১ম
পর্বঃ নীল সমুদ্র সবুজ পাহাড়ঃ এক আশ্চর্য্য ভ্রমন...
২য় পর্বঃ আমার কর্ণফুলী, আমার চট্টগ্রামঃ বৃষ্টিমেদুর স্মৃতিকাতরতা...
চট্টগ্রামে সেটাই ছিল আমার প্রথম আসা।
ঢাকা থেকে দূরে, দ্বিতীয় আর একটি মেট্রোপলিটান শহর হিসাবে চট্টগ্রাম, আজীবন শহুরেপনায় অভ্যস্ত আমাকে আশ্বস্ত করেছিলো। বেড়াতে যাওয়ার জন্য আর কিছুদিন কাটিয়ে যাওয়ার জন্য, অতি চমৎকার শহর। লোকজনের অতটা ভিড় নেই, খোলামেলা রাস্তা, ছড়ানো ছিটানো বাড়িঘর — প্রথম দেখাতেই শহরটা আমার মনে ধরেছিল।
এর পরে তো কতবারই এলাম এই শহরে, মজার ব্যাপার হলো, আজ পর্যন্ত এই শহরের কোন রাস্তাঘাটই আমি ভাল মত চিনি না। একদিকে নিউমার্কেট, আর তার সংলগ্ন এলাকা, রেলওয়ে ষ্টেশন (এখান থেকেই ঢাকার কোচগুলো ছাড়ত এক সময়) কিছুটা এগিয়ে গেলে কর্ণফুলি নদীর ধারে ফিরিঙ্গি বাজার (ফরেষ্টের রেষ্ট হাউসটা এখানেই কিনা) আর টাইগার
পাস... এর বাইরে চট্টগ্রামের পুরোটাই আমার অচেনা। একটা শহর চিনতে গেলে, সেখানে এক নাগাড়ে কিছুদিন থাকা আর অতি অবশ্যই পায়ে হেঁটে শহরটা ঘুরে ঘুরে দেখা— এর কোনটাই চট্টগ্রামে আমার কখনও করা হয় নি। আমার বন্ধুদের কিংবা নিকট আত্মীয়দের কেউ চট্টগ্রামে থাকে না, ফলে চট্টগ্রামে আমার আস্তানা সব সময়ই ছিল কোন হোটেল অথবা রেষ্ট হাউস।
জাকির হোসেন রোড হয়ে বাস এগিয়ে চলে। সিডিএ এভিন্যু তলিয়ে গেছে পানির নিচে, হাঁটু সমান পানিতে ধীর গতিতে চলছে বাস সিএনজি রিক্সা। চলমান গাড়ীর ধাক্কায় তৈরি হওয়া ছোট ছোট পানির ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে রাস্তার ডিভাইডারে। দূরে রাস্তায় জমে থাকা পানিতে দাপাদাপি করছে, কিছু পথ শিশু। এরই মধ্যে ডিভাইডারের উঁচু দেয়ালে দাড়িয়ে এক ভিক্ষুক আমার কাঁচের দেয়ালে টোকা দেয়, নগদ কিছু প্রপ্তির আশায়। আমি ভিক্ষুকটির অনভিজ্ঞতা নিয়ে আফসোস করি। আহা রে, বেচারা জানেই না— চারদিক এঁটে রাখা আমাদের এই ঘেরাটোপের দেয়াল, বাইরের যাবতীয় দরিদ্রতা আর হাহাকারের নাগালের বাইরে থাকার জন্য, আমাদের কি দারুন একটা বর্ম হিসাবে কাজে দেয়...! আমরা সব কিছু দেখতে পাই, কিন্ত কোন কিছু আমাদের স্পর্শ করতে পারে না।
চট্টগ্রাম শহরকে পিছে ফেলে আমরা এগিয়ে যাই, বহদ্দারহাটের দিকে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে। আমি জানি সামনে পড়বে কর্নফুলী নদী। সম্ভবত কালুরঘাট ব্রিজ পার হয়ে আমাদের রওনা হতে হবে পটিয়া হাটহাজারীর দিকে, কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে।
সামনে এবার নীল সমুদ্র
