somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কুরবানী : ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি- ২[৩] পর্ব

১০ ই অক্টোবর, ২০১১ সকাল ১০:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আগের পর্ব ....
কুরবানীর প্রথম পটভূমি :
মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম কুরবানীর ঘটনা ঘটে আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল-কাবীলের মাধ্যমে। কুরআনুল কারীমে হাবিল-কাবীলের কুরবানীর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে-

‘হে রাসূল! আপনি তাদেরকে আদমের পুত্রদ্বয়ের বৃত্তান্ত যথাযথভাবে পাঠ করে শুনান। যখন তারা উভয়েই কুরবানী করেছিল, তখন একজনের কুরবানী কবুল হ’ল এবং অন্যজনের কুরবানী কবুল হ’ল না। সে (কাবীল) বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন (হাবিল) বলল, অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকীদের কুরবানী কবুল করেন। সে (হাবিল) বলল, যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হস্ত প্রসারিত কর, তবুও আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার প্রতি হস্ত প্রসারিত করব না। কেননা আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি’ {মায়েদা ২৭-২৮}।

তৎকালীন সময়ে কুরবানী গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল এই যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কুরবানীকে ভস্মিভূত করে আবার অন্তর্হিত হয়ে যেত। যে কুরবানী অগ্নি এসে ভস্মিভূত করত না তাকে প্রত্যাখ্যাত মনে করা হ’ত।

হাবিল ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি পশু পালন করত। সে একটি মোটা তাজা উৎকৃষ্ট দুম্বা কুরবানী করল। কাবীল কৃষি কাজ করত সে কিছু শস্য, গম ইত্যাদি কুরবানীর জন্য পেশ করল। অতঃপর নিয়ম অনুযায়ী আকাশ থেকে অগ্নিশিখা অবতরণ করে হাবিলের কুরবানিটি ভস্মিভূত করে দিল এবং কাবীলের কুরবানী যেমনি ছিল তেমনি পড়ে রইল। এ অকৃতকার্যতায় কাবীলের দুঃখ ও ক্ষোভ আরও বেড়ে গেল। সে আত্মসংবরণ করতে পারল না এবং প্রকাশ্যে হাবিলকে বলে দিল لاقتلنك ‘অবশ্যই আমি তোমাকে হত্যা করব’। হাবিল তখন ক্রোধের জবাবে ক্রোধ প্রদর্শন না করে একটি মার্জিত নীতিবাক্য উচ্চারণ করল। এতে কাবীলের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা ফুটে উঠেছিল। সে (হাবিল) বলল, انما يتقبل الله من المتقين ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা মুত্তাকী ব্যক্তিদের কুরবানী কবুল করেন’।

কুরবানীর দ্বিতীয় পটভূমি :
কুরবানীর প্রচলন আদি পিতা আদম (আ.)-এর সময় থেকে শুরু হ’লেও মুসলিম জাতির কুরবানী মূলতঃ ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আ.) এবং তদীয় পুত্র ইসমাঈল যবীহুল্লাহ (আ.)-এর কুরবানীর স্মৃতি রোমন্থন, অনুকরণ অনুসরণে চালু হয়েছে।

আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতির হেদায়াতের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন অগ্নি পরীক্ষা নিয়েছিলেন ইবরাহীম (আ.)-এর নিকট থেকে। তিনি প্রতিটি পরীক্ষায় হিমাদ্রীসম ধৈর্য ও ত্যাগের মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বাণী, وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيْمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ قَالَ إِنِّيْ جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَاماً ‘যখন ইবরাহীম (আ.)-কে তাঁর পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন, অতঃপর তিনি তা পূর্ণ করলেন, তখন তিনি বললেন, আমি তোমাকে মাবনজাতির নেতা বানিয়ে দিলাম’ {বাক্বারাহ ১২৪}।

ইসমাঈল (আ.) যখন চলাফেরা করার মত বয়সে উপনীত হ’লেন, তখন ইবরাহীম (আ.) তাঁর প্রাণ প্রতীম পুত্রকে কুরবানী করার জন্য স্বপ্নাদিষ্ট হ’লেন। একথা সর্বজন স্বীকৃত যে, নবীগণের স্বপ্নও ‘অহি’। তাই এ স্বপ্নের অর্থ ছিল, আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে ইবরাহীম (আ.)-এর প্রতি স্বীয় পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে কুরবানী করার নির্দেশ। এ নির্দেশটি সরাসরি কোন ফেরেশতার মাধ্যমেও নাযিল হ’তে পারত। কিন্তু স্বপ্ন দেখানোর তাৎপর্য হ’ল, ইবরাহীম (আ.)-এর আনুগত্য পূর্ণমাত্রায় প্রকাশ পাওয়া। স্বপ্নে প্রদত্ত আদেশের ভিন্ন অর্থ করার যথেষ্ট অবকাশ ছিল। কিন্তু ইবরাহীম (আ.) ভিন্ন অর্থের পথ অবলম্বন করার পরিবর্তে আল্লাহর আদেশের সামনে মাথা নত করে দেন। আত্মসমর্পণকারী ইবরাহীম (আ.) এই কঠোর পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হন। তিনি পুত্র ইসমাঈলকে জিজ্ঞেস করলেন, يَا بُنَيَّ إِنِّيْ أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّيْ أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى ‘হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে যবেহ করছি। এ বিষয়ে তোমার অভিমত কি’?

