somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নজরুলের ঈদের কবিতা

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১০:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


নজরুলের আগে আর কোনো বাঙালি সাহিত্যিক মুসলমানদের বিভিন্ন ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠানকে এতো আবেদনময় এবং ব্যাপকভাবে কাব্যে ধারণ করেননি। এক্ষেত্রে নজরুলের পরেও কেউ তাঁর অবদানের কাছাকাছিও আসতে সক্ষম হননি। শুধু ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠানাদি নয়, দেশ-কাল নির্বিশেষে বিশ্ব মুসলমানদের ধর্মবিশ্বাস, তাদের ধর্মীয় পীঠস্থান মক্কা-মদিনা, তাদের আল্লাহ-রাসুল, তাদের খোলাফায়ে রাশেদীন, তাদের নানা ঐতিহাসিক বীর ব্যক্তিত্ব প্রভৃতিকে নজরুল আকর্ষণীয় উপমা-উৎপ্রেক্ষা-রূপক-প্রতীকের সাহায্যে অপূর্ব ধ্বনিতরঙ্গের মাধ্যমে সাহিত্যের আঙিনায় সগৌরবে স্থান দিয়েছেন। অনুষ্ঠানাদির ক্ষেত্রে আমরা শুধু রোজার ঈদ ও কোরবানীর ঈদকেই পাই না, পাই মোহররম, ফাতেহা দোয়াজদহম প্রভৃতিকেও। এইসব কবিতায় একদিকে ফুটে উঠেছে গভীর অধ্যাত্ম সুর, ইতিহাস ও ঐতিহ্যসচেতনতা, অন্যদিকে হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে সেদিনের পরাধীন হতোদ্যম মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য কবির ঐকান্তিক ইচ্ছা। এই কারণেই তিনি চিহ্নিত হয়েছেন বাংলার মুসলিম রেনেসাঁর প্রাণপুরুষ বলে। তাঁর অজস্র ইসলামী গান ও গজলের মধ্য দিয়েও নজরুল সেদিন মুসলিম রেনেসাঁর অগ্রনায়কের কাজ করেছিলেন। সেসব গান শিক্ষিত-অশিক্ষিত, পল্লবাসী ও নগরবাসী, সব বাঙালি মুসলমানের মনে অপূর্ব সাড়া জাগিয়েছিলো। শুধু যে ধর্মের মূল তত্ত্ব এবং মুসলিম অনুষ্ঠানসমূহের প্রাণের কথাটুকুই তিনি মুসলিম জনমানসের সামনে তুলে ধরলেন তাই না, তাঁর প্রেমের গানে ইরানের সুর যোগ করে বাংলা কাব্যকে একটা নতুন সম্ভারে ভরে দিলেন।

কিন্তু আজকের এই লেখায় আমি এতো সব বিষয় আনবো না। নজরুলের ঈদের কয়েকটি কবিতা সম্পর্কে সামান্য দু’ এক কথা শুধু বলবো। ঈদের উপর লেখা নজরুলের যেসব কবিতা ও গান আমি হাতের কাছে পেয়েছি, সেগুলি হলো ‘ঈদ-মোবারক’ (প্রথম পঙক্তিঃ শত যোজনের কতো মরুভূমি গো), ‘কৃষকের ঈদ’ (বেলাল! বেলাল! হেলাল উঠেছে পশ্চিম আসমানে), ‘ঈদের চাঁদ’ (সিড়িওয়ালাদের দুয়ারে এসেছে আজ), ‘আজ ঈদ ঈদ ঈদ খুশীর ঈদ এলো ঈদ’, ‘ঈদজ্জোহার তকবীর শোন ঈদগাহে’, ‘বক্রীদ’ (শহীদানদের ঈদ এলো বকরীদ), ‘ওরে ও নতুন ঈদের চাঁদ’, ‘এল আবার ঈদ, ফিরে এল আবার ঈদ’, ‘ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারত ঈদ’, ‘শহীদী ঈদগাহে আজ জমায়ত ভারি’, এবং ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।’