পর্যটন শহর হিসাবে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা মানুষদের জন্য যে পরিমান সুযোগ-সুবিধা থাকা উচিত, এর আগে কখনই তা না পাওয়া নিয়ে মনে একটা খেদ আমার সব সময়ই ছিল। পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেলগুলো বাদ দিলে, ৮০ দশকের শুরুর দিকেও কক্সবাজারে আবাসিক হোটেল বলতে ছিল— সৈকত থেকে বিস্তর দূরে, শহরের মধ্যে সাধারন মানের কিছু হোটেল। সেবার মান নিয়ে বলার মতো কিছু ছিল না। সমস্যা ছিল খাওয়া দাওয়া নিয়েও। ভাল কোন খাবার হোটেলই ছিল না, যেখানে আপনি শান্তি করে সাধারন খাবার খেতে পারেন। রেস্টুরেন্ট যা ছিল রান্না হতো স্থানীয় কায়দায়, যেন দুনিয়ার সকল মানুষ আরাকানী সভ্যতা আর ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত, আর তারা একই ধরনের খাবার খায়!! কোন খাবারের পদ কিভাবে সার্বজনীন উপায়ে রান্না করা যায়, এবং পর্যটকের পাকস্থলীকে দু দণ্ডের শান্তি দেওয়া যায়, সে বিষয়ে কারো কোন বিবেচনা ছিল না।
সে সময়েই প্রথম আমার কক্সবাজার আসা। মনে আছে শহরের পৌরসভার উল্টাদিকের একটা হোটেলে আমরা বন্ধুরা ছিলাম— খুবই সাদামাটা টানা বারান্দাওয়ালা একটা তিনতলা বিল্ডিংএ ছিল হোটেলটা। বাথরুমগুলো অপরিস্কার, সব সময় ভিজা একটা স্যাঁতসেতে ভাব। বিছানার চাদর বদলে দেবার পরেও তাতে যেন অচেনা মানুষের গায়ের গন্ধ! টেবিলের ড্রয়ারে মিনি সাইজের গুড়া গুড়া তেলাপোকা...
নব্বই দশকের শুরু থেকেই কক্সবাজারে বেসরকারী উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করা শুরু করে। সমুদ্র সৈকতের প্যারালাল বিচ রোডের পাশে পাশে তৈরী হতে থাকে নতুন নতুন হোটেল। বাড়তে থাকে সেবার মান, বাড়তে থাকে পর্যটকদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যের মাত্রা। সে সময় কক্সবাজার গেলে দেখা যেত একটার চাইতে আরেকটা ঝকমকে হোটেল, সেবার মধ্যে পেশাদারী ছাপ। এ সময় থেকেই কক্সবাজারে পর্যটকের ভীড়ও আগের চাইতে বাড়তে থাকে, শীতের চিরকালীন ভীড় ছাড়াও ঈদের ছুটি, এমন কি টানা ৩/৪ দিনের ছূটি পেলেই, দেখা গেছে মানুষজন রওনা হয়েছে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। আর ঈদ মানেই কক্সবাজারে ছুটি কাটানো তো এখন রীতিমতো চালু ফ্যাশন। তবে সবার উপরে সেরা আকর্ষন বোধ করি থার্টি ফাষ্ট নাইটের জমকালো অনুষ্ঠানগুলো।
