আত্মসমর্পণ একটি সর্বজনবিদিত ও পরিচিত শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হ’ল সম্পূর্ণরূপে অন্যের কাছে নতি স্বীকার করা। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ হ’তে আল্লাহর নিকট নিজেকে সমর্পণ করা বা উৎসর্গ করা। অবশ্য উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে যে কোন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, তাদের মৌলিক অর্থ ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য মোটামুটি সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে আত্মসমর্পণের প্রথম অর্থ নতি স্বীকার সম্পূর্ণরূপে পার্থিব জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে এর কার্যক্রম স্পষ্টতঃই সীমাবদ্ধ। পৃথিবীর প্রাচীন জ্ঞানী-গুণী পন্ডিতগণ তাঁদের গবেষণালব্ধ ফলাফল হ’তে আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়াকে শান্তি ও মীমাংসার প্রয়াসে আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত করেন। এর ফলশ্রুতিতেই পৃথিবীর বুকে বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে পারস্পরিক রক্তক্ষয় অপেক্ষাকৃত হ্রাস পায় এবং সন্ধি-চুক্তির পথ সহজতর হয়। এর ফলে সাধারণত দুর্বলরা সবল বা শক্তিশালীদের অধীনস্থ থেকে কালাতিপাত করে। এমনকি কোন কোন সময় সমঝোতার অভাবে বা একে অন্যের ভুল বোঝাবুঝির এক পর্যায়ে প্রচন্ড যুদ্ধ-বিগ্রহ বেধে যায় এবং শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী দলের নিকট দুর্বল দল আত্মসমর্পণ করে। এ প্রক্রিয়ায় দুর্বল বা অত্যাসন্ন পরাজিত দল আত্মরক্ষার মানসে বিজয়ী দলের সম্মুখে প্রকাশ্যভাবে দু’হস্ত উত্তোলনপূর্বক সর্বান্তকরণে আত্মসমর্পণ করে। ফলে সঙ্গে সঙ্গে চরম উত্তেজনার বিশাল রণক্ষেত্রে শান্তির ছায়া নেমে আসে। এতদসঙ্গে স্তব্ধ হয় শত্রুতার যাবতীয় কলা-কৌশল ও প্রতিহিংসার নির্মম ছোবল। শান্তির প্রয়াসে শুরু হয়ে যায় মানবিক আচরণবিধির প্রয়োগ ও তার উত্তম বাস্তবায়ন।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে আত্মসমর্পণের অর্থ হচ্ছে এক ও অদ্বিতীয় স্রষ্টা ও মা‘বূদ মহান আল্লাহর পদতলে নিজেকে অকৃত্রিমভাবে বিলিয়ে দেয়া। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উৎসের সন্ধানে গবেষণা চালালে, সৃষ্টির গোড়াতেই তার সূচনার প্রমাণ পাওয়া যাবে। স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সকল সৃষ্ট বস্তুকে আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়ায় আবদ্ধ করার লক্ষ্যে, তাঁর প্রিয় সৃষ্টি আদম (আ.)-কে সিজদা করার জন্য ফেরেশতা মন্ডলীকে আদেশ করেন এবং তাঁর আদেশে আত্মসমর্পণ করে সকল ফেরেশতাই সিজদা করেন। কিন্তু ইবলীস সিজদা করল না। অর্থাৎ সে আত্মসমর্পণ না করে আল্লাহর আদেশ অমান্য করল। আত্মসমর্পণের ক্ষেত্রে ইবলীস তার ব্যক্তিগত পান্ডিত্যের অহংকারে উক্ত প্রক্রিয়ার বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করে। কালের চক্রে তা বহু রূপধারণ করে এবং অসংখ্য কৃত্রিমতার সংযোজন ঘটায়। আলোচ্য প্রবন্ধে বিষয়বস্তুর অনুকূল ও প্রতিকূল বিষয়াদির সম্ভাব্য আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
আমরা অবগত আছি যে, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব জাতির জন্যই আত্মসমর্পণ প্রণালীর উদ্ভব ঘটান হয়েছে। যদিও মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে তা মহাপরীক্ষারূপে প্রবর্তিত হয় এবং পরে তা সমগ্র মানব জাতির প্রতি আদেশরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। যেহেতু আমাদের জ্ঞানে আত্মসমর্পণ হ’ল মানব জাতির জন্য এক আল্লাহর প্রতি আত্মার ও সমুদয় দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিনীত, নত, অবনত, সিজদাবনত সহ যে কোন অনুগত অবস্থার বাস্তব অবয়ব। আত্মসমর্পণের একটি অন্যতম পন্থা হচ্ছে আল্লাহর সকাশে নতজানু হয়ে বিনীতভাবে লুটিয়ে পড়া বা সিজদা করা। মানুষ ও জিন সহ পৃথিবীর ও আকাশের সবকিছুই মহান আল্লাহর সম্মুখে সিজদাবনত হয়। এ বিষয়ে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে সবিস্তার আলোচনা পেশ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আকাশ ও পৃথিবীর সকল বিচরণশীল জীব ও ফেরেশতাগণ আল্লাহকে সিজদা (আত্মসমর্পণ) করে, তারা অহংকার করে না’ {নাহল ৪৯}। একই মর্মার্থে অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে আছে ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় এবং তাদের প্রতিছায়াও সকাল-সন্ধ্যায়’ {রা‘দ ১৫}।
