উপক্রমণিকা :
আল্লাহর নৈকট্য, আত্মত্যাগ, আত্মোৎসর্গ, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, সাম্য, মৈত্রী, সম্প্রীতির সুমহান মহিমায় ভাস্বর কুরবানী। কুরবানী আমাদের আদি পিতা আদম (আ.) ও তদীয় পুত্র হাবিল-কাবীল এবং মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম (আ.) ও তদীয় পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর সুমহান আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা-ভরসা ও জীবনের সর্বস্ব সমর্পণের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সমন্বয়।
কুরবানীর আভিধানিক অর্থ :
আরবী قرب বা قربان শব্দটি উর্দূ ও ফার্সীতে قربانى (কুরবানী) রূপে রূপান্তরিত হয়েছে। যার অর্থ, নৈকট্য, সান্নিধ্য। পবিত্র কুরআন ও হাদীছে এর কয়েকটি সমার্থক শব্দ পরিলক্ষিত হয়। যেমন-
(১) نحر অর্থে। যেমন- আল্লাহ রাববুল আলামীনের বাণী فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‘সুতরাং আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন’ {কাওছার ২}। এই অর্থে কুরবানীর দিনকে يوم النحر বলা হয়।
(২) نسك অর্থে। যেমন- মহান আল্লাহর বাণী- قُلْ إِنَّ صَلاَتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ- ‘আপনি বলুন, আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ সবই বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য নিবেদিত’ {আন‘আম ১৬২}।
(৩) منسك অর্থে। যেমন আল্লাহর বাণী- لِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكاً ‘আমি প্রত্যেক উম্মাতের জন্য কুরবানীর বিধান রেখেছি’ {হজ্জ ৩৪}।
(৪) الاضحى অর্থে। হাদীছে এসেছে- এই অর্থে কুরবানীর ঈদকে عيد الاضحى বলা হয়।
কুরবানীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি :
বিশ্বের সকল জাতিই তাদের আনন্দ উৎসব প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট দিবস পালন করে থাকে। এ সকল দিবস স্ব স্ব ধর্মের কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা অথবা কারো জন্ম বা মৃত্যু দিন অথবা কোন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত হয়েছে। এসব দিবসে প্রত্যেক জাতি তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য-সংস্কৃতি (Culture) ও বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটায়।
সারা বিশ্বের প্রায় দুই কোটি খৃষ্টান যীশুখৃষ্টের জন্মদিন উপলক্ষে ২৫ ডিসেম্বরকে তাদের উৎসবের (Xmas day) ‘বড় দিন’ হিসাবে পালন করে। প্রায় সত্তর পঁচাত্তর লাখ বৌদ্ধ গৌতম বুদ্ধের জন্মদিন উপলক্ষে ২২ মে কে তাদের উৎসবের দিন ‘শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা’ হিসাবে পালন করে থাকে। সবচেয়ে বেশী উৎসবের দিন হ’ল হিন্দু জাতির। তারা ১২ মাসে ১৩টি উৎসব পালন করে থাকে। তবে এর মধ্যে লক্ষ্মীপূজা ও দুর্গাপূজা অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে পালন করা হয়। সারা বিশ্বের প্রায় দেড়শ’ কোটি মুসলমান মাহে রামাযানের শেষে শাওয়ালের প্রথম তারিখে ঈদুল ফিতর এবং যিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখকে ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ হিসাবে পালন করে থাকে। মুসলমানদের এ কুরবানীর ঈদের রয়েছে একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।
কুরবানী ঈদের প্রাক ইতিহাস :
