somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার কর্ণফুলী, আমার চট্টগ্রামঃ বৃষ্টিমেদুর স্মৃতিকাতরতা...

১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১০:৪৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


উৎসর্গঃ প্রিয় ব্লগার নুশেরা তাজরীন, রিফাত হাসান, তারার হাসি আর সেই সাথে চট্টগ্রামের সমস্ত ব্লগারদের।
প্রথম পর্বঃ আমাদের যাত্রা হলো শুরু...

দ্বিতীয় পর্বঃ আমার কর্ণফুলী, আমার চট্টগ্রাম। বৃষ্টিমেদুর স্মৃতিকাতরতা

শ্রদ্ধেয় ব্লগার মনজুরুল হক'কে এবারের ২য় পর্ব উৎসর্গ করা হলো

স্বচ্ছ কাঁচের ঘেরাটোপে মূড়ে রাখা পুরোটা বাস, এই মুহুর্তে স্থবির হয়ে পড়া শহরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে, বৃষ্টিতে। সেই জানালা বিহীন দেয়ালের পর্দা সরালে দেখা যায় কাঁচের স্বচ্ছতা বেয়ে নামছে অবিরাম জলের ফোঁটা, ফিরতি পথের গাড়ীর হেড লাইটের আলোয় মুহুর্তেই প্রতিটা জলের ফোঁটা পরিনত হচ্ছে উজ্জ্বল একেকটা আলোক বিন্দুতে। সারাটা কাঁচের দেয়াল ঝকমকিয়ে ওঠছে, যেন ঝলসে উ্ঠছে অজস্র চূনী পান্না... সুন্দরীর নাকে বসানো হীরার নাকছাবি।

সে দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার চোখে তন্দ্রা নেমে আসে...।

আজ ভোরে ঘুম ভাঙ্গলো বউ এর টেলিফোনে, আটলান্তিকের ওপার থেকে ভেসে আসে তার উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বর।

—তুমি এখন কোথায়, কক্সবাজার পৌঁছে গেছ?

ঘুমের আঠায় জড়িয়ে আছে চোখ... ভাল করে তাকাতে পারছি না, চোখ খুলতে কষ্ট। কতক্ষন ধরে বাসটা চলছে...? গত রাতের জট পাকানো রাস্তার গিঁট খুলে বাস কখন শহর ছেড়েছে কে জানে? আবছা মনে আছে, শেষ রাতে কুমিল্লায় থেমেছিল বাসটা কিছুক্ষনের জন্য, তারপর আর কিছু মনে পড়ছে না। পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাইরে আলো ফুটে গিয়েছে। কিন্তু চারপাশ ভোরের ফ্যাকাশে আলোতে বোঝার উপায় নেই, এটা কোথায়... বাইরে ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি তখনও পড়ছে, ঠিক ঘুমিয়ে পড়ার আগে যেমন দেখেছিলাম। বাস চলছে সতর্ক সাবধানী ভঙ্গীতে, একঘেঁয়ে গতিতে...

ভারী মুশকিল হলো... হঠাৎ করে কি ভাবে বলি— এটা কোথায়? কক্সবাজার নাকি চট্টগাম...? শেষবার কক্সবাজার এসেছিলাম প্রায় ৮/৯ বছর আগে। তখন রাস্তাঘাটের যা অবস্থা ছিল, এর মধ্যে কত কিছুর বদল ঘটে গেছে, চারপাশে... আমার পক্ষে এখন ঠাওর করা মুশকিল, কোনটা কক্সবাজার, আর কোনটা চট্টগ্রামের রাস্তা!! ফলে কিছুই বুঝতে পারছি না, মাথাও কাজ করছে না। এটুকু বোঝা যাচ্ছে, এই মুহুর্তে বাসটা কোন শহরতলীর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, চারপাশের গাছ-গাছালি কমে আসছে, এখুনি শুরু হয়ে যাবে লোকালয়। দেখতে পাচ্ছি রাস্তার পাশে জড়ো করে রাখা বিস্তর সিরামিকসের কমোড, ওয়াশ বেসিন..., বিশাল বিশাল সিলিন্ডার আর পুরানো ফার্ণিচার। এক সময় চোখে পড়ল, একটা নারকেল গাছে ছোট একটা সাইনবোর্ড ঝুলছে, তাতে লেখা ভাটিয়ারী (বাকী শব্দ গুলো অস্পষ্ট)। এ জায়গাটা অবশ্য আমি ভাল মতো চিনি, চট্টগ্রামে ঢোকার ঠিক আগে, পুরানো বাতিল সব জাহাজ ভাঙ্গার যে জেটিগুলো আছে, এগুলো ভাটিয়ারীতে। আরো কি কি যেন আছে ভাটিয়ারীতে, শুনে নিতে হবে। একটু পরেই আসবে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ...

