১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘুর্ণি ঝড়ের কথা মনে আছে আপনাদের? আমার অবশ্য মনে নেই। থাকবেই বা কি করে, এই ধরাতেই ত ছিলাম না তখন। পরে অবশ্য বাংলা রচনা পড়তে যেয়ে জানতে পেরেছি। ৮৮ র প্রলয়ংকরী বন্যাটাও রচনা পড়তে যেয়ে জেনেছি।
৯৮ র প্রলয়ংকরী বন্যার কথা মনে আছে ত, যার পরে আর সেরকম বন্যা দেশে হয়নি। এই ধরায় আসার সাত বছর পরের ঘটনা। এখনও আমার বেশ ভালই মনে আছে।
সারা বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা হলেও আমার সেটা উপলব্ধি করার মতন বয়স ছিল না। বন্যা দেখতে বায়না ধরলাম। নানা ভাই বাড়ী থেকে আসলে ঠিক হলো তার সাথে আমরা বাড়ী যাবো। কিন্তু আব্বা বেঁকে বসলেন। কিছুতেই যেতে দিবেন না আমাদের। বহুত যুদ্ধ-টুদ্ধ করে অবশেষ আমাদের ই জয় হলো।
আম্মা, আমি, ভাইয়া নানা ভাইর সাথে রওনা দিলাম।
যেখান থেকে ট্রলারে উঠলাম সে জায়গাটা এখনও আমার চোখের সামনে ভাসে। ট্রলার ছেড়ে চিকন একটা খালের মতন নদী(ওটা ছিলো হাজরা গাং, নদীটা এখন পদ্মার সাথে মিশে গেছে) দিয়ে চলা শুরু করলো। এর মাঝেই টের পেলাম প্রকৃতি আমায় ডাকছে।
এর মাঝে ঘটে গেল এক কাহিনী। ট্রলার মোটামুটি চিপা একটা খাল দিয়ে পাড়ি দিচ্ছিলো তখন। এক ডিংগী নৌকায় করে কয়েকটা বাচ্চা নিয়ে এক মহিলা যাচ্ছিলেন। আমাদের ট্রলারটা সেই নৌকায় ধাক্কা দিলে নৌকা গেলো উল্টে। নৌকার সবাই টাবুর টুবুর করে সাঁতরাতে লাগলো। হৈচৈ পড়ে গেল। ট্রলারওয়ালা ভয় পেয়ে ট্রলার থামিয়ে দিয়েছিলো, পরে এক বাস/ট্রাক ড্রাইভার হুইল ধরে।
এই নৌকা উল্টে যাওয়া আম্মা দেখেন নি উনি বাচ্চাদের পড়ে যাওয়ার শোরগোল শুনে ভেবেছেন আর কিছু না আমার মেয়ে পড়ে গেছে। এই ভেবে ঝাপ দিয়ে পানিতে পড়তে গিয়েছিলেন। পরে আশে পাশের মানুষ এই বলে ধরেছে রেখেছে বাচ্চা পড়লে ত আর আপনি কিছু করতে পারবেন না, অন্যরা তুলবে। এসবের মাঝেই আমি নানা ভাইর হাত ধরে হাজির।
যাক অবশেষে ভালয় ভালয় রাত ৮/৯টায় বাড়ীতে ফিরলাম। বাড়ী যেয়ে দেখি সে আরেক কান্ড। যেদিকে তাকাই খালি পানি আর পানি। আমি তো ছিলাম বিশা....ল বড় মানুষ তাই কোথাও আমার ঠাই হয় না, নানুর বাড়ী আর দাদুর বাড়ীর উঠান বাদে।
আশে পাশের সবার তিন কোনা পেনী জাল দিয়ে মাছ ধরা দেখে আমার ও শখ জাগলো মাছ ধরার। নানা ভাইকে বলতে নানা ভাই কি একটা জাল বানিয়ে দেয় পছন্দ হয়নি।
একদিন আম্মা নানুদের টিনের চালের উপর বসে কাঁথা সেলাই করছিলেন আর আমি পাশে বসে কিছু একটা করছিলাম। বাড়ীর পাশের ক্ষেত পানিতে থই থই। ভাইয়া, আমার চাচাত ভাই, এক চাচাত বোনের ছেলে আর এক চাচত বোনে জামাই আমার দাদা বাড়ী থেকে আসছিলো। এর মধ্যে ভাইয়া শুধু ভেলায় আর সবাই সাঁতরে আসছিলো। দুলাভাই বলে শালা আমরা ভিজে যাই আর তুমি একা শুকনা থাকবা কেন, বলে ধাক্কা দিয়ে ভাইয়াকে ফেলে দেয়। ভাইয়ার পড়ে যাওয়া আমি দেখে চিৎকার দিলাম। আম্মা তাকিয়ে দেখে ত তার কলিজা নাই। আম্মা চিৎকার করছে "ফারুক ওরে তোল ও সাঁতার জানে না"। দুলাভাই জানতো না যে ভাইয়া সাঁতার জানেনা কিন্তু চাচাত ভাই আর ভাগনা টা জানতো, কিন্তু কিছু বলার আগেই ঘটনা ঘটে যায়। পরে তাড়াতাড়ি উঠায় ভাইয়াকে। দুলাভাই সেই ঘটনার পরে বেশ কিছুদিন নাকি আম্মার সামনে আসতে লজ্জা পাইছিলো।
দাদা বাড়ীতে গেলে বাড়ীর সামনে আম্মা/বড়রা গোছল করতো আর আমি আম্মার গলায় ঝুলে ঝুলে যেতাম ঠাই পেতাম না বলে। ছোট ছোট বাচ্চাদের সাঁতার কাটা অবাক চোখে দেখতাম। এখনও কাউকে সাঁতরাতে দেখলে অবাক লাগে, কিভাবে এই কাজটি করে ভেবে!
নানুদের একটা নৌকা ছিলো । নৌকায় ঘুরতে যেতাম, শাপলা, কলমী, ঢ্যাপ তুলে আনতাম। পাকা ঢ্যাপে কেমন পঁচা গন্ধ আর পিচ্ছিল। তাই খই খাওয়ার আশায় সেই ঢ্যাপ ধুয়ে চালের উপর শুকাতে দিতাম। বেশ মজায় ই কেটে ছিলো দিনগুলো।
আরিয়ানা আপুর ১৯৮৮ ও আমার সাড়ে তিন মাস। পড়ে মনে পড়লো সেই সময়ত আমি দুনিয়াতেই ছিলাম না তবে তার দশ বছর পরের সময়টা আমি উপভোগ করেছিলাম। সে কথা মনে করেই লিখে ফেললাম।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