মহানবী (ছা.)-কে সম্বোধন করে প্রত্যাদেশ করা হয় যে, ‘আপনি কি দেখেননি যে, আল্লাহকে সিজদা করে যা কিছু আছে নভোমন্ডলে ও যা কিছু আছে ভূমন্ডলে, সূর্য, চন্দ্র, তারকারাজি, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং অনেক মানুষ। আর অনেকের উপর অবধারিত হয়েছে শাস্তি। আল্লাহ যাকে লাঞ্ছিত করেন, তাকে কেউ সম্মান দিতে পারে না। আল্লাহ যা ইচ্ছা তাই করেন’ {হজ্জ ১৮}।
উপরোক্ত আয়াত তিনটি দ্বারা মহিমাময় আল্লাহ তা‘আলার প্রতি সৃষ্টি জগতের আত্মসমর্পণের ব্যাখ্যা প্রতিভাত হয়েছে। এখানে কেউ উক্ত প্রক্রিয়ার বহির্ভূত নয়। কিন্তু শেষোক্ত আয়াতে মানুষের একটা দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অপর একটা দলকে বাদ দেয়া হয়েছে। এর কারণ হিসাবে ইবলীস-এর প্ররোচনাই সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তবে ইবলীসের প্রচেষ্টাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ করার প্রয়াসে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার বুকে অনেক নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। তাঁরা সবাই এ নশ্বর জগতের অনেক অবুঝ, অবোধ ও পথহারা মানুষকে আল্লাহর আদেশ-নির্দেশ ও নিজেদের আদর্শ দ্বারা আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের দিকে ধাবিত করতে সমর্থ হয়েছেন। আবার কখনো অনেক মানুষ তাঁদের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যারা নবী-রাসূলগণের অনুসরণে আত্মসমর্পণ করেছে তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছে এবং পরকালে তাদের জন্যই রয়েছে নাজাত ও পুরস্কার স্বরূপ জান্নাত।
মানুষকে হেদায়াত দিতে ও আত্মসমর্পণে অনুপ্রাণিত করতে আল-কুরআন নাযিল হয়েছে। এখানে আল্লাহ সাধারণ মানুষকে ও রাসূলকে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হওয়ার এবং আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় রাসূল (ছা.)-কে প্রত্যাদেশ করেন, ‘বলুন, আমি নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি। আরও আদিষ্ট হয়েছি, সর্বপ্রথম আত্মসমর্পণকারী হওয়ার জন্য। বলুন, আমি আমার পালনকর্তার অবাধ্য হ’লে এক মহাদিবসের শাস্তির ভয় করি’ {যুমার ১১-১৩}।
অন্যত্র তিনি বলেন, ‘আপনি বলে দিন, আমি কি আল্লাহ ব্যতীত যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের স্রষ্টা এবং যিনি সবাইকে আহার্য দান করেন ও তাঁকে কেউ আহার্য দান করে না, অপরকে সাহায্যকারী স্থির করব? আপনি বলে দিন, আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, সর্বাগ্রে আমিই আত্মসমর্পণকারী হব। আপনি কদাচ অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না’ {আন‘আম ১৪}।
অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আপনি বলুন, আমার ছালাত, আমার কুরবানী এবং আমার জীবন ও মরণ বিশ্ব পালনকর্তা আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোন অংশীদার নেই। আমি তাই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে আমিই প্রথম’ {আন‘আম ১৬২-১৬৩}।
বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (ছা.) পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসাবে অমর হয়ে আছেন। তাঁর অনুপম চরিত্র, সততা, বিশ্বস্ততা, চিন্তা-চেতনা, ন্যায়পরায়ণতা, দূরদর্শিতা ইত্যাদি তাঁকে পৃথিবীর ইতিহাসে শ্রেষ্ঠত্বের সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত করেছে। অতঃপর একই কারণে তিনি শ্রেষ্ঠ আল্লাহ ভীরুরূপেও বিশ্বনিয়ন্তার দরবারে মর্যাদা বা সম্মান লাভ করেন। তাঁর অভূতপূর্ব আল্লাহভীতি তাঁকে সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মসমর্পণকারীর স্থলাভিষিক্ত করেছে। তাই আল্লাহ তা‘আলা এই মহানবী (ছা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করার জন্য পৃথিবীবাসীকে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় বান্দাগণকেও একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণের জন্য পুনঃপুনঃ আহবান জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর এবং তোমরা আত্মসমর্পণকারী না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না’ {আলে ইমরান ১০২}। ঈমানদারগণের অনুকূলে ও সন্দেহ পোষণাকারীদের সংশোধনের প্রয়াসে পরম করুণাময় আল্লাহ তা‘আলা মহানবী (ছা.)-কে প্রত্যাদেশ করেন যে, ‘যদি তারা আপনার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় তবে বলে দিন, আমি এবং আমার অনুসারীগণ আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ করেছি। আর আহলে কিতাবদের এবং নিরক্ষরদের বলে দিন, তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করেছ? তখন যদি তারা আত্মসমর্পণ করে, তবে নিশ্চয়ই তারা সরল পথ প্রাপ্ত হ’ল, আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহ’লে তোমার দায়িত্ব হ’ল শুধু পৌঁছে দেয়া। আর আল্লাহ বান্দাদের সম্যক দ্রষ্টা’ {আলে ইমরান ২০}।
পার্থিব জগতের প্রতি অবহেলা পোষণকারী এবং আখেরাতের প্রতি যত্নশীল ব্যক্তিগণই মূলতঃ অকৃত্রিম আত্মসমর্পণকারী হয়ে থাকে। এ সকল ঈমানদারগণের পুরস্কারের ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই আত্মসমর্পণকারী পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী নারী, ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, ছিয়াম পালনকারী পুরুষ ও ছিয়াম পালনকারী নারী, লজ্জাস্থান হেফাযতকারী পুরুষ ও লজ্জাস্থান হেফাযতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও অধিক স্মরণকারী নারী তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার’ {আহযাব ৩৫}।
আল্লাহর মহাক্ষমতা দৃশ্য-অদৃশ্য সবকিছুর উপর বিদ্যমান এবং তাঁর জ্ঞান সব জিনিসকেই পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে। তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মানব সম্প্রদায়কে সদা প্রস্তুত থাকতে হয়। এজন্য অসংখ্য প্রক্রিয়া ও কর্মকান্ড রয়েছে। আলোচিত আত্মসমর্পণ তন্মধ্যে অন্যতম। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আরববাসীগণ বলে, আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। বলুন, তোমরা বিশ্বাস স্থাপন করনি, বরং বল, আমরা আত্মসমর্পণ করেছি। এখনও তোমাদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি। যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, তবে তোমাদের কর্ম বিন্দুমাত্রও নিষ্ফল করা হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ {হুজুরাত ১৪}।
আল্লাহ তা‘আলা সকল সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে সর্বাধিক ভালবাসেন। এ ভালবাসার কোন তুলনা নেই। আর আল্লাহ মানুষের মধ্যে তাদেরকে অধিক ভালবাসেন, যারা তাঁর নিকটে আত্মসর্পণ করে, তাঁর বিধানকে অবনত মস্তকে মেনে নেয় এবং তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়। এসব মানুষের কল্যাণে বহু আয়াতের অবতারণা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অভিমুখী হও এবং তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ কর, তোমাদের নিকট শাস্তি আসার পূর্বে। এরপর তোমারে কে সাহায্য করা হবে না’ {যুমার ৫৪}।
মূলতঃ পবিত্র কুরআনের সকল বাণী আল্লাহর তা‘আলার আহবান। এখানে কোন বিকল্প চিন্তার সুযোগ নেই। মানুষকে শুধু আল্লাহর নিকটে আত্মসমর্পণ করানো ও তাঁর নিকটে নত হওয়াই তাঁর কাম্য। আর অকৃত্রিম আত্মসমর্পণকারীই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে।
ইন্শাআল্লাহ আগামী পর্বে সমাপ্ত হবে ...
লেখকঃ
রফীক আহমাদ
শিক্ষক (অব.),
বিরামপুর,
দিনাজপুর।


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




