সেদিন যা হয়েছিল
নবম থেকে পঞ্চদশ শতক খ্রিষ্টানদের মধ্য যুগের শেষ পর্যায়। স্পেনের গ্রানাডার মুসলিম রাষ্ট্র তীব্র গতিতে ছুটছিল ধ্বংসের দিকে। রাজা পঞ্চম ফার্ডিনান্ডের সাথে পর্তুগিজ রানী ইসাবেলার বিয়ের মাধ্যমে গড়ে ওঠা খ্রিষ্টান শক্তির ঐক্য স্পেনে মিটমিট করে জ্বলতে থাকা মুসলমানদের প্রদীপে বাতাসের প্রবল ঝাপটা দিলো। ফার্ডিনান্ডের শক্তির সামনে ছোট ছোট খ্রিষ্টান শাসকরা ছিল দূর্বল, বলা যেতে পারে প্রায় ক্ষমতাহীন। মুসলমানদের ধর্মচ্যূত করার পায়তারা চলে ফার্ডিনান্ডের আমলে। মুসলমানদের আরবি পড়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। আরবীয় পোশাক পড়া ছিল আইন পরিপন্থী। অনেক মুসলমানদের বাধ্য করা হয় খ্রিষ্টান স্কুলে ভর্তি হতে। এতে যারা খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করত, তাদের জন্য ছিল বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা। মুসলমানদের জন্য ছিল আলাদা পোশাকের ব্যবস্থা । যেখানে সেখানে অপদস্থ করা হতো মুসলমানদের।
১ এপ্রিল, ১৪৯২ সাল।
অনেক আগেই রাজা ফার্ডিনান্ড ও রানী ইসাবেলা মুসলমানদের হাত থেকে কর্ডোভাসহ অনেক অঞ্চল দখল করে নিয়েছিলেন। বাকি ছিল গ্রানাডা। এখানকার শাসনকর্তা ছিলেন আবুল হাসান। তার পুত্র আবু আব্দুল্লাহর বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তিনি তার শাসন ক্ষমতা হারান। মসনদে বসেন বিশ্বাসঘাতক আবু আব্দুল্লাহ। কিন্তু বেশি দিন টিকে থাকতে পারেননি। নিজের জীবন বাঁচাতে ফার্ডিনান্ডের সাথে সন্ধি করেন।
আবু আব্দুল্লাহ খ্রিষ্টানদের কাছে আত্মসমর্পণ করে প্রাণে রক্ষা পাবেন বলে যে ধারণা করেছিলেন, সেটা ভুল প্রমাণিত হয়। প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ফার্ডিনান্ড বাহিনী শহর অবরোধ করে রাখে। বিচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যান কিছু মুসলমান। এ সময় রাজা ফার্ডিনান্ডের একটি ঘোষণাপত্র প্রচার করা হয় যেসব মুসলমান নিরস্ত্র হয়ে গ্রানাডার মসজিদগুলোতে আশ্রয় নেবে তাদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হবে। আর যারা খ্রিষ্টান জাহাজগুলোতে আশ্রয় নেবে, তাদের অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেয়া হবে। অন্যথায় আমাদের হাতে তোমাদের প্রাণ হারাতে হবে।
অসহায় মুসলমানরা সরল বিশ্বাসে বন্ধ করেন যুদ্ধ। অনেকে জাহাজে করে পালিয়ে যান, আবার অনেকে আশ্রয় নেন মসজিদে। কিন্তু মিথ্যাবাদী প্রতারক ফার্ডিনান্ড মসজিদে আশ্রয় গ্রহণকারী নিরস্ত্র মুসলিম শিশু-বৃদ্ধ নরনারীকে পুড়িয়ে এবং জাহাজে আরোহণকারী মুসলমানদের জাহাজ ডুবিয়ে হত্যা করে।
এ হূদয়বিদারক ও করুণ ঘটনা যে দিন ঘটেছিল সে দিন ছিল পয়লা এপ্রিল।