নব্বই দশকের এই পর্যায়ে এসেও কক্সবাজারের সমস্যা ছিল ভাল মানের খাওয়ার হোটেল। থাকার জন্য মানান সই হোটেল পাওয়া যেত, কিন্ত অনেক আবাসিক হোটেলেরই নিজস্ব ডাইনিং এ্যারেঞ্জমেন্ট ছিল না। অল্প কিছু রেষ্টুরেন্ট যা ছিল, তাতে খাবারের মান চলনসই, কিন্ত পরিচ্ছন্নতার বিষয়টা তখনও অবশ্যকরনীয় তালিকায় মুখ্য হয়ে উঠে নাই। আমার মনে আছে ২০০০ সালের দিকেও, কক্সবাজারে কোন একটা রেষ্টুরেন্টে ঢুকেছি, বীচ রোডের উপর সেটা ছিল সে সময়ের যথেষ্ট জনপ্রিয় একটা রেষ্টুরেন্ট। কিন্ত সেখানে যত মানুষের ভীড়, তার চেয়েও বেশি ভীড় ছিল মাছির। মানুষজন পরিবার পরিজন নিয়ে খাবার খাচ্ছে আর দুই হাত দিয়ে প্রাণপণ মাছি তাড়াচ্ছে। যারা সামান্য মাছি সামলাতে পারে না, তারা কিভাবে রেষ্টুরেন্ট চালায়... এ প্রশ্ন করার লোক অবশ্য তেমন একটা চোখে পড়ে নাই। সে যাত্রা হোটেল সায়মনের নিষ্প্রান রান্না খেয়েই দিন কাটিয়েছিলাম।
আমার ধারনা ভাল একটা রেষ্টুরেন্ট চালানো পুরোপুরি একটা সামগ্রিক কাজ। অর্থাৎ এটা করলে আপনি অন্য কোন দিকে নজর দিতে পারবেন না। একই সঙ্গে আবাসিক হোটেল এবং জনপ্রিয় রেষ্টুরেন্ট চালানো অনেক দুরহ কাজ। কাজেই ভাল বুদ্ধি হলো যে হোটেলে উঠেছেন, খাওয়া দাওয়ার জন্য সে হোটেলের ইনহাউস ডাইনিং এর পথ কখনই না মাড়ানো...
শেষ পর্যন্ত ঘড়িতে যখন বেলা ৩টা ছুই ছুই, আমাদের বাস এসে ঢুকলো কক্সবাজারে। ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার সময় আমার হাতে হোটেল রিজার্ভেশনের একটা এনভেলাপ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অলশ ভাবে তাতে একবার চোখ বুলিয়েছিলাম, সীগাল হোটেল। কিন্ত জানা ছিল না কি ধরনের হোটেল, কেমন তার মান...
হোটেল সীগালঃ বঙ্গোপসাগরের ২৫গজের মধ্যে...
কক্সবাজার পৌছে ফোনে ইমরানের সাথে কথা হলো, ঘুম জড়ানো গলায় উত্তর এলো, একটা রিক্সা নিয়ে চলে আয়। আমি তোর জন্য অপেক্ষা করছি।
রিক্সা নিয়ে হোটেলে ঢুকছি, চারপাশটা দেখতেই মনটা ভরে গেলো। এত চমৎকার হোটেল, কক্সবাজারে!! আশাই করা যায় না, মানে আমি অন্ততঃ করি নাই। বীচের ঝাউবন আর তার পাশের রাস্তার ওপাশে নীল কাঁচে ঢাকা পরিচ্ছন্ন ছিমছাম হোটেল। প্রথমেই যা চোখে পড়ে, তা হলো যত্ন করে লাগানো গাছ। রাস্তার ওপারে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে থাকা বিশাল ঝাউ গাছের বন। মজার ব্যাপার হলো সেই বন থেকে কয়েকটা ঝাউ গাছ যেন হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে হোটেলের লনে। সার বেঁধে দাড়িয়ে থাকা ঝাউগাছগুলোর নীচে রয়েছে সারি সারি নারকেল গাছ। হোটেলের প্রবেশ পথ আর প্রস্থান পথ থেকে দুই অর্ধবৃত্তাকার রাস্তা সোজা গিয়ে মিলেছে পোর্টিকোতে। সে রাস্তার দুপাশে ট্রিম করে রাখা ছোট ছোট ঝাউগাছ। আর মাঝখানে সবুজ ঘন ঘাসের মসৃন বিশাল আকারের লন...
