আগের পর্ব...
আসলে মানব সৃষ্টির মূল উপাদান কী, কত মূল্যবান, কত উল্লেখযোগ্য বা আকর্ষণীয় তা জানা আবশ্যক। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা মানব জন্মের উপরোক্ত প্রক্রিয়াকে আরও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে অভিন্ন অর্থে বিভিন্ন প্রসঙ্গে উপস্থিত করেছেন। সৃষ্টিতত্ত্বের গুপ্তরহস্যের অলৌকিক বর্ণনায় ইতিমধ্যে মানব প্রজনন সংক্রান্ত কুরআনুল কারীমের বিবরণ ও ব্যাখ্যায় পাওয়া যায়, মানব সৃষ্টির প্রধান উপাদান মাটি। তাই মানব সৃষ্টির অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপাদান মাটি বিষয়ক কয়েকটি আয়াতের উদ্ধৃতি দেয়া হ’ল। এ বিষয়ে সূরা হিজর এর ২৬ ও ২৭ আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন,
‘অবশ্যই আমি মানুষকে ছাঁচে ঢালা শুকনো ঠনঠনে মাটি থেকে পয়দা করেছি, আর (হ্যাঁ,) জ্বিন! তাকে আমি আগেই আগুনের উত্তপ্ত শিখা থেকে সৃষ্টি করেছি’।
সূরা আর-রাহমানের ১৪ ও ১৫ আয়াতে আল্লাহ বলেন,
‘তিনি মানুষকে বানিয়েছেন পোড়ামতো শুকনো ঠনঠনে মাটি থেকে, এবং জ্বিনদের বানিয়েছেন আগুন থেকে’।
সূরা সিজদাহর ৭ আয়াতেও অনুরূপ বিধৃত হয়েছে-
‘তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন সুন্দর (ও নিখুঁত) করেই সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি মানুষ সৃষ্টির সূচনা করেছেন মাটি থেকে’।
অনুরূপভাবে সূরা আন‘আম এর ২ আয়াতেও বর্ণিত আছে যে,
‘তিনি তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি (প্রত্যেকের জন্যে বাঁচার একটি) মেয়াদ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, (তেমনি তাদের মৃত্যুর জন্যেও) তাঁর কাছে একটি সুনির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে, তারপরও তোমরা সন্দেহে লিপ্ত আছো!’।
উল্লিখিত আয়াত সমূহে মানব সৃষ্টির প্রধান উপাদান যে মাটি, ইহা সন্দেহাতীতভাবেই প্রমাণিত হ’ল। অতঃপর সৃষ্টির সর্বব্যাপক কর্মসূচীর মাঝে অসংখ্য প্রাণীর উৎপত্তির সূত্রপাত হয়। এই প্রাণের বা জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের বাণী একদিকে যেমন ব্যাপক, অন্যদিকে তেমনি বাস্তব ও সংক্ষিপ্তও বটে। সামগ্রিকভাবে প্রাণীকূল সৃষ্টির মূল উপাদান হচ্ছে পানি। এর সমর্থনে সূরা আন্ নূর এর ৪৫ আয়াতে প্রত্যাদেশ হয়েছে, ‘আল্লাহ তা'আলা বিচরণশীল প্রতিটি জীবকেই পানি থেকে পয়দা করেছেন’। যেহেতু সকল জীব বা প্রাণী সৃষ্টির মূল উপাদান পানি। সুতরাং মানব সৃষ্টির ক্ষেত্রেও পানির গুরুত্ব অপরিসীম। অর্থাৎ মানব সৃষ্টির মূল উপাদান মাটি, অতঃপর পানি। ইহার সত্যায়নে সূরা আল ফুরক্বান এর ৫৪ নং আয়াতে অবতীর্ণ হয়েছে,
‘তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি মানুষকে (এক বিন্দু) পানি থেকে পয়দা করেছেন, অতঃপর তিনি তাকে (রক্ত সম্পর্ক দ্বারা) পরিবার (বন্ধন) ও (বৈবাহিক বন্ধন দ্বারা) জামাইয়ে (স্বশুরে) পরিণত করেছেন; তোমার মালিক প্রভূত ক্ষমতাবান’।
এরপর সূরা মুরসালাত এর ২০ আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, ‘আমি কি তোমাদের (এক ফোঁটা) তুচ্ছ পানি থেকে সৃষ্টি করিনি?’।
