অফিস থেকে আজকে বাসায় তারাতারি ফিরেছি। শরীর টা ভালো নেই, ক্লান্ত আর বিষন্ন লাগে। আমার জুনিয়র কলিগকে ম্যানেজ করে বাসায় চলে আসলাম। বাসায় আগেই আমার খালাতো বোন চলে এসেছে, তাই মনটা কিছুটা ভালো হয়ে গেলো। আগেই বলে নেই আমার কোনো বোন নেই তাই তাকে আমি অনেক স্নেহ করি। সে আমার চাইতে দুই বছরের ছোট। ছোট বেলা থেকেই আমি ওর সাথে অনেক ফ্রেন্ডলী। ছোট থাকতে নানা বাড়ীতে যখন বেড়াতে যেতাম ওর সাথে অনেক মারামারী করতাম। ও যদি কিছু কিনে (আইস ক্রীম, চীপস) নিয়ে আসতো সেটা জোর করে কেড়ে নিয়ে খেয়ে ফেলতাম। সে কান্না কাটি করে আমার আম্মার কাছে নালিশ করতো, আমার আম্মা আবার নতুন করে তাকে কিনে দিতো। বয়স বাড়ার সাথে কিছুটা দুরত্ত্ব চলে আসে। আর ওর বিয়ের পর আরো দুরত্ত্ব বেড়ে যায়। আমাদের বাসায় হঠাত হঠাত আসে। সে আসলেই ওর সাথে আড্ডায় মেতে উঠি।
কিন্তু আজকে শরীর টা ভালো লাগছে না। বাসায় গিয়েই বিছানার লেপের তলায় ঢুকলাম। সে অন্য রুমে আমার মায়ের সাথে গল্প করছে। আমার ছোট ভাই তার রুমে লেপটপ নিয়ে বসে আছে আর বাবা টিভিতে খবর দেখছে। কিছুক্ষন পরে আমার কাজিন আমার রুমে এসে আমার পাশে বিছানায় বসলো। আমার দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে। ওর চেহারার দিকে তাকালে আমি হাসি থামাতে পারি না, তাই জোড় করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম। সে আমাকে ডাকলো, এই ভাইয়া উঠো তোমার জন্য সারপ্রাইজ আছে। উঠো উঠো...।আরে বাবা চোখ টা একটু খুলো.....প্লিজ.....। চোখ খুলেই ওর দিকে তাকালাম, এই অসুস্থ শরীর নিয়েও হেসে ফেললাম। ওর হাতে একটি খাম, -“এটা দেখো আর আমাকে জানাও কেমন লাগলো। আমি রান্না ঘরে খালামনির সাথে চা বানাতে যাচ্ছি”। বলেই চলে গেলো।
আমার বালিশের পাশে একটি সাদা খামের ভিতরে একটি ছবি আর একটা বায়োডাটা। আমার মা সরাসরি আমাকে না দিয়ে আমার খালাতো বোনের মাধ্যমে দিয়ে আমাকে দিয়েছে। এটার ও অনেক কারন আছে। আমি বাবা মায়ের সাথে অনেক বন্ধু সুলভ কিন্তু একদম ফ্রী নই। ছোট বেলা থেকেই অনেকটা নিয়ন্ত্রিত আর অনুশাসনের মাধ্যমেই মানুষ হয়েছি। সব বিষয়ে ফ্রী আলোচনা করলেও কিছু কিছু বিষয়ে বাবা-মা, ছোট ভাইয়ের সাথে রেস্টিকশন থেকেই যায়। যেমন ঃ বাবা-মা, ছোট ভাইয়ের সাথে টিভি দেখছি আর সেই মুহুর্তে “ কনডমের” বিজ্ঞাপন দিলো বা “এইডস” বা “জন্ম বিরতিকরন পিল” বা আমি বিব্রত হই অনেক টা অসস্তি বোধ করি।
আমার মা খুব ভালো ভাবেই আমার মাইন্ড রিড করতে পারে, তাই তিনি আমাকে সরাসরি না দিয়ে ছবি আর বায়োডাটা আমার ছোট বেলার বন্ধু, খেলার সাথী কাজিন কে দিয়ে আমার কাছে পাঠিয়েছে। ধীরে ধীরে খামটি খুললাম, ছবি টি দেখলাম- মা শাল্লাহ অনেক সুন্দরী একটা মেয়ে, আমার সাথে বে মানান। বায়োডাটা দেখলাম “ইডেনে পড়ে”। ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক ভালো। ছবি আর বায়োডাটা আবার খামের ভিতরে রেখে দিয়ে শুয়ে থাকলাম।
শুয়ে শুয়ে চিন্তা করছি আর ভাবছি। ভাবতে ভাবতে উদাস হয়ে গেলাম। কি ভাবে যেন আমার চাওয়া পাওয়া অনেক টা ভিন্ন হয়ে গেছে, যেন এক ভাবে জীবনটাকে গড়তে চেয়েছিলাম কিন্তু জোড় করেই যেন সবকিছু অন্য দিকে টার্ন নিলো। জীবনে একজনকে অনেক অনেক ভালোবাসতাম অনেক অনেক সীমা হীন ......। কেন যেন তাকে আমি ভুলতে পারি না, এতো বছর হয়ে গেলো তবুও তার কথা ক্ষনে ক্ষনে মনে পড়ে। কোনো অজানা একটি মেয়ে দেখলেই আমার সেই হারানো ভালোবাসার সাথে মিলিয়ে দেখি তার চোখ টা মনে হয় সেই রকম, তার মুখটা ওর সাথে মিল আছে। কখনো শপিং মলে বা কোনো মার্কেটে গেলে যদি কাউকে তার মতন চেহারার কাউকে দেখি তাহলে বুকটা ধক করে উঠে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। সম্বিত ফিরে পেলে বুঝতে পারি নাহ আসলে এটা সে না। আমিই ভুল দেখেছি। তার সাথে কখনোই আর দেখা হবে না, কেন মিছে মিছি তাকে নিয়ে ভাবি?