দোতলায় হোটেলের রিসেপশন, সেখানে কাউন্টারের পিছনে কয়েকজন তরুনী একই ডিজাইনের ড্রেস (ইউনিফর্ম) পরে ব্যাস্ত সমস্ত হয়ে ছুটোছুটি করছে। পোর্টার পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সেদিকে, চেক ইন করার জন্য। কাউন্টারের কোনের দিকে খাটো চুলের গোলগাল উজ্জ্বল স্বাস্থ্যের একটা মেয়ে কম্পিউটারে কিছু একটা করছিল... আমার খুব ইচ্ছে করছিল মেয়েটা আমাকে সার্ভ করুক। আমি সেদিকেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার আগেই সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন চশমা পরা এক ভদ্রলোক , হাসি হাসি মুখে আমাকে সম্ভাষন জানালেন... হাত বাড়িয়ে আমার হাত থেকে রিজার্ভেশনের খামটা নিলেন। কাজ থামিয়ে আড় চোখে মেয়েটা আমার দিকে তাকালো, তাকিয়ে থাকলো স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সময় নিয়ে।
আজ সন্ধ্যায় কফিশপে, মেয়ে তোমার দাওয়াত থাকলো... মনে মনে বললাম আমি।
সপ্তাহ দুয়েক আগে হোটেলের এসব বুকিং সেরে রেখেছিল ইমরান, তার এক বন্ধুর মাধ্যমে। ইমরান থাকলে এ সব ঝুট ঝামেলা নিয়ে আমাকে মাথা ঘামাতে হয় না। হোটেলের সাত তলায় বাম পাশে্র ব্লকে সার বেঁধে স্যুইটগুলো, তার আগে লিফট থেকে নেমে ফ্লোরের কালো মার্বেলের দাগ ধরে এগুলে সামনেই ডিলাক্স রুমগুলো। আমাদের পাশাপাশি দুইটা রুম ৭২৮ আর ৭৩০।
হোটেলের র্যাংকিং কিভাবে করে সে বিষয়ে আমার পরিস্কার ধারনা নাই, যদিও কাগজে কলমে সীগাল হোটেল নিজেদের ফাইভ স্টার ডিলাক্স হোটেল হিসাবে দাবী করছে, তবে হোটেলটাকে আমার পুর্ণাঙ্গ পাঁচতারা হোটেল মনে হয় নাই। হয়তো কক্সবাজারের মাপে এগুলোই পাঁচতারা হোটেল। তবে সে যাই হোক, গতরাত থেকে ধকল পোহানো শরীরে এ রকম একটা আশ্রয়ের খুব দরকার ছিল। রুমে ঢুকে গরম পানিতে শরীর ডুবিয়ে একটা ম্যারাথন ওয়াশ দিয়ে ফ্রেশ হয়ে যখন লবিতে নামলাম, ঘড়ির কাটায় তখন সন্ধ্যা হয় হয়। ইমরান আমার জন্য খাবার অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছিল, ডাইনিং রুমে ঢুকেই ঝাঁপালাম ভুনা পামফ্লেটের ওপর। খিদার মুখে খেলাম গোগ্রাসে, কিন্ত বেশ টের পেলাম আসল পামফ্লেট খাওয়ার জায়গা এটা নয়। সমুদ্রের ধারে বসে যদি ডিপ ফ্রীজে রাখা পামফ্লেট খেতে হয়...
