১৯৯১ এর নির্বাচন:
চারিদিকে ব্যাপক হুলুস্থুল। আমি বুঝিনা ঘটনা কি? কিন্তু একটা বিষয় আমাকে অবাক করে। মিছিল শেষে লজেন্স পাওয়ার আশায় আমি যে মিছিলেই যাই, আমাকে হাটতে হয় না। কোন না কোন দরদী ব্যাক্তি আমাকে পুরা মিছিল কাধে করে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমার বন্ধুদের এই সৌভাগ্য হয় না। তারা কষ্ট করে মাইলের পর মাইল হেটে লজেন্স হালাল করার পরও ভাগে আমার চেয়ে কম লজেন্স পায়। কারনটা তখন বুঝিনি। পরে বুঝেছি। আমার বাবা মোটামুটি জনপ্রিয় মানুষ। দুইবার গ্রামের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। আমার বাবা বিএনপি করে না আওয়ামীলীগ করে, কেউ জানত না। তিনি বিএনপি-আওয়ামীলীগ উভয়ের মিটিং এই উপস্থিত থাকতেন এবং গ্রামের সমস্যা গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করতেন। উল্লেখ্য, ৯১ এর নির্বাচনে মনে হয় জাতীয় পার্টির সমর্থনকারীরা খুব একটা একটিভ ছিল না। আমাদের গ্রামে লাঙ্গল মার্কার কোন মিছিলের কথা মনে পড়ে না। আমাকে কাধে তুলে এলাকার মানুষকে দেখানো, “দেখ, উনি আমাদের দলে কারন তার ছেলে আমাদের মিছিলে।“ যেন প্রতিযোগীতা হয়ে দাড়িয়েছিল। আমার একক ফুপাত ভাই একদিন আমাকে প্রস্তাব দিল, আমি যদি নৌকা মার্কার মিছিলে না যাই তবে প্রতিদিন লজেন্স পাব। লজেন্সের লোভে আমার আর নৌকার মিছিল করা হল না। তবে নির্বাচন শেষে ফলাফল হল দেখার মত। আমার সব বন্ধুদের চেয়ে নিজেকে অধিক জ্ঞানী প্রামানিত করার জন্য তাদের জানাইলাম, “জানিস, খালেদা জিয়া এরশাদ হইছে।“
নির্বাচন পরবর্তী:
অচিরেই টের পেলাম, খালেদা জিয়ার এরশাদ হওয়া আমার জন্য মোটেও সুখকর নয়। কারন আমার নাম মো: জিয়াউর রহমান। ক্যামনে ক্যামনে বন্ধু মহলে আমার জিয়া নামটার জায়গায় “খালেদা জিয়ার স্বামী” নামটা জায়গা করে নিল বুঝে উঠতে পারলাম না। অভিযোগ নিয়ে হাজির হলাম আম্মার কাছে। আমার নাম জিয়া ক্যা? আম্মা বলেলেন, “তোমার নামতো খালি জিয়া না। আরো একটা নাম আছে। “আরাফাত”। বন্ধুদের বলবা আমার নাম জিয়া না “আরাফাত”।“ এই নামটা আমার আব্বা রেখেছিল। ফিলিস্তিনী স্বাধীনতা আন্দোলনের মহান এই নেতাকে তিনি খুব শ্রদ্ধা করতেন। সিদ্ধান্ত তাই হল। আমার স্কুলের খাতায় নাম বদলে নাম রাখা হল “প্যালেস্টাইন আরাফাত”। শুরু হইল নতুন যন্ত্রণা। সবাই ডাকে “পেলাস্টিক”। সে যাই হোক। অল্প বয়সে কারো স্বামী হওয়ার হাত থেকে তো মুক্তিতো মিলল।
নাম নিয়ে গ্যান্জাম:
১৯৯৬ সালে উন্নত শিক্ষা লাভের আশায় চট্টগ্রামে বড় মামার কাছে থাকতে গেলাম। আবার শুরু হল নাম নিয়ে ক্যাচাল। কারন মামার জিয়াউর রহমান নামটা পছন্দ। আমার না। বড় মামার কাছেই শুনলাম আমার নামকরনের ইতিহাস। নামটা রেখেছিল আমার দাদী। পাড়াগায়ের অশিক্ষিত গ্রাম্য বধু তার প্রথম নাতীর নাম জিয়া কেন রাখবে? প্রশ্নটা সবার মনেই আসতে পারে। এ প্রসঙ্গে একটু বলে রাখি, আমার দাদাও ছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। যে কারনে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ১০/১২ বছর আমাদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিল আমাদের পরিবারের সদস্য। ফলে দেশের রাজনৈতিক ও আর্থ সামাজিক অবস্থার কথা আমার দাদী কিছুটা হলেও জানত। আমার বাবার মুখে প্রথম যখন তিনি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নিহত হবার খবর শোনেন তখন তিনি শুধু বলেছিলেন, “এত ভাল মানুষটাকে মেরে ফেলল!” তারপর টান ৩ দিন দিন প্রায় না খেয়ে ছিলেন। অত:পর ১৯৮৪ সালের ৩০ শে মে (জিয়াউর রহমানের মৃত্যুদিবসে) জন্ম হয় আমার। পাড়াগায়ের অশিক্ষিত গৃহ বধুর ধারণা হয় “তার প্রিয় নেতা আবার তার বংশেই জন্ম নিয়েছে।“ তাই তিনি আমার নাম রেখেছিলেন জিয়া। আমি পারিনি আমার দাদীর এই বিশ্বাসটুক কে অসম্মান করতে। শুধু নিজের নামটা জিয়া বলেই মেনে নিলাম না, জিয়া নামের প্রতি চলে এল এক ধরনের শ্রদ্ধা। শ্রদ্ধা করতে শুরু কররাম জিয়া নামক এক রাষ্ট্র নয়ককে যার মৃত্যুতে অন্তত একজন হলেও কষ্ট পেয়ে না খেয়ে ছিল।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই আগস্ট, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