ঈদ বিষয়ক কবির উপরোক্ত কবিতা ও গানগুলি সব সমমানের নয়, সকল রচনায় ঝোঁকটাও একই বিষয়ের উপর পড়েনি, যদিও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে শব্দ ব্যবহার ও সাধারণ রচনারীতিতে একটা ঐক্য সুর লক্ষণীয়। প্রায় সব রচনাতেই মুখ্য হয়ে উঠেছে ঈদের খুুশি ও আনন্দ, ভ্রাতৃত্ব ও মিলনের সুর, উচ্চ-নীচ ভেদাভেদের অবলুপ্তি ও সাম্যের উপর গুরুত্ব এবং সেই সঙ্গে শোষণ, বঞ্চনা ও অনুষ্ঠানসর্বস্বতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ক্ষোভ। তবে এরই মধ্যে আবার কোনো- কোনো কবিতায় শেষোক্ত বক্তব্যের দিকটি প্রাধান্য পেয়েছে, অন্যত্র প্রাধান্য পেয়েছে হৃদয়-উপচানো খুশির তরঙ্গ, অনাবিল উচ্ছলতা ও তারুণ্যের উদ্ভাসন। যেখানে এই আনন্দ উচ্ছলতা প্রধান হয়ে উঠেছে, বক্তব্যের চাইতে আবেগ-অনুভূতি যেখানে বেশী গুরুত্ব পেয়েছে, সেখানেই আমার বিবেচনায়, যথার্থ কাব্যরসিক অধিকতর তৃপ্তি লাভ করেন। এটা এজন্য নয়, যে বক্তব্যের আবেদন কম এবং এজন্য যে ভাষা, ছন্দের কারুকাজ, শব্দ নির্বাচন, চিত্রকল্পের মাধুর্য ও ধ্বনির সুষমা ওই সব কবিতায় বেশী তাৎপর্যময়, উদ্ভাবনশীল ও হৃদয়গ্রাহী।

১৩৩৫ সালে প্রথম প্রকাশিত কবির “জিঞ্জীর” কাব্যগ্রন্থভুক্ত ‘ঈদ মোবারক’ কবিতার তৃতীয় স্তবকটি লক্ষ্য করুণঃ

ও গো কাল সাঁঝে দ্বিতীয়া চাঁদের ইশারা কোন
মুজ্দা এনেছে, সুখে ডগমগ মুকুলী মন!
আশাবরী সুরে ঝুরে সানাই।
আতর সুবাসে কাতর হলো গো পাথর-দিল,
দিলে দিলে আজ বন্ধকী দেনা- নাই দলিল,
কুবলিয়াতের নাই বালাই।


গোটা কবিতা জুড়েই এই রকম বন্ধনহীন স্ফূর্তির আবেগ। সাকী, জা’ম, লায়লী-কায়েস, শিরী-ফরহাদকে এনে নজরুল বাংলা ভাষায় ঈদের কবিতায় নতুন মাত্রিকতা যোগ করলেন। কিন্তু তাই বলে তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্মের সর্বপ্রধান যে সুর, মানবতাবাদের যে জয়-ঘোষণা, সাম্য-মুক্তি-ভ্রাতৃত্বের যে বাণী, তাও তিনি বিস্মৃত হননি। তাই, হৃদয়ের উচ্ছ্বাস সমৃদ্ধ এই কবিতাতেও নজরুলকে বলতে শুনিঃ

আজি ইসলামী ডঙ্কা গরজে ভরি জাহান,/নাই বড় ছোট-সকল মানুষ এক সমান,/রাজা প্রজা নয় কারো কেহ।/কে আমীর তুমি নওয়াব বাদশা বালাখানায়?/সকল কালের কলঙ্ক তুমি; জাগালে হায়/ইসলামে সন্দেহ।

একই ধারা আমরা লক্ষ্য করি ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’, ‘এল আবার ঈদ ফিরে এল আবার ঈদ’ প্রভৃতি গান। এসব রচনায় শব্দ ও ছন্দ নিয়ে কবি যেন খেলায় মেতেছেন, ঈষৎ প্রগলভতা যেন আছে এখানে, কিন্তু ঈদের আনন্দঘন পরিবেশে তা চমৎকার সুসমঞ্জস। শেষের গানটির কয়েক চরণ নিম্নরূপঃ

