আমার একটা কুকুর ছিল। ছিল বলছি কেন, এখনো তো আছে। তবে সেটা আছে অন্য কোন জায়গায়, অন্য কোন জগতে। যেই জগতটার ভেতরে আমি, আমার মন নিয়ে প্রবেশ করতে পারব না। সেই গল্পটা শুরু করি। কুকুর কুকুর করতে ভাল লাগবে না, তাই তার একটা নাম দিয়ে দেই। ধরলাম তার নাম তাসনিম। মানুষের নামই দিলাম, কেননা কুকুরটার একটা অদ্ভূত ক্ষমতা ছিল যেটা সচরাচর তাদের থাকে না, কুকুরটা কথা বলতে পারত। এজন্যই মনে হয়, আমি এতটা আকৃষ্ট হয়েছিলাম ওটার জন্য।
কুকুরটাকে পাওয়ার ইতিহাসটা বলি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘন বনানীর ভেতর ওটা পড়ে ছিল। দেখে খুব মায়া হল। কেন জানি পুষতে ইচ্ছা হল। অন্যান্যদের থেকে একটুখানি আলাদা হয়তোবা। কাছাকাছি হতেই আমি ওটার ক্ষমতার ব্যাপারটা জানতে পারলাম।
"এদিকে আসছেন কেন?" তাসনিম বলে উঠল।
"এই যে এই, তোমার কোন মালিক আছে?"
"নাতো, আমি খুব অসহায়, কেউ দিলে খেতে পারি, নাহলে উপোস থাকতে হয়।"
"তাহলে তো কোন সমস্যাই নেই। তুমি আমার সাথে যাবে? তোমাকে পছন্দ হয়েছে। তুমিতো দেখি কথাও বলতে পারো। আমার সাথে থাকলে তোমার ভালই হবে।"
"আমার তো কোন মনিব নেই, তাই আপনার সাথে যেতে আমার কোন আপত্তি নেই।" বলে এগিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়াল।
"বাহ্, তুমি তো খুব লক্ষ্মী। চলো, যাওয়া যাক।"
যা ভেবেছিলাম তাই হলো। আম্মা প্রচণ্ড রেগে গেলেন।
"ঘরে থাকার জায়গা নেই, তার ওপর একে এনিছিস, যা এক্ষুণি ফেলে দিয়ে আয়। নিজের থাকার ঠিক নেই আবার এসেছে কুকুর পুষতে।"
ওটাকে নিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম।
"দেখো, সমস্যা তো হয়ে গেল, এখন কি করা যায়।" ওটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ বুঝে ফেললাম কি করতে হবে। তোমাকে একটা মোবাইল ফোন কিনে দেই। তুমি তাহলে আমার সাথে সব সময়ই থাকতে পারবে। যখন প্রয়োজন হবে আমাকে ডাকতে পারবে। তবে সাবধান, হারিয়ে ফেলো না, তাহলে মুশকিল হয়ে যাবে।"
এরপর থেকে কোন সমস্যা হল না। দরকার হলেই ওর সাথে কথা বলতে পারি। তবে দেখা তো করতে পারি না। ওর বাসা যেখানে, সেখান থেকে আমাদের বাসার কাছে চলে আসলে সে নির্ঘাত খাবারের অভাবে মারা যাবে। কারণ বাসা থেকে খাবার নিয়ে ওকে দেয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। এদিকে নিজের ইনকাম থাকলে তো কথাই ছিল না।
মাঝে মাঝে দেখা হয়।
ওর সাথে খুব ভাব হয়েছে। ওকে জড়িয়ে বসে থাকি। ওটা আমার কোলে বসে থাকে। আসলেই সুন্দর দেখতে। দেখলেই কেমন জানি মায়া পড়ে যায়।
ভাবি, আশ্চর্য, আমার আগে, এত সুন্দর একটা কুকুরকে তো যে কেউই নিয়ে যাবার কথা। কারোরই চোখ পড়লো না এটার দিকে? ভাবতাম, সবার দেখার চোখ নেই।
আমার ধারণা ভুল ছিল।
ওটার দিকে আগেই মনে হয় কারো চোখ পড়েছিল।
২
সমস্যাটার শুরু এভাবেই।
এক রাতে ফোনে কথা বলতে গিয়ে আম্মু ধরে ফেলল।
"কার সাথে এত কথা?"
"আম্মু, ওই কুকুরটার সাথে।"
"কি, আমার সাথে ফাজলামো করো? দাও তোমার মোবাইল, রাখার কোন দরকার নাই। এটা তোমার কাছে থাকলে অনেক সমস্যা হবে বুঝতে পারছি।"
"ঠিক আছে আম্মু, আমি আর রাতে কথা বলব না, হয়েছে তো?"
