১৫ই জুলাই অস্থির, হাইপার, পাগলীর জন্মদিন। অনেকবার লিখে রাখবো লিখে রাখবো মনে করি, আর ভুলে যাই। আজকে ভাবলাম নাহ, এবার সেটা লিখে ফেলানোই যাক। মাশীদ যেদিন সিংহপুরের নিবাসগুটিয়ে মালয়শিয়ায় চলে যাবে সেদিকের গল্প। কতদিন আগের কথারে মাশীদ? (আমার আবার দিনতারিখ মনে থাকে না!)
এক.
মাশীদের জামাই ইতিমধ্যে মালয়শিয়ায় মোটামুটি কাজের খাতিরে স্থায়ী। সুতরাং এখানে মাস্টার্সের কাজে ফাঁকে ফাঁকে মাশীদ সিংহপুর - মালয়শিয়ার অভিযাত্রী। কতবার যে উইকএন্ডে মালয়শিয়া গেছে তা ওর পাসপোর্টের সিল না গুনলে বলা মুশকিল। ত্রিশবার, নাকি? সিংহপুর খুব উদার। ন্যাশনাল ইউনির ছাত্র হিসেবে আমাদের স্টুডেন্ট পাসের কল্যানে যতবার খুশি আসাযাওয়ার মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা থাকায় মালয়শিয়া যাওয়া ডাল ভাত।
সুতরাং সব গুটিয়ে মাশীদ মালয়শিয়া চলে যাচ্ছে এ বহুবার ঘটে যাওয়া ঘটনা। তারপরেও সেবারের শেষ বারের মতো যাওয়াটা ছিলো তার থেকে বেশি কিছু। মাশীদ এবার পুরোপুরি চলে যাচ্ছে। হয়তো আবার আসবে, হয়তো আসা হবে না।
আমার চেয়ে ইন্দ্রনীল বেচারার মনটা বেজায় খারাপ। আমি চুপচাপ নিরিবিলি মানুষ। একা ঘুট করে বসে থাকতে পারি। ওদিকে ইন্দ্রনীলের জন্য মাশীদ ছিলো খুব ভালো বন্ধু এবং ভাইস ভার্সা। সুতরাং ওর মিস করার ইনটেনসিটি অনেকগুন বেশি হবে সেটা অনুভব করা যাচ্ছিলো।
কলকাতায় গিয়ে ইন্দ্রনীলের বাবা মায়ের সাথে দেখা করতে যাওয়ার সময়ে কাকিমা বলছিলেন, তুমি মাশীদ সিংগাপুর থেকে চলে যাবে, নীলটা (ইন্দ্রনীলের বাড়ির ডাক নাম) যে কিভাবে থাকবে। ইন্দ্রের যত রাজ্যের খাতির ঐ মাশীদের সাথে। থ্যাংকস গড যে আজকাল মেসেঞ্জার ফেসেঞ্জার আছে। যেখানেই যাও একেবারে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় না। তারপরেও টুক করে রবিবারে ঘুরতে যাও, মন ভালো না লাগলে একটা উদ্দেশ্যবিহীন বাসে সঙ্গী হয়ে বেরিয়ে পড়ো সেসব তো আর থাকছে না।
দুই.
মাশীদ চলে যাবে, চলে যাবে - করতে করতে এক সময়ে সত্যই মাশীদের গুডবাই সময় চলে আসলো। শেষ কয়েকটাদিন আমরা ধুমায়ে সময় কাটিয়েছি নিজেদের কাছাকাছি। আমরা মানে আমি, মাশীদ, ইন্দ্রনীল আর কখনো কখনো শোভন, সাজিদ, আরেফিন দম্পতি। "এমনি করে যায় যদি দিন, যাক না" টাইপ অবস্থা। আমি যখন বাংলাদেশে তখন আমাদের সুপার হিরোইন এন্ড পপুলার মাশীদের ফেয়ারওয়েলটা পর্যন্ত হয়ে গ্যাছে, মিস করেছি সেটা।
অবশেষে মাশীদের যাওয়ার সময় আসন্ন। বিভিন্ন কিস্তিতে যাবতীয় জিনিসপত্র ইতিমধ্যে বর্ডার পার হয়েছে। সুতরাং ওর সাথে এবার অল্প কিছু জিনিস। ঢাউস একটা ব্যাকপ্যাক আর টুকিটাকি হন্ডিপন্ডি। ইন্দ্রের বাড়ি থেকেই যাওয়া হচ্ছিলো। সবার মনটন খারাপ। মাশীদের একটু আগ পর্যন্ত লাফালাফি, হাসিখুশি অবস্থার বিরতি। এখন তার মুখে মন খারাপের অন্ধকার যা আমাবশ্যার চাঁদ। (অন্য সময়ে মন মেজাজ খারাপ থাকলে তার কুটনামী বন্ধ হয় না, বাকিদের জ্বালাতে থাকে। হাইপার যে!)