নবী-রাসূলগণের স্বপ্ন নিদ্রাপুরীর কল্পনা বিলাস নয়। এ আদেশ অহি-র অন্তর্ভুক্ত। পুত্র ইসমাঈল (আ.) পিতার এ প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে বলতে পারতেন এটি একটি নিছক স্বপ্ন বৈ কিছুই নয়। কিন্তু তিনি তা না বলে অত্যন্ত বিনয় ও আনুগত্যের সাথে স্বীয় পিতাকে সম্বোধন করে বলেছিলেন, يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِيْ إِنْ شَاءَ اللهُ مِنَ الصَّابِرِيْنَ ‘পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে আপনি তা পালন করুন। আল্লাহ চাহে তো আপনি আমাকে ছবরকারীদের মধ্যে পাবেন’ {ছাফফাত ১০২}।

আত্ম নিবেদনের এ কি চমৎকার দৃশ্য! জনমানবহীন মিনা প্রান্তরে ৯৯ বছরের বৃদ্ধ ইবরাহীম (আ.) স্বীয় প্রাণাধিক প্রিয় পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানী করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে এবং তাঁরই অনুরাগ ও প্রেমলাভ করার দুর্ণিবার আগ্রহে পুত্রকে কুরবানীর মেষের মতই উপুড় করে শুইয়ে দিলেন। আর কণ্ঠনালীকে কাটার জন্য বার্ধক্যের শেষ শক্তি একত্রিত করে শাণিত ছুরি তুলে ধরলেন। পুত্র ইসমাঈলও শাহাদতের উদগ্র বাসনা নিয়ে নিজের কণ্ঠকে বৃদ্ধ পিতার সুতীক্ষ্ণ ছুরির নিচে স্বেচ্ছায় সঁপে দিলেন। এ এক অভাবনীয় দৃশ্য! পৃথিবীর জন্ম থেকে এমন দৃশ্য কেউ অবলোকন করেনি। এ দৃশ্য দেখে পৃথিবী যেন থমকে দাঁড়ায়। পৃথিবীর সকল সৃষ্টি যেন অপলক নেত্রে চেয়ে থাকে এ চরম পরীক্ষার দিকে। সকল সৃষ্টিই যেন নিথর নিস্তব্ধ হয়ে যায় এ দৃশ্য অবলোকনে। কিন্তু না চরম আত্মত্যাগী ইবরাহীম (আ.)ও চরম আত্মোৎসর্গকারী ইসমাঈল (আ.) এ কঠিন ও চূড়ান্ত পরীক্ষায়ও কৃতকার্য হ’লেন। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষণা হ’ল- وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيْمُ- قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِيْنَ- إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلاَءُ الْمُبِيْنُ- وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيْمٍ- ‘তখন আমি তাঁকে ডেকে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটা একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি এর পরিবর্তে যবেহ করার জন্য দিলাম এক মহান পশু’ {ছাফফাত ১০৪-১০৭}।

বিশ্ব নিয়ন্তা আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (আ.)-এর প্রতি সদয় হ’লেন। ইসমাঈলের রক্তের পরিবর্তে তিনি পশুর রক্ত কবুল করলেন। আর ইবরাহীম (আ.)-এর পরবর্তী সন্তানদের জন্য কুরবানীর সুন্নাতকে জারি রাখলেন।

আত্মত্যাগ ও আত্মসমর্পণের এই মহান স্মৃতিকে চির জাগ্রত করার জন্যই ১০ যিলহজ্জকে আল্লাহ চির স্মরণীয় ও বরণীয় করেছেন। জন্ম থেকে জীবনের ৯৯টি বছর ধরে একের পর এক পরীক্ষা করে যখন আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (আ.)-এর প্রতি সন্তুষ্ট হ’লেন, তখন তাঁর এই সুমহান কীর্তি পৃথিবীর সকল মুসলমানের জন্য ক্বিয়ামত পর্যন্ত অবিস্মরণীয় ও স্থায়ী করে দিলেন। নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে। وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِيْنَ ‘আমি তাঁর জন্য এ বিষয়টি পরবর্তীদের জন্য পালনীয় করে রেখেছি’ {ছাফফাত ১০৮}।

আজও আমরা সেই ইবরাহীমী সুন্নাতের অনুসরণেই প্রতি বছর যিলহজ্জ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে পশু কুরবানী করে থাকি। এটি মুসলিম মিল্লাতের অন্যতম একটি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। ক্বিয়ামত উষার উদয়কাল পর্যন্ত এই মহান আত্মত্যাগের ধারাবাহিকতা চলমান থাকবে ইনশাআল্লাহ।

আগামী পর্বে সমাপ্য ...

রচনাঃ
ক্বামারুয্যামান বিন আব্দুল বারী
প্রধান মুহাদ্দিছ,
বেলটিয়া কামিল মাদরাসা,
জামালপুর।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×