"কথা কম, এখন থেকে যেন কথা বলতে না দেখি, মনে কর আমি কিছু বুঝিনা না? দিনে যখন কথা বলবে তখন আমার সামনে বলবে। তা না হলে মোবাইল আমি নিয়ে নেব।
ঘটনাটার পর থেকে আমার খুব ভয় হতে লাগল। যদি আম্মু মোবাইল নিয়েই যায়, তাহলে তো মহা সর্বনাশ। আমি আমার কুকুরটার সাথে কথা বলব কিভাবে! আম্মু তো আমার কোন কথাই শুনতে চাইল না।
ওকে আমি আমার সমস্যাটার কথা বলে দিলাম।তারপর থেকে ওটার সাথে কথা খুবই কম হতো। তবে যতটুকু হতো, তাতেই চলে যেত। কিন্তু ভেতরে যে অন্য ব্যাপার ঘটছে সেটা আমি ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি।
ওটার মধ্যে একটা মায়াময় জাদু ছিল। যে মায়ার অদৃশ্য এক শৃঙ্খলে ওটার বৃত্তবন্দী হয়ে পড়েছিলাম আমি। একটা কুকুরের জন্য এক ভালবাসা! কিন্তু ওই যে বললাম, কুকুরটা কথা বলতে পারতো.........
৩
এক রাতের কথা।
তাসনিমকে ফোন দিলাম।
কল ওয়েটিং।
আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম।
ওর নাম্বারই বা কে কীভাবে পেল আর এত রাতেই বা ওর সাথে কেন কথা হচ্ছে? কথা শেষে জিজ্ঞাসা করলাম।
এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। প্রথমবারের মতো বুঝতে পারলাম কুকুরটা শুধু কথাই বলতে পারে না, তার বুদ্ধিও আছে।
এভাবে চলতে থাকল। কিন্তু আমি আর কতো সহ্য করতে পারি। আমি ওর মনিব, আর সে কিনা আমাকে রেখে রাতের বেলা কথা বলছে আরেকজনের সাথে। আমার সহ্য হলো না। ওকে ফোন দিলাম।
"ওই শোন, তুই আর আমাকে ফোন করবি না, ও কেমনে করবি, তুই তো ফোন করতেও পারিস না। শোন, আমি তোকে আর ফোন করব না। তুই তোর মতো থাক। আমার আগেই বোঘা উচিত ছিল তুই রাস্তার একটা কুকুর। তোকে বিশ্বাস করে আমার ভুল হয়েছে। তুই তোর মতো থাক।"
বলে ফোন কেটে দিলাম।
অনেক দিন কোন যোগাযোগ নেই।
কোন ফোন দেইনি।
এরপর এক রাতে....
মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। বুঝলাম না কে ফোন করলো এত রাতে, দেখি তাসনিমের নম্বর। আমি আরেকবার অবাক হলাম। ও ফোন করতেও শিখে গেছে।
ও কথা বলতে শুরু করলো।
কিছুক্ষণ কথা হলো।
আমি বললাম, "এ কয় দিনে এত পরিবর্তন? ভালই তো।"
তাসনিম বলল, "শোন, বেশী কথা বলব না, তোমাকে কয়েকটা কথা বলে রাখি। আমার বিয়ে হবে। আমার পেটে বাচ্চা। আমি আমার স্বামীর ঘর করব। তুমি কখনো আমার কাছে মনিবের দাবি নিয়ে আসবে না। আমাকে এ কয়েকমাস তুমি অনেক অত্যাচার করেছো। আমি সহ্য করেছি কেননা আমি একসময় তোমাকে মনিব বলে স্বীকার করেছিলাম। এখন সব ভুলে যাও। গুড বাই। ফোনটা কেটে গেল।
এরপর আমি ফোন দিয়েছিলাম। সে ফোন ওপাশ থেকে ধরা হয়নি। আমি ভাবলাম এটা নিশ্চয়ই কোন কুকুর নয়। কুকুর কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করে না। সে বোধ তাদের নেই। একমাত্র মানুষই পারে বিশ্বাসকে ভঙ্গ করতে। আমি বুঝতে অপারগ, তাসনিম নামে যে প্রাণীটাকে আমি ভালবেসেছিলাম, সেটা আসলে একটা মানুষ, নাকি মানুষরুপী কুকুর, নাকি রাস্তার একটা আবর্জনা?
উত্তরটা আমার অজানাই রয়ে গেল।
[গল্পটা কারো মনে আঘাত দিয়ে থাকলে বিনীত ক্ষমাপ্রার্থী]
আলোচিত ব্লগ
চলতি পথের গল্পঃ দুই

‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।
এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক
‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।