তার কথা গুলো এখনো আমার কানে বাজে অলঙ্কারের ঝংকারের মতন। সে ছিলো চট্রগ্রামের আঞ্চলিক মেয়ে। তাই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে গেলে অশুদ্ধ উচ্চারন করতো। সেটাও আমার কাছে অদ্ভুত ভালো লাগতো। মনে হতো অশুদ্ধ উচ্চারন শুদ্ধের চাইতেও অনেক ভালো। তার সাথে কতো কতো সময় কাটিয়েছি, বৃস্টিতে ভিজেছি, রিকশায় ঘুরেছি, রেস্টুরেন্টে খেয়েছি......কতো কতো না জানা ভালো লাগা, ভালোবাসার কতো অনুভুতি তা হয়ত বলে শেষ করতে পারবো না।
চট্রগ্রামে আমাদের বাড়ী ছিলো, তাদের ও বাড়ী ছিলো। তার বাড়ী ছিলো আমার দুই প্লট পরে। ওর আর আমার প্রেম কাহিনী ওই এলাকায় এখনো কিংবদন্তীর মতন। আর আমাদের প্রেমের জন্য দুই পরিবারে হয়ে ছিলো কড়াকরি আরোপ। নিষেধাজ্ঞা। দুই পরিবার একে অপরের উপরে নাখোশ ছিলো । মেয়ে হিসেবে তার উপরে ছিলো আর কড়া কড়ি। তার পরেও কিভাবে যে ফাকি দিয়ে দেখা করতাম সেটাও অনেক মজার কাহিনী। তার হাত ধরে আমি প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছিলাম, তাকে আমি চিরদিন মনে রাখবো আর বিয়ে করলে তাকেই করবো।
তখন ছিলো স্টুডেন্ট লাইফ, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। চাকুরী পাবো, ক্যারিয়ার গড়তে হবে, তার পরে তাকে বিয়ে করবো, অনেক ভয় পেতাম তাকে যেন হারিয়ে না ফেলি। কতো কতো টেনশন ছিলো মনে, পড়ালেখা ফেলে তাকে নিয়েই মনটা পড়ে থাকতো। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখতাম তাকে নিয়ে।
কিন্তু আমার সেই আশংকাই সত্যি হয়েছে, তাকে আমি হারিয়ে ফেলেছি। ভাগ্য আমার সাথে নির্মম খেলা খেলেছে। অনেক নির্মম খেলা খেলেছে। আমার কিছুই করার ছিলো না। আমি ছিলাম সব দিক থেকেই শৃঙ্খলাবদ্ধ। সময় সব কিছুই পরিবর্তন করে দিলো খুব দ্রুত।
এখন ২০১০ সাল। আজকে আমি প্রতিষ্ঠিত- আমি চাকুরী করি, আমার স্বচ্ছলতা আছে। কিন্তু সে নেই , ভাবতে দুই চোখ ভিজে যায়। সব কিছু আছে কিন্তু তারপরেও মনে হয় সব কিছু অসার। জীবনের আনন্দ উচ্ছাস আর রঙ যেন সব কিছুই মাটি হয়ে গেছে। কোনো ভাবেই কোনো হিসেব মিলাতে পারি না। কেন যেন মনে হয় জীবনটাকে একটু অন্যভাবে চেয়েছিলাম।
বালিশের তলা থেকে খামটি আবার বের করে মেয়েটির ছবি দেখলাম। মাঝারী গড়নের ফর্সা একটি মেয়ে। তাকিয়ে ভাবলাম- ওর হয়ত অনেক ভাগ্য। তাকে আমার মতন জীবন যুদ্ধে পড়তে হয়নি। একটি প্রতিষ্ঠিত ছেলেকে বিয়ে করেই পেয়ে যাবে একটি নিশ্চিত সাংসার জীবন। আমার সাথে না হলেও অন্য কোনো প্রতিষ্ঠিত ছেলেকেই সে বিয়ের জন্য পেয়ে যাবে।
নাহ আর ভালো লাগছে না কোনো কিছু ভাবতে। মেজাজ টা বিগড়ে আছে। এর আগে আমার আরো একটি বিয়ে ঠিক করেছিলো আমার আত্নীয়-স্বজন, বাবা-মা মিলে। প্রায় সব কিছুই ঠিক ঠাক ছিলো । কিন্তু কোনো কারন ছাড়াই রাগের মাথায় সেটাও প্রত্যাখান করেছিলাম, একতরফা ভাবেই সেটা করেছিলাম। আমার ব্যাবহারে অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলো। আমার মা সে সময় অনেক কেদে ছিলেন।আমার ভাইও অনেক বিরক্ত হয়েছিলো। আমার মায়ের চোখের পানি দেখে আমিও পরে আপসেট হয়েছিলাম। কিন্তু কেন জানি কোনো মেয়েকেই আর ভালো লাগে না। অন্য কাউকেই ভাবতে পারি না।