পরবর্তীতে সূরা আত্ তারেক্ব এর ৫ ও ৬নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় মানব প্রতিনিধিদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘মানুষ যেন (ভালো করে) দেখে, তাকে কোন্ জিনিস দিয়ে বানানো হয়েছে; বানানো হয়েছে সবেগে স্খলিত (এক ফোঁটা) পানি থেকে’।
মানব সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব, মাহাত্ম্য, গুরুত্ব ও অপরিসীম তাৎপর্যের অন্তরালে মহান স্রষ্টার পবিত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, মানব জাতির হৃদয় স্পন্দন করার প্রয়াসে, পাক কালামে বহু আয়াতের সমন্বয় ঘটেছে। উপরে বর্ণিত পানির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কযুক্ত বস্ত্তরও (বীর্যের) বহু আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারীমের সূরা আন্ নাহল এর ৪নং আয়াতের তাৎপর্যপূর্ণ বাণী হ’ল,
‘তিনি (ক্ষুদ্র একটি) শুক্রকণা থেকে (যে) মানুষ তৈরী করেছেন- (আশ্চর্যের ব্যাপার!) সে (এখানে এসে স্বয়ং তার স্রষ্টার সাথেই) প্রকাশ্য বিতর্ককারী বনে গেলো!’।
সূরা ইয়াসীন এর ৭৭ আয়াতেও মহান আল্লাহ বলেন,
‘এ মানুষগুলো কি দেখে না, আমি তাদের একটি (ক্ষুদ্র) শুক্রকীট থেকে পয়দা করেছি, অথচ (সৃষ্টি হতে না হতেই ক্ষুদ্র কীটের) সে (মানুষটিই আমার সৃষ্টির ব্যাপারে) খোলাখুলি বিতন্ডাকারী হয়ে পড়লো!’।
একই মর্মার্থে সূরা আদ্ দাহর-এর ২য় আয়াতেও পুনরায় আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি (নারী পুরুষের) মিশ্রিত শুক্র থেকে, যেন আমি তাকে (তার ভালো মন্দের ব্যাপারে) পরীক্ষা করতে পারি, অতঃপর (এর উপযোগী করে তোলার জন্যে) তাকে আমি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন করে পয়দা করেছি।’।
আরও বিস্তারিত তথ্য সহ সূরা আল হাজ্জের ৫ আয়াতে মহান আল্লাহ তা‘আলার বাণী,
‘আমি তোমাদের (প্রথমত) মাটি থেকে, অতঃপর শুক্র থেকে, অতঃপর রক্তপিন্ড থেকে তারপর মাংসপিন্ড থেকে পয়দা করেছি, যা আকৃতি বিশিষ্ট (হয়ে সন্তানে পরিণত হয়েছে) কিংবা আকৃতি বিশিষ্ট না হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে- যেন আমি তোমাদের কাছে (আমার সৃষ্টি কৌশল) প্রকাশ করে দিতে পারি’।
উপরের আয়াতগুলোতে শ্রেষ্ঠ মানবের মর্যাদা ও মাহাত্ম্যের প্রতীক স্বরূপ তার প্রজনন প্রক্রিয়ায় রয়েছে উচ্চতর কলা-কৌশল এবং বিভিন্ন প্রকারের উপাদানের সুস্পষ্ট বিবরণ। মানব শিশু তার জন্মলগ্নে মাতৃগর্ভে ক্ষুদ্রাকৃতির এক গোশতপিন্ডের মত দেখায়। কেন্দ্রস্থলটি মানবাকৃতির মত দেখালেও তখন আলাদা করে কিছুই বুঝা যায় না। পরে গোশতপিন্ডটি (ভ্রুণটি) ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করে বৃদ্ধি থাকে। প্রবৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায়েই গঠিত হয়ে থাক মানব শিশুর হাড়ের কাঠামো পেশ, স্নায়ুতন্ত্র, বিভিন্ন সরবরাহ যন্ত্র এবং অন্ত্রাদিও। আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত এসব তথ্যচিত্র এখন সর্বজনবিদিত।