ঈদ এসেছে দুনিয়াতে শিরণী বেহেশতী,
দুষমনে আজ গলায় গলায় পাতালো ভাই দোস্তী,
জাকাত দেবো ভোগ-বিলাস, আজ গোস্বা
বদমস্তি,
প্রাণের তশতরীতে ভরে বিলাব তৌহিদ।
চলো ঈদগাহে।

শ ও সব ধ্বনি এবং ই-র হ্রস্ব উচ্চারণকে কবি যেভাবে ব্যবহার করেছেন তা আমাদের মুগ্ধ বিস্মিত করে। এই গানে শোষিত বঞ্চিতের কোনো উল্লেখ নেই, কিন্তু তা সুস্পষ্টভাবে আছে সর্বজনপ্রিয় ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’ গানটিতে। ওই গানে তিনি স্মরণ না করে পারেননি তাদের, যারা জীবনভর রোজা রাখে, যারা নিত-উপবাসী। এবং এই খুশির গানের শেষ দু’টি চরণে বিষণœ গভীরতা আমরা লক্ষ্য করি ওই নিত উপবাসীদের উদ্দেশ্য করে যখন তিনি বলেনঃ

তোরে মারল ছুঁড়ে জীবন জুড়ে ইট পাথর যারা

সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরি মসজিদ।

তবে শোষিত বঞ্চিতের পক্ষে নজরুলের যে- প্রতিবাদী উচ্চারণ এবং আন্তর্জাতিকভাবে মেহনতি মানুষের পক্ষে নজরুলের যে- বৈপ্লবিক অবস্থান তাঁর কবিসত্তার মর্মমূলে ধৃত তা আরো স্পষ্টভাবে উপস্থিত ‘কৃষকের ঈদ’, ‘ঈদের চাঁদ’, ‘ঈদজ্জোহার তাকবীর শোন’ এবং ‘বক্রীদ’ প্রভৃতি কবিতায়। এই কবিতাগুলিতে ধর্মের নামে ভন্ডামি ও ধর্মের নিছক অনুষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে কবির ক্ষোভ তীব্রভাবে ঝলসে উঠেছে।

‘কৃষকের ঈদ’ কবিতায় নজরুল লিখেছেনঃ

জরীর পোশাকে শরীর ঢাকিয়া ধনীরা এসেছে সেথা,
এই ঈদগাহে তুমি কি ইমাম, তুমি কি এদেরই নেতা?
নিঙাড়ি কোরান হাদিস ও ফেকা, এই মৃতদের মুখে
অমৃত কখনো দিয়াছ কি তুমি? হাত দিয়ে বল বুকে!
নামাজ পড়েছ, পড়েছ কোরান, রোজাও রেখেছ জানি,
হায় তোতাপাখী, শক্তি দিতে কি পেরেছ একটু খানি?

কৃষক যখন দুর্বল, ক্ষুধার্ত, শক্তিহীন, সে যখন তীর-খাওয়া বুক আর ঋণে বাঁধা শির নিয়ে ধুঁকতে-ধুঁকতে ঈদগাহে চলেছে তখন কবি আর ঈদের মধ্যে কোনো আনন্দ দেখেন না। তিনি অপেক্ষা করে থাকবেন মহান শক্তিসাধকের জন্য, যিনি কৃষককে জাগিয়ে তুলবেন এবং তখনি, কবি বলেছেনঃ

রোজা ইফতার করিব সকলে, সেই দিন ঈদ হবে।

‘ঈদের চাঁদ’ কবিতায় বৈপ্লবিক সংগ্রামী উচ্চারণ আরো স্পষ্ট, আরো ক্ষুরধার। নির্যাতিত জনগণের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মৈত্রীবন্ধনের কথাও এখানে দ্বিধাহীনভাবে উচ্চারিতঃ

