হকিং বাবা, বিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের মত থাকতে দাও। ঈশ্বরের অস্তিত্ব/অস্তিত্বহীনতা প্রমাণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানকে অপমান করার কি দরকার!! তুমি তোমার “A Brief History of Time” বইতে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টির পেছনে ঈশ্বরের অস্তিত্বের দিকে ইঙ্গিত করলা। এর আগে একবার বলেছিলেঃ "যারা গণিত বুঝে না তারাই ঈশ্বরে বিশ্বাস করে"। তোমার এই বক্তব্য ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার ইঙ্গিত বহন করে। যদিও গণিত বুঝতে পারে, এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে তোমার চেয়েও বেশি গণিত বুঝে, এমন অনেকেই ঈশ্বরে বিশ্বাস করে। অবশ্য কে বিশ্বাস করবে বা না করবে সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
সম্প্রতি প্রকাশিত “The Grand Design” বইতে বললা:
“Because there is a law such as gravity, the universe can and will create itself from nothing. Spontaneous creation is the reason there is something rather than nothing, why the universe exists, why we exist. It is not necessary to invoke God to light the blue touch paper and set the universe going.”
তার মানে তুমি ঈশ্বরের অস্তিত্বের দিকে ইঙ্গিত করলা কিন্তু বললা যে, মহাবিশ্ব সৃষ্টির পেছনে ঈশ্বরের কোন হাত নেই। আর তাতেই আমাদের নব্য বিজ্ঞানমনস্ক নাস্তিকগণ হাততালি মারতে লাগল এই বলে যে, ঈশ্বর নাই, ঈশ্বর নাই। ঠিক চিলে কান নিয়ে যাওয়ার মত। যারা বিজ্ঞান জানে না, যারা জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ে নাই, পড়লেও পড়েছে বাংলায় অথবা নাট্যকলায়, বিজ্ঞানবিষয়ে একাডেমিক কোন জ্ঞানও নেই, জীবনে বিজ্ঞান পড়েও নাই, পড়লেও বাজার থেকে আপেক্ষিকতা বিষয়ক বই পড়েছে নিজেকে বিজ্ঞানমনস্ক প্রমাণ করার জন্য অথবা বন্ধুদের সাথে আপেক্ষিকতা নিয়ে আলোচনা করে নিজেকে তাদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী প্রমাণ করার জন্য, তাদেরকেই তুমি বিজ্ঞান বুঝিয়ে ছাড়লা এবং সেটা করলা বিজ্ঞানের সাথে ঈশ্বরকে গুলিয়ে। কখনো ঈশ্বরকে মিশাইছো, আবার কখনও ঈশ্বরকে মিশাও নাই। ঈশ্বরকে তুমি আচার (সস) বানাইয়াছো, তুমি বুঝে গেছ ঈশ্বর নামক আচারটা লেখাকে অনেক সুস্বাদু করে, তাই বিজ্ঞানকে খাওয়াইয়া দিয়াছো ভাল করে, নব্য-বিজ্ঞানমনস্কদের হজম হোক বা না হোক। যখন ঈশ্বরবিষয়ক আচারটা (সস) মিশাইছো তখনই উহা তীব্র স্বাদের বলে পাবলিক গিলে ফেলেছে। পাবলিক বুঝে নাই যে, ইহা হজম হবে কি-না।