ইন্দ্রের মন খারাপ, আরেফিনের বউয়ের মন খারাপ, সাজিদের, শোভনের মন খারাপ। মাশীদ যাইতাছে গা!
তিন.
মালয়শিয়া সম্প্রতি ফরমুলা ওয়ান চালু করতে যাচ্ছে এবং মাশীদের সাথে তিনজন জুনিয়ার ইউনিভার্সিটির ছেলে একসাথে মালয়শিয়া যাচ্ছে সেই ফরমুলা ওয়ানের ভুম ভুম রেস দেখতে।
ওদের পিকআপ করার জন্য ট্যাক্সিতে ওঠা হলো। আমি, মাশীদ আর সাজিদ যাচ্ছি। ইতিমধ্যেই মাশীদের চোখে পানি। ইন্দ্রনীলের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া হলো, নেওয়া হলো আরেফিন দম্পতির কাছ থেকে।
গাড়িতে উঠে মাশীদের মন খারাপের ভলিউম হুহু করে বেড়ে উঠছে। কখনো বেচারার মাথায় হাত রাখি, কখনো অস্ফুট বিড়বিড় করে বলি মন খারাপ করিস না (সব সময় ঠিক কথাগুলোও মনে আসতে চায় না, কচুর মাথা!)। বোধ হয় বলেছিলাম, আমি ইন্দ্র কয়েকদিন পরেই তোর বাড়িতে বেড়াতে যাবো - ইত্যাদি ইত্যাদি (যা প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ফলোআপ করা হয়েছিলো)।
ঠিক সেই সময়, ঠিক সেই সময়ে একটা ঘটনা ঘটেছিলো। অনেকে সেটাকে ডাকে মিনিংফুল কো-ইনসিডেন্স, কখনো অনেকে ডাকে সিনক্রোনোসিটি।
চার.
ট্যাক্সির পেছনের সিটে আমরা তিনজন। ট্যাক্সির রেডিওতে এফএম চলছে। মাশীদের মুখ বেয়ে চোখের জল। পরিবেশ গুরুগম্ভীর। সবার মন খারাপ বলাই বাহুল্য।
আমি বোধ হয় অস্ফুট স্বরে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আবার নিরবতা, হাতে গোঁজা টিস্যু। কখনো নিজেকে লুকাতে ট্যাক্সির জানালা দিয়ে মনোযাগের সাথে বাইরের দৃশ্য দেখার সাজানো ভান। আবার কখনো টুকটাক কথায় মন খারাপ ভুলানোর চেষ্টা। তখন আমার সান্তনা দেওয়ার ব্যর্থতাকে ব্যঙ্গ করতেই বোধ হয় রেডিওতে বেজে উঠলো, 'নেভার সে গুডবাই'।
মনখারাপের অন্ধকার সরিয়ে আলো জ্বরে ওঠে মাশীদের মুখেও। মাশীদ আর আমি দুজনেই ফিক করে হেসে উঠি এক জন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে। আবার একই লাইন, টেনে টেনে খুব দরদ দিয়ে গাইছে গায়ক। ঠিক সময়ে ঠিক গান। 'নেভার সে গুডবাই'। ঐ মুহুর্তের জন্য এরচে ভালো গান আর কি হতে পারে, এরচে ভালো কথা আর কি বলা যায়?
আসলেই, নেভার সে গুডবাই। দরকার কি?
জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা। ভালো থাকিস, যেখানেই থাকিস। সিংহপুর ছাড়ার আগে আরেকবার দেখা হতে পারে, নাও পারে। ঠিক নেই। তবে... পৃথিবী আজকাল বড্ড ছোট্ট হয়ে গেছে। গুডবাই বলার দিন ফুরিয়েছে। তাই আবারও বলি, নেভার সে গুডবাই। এন্ড হ্যাপি বার্থডে মাশীদ।
আমার সবাই পাল্লা দিয়ে বুড়ো হচ্ছি। কি মজা!
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০০৭ সকাল ১০:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