সুর্য ডোবার মুখে বের হলাম বীচের দিকে। জানা গেল সীগালের নিজস্ব প্রাইভেট বীচ আছে, রাস্তার ওপারেই... সার্বক্ষনিক নিরাপত্তা রক্ষীদের তত্ত্বাবধানে। ঝাউবনের মাঝদিয়ে চলে গেছে লম্বা কাঠের পাটাতন, সেখান থেকে নামলেই শুরু হয়ে গেল সমুদ্রের ঢেউএর আছড়ে পড়া।
কাফে মারমেইড
দূর থেকে ভেসে আসছিল রিদমিক রক মিউজিকের জোরালো সুর। ফোঁটায় ফোঁটায় জারক রসে রাত জমে উঠছে কাফে মারমেইডে। চড়া বিটের ধাতব মুর্ছনা, এ্যাকুয়াষ্টিক গিটারের ক্রমশঃ চড়াই থেকে পীকে উঠতে থাকা... কলিজায় টান লাগানো ড্রামের বিস্ফোরক বাজনা। কিছুটা রক কিছুটা ব্লুজ, কিছুটা ক্ষেপাটে, কিছুটা বন্য... কিন্ত দারুন সপ্রাণ এ্যারোস্মিথ, দ্য ব্যাড বয়েজ ফ্রম বোষ্টন। মাথার মধ্যে সব কিছু আউলা করে দেওয়া। সারা শরীরের প্রতিটা কোষে জমে থাকা শেষ বিন্দু শক্তি থাকা পর্যন্ত সচল থেকে, প্রমোদে মন ঢালিয়া দিতে বাধ্য করা।
কাফে মারমেইড
আমি মনে মনে কল্পনা করার চেষ্টা করছিলাম, যেন লাইভ মিউজিক শুনছি... আর দেখছি সাথে উদ্দাম নাচ। ঘন ভিয়ানে চড়ানো খেজুর রসে ক্রমাগত জ্বাল দিয়ে যাওয়া যেন, ধীরে ধীরে দানা বেঁধে জমে উঠছে জীবনের এক একটা ক্রিস্টাল মুহুর্ত। একটা সত্যিকারের সময় কাটানোর মত সন্ধ্যা। বীচের উপর দিয়ে কোনাকুনি হাঁটতে হাঁটতে আমরা যাচ্ছিলাম কাফে মারমেইডের দিকে — রাতের খাওয়া সারতে...। অনেকটা সময় পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে বেশ, ঝির ঝির বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে আবার, এরই মধ্যে। এ সময় যেন মঞ্চে উঠলেন জিমি হেন্ড্রিংস... হেই জো, হোয়্যার য়্যু গোয়িং উইথ দ্যাট গান অব ইয়োর হ্যান্ড... বৃষ্টি অগ্রাহ্য করে হেভী মেটালে শরীর ডুবিয়ে আমরা এসে ঢুকলাম কাফে মারমেইডে।
কয়েকটা দোচালা আর চৌচালা, দূরে কিচেনের পাশে একটা ছোট হলরুম, বিশাল এলাকা জুড়ে এই হল কাফে মারমেইড। মাথার উপর পাতার ছাউনি, তাতে খুঁটি হিসাবে ব্যবহার হয়েছে গাছের কোন কান্ড। পার্টিশন আর আড়ালের জন্য ইচ্ছেমতো ব্যাবহার করা হয়েছে বাঁশের বেড়া আর বাঁশের চিক। গাছের গুড়ি আর ডালপালা। টেবিল চেয়ারের নিচের মেঝেতে কাঠের পাটাতন, বাকিটা স্রেফ ইট বিছানো পায়ে চলার রাস্তা। পালিশ বিহীন চেরাই করা কাঠের চেয়ার, বিবর্ণ আর অমসৃন কাঠের উপরিভাগ। টেবিল গুলো জোগাড় করা হয়েছে পুরানো জাহাজের প্লাইউডের বোর্ড থেকে। এখানে ওখানে বেড়ার পাশে রাখা আছে বাঁশের টুকরি, মাছ রাখার খালুই। যেন কোন নিষ্ঠাবান গেরস্থর ঘর-বাড়ী আর কি। যেখানে খাবার খেতে বসলে এমনিতেই আপনি রিল্যাক্স ফিল করবেন, শিথিল আরামে ডুবে যাবেন আপনি। কিন্ত এখানে ওখানে যা কিছুই থাক না কেন, সব কিছুর সাথে জড়িয়ে আছে একটা নিঁখাদ পরিকল্পনা, একটা সামঞ্জস্য আর পরম্পরা। কোন কিছুই তুচ্ছ কিংবা বাড়তি মনে হবে না আপনার কাছে।
