ভালবাসার সুখ-দুখ! - পর্ব ৫
রাতে ঘুম হয়নি তেমন। মাথা ব্যাথায় কুকড়েঁ আছে আকাশ, তাছাড়া শরীরটাও কেমন ঝিমঝিম করছে। বিধ্বস্হ সব চিন্তা ভাবনা আর অঘুমে শরীরের ক্লান্তিটা স্পষ্ট। এখন বাজে সবেমাত্র পাচঁটার কিছু বেশী। খালি ঘরটায়ই আকাশ হাটহাটি করল খানিক্ষন। তারপর বেলকুনিতে রাখা ফুলের টব গুলোতে পানি দিল খুব যত্ন করে। গাছ, ফুল নীলার খুব পছন্দের। দুটো বেলকুনিই গাছে গাছে ছেয়ে ফেলেছে। সব গুলো টব আর গাছ সে নিজেই কিনে এনেছে, লাগিয়েছেও যত্ন করে পরিকল্পিতভাবে। আকাশও গাছ, ফুল পছন্দ করে কিন্তু ভালবাসাটা নীলার মত না। তবে যত্নআত্তি সে ভালই করে আর ভালাবাসাও বাড়ছে একটু একটু করে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে টকটকে সতেজ ফুলগুলোর দিকে তাকালে মনটা আপনাতেই ভাল হয়ে যায়। এক ধরনের পবিত্রতায় আর শুভ্রতায় ভরে উঠে মন, হৃদয়ে প্রফুল্লতা আসে।
বর্তমানে অনেকগুলো টবেই ফুল এসেছে। সব গুলো ফুলই দেখতে ভারী চমৎকার। বাহরী রংয়ের ছোট ছোট ঘাস জাতীয় ফুল গুলো দেখতে দারুন মনোমুগ্ধকর। আর অপরাজিতার গাছটাও ভরে গেছে নীল আর সাদা ফুলে ফুলে।
অফিসের গাড়ি সাধারনত সাড়ে আটটার আগে আসে না। এতটা সময় কি করবে আকাশ বুঝে উঠতে পারছেনা। কফি খেলে হয়ত ক্লান্তিটা কিছু লাঘব হতে পারে। রান্না ঘরে ঢুকে তাই কফির জন্যে পানি বসাল। দুধ চিনি একত্রে মিশিয়ে ফুটন্ত পাত্রের দিকে চেয়ে রইল আনমনে। রাতে খাওয়া হয়নি তেমন কিছু, তাছাড়া রাতও জেগেছে অনেক। ক্ষুধায় পেটের নাড়িবুড়ি কেমন যেন করছে। ইদানিং তার খাওয়া দাওয়ায় বেশ অনিয়ম হচ্ছে। নীলা বাসায় না থাকলেই সব কিছুতেই অনিয়ম করে আকাশ। তার কথা ভেবেই নীলা কখনও কোথাও যেতে চায় না। কিন্তু চাকরী আর সংসার করে বেচারী বেশ হাপিয়ে উঠেছিল। চোখে মুখে ক্লান্তির ছায়া ছিল বেশ স্পষ্ট । তাই আকাশ একরকম জোর করেই রেখে এসেছে তার মায়ের কাছে। কিছুদিন থাকলে হয়ত ভাল লাগতে পারে তাই। যাওয়ার আগে নীলা বেশী করে পুডিং আর নুডুলস বানিয়ে রেখে গেছে আকাশের জন্যে। আর খুব আদেশের সুরেই বলে গেছে খাওয়ার দাওয়ার অনিয়ম যেন না করে।
ফ্রিজ খুলে আকাশ সেখান থেকে খানিকটা পুডিং খেল। পুডিংটা নীলা চমৎকার! বানায়। তাছাড়া পুডিং আকাশের খুব পছন্দের, তাই সে প্রায়ই বানিয়ে রাখে। এখন অনেকখানি পুডিং খেল সে। তারপর বাটিটা রেখে খুব কড়া করে কফি বানাল আকাশ। কড়া কফি নীলারও খুব পছন্দ। নীলা বাসায় থাকলেও প্রায়ই সে দুজনের জন্যে কফি বা চা তৈরী করে। এই চা পর্বটা তারা দুজনেই খুব এনজয় করে আলাদা আলাদা নিজস্ব ভাল লাগায়।
এই চা গররমম..... বলে মগটা যখন নীলার হাতে আকাশ তুলে দেয় তখন এর প্রতিদানে নীলার থ্যান্কয়্যুর সাথে রোমান্টিক সিম্বলিক কিস!, খুবই উপভোগ্য করে তুলে পুরো পরিবেশটা। এই লোভেই আকাশ নিত্যই করে যাচ্ছে অ-কর্মটি।