কিন্তু এ সময় তো আমাদের কক্সবাজারের কাছাকাছি থাকার কথা, ঘড়িতে বাজে প্রায় ৯টা... বৃষ্টির দাপটে সব কিছু আবছা হয়ে যাওয়ায় এতক্ষন ঠিক বোঝা যায় নাই। যতটা ভোর ভাবছিলাম, সে তুলনায় বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে। ঢাকায় আমাদের বলা হয়েছিল ৯টার মধ্যে আমরা কক্সবাজার পৌঁছে যাব। কোথায় কি...? গাড়ী এখন মাত্র ঢুকছে চট্টগ্রাম শহরে, কক্সবাজার তবে পৌঁছবে কখন?

এ সব নিয়ে আমার খুব যে উৎকন্ঠা, তা অবশ্য নয়। নেহাৎ এই হঠাৎ ঘুমের চটকা ভেঙ্গে বউ এর গলায় কিছুটা দুঃশ্চিন্তার সুর শোনা, (আর কে না কানে বউদের কাজই হলো স্বামীদের সব কিছু নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করা)। সাত সকালে সেটাই হয়তো ছোঁয়াছে রোগের মতো আমাকে আক্রান্ত করেছে। তা না হলে, বেড়াতে বেড়িয়েছি, কারও সাথে কোন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেই, ফেরারও কোন দিনক্ষন নেই, কোথাও কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে নেই... এখানে দুঃশ্চিন্তার প্রশ্ন আসে কোত্থেকে...? আমার কি কোন সকাল বিকাল আছে? কক্সবাজার পৌছানো নিয়ে কথা, এক সময় পৌছলেই তো হলো।

তার চেয়ে আমি খুব মনোযোগ দিয়ে চট্টগ্রাম শহরটাকে দেখতে থাকি। এখনও যথেষ্ট যৌবনদীপ্ত এ শহর, উপচে পড়া গাড়ীর চাপে নষ্ট হয়ে যায় নি। কাল সারা রাতের বৃষ্টিতে ভিজে পুরো শহরকে লাগছে ধোয়া ফিটফাট ঝকঝকে। দেখতে বেশ লাগে। যেন ঈদের দিনের সকালের নবীনা কিশোরী। গোসল সেরে উঠে সাজগোজ করার অপেক্ষায়- সামনে ছড়ানো তার এক গুচ্ছের ড্রেস, সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না... কোনটা রেখে কোনটা পড়বে। আয়নায় ভেসে উঠে তার পান পাতার মতো সজীব মুখচ্ছবি... আর চুলের গোড়া বেয়ে নামতে থাকে বিন্দু বিন্দু পানির ফোঁটা।

ছুটির দিনের চাকুরীজীবির মতো এ শহরের ঘুম তখনও ভাঙ্গে নাই। আমার সিট পড়েছে বাসের ডান ধারে, সিটে বসে বসে দেখছি চারপাশ। দোকানপাট, খাটো পাঁচিল দেওয়া বাসাবাড়ী আর রাস্তার ফুটপাত... সব কিছু পিছলে চলে যাচ্ছে- পেছনের দিকে। এখান থেকে রাস্তার অপর প্রান্ত অনেক দূর... সাইনবোর্ডগুলোর ছোট ছোট লেখাগুলো পড়া যাচ্ছে না। ফলে বোঝা যাচ্ছে না, এটা শহরের কোন এলাকা।

খুবই অবাক লাগে, চট্টগ্রাম শহর নিয়ে আমার অধিকাংশ স্মৃতির সাথে জড়িয়ে আছে বৃষ্টি... ৮০’র দশকের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রামের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। সেই আমার জীবনের প্রথম সমুদ্র দেখা, আর প্রথম দেখা একটা শহর, যার পথের চড়াই উৎড়াই এর বাঁকে বাঁকে ছড়ানো ছিটানো থাকে ঘন সবুজ অরণ্যানী, লতানো গাছপালা আর গভীর খাদ — দিকচক্রবালে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে সারিবদ্ধ মাটির পাহাড়। অপুর্ব লাবন্যময়ী বালিকারা সেখানে সবুজ ফিতায় তাদের স্কুল ড্রেসের কোমরবন্ধ এঁটে রাখে, আর স্কুলের সামনের ঢালু মাঠটায় জটলা করার সময় গাড়ী থামানো ভিনদেশী তরুনদের পাঁচলাইশের ঠিকানা বাতলে দেয়। এই শহরের ধর্মীয় মুল্যবোধের আধিক্য আর আপাত রক্ষনশীলতা নিয়ে অনেক কিছু শুনেছি, কিন্ত মনে আছে অচেনা সেই স্কুল বালিকারা আমাদের সাথে কথা বলেছিলো সোজাসুজি চোখে চোখ রেখেই।

চট্টগ্রামে সেটাই ছিল আমার প্রথম আসা।

দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১০:৫১
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×