খাঁটি সমালোচকের ভঙ্গিতে খুঁত ধরার আশায় এক ফাঁকে ঘুরে আসলাম ওয়াশ রুম থেকে... সেখানেও পেলাম খটখটে শুকনা এক চিলতে বাথরুম, যথেষ্ট উজ্জ্বল আলো, আধুনিক ফিটিংস আর অবশ্যই সাবানের বদলে লিক্যুইড হ্যান্ড ওয়াশ। আগেই ঠিক করা ছিল এ যাত্রায় আমরা কোন মুরগীর কিংবা গরুর মাংশ ছোঁব না। যত পারি মাছ বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ খেয়ে যাব। খাবারের অর্ডার দিলাম নান রুটি, রুপচাঁদা ফ্রাই আর স্যামন মাছের কিছুটা স্মোকড, কিছুটা ভুনা (এটা ছিল সেফ’স চয়েশ) সাথে ফ্রেশ সালাড।
একটা জিনিষ খুব ভাল লাগলো, কাফে মারমেইড যারা চালায়, তারা প্রায় কেউই স্থানীয় নয়। কেউ গাজীপুরের, কেউ মানিকগঞ্জের এমন কি কেউ কেউ ময়মনসিংহের। তারা কক্সবাজার এসেছে শুধু মাত্র পেশাগত কারনে। এর আগে সাধারনতঃ পর্যটকদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ব্যাবসায় স্থানীয় লোকেরাই যুক্ত থাকতো। পেশাগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটা অবশই একটা অন্তরায় ছিল। সে জায়গায় বর্তমানে ব্যক্তি উদ্যোগ গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে এই যে বেশী মাত্রায় অস্থানীয় লোক পর্যটন শিল্পের সাথে যুক্ত হচ্ছে, এটা একটা শুভ লক্ষন। এর অন্য একটা অর্থ হচ্ছে পর্যটন শিল্পের বাজার সম্প্রসারন হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় বসবাসরত যোগ্য আর পেশাদার ব্যক্তিদের কক্সবাজার এখন চাকুরি অফার করতে পারে।
সীগালে সকালের নাস্তার বুফে দশটার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। এই ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারী, রুম ট্যারিফের সাথে ইনক্লুডেড। পৌনে দশটার দিকে ঘুমে কাতর শরীর টাকে ঠেলেঠুলে কোন ভাবে ডাইনিং রুমে গিয়ে হাজির হলাম। থরে থরে সাজানো সব্জি ডাল থেকে শুরু করে সেমাই সুজির হালুয়ার সাথে পরোটা অথবা লুচি। আন্ডা চাইলে তাও মজুত...
এ জীবনে আমি যত সমুদ্র দেখছি আমার কাছে কেন যেন উড়িষ্যার পুরীর সমুদ্র সব চেয়ে বেশী প্রানবন্ত আর বন্য মনে হয়। সাহায্যকারী হিসাবে স্থানীয়দের পাওয়া যায়, যাদের নুলিয়া বলে... আমার কাছে পুরীর সমুদ্রর মতো অন্য কিছুকে আর লাগে নি। আর আমার দেখা সবচেয়ে জঘন্য সমুদ্রবীচ মনে কেন্টের (ইংল্যান্ড) মারগেট বা হার্ণ বে।
বয়স হচ্ছে বলেই হয়তো, দিন দিন আমি যেন বেশি সুশীল হয়ে যাচ্ছি... নাস্তার পরে সমুদ্রে গিয়ে দাপাদাপির প্রসঙ্গ উঠতেই সমুদ্রের ঘোলা ময়লা পানির কথা মনে পড়লো। ইমরান আমাকে খুব ভাল চেনে, ভাল বোঝে — ফলে চাপাচাপি করলো না। ঠিক হলো ওরা পানিতে নামবে, আমি কাঠের চেয়ারে গা এলিয়ে থাকবো। সকাল বেলা হোটেলের প্রাইভেট বীচ জমে উঠেছে... দলে দলে মানুষ আসছে জোড়ায় জোড়ায়।
এক বিদেশী কাপল কে দেখলাম রাবারের টিউব নিয়ে, মাতামাতি করতে। ইমরানদের দাপাদাপি চলছে মহা উৎসাহে, এমন সময় নামলো আচমকা এমন মুষলধারে বৃষ্টি। মাথার উপর বিশাল বীচ আমব্রেলা কিন্ত বৃষ্টির দাপট থেকে সাধ্য কি আমাকে বাঁচায়?, আমার কাপড় ভিজলো, মোবাইল ভিজলো, শেষে ক্যামেরা বাঁচাতে ছুট লাগালাম হোটেলের দিকে।
আগামী পর্বঃ বান্দরবান
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