জানি না, তাহারা হিন্দু কি ক্রীশ্চান কি মুসলমান।

নির্যাতিতের জাতি নাই, জানি মোরা মজলুম ভাই-

জুলুমের জিন্দাকে জনগণে আজাদ করিতে চাই।

ঈদের এই কবিতায় নজরুল শোষক-ধনীর ঘর থেকে নির্যাতিত-বঞ্চিতের অধিকার ছিনিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেঃ

যার ঘরে ধনরত্ম জমানো আছে,
ঈদ আসিয়াছে, জাকাত আদায় করিব তাদের কাছে।
এসেছি ডাকাত জাকাত লইতে, পেয়েছি তাঁর হুকুম,
কেন মোরা ক্ষুধা তৃষ্ণায় মরিব, সহিব এই জুলুম।
এই রকম ডাকাতি সৃষ্টিকর্তার অনুমোদনসিদ্ধ।
ডাকাত এসেছে জাকাত লইতে, খোলো
বাক্সের চাবি,
আমাদের নহে, আল্লার দেওয়া ইহা
মানুষের দাবী

‘বক্রীদ’ কবিতায় শানিত হয়ে উঠেছে আনুষ্ঠানিকতায় আপাদ-মস্তক নিমজ্জিত কপট ধার্মিকের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র বক্তব্যঃ

অন্তরে ভোগী, বাইরে যে যোগী, মুসলমান সে নয়,

চোগা চাপকানে ঢাকা পড়িবে না সত্য যে পরিচয়।”

ওই একই কবিতায় কবির উচ্চারণঃ

বকরীদি চাঁদ করে ফরয়্যাদ, দাও দাও কোরবানী,
আল্লারে পাওয়া যায় না, করিয়া তাঁহার না-ফরমানি!
পিছন হইতে বুকে ছুরি মেরে, গলায় গলায় মেলো,
করো না আত্মপ্রতারণা আর, খেল্কা খুলিয়া ফেল।

নজরুলকে বাংলার মুসলিম রেনেসাঁর প্রাণপুরুষ বলা হয়েছিলো, সেকথা আগে উল্লেখ করেছি। রেনেসাঁর একটা প্রধান ধর্ম হলো কুসংস্কার, ভন্ডামি, গোঁড়ামি, নিষ্প্রাণ গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতা ও সকল প্রকার সঙ্কীর্ণতাকে আক্রমণ করে তার জায়গায় সত্য, ন্যায়, উদার মানবিকতা ও চিন্তার স্বাধীনতার জয় ঘোষণা করা। নজরুল দেখলেন যে ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সমাজ গতানুগতিক আচারের বেড়াজালে ধরা পড়ে আছে, কল্যাণমুখী বাস্তব কর্মকাণ্ড উপেক্ষা করে তা এখন শুধু কতিপয় প্রাণহীন নিয়ম পালনে তৎপর। কবির বহু ইসলামী গান ও কবিতায় এর বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের ক্ষুরধার তরবারি বারবার ঝলসে উঠেছে। ঈদের কবিতাগুলিতেও আমরা তার পরিচয় পাই।

তাছাড়াও অজস্র কবিতায় নজরুল বারবার একটা জিনিসের উপর জোর দিয়েছেন। কোনো আচার-অনুষ্ঠানই অন্তরের সত্যের চাইতে বড়ো নয়। আল্লাহকে পাবার জ ন্য যোগী বা দরবেশ সাজার প্রয়োজন নেই। নিজের হৃদয়ের দিকে তাকাবার পরামর্শ দিয়ে কবি বলেছেনঃ

এই তোর মন্দির মসজিদ
এই তোর কাশী বৃন্দাবন,
আপন পানে ফিরে চল,
কোথা তুই তীর্থে যাবি, মন!
এই তোর মক্কা-মদিনা,
জগন্নাথ-ক্ষেত্র এই হৃদয় ।।

একই কথা তিনি বলেছেন তাঁর বিখ্যাত ‘সাম্যবাদী’ কবিতায়ওঃ

এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,
বুদ্ধ-গয়া এ, জেরুজালেম এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
মসজিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,
এইখানে বসে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।

হৃদয়কে মূল্য না দিয়ে, পেটে-পিঠে আর কাঁধে-মগজে পুঁথি ও কেতাববহনকারী কাঠমোল্লাদের সম্পর্কে নজরুলের তীব্র উক্তি, ‘ঈশ্বর’ কবিতায়ঃ

শাস্ত্রবিদের করো নাক’ বীর, ভয়-

তাহারা খোদার খোদ “প্রাইভেট সেক্রেটারী” তা নয়!