মানুষের মধ্যে অলরেডি ধারণা হয়ে গিয়েছে যে, বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল। বিজ্ঞান কিন্তু পরিবর্তনশীল না, জ্ঞান পরিবর্তনশীল। পরমাণুর গঠনেই কথাই ধরা যাক। থমসন বললেনঃ পরমাণুতে ইলেক্ট্রন-প্রোটন-নিউট্রন মিশ্রিত অবস্থায় আছে। পরে রাদারফোর্ড বললেন যে, না, পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস এবং ইলেক্ট্রন সেই নিউক্লিয়াসে চারপাশে ঘোরে। তিনি এটা প্রমাণ করেছিলেন গোল্ড ফয়েলের মধ্য দিয়ে আলফা রশ্মি চালনা করে। আলফা রশ্মি হচ্ছে আয়নিত (ধণাত্বক) হিলিয়াম। তিনি দেখতে পেলেন যে, বেশিরভাগ রশ্মি ফয়েল ভেদ করে চলে যায়, শুধু অল্পকিছু রশ্মি কেন্দ্র থেকে বিচ্যূত হচ্ছে এবং আরো অল্পকিছু রশ্মি প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসছে। এ থেকে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, প্রোটন (ধণাত্বক আয়নিত) আর নিউট্রন নিউক্লিয়াসে থাকে আর ইলেক্ট্রন চারপাশে সৌরজগতের গ্রহগুলোর মত ঘোরে। কিন্তু এখানে বাধ সাধলো ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক থিওরি। ইলেক্ট্রম্যাগনেটিক থিওরি অনুসারে, কোন চার্জিত বস্তু গতিতে থাকলে শক্তি নির্গত হবে। কাজেই ইলেক্ট্রন যদি ঘুরতে থাকে তাহলে সে শক্তি নির্গত করতে করতে একসময় কক্ষপথ থেকে আস্তে আস্তে নিউক্লিয়াসে চলে আসবে এবং তখন পরমাণুর বিলুপ্তি ঘটবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। এবার নিলস্ বোর সাহেব বললেনঃ ইলেক্ট্রন নিউক্লিয়াসের চারপাশে ঘোরে ঠিকই কিন্তু সেগুলো হলো বিভিন্ন শক্তিস্তরে ঘোরে। এবং ইলেক্ট্রনগুলো এমন সব শক্তিস্তরে ঘোরে যেসব শক্তিস্তরের শক্তি 2πn, এখানে n হচ্ছে কক্ষপথের ক্রমসংখ্যা।
পরমাণুর এই মডেলটাই এখন পর্যন্ত গৃহিত। এই মডেলটা ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কিছু সূত্র মেনে চলছে এবং আপাতঃদৃষ্টিতে অন্যকোন সূত্র ভায়োলেট করছে না। কিন্তু এর মানে কি এই যে, আমরা পরমাণুর গঠন সঠিকভাবে জেনে গেছি এবং এইটাই পরমাণুর আসল চেহারা?? বাস্তবে পরমাণুর গঠন কেমন তা আরো গবেষণার বিষয়। কারণ, পরমাণুর মধ্যে নিউটিনো, এন্টি-নিউট্রিনো ছাড়াও বিজ্ঞানীরা কোয়ার্ক নামক অন্য আরো কিছু কণিকার সন্ধান পেয়েছেন। এতে পরমাণুর গঠনের কিন্তু কোন পরিবর্তন হয় নাই, পরিবর্তন হয়েছে আমাদের লব্ধ জ্ঞানের। এগুলো হল বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানের ক্রমোন্নতি। এতে কিন্তু ঈশ্বরের অস্তিত্ব/অস্তিত্বহীনতা প্রমাণ করে না। তুমি মামু একেক সময় একেক কথা বলবা আর সেই অনুসারে ঈশ্বর থাকবে অথবা থাকবে না, এটা তো হয় না মামু!!! বিজ্ঞান হচ্ছে চাক্ষুস (সত্য হোক মিথ্যা হোক যতদূর দেখা যায়) ঈশ্বর হচ্ছে আধ্যাত্বিক বিষয়, উপলব্ধির বিষয়, এবং সর্বোপরি বিশ্বাসের বিষয়, বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণের বিষয় নয়।
কাজেই ষ্টিফেন মামু, বিজ্ঞানের সাথে সস মিশাইয়া বিজ্ঞানকে অপমান করার দরকার নাই। এতে পাবলিকের তেমন কিছু এসে না গেলেও তোমার অনেককিছু এসে যায়। তোমার বই বিক্রি হয়, তুমি আলোচনায় আসো, তোমার টাকা হয় অনেক, আর টাকা কামায় তোমার পেছনে টাকা খাটানো কোম্পানি আর আমাদের কান ফাটে চিলে নেয়া কান হারাদের হাততালিতে।
ধন্যবাদ সবাইকে।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০১০ বিকাল ৫:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