বর্তমানে ‘এপ্রিল ফুল ডে’ নিয়ে রকম গল্প প্রচলিত আছে। এপ্রিল ফুল বাংলাদেশের বা প্রাচ্যের কোনো উৎসব বা আনন্দের দিন নয়। বাংলাদেশসহ এই উপমহাদেশে দিনটির প্রচলন হয় ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজদের সাথে যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পরিণামে। ব্রিটিশরা আমাদের প্রায় ২০০ বছর শাসন করেছিল। অন্য অনেক কিছুর মতো ইংরেজরা এ দেশে তাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির নানা বিষয় চালু করে। এর একটি দৃষ্টান্ত, এপ্রিলের ১ তারিখে ‘এপ্রিল ফুল ডে’ চালু করা।
এপ্রিল ফুল ডে উদযাপনের জন্য একে অন্যকে বোকা বানায়। কেউ কেউ বলে থাকেন, বিভিন্ন দেশে একই সময়ে এপ্রিল ফুল ডে’র সূচনা হয় বিশেষ করে বসন্ত বিদায়ের উৎসবকে সামনে রেখে। ইংল্যান্ডে আঠারো শতক থেকে দিনটি ব্যাপকভাবে উদযাপিত হতে থাকে।
স্কটল্যান্ডে ৪৮ ঘণ্টাব্যাপী এপ্রিল ফুল ডে উদযাপিত হয়। মেক্সিকোতে এ দিবসটি অন্য প্রেক্ষাপটে উদযাপিত হয়ে থাকে। ডিসেম্বরের ২৮ তারিখ খ্রিষ্টানরা এরাডসের হাতে নিষ্পাপ শিশুদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের স্মরণে দিনটি উদযাপন করে। আবার ১৫৬৪ সালে ফ্রান্সে প্রবর্তিত নতুন ক্যালেন্ডারকে সামনে রেখে আধুনিক এপ্রিল ফুল ডে উদযাপিত হয়। তার আগে ইউরোপে একটিমাত্র ক্যালেন্ডার ব্যবহূত হতো। তখন বছরের সূচনা হতো এপ্রিল মাসের ১ তারিখ থেকে। ১৫৬৪ সালে ফ্রান্সের সম্রাট দশম চার্লস এই পুরনো তারিখ পরিবর্তন করেন। তিনি ১ জানুয়ারি থেকে নববর্ষ চালুর ঘোষণা দেন। এটা পৃথিবীর সর্বত্র আজো চালু আছে।
পহেলা এপ্রিল হলো সেই তারিখ, যেখানে পারস্যবাসী ও ইহুদিদের পক্ষ থেকে হজরত ঈসা (আঃ) কে ঠাট্টা-বিদ্রূপের বস্তুতে পরিণত করা হয়েছিল। ইঞ্জিলের মধ্যে (বর্তমানে যা বাইবেল) ঘটনার বিবরণ দেয়া আছে এভাবে-
আর সে ব্যক্তি ঈসা (আঃ) কে বন্দী করে তার সাথে ঠাট্টা-পরিহাস করত এবং তাকে আঘাত করত, আর চোখ বেঁধে তার গালে চড়-থাপ্পড় মারত এবং তাকে এই বলে জিজ্ঞাসা করা হতো, নবুয়তের মাধ্যমে বলো কে তোমাকে মারছে? এভাবে ভৎসনা করে আরো অনেক কথা তার বিরুদ্ধে বলা হয়। (লুক, ২২:৬৩-৬৫)
হজরত ঈসা (আঃ) কে বিচারের নামে পিলাতস থেকে হিরোডস আবার হিরোডস থেকে পিলাতসের আদালতে প্রেরণ করার উদ্দেশ্য হলো ঠাট্টা পরিহাস করে তাকে কষ্ট দেয়া। আর এ ঘটনা ঘটেছিল পয়লা এপ্রিলে। এপ্রিল ফুল ডে বাস্তবিকভাবেই একটি লজ্জাজনক ঘটনার স্মৃতি।
এপ্রিল ফুল উৎসব আজ আমাদের একটি প্রিয় উৎসবে পরিণত করেছি। অথচ এর উৎস মূলত: মুসলমানদের বিরুদ্ধে স্পেনের মাটিতে খ্রিষ্টানদের প্রতারণাপূর্ণ বিজয়ের ইতিহাস। কেননা, পহেলা এপ্রিলের অন্য সব ইতিহাস ১৪৯২ সালের পরে।
আহা! আমরা সত্যিই কতো বোকা!
ইতিহাসের হৃদয়বিদারক ঘটনা ভুলে না গেলে এপ্রিল ফুল কোনো মুসলমানকে আনন্দ দান করতে পারে না। বলতে পারেন,আমরা এখন কি করব? হাসি খুশি মুখে অপরকে বোকা বানিয়ে আনন্দ উৎসব করব? নাকি সেদিনকার অসহায় মুসলমানেদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড মনে করে তাদের জন্য গভীর সমবেদনা জানাবো?
কৃত্জ্ঞতা: সুজন (প্রথম আলো ব্লগ)
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০০৯ সকাল ৮:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



