অনিবার্য আগুনে পুড়ে যেতে চেয়েছিলাম একদিন। পুড়েছি প্রতিদিন, ভস্ম হই নি। একদিন জরাস›ধ হয়ে জন্মেছিলাম, জুড়ে দিলো যেজন-- তার নাম জরা নয়, অভিমান। আমি তার মুঠোর ভিতর দৃশ্যের পাথর, তার মুঠোভর্তি আমার চোখ।
মেঘদূত ভালো লাগে। অনেকবার পড়েছি। হয়েছি মনে মনে বিরহী যক্ষ। বুদ্ধদেবের অনুবাদ মূল সংস্কৃতির চেয়ে শক্ত। মাত্রা ঠিক রাখতেই বোধকরি তিনি এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। একদিন ভাবলাম, আমি নিজেই মেঘদূত অনুবাদ করবো।
তার সাথে আমার পরিচয় ছিলো না। অথচ আমরা পরস্পরকে চিনতাম। একদিন বলেই ফেললাম, আপনি আমাকে সংস্কৃত ভাষাটা শেখাবেন।
তার বিষয় সংস্কৃত। সে কারণ জানতে চাইলো।
মেঘদূত অনুবাদ করবো।
ঠিক আছে। ছয়মাস পর। আগে আমাকে ভালোভাবে শিখতে হবে।
সে চলে গেলো।
সতেরোদিন পর তাকে দেখলাম। জারুলবনে হেঁটে বেড়াচ্ছিলো। ডাক দিলাম, অ্যাই... আপনার সাথে কথা ছিলো...
না ফিরেই জবাব দিলো, ছয়মাস পর।
একদিন মিছিল নামলো। দাবী আদায়ের মিছিল। আমি তখন মিছিলের। প্রখর রৌদ্র আর স্লোগানের ভিতর তাকে খেয়াল করি নি। মিছিলে তারও পা চলছে, হাত উঠছে, হাত নামছে। আর আমাদের কণ্ঠের গান তখন নিবিড় স্লোগান।
যথারীতি ঝাপিয়ে পড়লো একপাল কুকুর, সনখ। রুখতে যখন গেছি-- আর মনে নেই...
আমি আর্তনাদ করছিলাম। আমার চেতনা আসছিলো, আবার চলে যাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো আমার দুটো হাতই ভেঙে গেছে। হাড় ভেঙে বেরিয়ে এসেছে। রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো। আমি বোধহয় হাতের জন্যে কাঁদছিলাম, না হাতের জন্যে নয়, বোধহয় কিভাবে কবিতা লিখবো, ছবি আঁকবো এইসব বকছিলাম।
সে এসে আমার বুকে হাত রাখলো, হাত রাখলো চুলে। বললো, তুমি বলবে, তোমার কবিতা আমি লিখে দেবো ইত্যাদি।
তার চোখে তখন আষাঢ়ের সকল বৃষ্টিপাত।
একদিন মেঘের একটি হাত নেমেছিলো আমার বুকের খরায়, আমার হিজিবিজি চুলের বনে...
মেঘের নাম অভিমান। অভিমান! তুমি কি আমার পুজো নিবে?
আমার জন্যে কেউ কোনোদিন কাঁদে নি। একজন একদিন কেঁদেছিলো-- আমাকে আমৃত্যু কাঁদাবে বলে।
আমার স্বপ্ন, আবেগ আর শূন্যতা ছাড়া কিছু নেই। আর তুমি অভিমান।
অভিমান, তোমাকে এখনো জানি না।
সে অবাক হলো, বললো, শূন্যতা!
হ্যাঁ, শূন্যতা যতোদিন মানুষকে ঘিরে থাকে মানুষ ততোদিনই সুন্দর থাকে।
মানে!
বুঝলে না? বুঝবে না জানতাম। মানে তুমি ধরা দিলে তো তোমাকে আর খুঁজে বেড়াবো না।
তুমি হাসলে এবার।
বললাম, শূন্যতা সুন্দর।
কী তাকাও?
তোমার চোখের ভিতর।
না।
কেনো?
আমার চোখে কী আছে?
স্বপ্নের বিষ।
অভিমান তোমাকে আমি বুঝি না, কিংবা তুমিও আমাকে...। বৃষ্টি এলে কি তুমিও পুড়ে যাও, আমি যেমন? আমি সোনালু ফুলকে রাধাচূড়া বলে ডাকি। আমি ডাহুক চিনি না, আমি পানকৌড়ি চিনি না...
তোমার কণ্ঠে ছিলো রুদ্রের গান, ...দিও তোমার মালাখানি...
তোমার কণ্ঠের গান দিগন্ত ছুঁয়ে আমার কাছেই ফিরছিলো। তুমি বললে, ছি! তুমি নিমগাছও চেনো না?
তুমিই বলো দোষ কি আমার একার? তুমি যে কোনোদিন চিনিয়ে দাও নি।
তিনদিন দেখা না হওয়ার সুন্দরতম কষ্টের কথা বুঝে না অভিমান। তার বিরহের ক্ষণ ছিলো বৃষ্টির কালে। তখন স›ধ্যা পেরিয়ে কেবল রাতের শুরু। সে জানলার গরাদে হাত রেখে দেখছিলো বর্ষার পূরবী। আর আমি নিরন্তর পুড়ে যাচ্ছিলাম বৃষ্টির আগুনে-- একা একা, একা একা।
আমি, সে, সে আর সে গাঁজা টানছিলাম আয়েস করে। আমাকে এইসবে কাজ করে না। মদেও না। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি নিজেই মদ, নিজেই...
ওখানে পাঠ করলাম, আমার সদ্য লেখা পদ্যটা,
একজন হেঁটে চলে গেলে
অরণ্যের বুকে পড়ে থাকে শুধু প্রান্তর; আর কেউ থাকে না--
থাকে শুধু একজন: কোমল পাথর।
সে বললো, অরণ্যের বুকে প্রান্তর থাকে না।
প্রান্তর যে শূন্যতার রূপক-- তাকে তা আর বুঝাতে মন চাইলো না।
বললাম, ওকে বস্। প্রান্তর বাদ। হোক তবে পাতার মর্মর।
পথে অভিমানের সাথে দেখা। সে দাঁড়ালো-- আমার হাত থেকে পদ্যটা নিলো। নির্বিকার পড়ে গেলো। তারপর মুঠোর ভিতর আমার চোখদুটি নিয়ে ফুরিয়ে গেলো। ফুরিয়ে গেলো, ফুরিয়ে গেলো।
না, সে একবারও পেছন ফিরে তাকালো না।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা অক্টোবর, ২০১১ দুপুর ১২:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