আমরা যেভাবে কুরবানীর ঈদ উদযাপন করি তার শুরু বস্তুত হিজরতের অব্যবহতি পরে। মুসলিম জাহানে এ পবিত্র উৎসবটি পালন কিভাবে শুরু হয় তার একটি বিস্তারিত বর্ণনা প্রদান আবশ্যক। কারণ ঈদুল-আযহা তথা কুরবানী দিবসের মাহাত্ম্য ও সুমহান তাৎপর্য যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে হ’লে এ ইতিহাস জানা একান্তভাবেই প্রয়োজন। মুহাম্মাদ (ছা.) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করলেন। মদীনায় এসে তিনি জানতে পারলেন যে, সেখানকার অধিবাসীগণ শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোজ’ ও বসন্তের পূর্ণিমায় ‘মিহিরজান’ নামে দু’টি উৎসব প্রতিবছর উদযাপন করে থাকে। কিন্তু এ দু’টি উৎসবের চালচলন, রীতিনীতি ছিল ইসলামের সুমহান আদর্শ ও ঐতিহ্য-সংস্কৃতির পরিপন্থি। শ্রেণী-বৈষম্য, ধনী-দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান, ঐশ্বর্য-অহমিকার পূর্ণ স্বীকৃতি প্রদান করত এ দু’টি উৎসব। দু’টি উৎসব ছিল ছয়দিন ব্যাপী এবং এই বারোটি দিন ভাগ করে দেয়া হ’ত বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজনদের মধ্যে। কোন একটি দিনকে চিহ্নিত করা হ’ত ‘নওরোজ-এর হাসা, বা ‘নওরোজ-এ বুযুর্গ’ হিসাবে শুধুমাত্র বিত্তবানদের জন্য নির্ধারিত। সেদিন কোন হতদরিদ্র বা নিঃস্বের অধিকার থাকত না। নওরোজ উৎসব উদযাপনে শালীনতা-বিবর্জিত নর্তকী ও চরিত্রহীনা ‘কিয়ানদের’ জন্যও একটি দিবস বিশেষভাবে পরিচিত হ’ত। সাধারণ মানুষের জন্য নওরোজ আম্মা হিসাবে চিহ্নিত করা হ’ত শুধুমাত্র একটি দিনকে। অন্য পাঁচটি দিনের উৎসবে অংশগ্রহণের বিন্দুমাত্র কোন সুযোগ ছিল না বিত্তহীন সহায়-সম্বলহীন সাধারণ মানুষের। এই ‘নওরোজ-এ আম্মা’ দিবসটিকে অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখত আমীর-ওমারাহ ও বিত্তশালী ব্যক্তিগণ। সাধারণ, দরিদ্র অসহায় মানুষ কোনক্রমে এ দিবসটি উদযাপন করত ব্যথা-বেদনা ও লাঞ্ছনার মাধ্যমে।
কিন্তু ইসলাম হচ্ছে শান্তি ও মিলনের ধর্ম। সাম্য, মৈত্রী, প্রেম-প্রীতির ধর্ম। ইসলাম তো শ্রেণীবৈষম্যের স্বীকৃতি দেয় না। তাই শ্রেণীবৈষম্য নির্ভর শালীনতা-বিবর্জিত উৎসব দু’টির বিলুপ্তি ঘটিয়ে মনুষ্য সৃষ্ট কৃত্রিম পার্থক্য দূরীকরণের লক্ষ্যে ধনী-দরিদ্রের মহামিলনের প্রয়াসে মহানবী (ছা.) প্রবর্তন করলেন দু’টি উৎসব তথা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ।
আনাস (রা.) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছা.) মদীনায় আগমনের পর দেখলেন মদীনাবাসীদের দু’টি উৎসবের দিন রয়েছে, এ দিনে তারা খেলাধুলা, আনন্দ ও চিত্তবিনোদন করে। তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, এ দু’টি দিন কি? তারা বলল, জাহেলী যুগে আমরা এইদিনে আনন্দ উৎসব, খেলাধুলা করতাম। রাসূল (ছা.) তখন বললেন, আল্লাহ তা‘আলা এই দুই দিনের পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দুইটি দিন তোমাদেরকে দান করেছেন। একটি হ’ল ঈদুল ফিতর অপরটি হ’ল ঈদুল আযহা তথা কুরবানীর ঈদ {নাসাঈ হা/১৫৩৮; মিশকাত হা/১৪৩৯; সিলসিলা ছহীহাহ হা/২০২১}। এতে চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল ‘নওরোজ’ ও ‘মিহিরজান’ উৎসব উদযাপন। শ্রেণী বৈষম্য-বিবর্জিত, পঙ্কিলতা ও অশালীনতামুক্ত সুনির্মল আনন্দ উপভোগ শুরু হ’ল ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা তথা কুরবানীর ঈদ উদযাপনের মাধ্যমে। জন্ম নিল সুসিণগ্ধ, প্রীতিঘন সাম্য, ত্যাগ ও মিলনের উৎসব।
ক্রমশঃ ...
রচনাঃ
ক্বামারুয্যামান বিন আব্দুল বারী
প্রধান মুহাদ্দিছ,
বেলটিয়া কামিল মাদরাসা,
জামালপুর।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

