ভূখণ্ডের মানুষজন স্বাধীনতা লাভ করলেও এই দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা কী আসলেই কখনো এর স্বাদ উপলব্ধি লাভ করতে পেরেছে? নাকি তারা সেদিন শাসকশ্রেণীর হাত থেকে আরেক শাসকশ্রেণীর হাতে কেবল হস্তান্তরিত হয়েছিলেন। পার্বত্যবাসীদের সম্পর্কে তখনকার শাসক গোষ্ঠী বা শেখ মুজিবের যে ধ্যান-ধারণা ছিল তা কিন্তু ঐ হাতবদলের ব্যাপারটিই নিশ্চিত করে (যদি তাই না হতো তাহলে শেখ মুজিব পাহাড়ীদের বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাতে পারতেন না)। এরপর জেনারেল জিয়ার আমলে একের পর এক সবুজ পাহাড়ে জলপাই ছাতা বসিয়ে, দেশের বিভিন্ন এলাকার খুনী-দাগী আসামীসহ দু:খী, অসহায় মানুষদের সেটেলার হিসেবে আনা হয়। মানুষের বিরুদ্ধে মানুষকে লেলিয়ে দেওয়া মাধ্যমে মনুষ্যত্বের চরম অবমাননা-জলপাই ছাউনীর দাপট উত্তরোত্তর বাড়ানোসহ নানান কায়দায়-কানুনের মধ্য দিয়েইতো এই রাষ্ট্র তার অধিপতি জাতির প্রতিনিধির মাধ্যমে আদিবাসীদের নিয়ে তার নৃশংস-নিপীড়ক মনস্তত্ত্বকে বারে বারে হাজির করেছে। পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ীদের উপর হামলা, তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া, জায়গাজমি দখল, গণহত্যাসহ এমন কোন ঘটনা নেই যাতে নারী নির্যাতনের বিষয়টা জড়িত ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত পার্বত্য এলাকায় কত হাজার চাকমা, মারমা, ম্রো, খুমী, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গা, রাখাইন, চাক মা-বোনকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে তার হিসেব নেই আমাদের কাছে। পাহাড়ে ঘটে যাওয়া কত কিছুইতো আমাদের জানার বাইরে থেকে যায়; পাঙ্খো, খিয়াং, লুসাইসহ অপরাপর জাতির মা-বোনের ইজ্জত হারানোর মত নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনাগুলোতো প্রতিনিয়তই আড়ালে চলে যায়। পাহাড়ীদের উপর নিপীড়ন বা পাহাড়ী মা-বোনের অপমানিত হওয়ার এই যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বেদনা তা কী সহজে ভুলে থাকার মতন কোন বিষয়। হ্যাঁ নতুন প্রজন্মের আদিবাসী মানুষজনের এই আস্থাহীনতা বা উদ্ভিগ্নতার বিষয়টি হয়তো এতটা প্রকটভাবে কাজ করত না যদি তাদের উপর দমন-পীড়নের মত কলঙ্কজনক বিষয়গুলোকে বর্তমানে না দেখতে হতো; না দেখতে হতো নানিয়ারচর-লোগাং গণহত্যা, কল্পনা চাকমা অপহরণ, মহালছড়ি বা মাইচ্ছড়িরর ঘটনাগুলো। বাস যাত্রায় পাহাড়ী তরুনীর বিষয়টি আমি অন্যভাবে দেখতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করতাম দেখতাম যদি না এই দমন-পীড়নের বিষয়গুলো বর্তমান সময়েও চলমান না থাকতো। যাই হোক, এইরকম অনেক কিছু ভাবতে ভাবতেই ভোরের দিকে বাস চট্টগ্রাম পার হয়ে পাহাড়ী পথে গড়াতে লাগল। সূর্যের আলো তখনো দেখা দেয়নি। এক অদ্ভূত ভালোলাগা নিয়ে আঁকা-বাঁকা পথে বিলি কাটতে কাটতে একসময় রাঙামাটি শহরে পৌঁছলাম।
(পরের কিস্তি আসছে শীঘ্রই...)
আমার সর্বশেষ রাঙামাটি ভ্রমনের কিছু অভিজ্ঞতা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা (প্রথম কিস্তি)
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
পণ্ডশ্রম

এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,
আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।
দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন
আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?
আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?
ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন
১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন
নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন
শৃঙ্খল মুক্তি আমার
শৃঙ্খল মুক্তি আমার

ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।