অণুগল্প-২। ইলিশ।
১২ ই এপ্রিল, ২০০৮ রাত ৩:৪১
আকবর আলী দাওয়ায় গল্পের আসর বসিয়েছে। মালেক, রাজ্জাক আর তার চাচাতো ভাই রউফ হাঁ করে আকবর আলীর মাছ ধরার গল্প শুনছে।
"তরা তো বিশ্বাস যাবি না। গহীন রাইতে আমরা সবাই ঘুমাইয়া আছি। হঠাত্ আমার ঘুম ভাইংগা গেল। কিসের যেন ঘ্রাণ পাইলাম।"
"কিসের ঘ্রাণ, আকবর ভাই?"
"পয়লা ঠাহর পাই নাই। পরে বুঝলাম,ইলিশের ঘ্রাণ। বাপরে-সেকি ঘ্রাণ। পরাণডা এক্কেরে জুড়াইয়া যায়। আস্তে আস্তে সবটিরে উডাইলাম। তারপর ফেললাম জাল। আমাগো চাইরদিকে শুধু ইলিশ আর ইলিশ। জাল ফেললেই ইলিশ। তাগো চকচকা গায়ে চান্দের আলো পিছলাইয়া যায়। আমাগো নৌকা প্রায় ডুবেডুবে ইলিশের ভারে।"
রাজ্জাক বিশ্বাস যায়না। "এইডা তুমি চাটাম মারলা আকবর ভাই। নৌকায় বইসা তুমি পানির ইলিশের ঘ্রাণ পাইছো?"
আকবর আলী হা হা করে হাসে। "আমার নাক কি আর তগো মতোন? এই নাক হইলো গিয়া আকবর নিকারীর নাক। এর সামনে ইলিশের বাঁচন নাই।"
এবার যাবার সময় বলেছিল চার-পাঁচ দিনের মাথায় ফিরবে। কিন্তু ফিরেছে বারো দিন পর।
চুলোয় কয়েকটি নতুন খড়ি দিয়ে জমিলা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আকবর আলীর মাথায় আর কিছু নেই। শুধু ইলিশ ছাড়া।
তাদের বিয়ে হয়েছে দুই বছর হোল। আকবর আলী মাছ ধরে, দুইপুরুষের পেশা। "জেলে" শব্দটা কেমন হিন্দু হিন্দু শোনায় বলে আকবর আলী নিজেকে নিকারী বলে। জমিলা সেই সুবাদে নিকারীবৌ।
জমিলার বাপ ছিল মাঝি। বাপের নৌকায় করে কত বড় বড় গাঙ পাড়ি দিয়েছে জমিলা।
"নদীর মইধ্যে কেমুন একটা নেশা আছেরে, মা।" দাঁড় টানতে টানতে বাপজান কথাটা বলেছিল তাকে।
জমিলার কাছে তাই নদীকে আপন মনে হয়। নদীর বুকে যখন বড় ঢেউ ওঠে, তখন সে ভয় পায়না। কিন্তু আকবর আলীকে তো নদীর নেশায় পায়নি। তার নেশার জিনিস থাকে নদীর গভীরে। তা হোল রূপোলী ইলিশের ঝাঁক।
আগে নিজের নৌকা ছিল, কিন্তু দুর্ভিক্ষের সময় তা বেচতে হয়েছিল। এখন আকবর আলী গফুর বেপারীর নৌকায় মাছ ধরে। আগে ইচ্ছেমত ঘরে ফিরে আসতে পারতো, এখন সে স্বাধীনতা নেই। বেপারীর কথামত নদীতে থাকতে হয়। তাতে আকবরের কোন সমস্যা নাই। সে তো পারলে সারাটা জীবনই কাটাতে চায় ইলিশের পিছন পিছন।
আজকে সে ফিরেছে সন্ধ্যার একটু আগে। হাতে তিনটে বড় ইলিশ ঝুলিয়ে।
"বৌ-কেমুন আছস?"
তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করেই সে চলে গেছে পুকুরের দিকে গোসল করতে।
এখন রাত। জমিলার রান্না প্রায় শেষ। একটা বড় ইলিশকে কেটে তিন রকমের রান্না করেছে সে। কড়কড়ে করে ইলিশ ভাজা, সর্ষে-ইলিশ, আর ইলিশের কাটাকুটি দিয়ে একটা বেগুনের তরকারী। আর দুটো ইলিশকে সে অমনি রেখে দিয়েছে রান্নাঘরে, কালকে সেগুলোকে কেটে জ্বাল দিয়ে রাখবে।
খেতে বসে বেশী খেলোনা আকবর আলী। "তর পাক ভাল হইছে রে বৌ। কিন্তু খিদা নাই বেশী। শরীলডাও ছাইড়া দিছে। আমি ঘুমাইতে গেলাম।"
রান্নাঘরের সব কিছু গুছিয়ে যখন জমিলা ঘরে ঢুকলো তখন আকবর আলীর নাক ডাকছে। জমিলা জানে যে এখন বাড়ীতে ডাকাত পড়লেও তার ঘুম ভাংবেনা। আকবরের পাশে চুপ শুয়ে পড়ে সে।
বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে জমিলার ঘুম আসেনা। শরীরের মধ্যে এক জ্বলুনি টের পায় সে। জমিলার দাদী বলতো যৈবনজ্বালা। "সোয়ামীর পায়ে পায়ে থাকবি সব সময়। সোয়ামী হইলো যৈবনজ্বালার ওষুধ।"
হায়রে-সোয়ামী! বারো দিন পরে যাও বা সোয়ামীর দেখা পাইলাম, সে কিনা এখন নাক ডাইকা ঘুমায়।
কিছুক্ষণ পর আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে পড়ে জমিলা। কুয়োতলায় গিয়ে বালতি বালতি পানি ঢালে গায়ে। জলের ধারায় মুছে ফেলে সংসারের সব গন্ধ। আনাজপাতি, ঘুঁটে, তেল মশলা সব কিছুই মুছে যায় একে একে। এখন সে নতুন নারী। ডানপিটে মাঝির মেয়ে জমিলা, যে নদীর মতোই সদা-চঞ্চলা। এই রমণীকে সংসারে যেন মানায় না।
অন্ধকারের মধ্যে ভেজা শাড়ী বদলায় জমিলা। গায়ে তোলে নতুন প্রসাধন। বিড়বিড় করে বলে,"আকবর নিকারী, তুমি আমারে অহন তরী চিনো নাই।"
গহীন রাতে আকবর আলী নড়ে ওঠে। বাতাসে ও কিসের ঘ্রাণ? ঘুমের মধ্যেই সে হাত বাড়ায়।
এ কি ইলিশ নাকি ইলিশগন্ধা কোন জলদেবী? শিকারী আকবর আলী আধোঘুমে তার নিশানা সই করে। তুমি যেইই হও না কেন, আকবর নিকারীর কাছ থেইকা আজ আর তোমার বাঁচন নাই।
সোয়ামীর আদরে খল খল করে হাসে জমিলা। অবিকল নদীর মতোন।
ভোররাতের দিকে একটি শিয়াল উঠোনে ফেলে দেওয়া দুটি আস্ত ইলিশ দেখে নিজের সৌভাগ্যে নিজেই অবাক হয়ে যায়।
(চাটাম মারা= চাপা মারা)
অণুগল্প-১। হিসেব-কিতেব।
মাইনুল বলেছেন:
বেশ সুন্দর লেগেছে আপনার এই গল্পটি। ধন্যবাদ।
রোডায়া বলেছেন:
ভালো৷
বিষাক্ত মানুষ বলেছেন:
চমৎকার লেখা ।কৈ এর তেলে কৈ ভাজা শুনছি
এইটা হইলো -- "ইলিশের তেলে নিজেরে ভাজা" ।
লেখক বলেছেন: এত খোলাসা করে সবকিছু বলতে নেই।
বিবর্তনবাদী বলেছেন:
আপনার লেখার প্রশংসা করতে করতে ক্লান্ত। কি করা যায়!!! আর কিছুতো করারও পাচ্ছি না। আবারো দিয়ে যেতে হল ++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++
প্রিয়তি বলেছেন:
দারুন লাগলো গল্পটা। অন্যরকম লেখা।
আকাশচুরি বলেছেন:
বিবর্তনবাদী বলেছেন: আপনার লেখার প্রশংসা করতে করতে ক্লান্ত। কি করা যায়!!! আর কিছুতো করারও পাচ্ছি না। আবারো দিয়ে যেতে হল ++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++++
সত্যিই!!
নির্বাসিত বলেছেন:
লেখাটি পড়ার এবং মন্তব্য করার জন্যে সবাইকে ধন্যবাদ। ভাল থাকুন।
রাশেদ বলেছেন:
ভাল্লাগছে।
আলী আরাফাত শান্ত বলেছেন:
+
নির্বাসিত বলেছেন:
শান্ত ও রাশেদ, ধন্যবাদ রইলো। শুভ নববর্ষ।
লেখক বলেছেন: নিশ্চয়ই।
লেখক বলেছেন: ভারী সুন্দর তো কার্ডটি। শুভেচ্ছাটি আরো মনোরম। ধন্যবাদ। আপনার জন্যেও রইলো নতুন বছরের শুভেচ্ছা।
লেখক বলেছেন: নারে ভাই। ওপাড়ার জন্য লিখেছিলাম, এখন এ পাড়াতেও চালিয়ে দিলাম। তবে এগুলো লেখার সময় বেশ মজা পেয়েছি।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে।
আছহাবুল ইয়ামিন বলেছেন:
বিষয়বস্তু যাই হোক না কেন, নির্বাসিতদার সাবলীল হাতে পড়লে তার আর বাঁচন নাই।আপনার লেখা সবসময় পড়ি। লেখার অভ্যাস নেই বলে সবসময় ধন্যবাদ দেয়া হয় না।
এক নিরব পাঠকের পক্ষ থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ!
লেখক বলেছেন: জবাব দিতে দেরী হোল বলে ক্ষমা চাইছি। কে বলে আপনি নীরব? এইতো বেশ সরব হলেন। লেখাটি পড়ার এবং মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
রাজর্ষী বলেছেন:
খুবই ভালো লাগলো।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকে।
লেখক বলেছেন: লেখাটি আপনার কাছে ভাল লেগেছে জেনে আমারও ভাল লাগছে।

