এই কবিতাগুলিতে নজরুল কাশী, বৃন্দাবন, মথুরা, মক্কা, মদিনা, বুদ্ধ-গয়া, জেরুজালেম প্রভৃতির উল্লেখ দ্বারা জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সমগ্র মানবসভ্যতা ও ঐতিহ্যের এক মহান উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন। তবে বাঙালি কবি হিসাবে স্বাভাবিকভাবেই তাঁকে সবচাইতে বেশী আকর্ষণ করেছিল তাঁর স্বসম্প্রদায় তথা মুসলিম সমাজের সামাজিক ঐতিহাসিক ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং তাঁর নিকটতম প্রতিবেশী সম্প্রদায় তথা হিন্দু সমাজের সামাজিক-ঐতিহাসিক-ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং এই একটি ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমানের যুগ্ম ঐতিহ্যের ধারকরূপে, সমগ্র বাংলা সাহিত্যে নজরুলের চাইতে বড়ো আর কেউ নেই।

“রাঙা জবা” গ্রন্থের প্রায় একশ” গানে নজরুল হিন্দুর দেবী শ্যামা মায়ের চরণে হৃদয়ের অর্ঘ্য উজাড় করে ঢেলে দিয়েছেন। ‘দেবীস্তুতি’-তে আমরা পাই মহাকালী, মহালক্ষ্মী, মহাসরস্বতী, সতী, উমা, চন্ডিকা প্রমুখের উদ্দেশ্যে নিবেদিত শ্রদ্ধাঞ্জলী। এসব রচনায় পৌত্তলিকতার প্রকাশ খুঁজতে গেলে তা হবে চরম মূর্খতা। কবির হৃদয়াবেগ এসব কবিতায় প্রতীককে অবলম্বন করে উৎসারিত হয়েছে, সৃষ্টি সুখের উল্লাসে তা নেচে উঠেছে। প্রচলিত অর্থে আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি জীবনে যে ধর্মপালন করা হয় তার সঙ্গে এর কিছুমাত্র যোগ নেই। নজরুলের ইসলামী কবিতা ও গানের মতো এইসব রচনাতেও কোথাও আছে মানবতার জয়গান, কোথাও ধর্মের মোহের বিরুদ্ধে উদাত্ত উচ্চারণ, কোথাও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তির উদ্বোধনের জন্য প্রার্থনা। যেমন “রাঙা জবা” গ্রন্থের ৯৫ নম্বর গানে আছেঃ

যেথা দেবী শক্তি-নারী
অপমান সহে,
গ্লানিকর হানাহানি চলে
ধর্মের মোহে।
হানো সংঘাত অভিসম্পাত
সেথা নিরন্তর ।।

‘দেবীস্তুতি’-র মহালক্ষ্মী অংশে আছেঃ

রূপ দাও, জয় দাও, যশ দাও, মান দাও,
দেবতা কর ভীরু মানবে।
শক্তি বিভব দাও, দাও মা আলোক,
দুঃখ দারিদ্র্য অবগত হোক,
জীবে জীবে হিংসা এই সংশয় দূর হো
পোহাক এই দুর্যোগ রাত্রি।