মাঝে মাঝে বাবা-মায়ের প্রতিদানের কথা ভাবলেই চোখ ভিজে যায়। আমি যখন চট্রগ্রামের ইংলিশ মিডিয়াম হাতেখড়ি স্কুলে পড়তাম, আমার ছোট ভাই তখন দুধের শিশু। সকাল বেলা মা ঘুম থেকে তুলে নাস্তা খাইয়ে ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে আমাকে হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যেতো-নিয়ে আসতো। রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতো। বৃস্টিতে নিজে ভিজে আমাকে ছাতা ধরে নিয়ে আসতো।এমন কি ইন্টার মিডিয়েট পরীক্ষার সময় আমার বাবা আমার সাথে যেতেন। অফিস বাদ দিয়ে পরীক্ষা দিয়ে বের না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতেন। উদ্বিগ্ন হয়ে হলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কোচিং, প্রাইভেট মাস্টার জীবনের কোনো কিছুই অপুর্ন রাখেন নি। অসুস্থ হলে বাবা-মা দুই জনেই রাত জেগে আমার সেবা করতেন। শেষ রাতে উঠে আমাকে ঔষধ খাইয়ে দিতেন। জীবনে যেটা খেতে চেয়েছি তা-ই দিয়েছেন।
কিন্তু আমি বাবা-মা কে কিছুই দিতে পারিনি। শুধু কস্টই দিয়েছি। চাকুরী করছি আড়াই বছর হতে চললো। কিন্তু মা কে একসেট গয়না কিনে দিতে পারিনি, দামী কোনো শাড়ী গিফট দিতে পারিনি। কেন করি নাই, কেন ইচ্ছা হয় নাই জানি না। আমার বেতনের টাকা ফেমিলিতে না দিলেও কিছু হবে না জানি। কিন্তু আমি বেনসন সিগারেট খেয়ে প্রতি মাসে অনেক টাকাই নস্ট করি, ফালতু অপচয় করি, আড্ডায় টাকা উড়াই, শেয়ার বিজনেস এ টাকা দিয়ে প্রচুর টাকা নস্ট করেছি। আসলে আমি বাবা-মায়ের যোগ্য সন্তান হতে পারিনি এখনো। তাদের জন্য কিছুই করতে পারিনি, তাদের কে কস্ট ছাড়া আর কিছুই দেইনি।
বিছানা থেকে উঠে বারান্দায় গেলাম। ঠান্ডা বাতাস বইছে বাইরে। শরীরে পাতলা গেঞ্জি পরা, অনেক শীত লাগছে। বিষন্ন মন নিয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। কুয়াশায় ঢাকা আকাশ। মনে মনে ভাবছি-এই ছবিটা দেখে হ্যা বলবো না কি না বলবো। জানি আমার পরিবারের সকলেই অনেক অনেক উতকন্ঠা নিয়ে আছে। আমার একটি সিধান্তের উপরে আছে অনেক গুলো মানুষের স্বস্তি, আকাঙ্ক্ষা।
আমার প্রেয়সিকে আমি কথা দিয়ে ছিলাম আমি তাকে সারাজীবন মনে রাখবো আর বিয়ে করলে তাকেই করবো। তাকে আমি এখনো ভুলিনি বার বার কেন যেন তার কথাই মনে আসে।....আমার খালাতো বোন ডাকদিচ্ছে রুমে এসে, এই ভাইয়া তোমার চা, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, তারাতারি আসো। বিষন্ন মন নিয়ে আমার রুমে ফিরে গেলাম.........

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