আজ অনেকটা সময় নিয়েই শাওয়ার করল আকাশ। তারপর আস্তে ধীরে অফিসের জন্যে তৈরী হয়ে নিল। একটু সময় থাকতেই বের হল ঘর থেকে। গাড়ির জন্যে নির্ধারিত জায়গাটায় গিয়ে দাড়াল। মাথা ধরাটা এখনও বেশ রয়ে গেছে। অফিসে যাওয়ার আগ্রহ তেমন করে পাচ্ছে না।
কি করবে আকাশ? বুঝে উঠতে পারছে না।
অফিসে না গেলে কি হয়? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করল
আর তখনই একটা অবসাদ আর ক্লান্তিতে তাকে পেয়ে বসল। তরপরই মনস্হির করে ফেলল।
নাহ, আজ আর সে অফিসে যাবে না। ফোন করে শরীরটা ভাল নেই জানিয়ে দিল সাব্বির ভাইকে। সাব্বির ভাই আর আকাশ একই অফিসে চাকরী করে, বসেও দুজন পাশাপাশি। বয়স ও চাকরী উভয় ক্ষেত্রেই সাব্বির ভাই বেশ সিনিয়র কিন্তু তাদের সখ্যতাটা একেবারেই বন্ধুর মত। তাকে খবরটা দেওয়ার পর থেকেই নিজেকে খানিক অবসাদ মুক্ত মনে হচ্ছে।
তারপর, হাঠতে লাগল আনমনে। কোথায় যাবে, কি করবে কিছুই জানে না সে। হেটে চলছে অজানার পথে।
হাঠতে হাঠতেই আবার মনে পড়ল বৃষ্টির কথা। অসহ্য! , বৃষ্টির কথা মনে হলেই একটা অস্হিরতায় পেয়ে বসে তাকে। জীবনের একটা সময় সুখস্বপ্ন গুলো সব রচিত হত শুধুমাত্র বৃষ্টিকে ঘিরেই। দুজন মিলে এক সাথে স্বপ্ন বুনত। ভবিষ্যতের ঘর বাধত, সংসার সাজাত। বৃষ্টির কল্পনা বিলাসী কথায় আকাশ খুবই রোমাঞ্চিত হত, পুলকিত বোধ করত। অদ্ভুত এক ভাল লাগা নিয়ে সুখেরা সব ডানা মেলত। ভাসতে ভাসতে গিয়ে জড়ো হতো আকাশের বুকে। একটা হাত আকড়ে ধরে, কাধে মাথা গুজে, বৃষ্টি যখন স্বপ্ন-সুখের মালা গাঁথত, আবেগে তখন আকাশের চোখ বুজে আসত আপনাতেই। সকরুণ আকুতিতে কন্ঠ রূদ্ধ হয়ে যেত। মনে হত দুজন শুধুই দুজনার, চিরকালের, জন্ম জন্মান্তরের........
ভালবাসা, প্রেম মানুষকে কেমন করে যে পাল্টে দেয়, রোমান্টিক করে তুলে, এর আগে তা অজানাই ছিল আকাশের কাছে। বৃষ্টির সাথে দেখা হওয়ার আগে ও ক্ষনে বিচিত্র সব সুখাবেশে তন্ময় হয়ে থাকত আকাশ। ভালবাসার উঞ্চতায়, ফুবফুরে ভাল লাগায় বিমোহিত থাকত প্রতিটিক্ষন। অদ্ভুত সব অনুভুতিরা আকাশের হৃদয়কে রাঙিয়ে রাখত সারাবেলা। রাঙা হৃদয় নিয়ে আকাশ ভাসতে থাকত সুখ সাগরে। এসব সুখস্মৃতির কথা ভাবতে ভাবতেই একটা অসহ্য যন্ত্রনায় চোয়াল দুটি শক্ত হয়ে গেল আকাশের।
জীবনের জঠিল হিসাবে কখন যে কি ঘটে যায়, তা আমরা কখনও পেতে চাই বা হয়ত কখনই পাওয়ার আশা করি না। তারপরও যখন প্রাপ্তিগুলো পাওয়া না পাওয়ার হিসেবের খাতায় ঢুকে পড়ে ঠিক তখনই বুঝা যায় জীবনের আসল বাস্তবতা, বৈচিত্রময়তা। একারনেই হয়ত জীবন আমাদের কাছে ভাল লাগে, আমরা জীবনকে উপভোগ করি, কখনও ভালবাসায় আপ্লুত হই, কখনও আবার বিরহে জ্বলতে থাকি।
বিরহ!, বিরহ কি তাহলে ভালবাসারই অংশ? ভাবতে থাকে আকাশ........... ।
(চলবে)
বি:দ্র: সময় স্বল্পতার কারনে প্রকাশে দেরী হয় তাই, মার্জনাপ্রার্থী।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০১০ দুপুর ১২:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