স্পষ্টতই এসব কবিতার আবেদন কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বীদের কাছে নয়, সর্বমানবতার কাছে। যে প্রতীককে আশ্রয় করে কবির আবেগ অনুভূতি ও বক্তব্য এসব কবিতায় প্রকাশ লাভ করেছে তার ফলে হয়তো হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হৃদয়ে তা দ্রুততর ও অধিকতর প্রত্যক্ষভাবে আলোড়ন তুলতে পারে, এই পর্যন্ত, এর বেশি কিছু নয়। তাই এ ধারার কয়েকটি কবিতায় নজরুলের শব্দ ব্যবহার ও ছন্দ নির্মাণের বৈশিষ্ট্যও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘দেবীস্তুতি’র মহাখালী অংশের নিম্নোক্ত চরণ ক’টি লক্ষ্য করুনঃ

নীল জ্যোতির্ময়ী অসীম তিমির-কুন্তলা মা গো,
আসন্ন প্রলয়পয়োধির ঊর্ধ্বে দেখা দাও, জাগো।
দশ পায়ে দশ দিকে আঘাত হানো,
দশ হাতে দশবিধ আয়ুধ আনো;
দশ-মুখ কমলে অভয়বাণী
শোনাও আর্তজনে বিপদবারিণী। ।

উপরে উল্লিখিত কবিতাগুলি এবং ঈদের বিষয়সহ ইসলামী অনুষঙ্গ নিয়ে লেখা নজরুলের কবিতাবলী অবশ্য সব সমান উচ্চমানের নয়। প্রত্যেক কবির ক্ষেত্রেই একথা সত্য। মাঝে মাঝে নজরুল একটু বেশী উচ্চকক্ত, একটু বেশী প্রচারধর্মী। কবি এ সম্পর্কে অসচেতন ছিলেন না, কিন্তু চারদিকের অন্যায়-অবিচার, শঠতা-ধূর্ততা, দুর্বলের উপর অত্যাচার নির্যাতন, ধর্মের নামে অধর্ম তাঁকে অস্থির ও চঞ্চল করে তুলতো। এজন্যই তাঁর রচনায় মানের উত্থান-পতন ও অসমতা। কিন্তু এসত্ত্বেও তাঁর সামগ্রিক সাহিত্যকর্মে একটা মৌলিক ঐক্যবদ্ধ সুর নিরন্তর অনুরণিত। এরমূলে যা কাজ করেছে তা নজরুলের নিজের উক্তিতেই অসামান্য সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে। তিনি বলেছেনঃ

আমি পরম আত্মবিশ্বাসী। আর যা অন্যায় বলে বুঝেছি, অত্যাচারকে অত্যাচার বলেছি, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেছি- কাহারো তোষামোদ করি নাই, প্রশংসার ও প্রসাদের লোভে কাহারো পিছনে পোঁ ধরি নাই,- আমি শুধু রাজার অন্যায়ের বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করি নাই, সমাজের জাতির দেশের বিরুদ্ধে আমার সত্য তরবারির তীব্র আক্রমণ সমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে, তার জন্য ঘরে-বাইরের বিদ্রুপ, অপমান, লাঞ্ছনা, আঘাত, আমার উপর পর্যাপ্ত পরিমাণে বর্ষিত হয়েছে, কিন্তু কোন কিছুর ভয়েই নিজের সত্যকে আপন ভগবানকে হীন করি নাই, লোভের বশবর্তী হয়ে আত্ম উপলব্ধিকে বিক্রয় করি নাই, নিজের সাধনালব্ধ বিপুল আত্মপ্রসাদকে খাটো করি নাই, কেননা আমি যে ভগবানের প্রিয়, সত্যের হাতের বীণা; আমি যে কবি, আমার আত্মা যে সত্যদ্রষ্টা ঋষির আত্মা।

নজরুলের এই উক্তি আমাদের হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। এবং আমরা বিনা দ্বিধায় বলতে পারি যে তাঁর ঈদের কবিতাগুলিতেও আমরা প্রধানত একজন মুসলমান কবিকে পাই না, আমরা খুঁজে পাই এক সত্যদ্রষ্টা ঋষির আত্মাকে, সেই কবিকে যিনি মুসলমান বা হিন্দুর কবি নন, এমনকি কেবল বাঙালির কবিও নন, যিনি শুধু কবি, তারপর পূর্ণ যতি।

Click This Link
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×