যাহোক মানব প্রজনন সংক্রান্ত পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলো অত্যন্ত সরল, সহজ ও সাধারণ ভাষায় এলোপাতাড়িভাবে বর্ণিত হয়েছে।
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির ভয়াবহ বিশালতা ও কাঠিন্যতা ব্যতীত, অন্য কোন সৃষ্টির ক্ষেত্রে, মানব সৃষ্টির মত এত খুঁটি-নাটি বা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সৃষ্টিতত্ত্ব উদ্ভাসিত হয়নি। ধর্মীয় উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যেই মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে বিশ্ববাসীর প্রতি অতীব সঠিক ও যুক্তিযুক্ত আধ্যাত্মিক বিষয়াদির বহু উদাহরণ উপস্থিত করা হয়েছে। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পর্যালোচনার জন্যই, মাহাত্ম্যপূর্ণ আয়াতগুলোর অবতারণা যা মানুষের মুক্তির প্রকৃত পথের সন্ধান দিতে সহায়ক হ’তে পারে।
মানব সৃষ্টির নিভৃতে যে গোপনীয় গূড় রহস্য বিদ্যমান, সে বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেন,
‘আকাশমন্ডলী ও যমীনের (সমুদয়) সার্বভৌমত্ব (একমাত্র) আল্লাহ তায়ালার জন্যে; তিনি যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন; যাকে চান তাকে কন্যা সন্তান দান করেন, আবার যাকে চান তাকে পুত্র সন্তান দান করেন’ {সূরা আশ শূরা, আয়াত ৪৯}।
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ সৃষ্টিতে আল্লাহ পরম সন্তুষ্টির বাণী হচ্ছে, ‘অবশ্যই আমি মানুষকে সুন্দরতম অবয়বে পয়দা করেছি’ {সূরা আত্ ত্বীন, আয়াত ৪}।
আমরা আল্লাহ সৃষ্ট শ্রেষ্ঠ জীব। জন্ম-মৃত্যু, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, চিন্তা-গবেষণা, মনোযোগ, অমনোযোগ ইত্যাদি আমাদের চিরসাথী। তন্মধ্যে চিন্তা-ভাবনা, বিবেক-বিবেচনা দ্বারা সত্য ধর্ম ইসলামে প্রতিষ্ঠিত থাকাই হ’ল আমাদের শ্রেষ্ঠ দায়িত্ব ও কর্তব্য। জীবন প্রবাহের মুহূর্তগুলোতে কারণে অকারণে বিভিন্ন চিন্তা ভাবনায় অসংখ্য ভীড়ের উৎপত্তি হয়। অনাকাংখিত ঐসব অশুভ তৎপরতা হ’তে আত্মরক্ষার জন্য আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সুনির্দিষ্ট বিধানাবলী প্রদান করেছেন। তন্মধ্যে জন্ম-মৃত্যু নিয়ে গভীর চিন্তা করা উক্ত বিধানাবলীর একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। অবশ্য এখানে শুধু জন্ম রহস্যের বৈচিত্র্যময় প্রত্যাদেশপ্রাপ্ত বাণীগুলোরই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হয়েছে- যা আল্লাহ একত্ব সহ অন্যান্য সত্য বিধানে আকৃষ্ট করার উত্তম সহায়ক। মানুষ তার জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষা, পান্ডিত্য প্রতিভা, অর্থসম্পদ, প্রভাব প্রতিপত্তি, বিবেক-বিবেচনা প্রভৃতি গুণাবলীর মাঝে নিজের জন্ম বৃত্তান্তের অনুসন্ধান করুক, অতঃপর নিজের করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক, এটাই হ’ল প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা‘আলার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপদেশমালা।
~~~সমাপ্ত~~~
রচনাঃ রফীক আহমাদ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

