somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অন্তর্সত্তা

৩০ শে এপ্রিল, ২০১০ রাত ১০:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আঘাত দেয়ার মেকানিজম আমি ভালোভাবেই শিখেছি। ওই গল্পটা জানো তো, প্রাচীনকালে যুদ্ধক্ষেত্রে বীরযোদ্ধারা যখন শত্রুসেনার মস্তকছেদন করতেন তখন তাদের সুক্ষ্ম অথচ নিখুঁত তলোয়ারের আঘাতে শত্রুসেনার কর্তিত মস্তক ছিন্ন হবার পরও ধড়ের উপরই বিরাজ করত, ভূপাতিত হত না। আমার আঘাতগুলি অনেকটা সেই ধরনের। তুমি বুঝতেই পারবে না তোমার ধড় থেকে মাথাটা কখন আলাদা হয়ে গেছে। যখন বুঝবে তখন করতে পারবে না কিছুই, আমাকে দোষ দিতে পর্যন্ত না! আমার তলোয়ার খুব সুক্ষ্ম যে! ওটাতে আমি ধার দেই তোমার অবচেতনে, যখন তুমি তোমার কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত থাক তখন আমি একটু একটু করে রসদ যোগাড় করি, তলোয়ারে শাণ দেই। সেটা অবশ্য তোমার জানার কথা নয়, ভিড়ের মাঝে তোমাকে দর্শন দিতে আমার অনাগ্রহ ছিল বরাবরই, কারণ সেখানে তুমি সহজেই আমার চোখ ফাঁকি দিয়ে পালাতে পার। আমি তো রাতের অপেক্ষায় থাকি, যখন তুমি একাকী, নিরস্ত্র আর নির্জনে মুখোমুখি হবে আমার। অতঃপর তোমার শরীরে আঘাত হানব আমি, অথবা মাথায়- ওই জায়গাটাই সবচাইতে পছন্দ আমার। সব পাপানুভূতি ঐখানেই জমা করে রাখো কিনা!
তবে আজকাল খুব অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে, কোনো কোনো মানুষের মাথা পর্যন্ত পৌঁছতেই পারছিনা আমি। ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে বারবার। এমন কেন হচ্ছে বল তো! হতে পারে শত সহস্র বছরের নিয়মিত অনুশীলিত পাপে জন্মমূহূর্ত থেকেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে তোমাদের দেহ আর মন এমনকি হয়তবা আত্মাও। তাইতো বোধেরও এমন ভয়ঙ্কর অবনমন, তোমাদের কলুষিত আত্মা জনম জনম ধরে বন্দী হয়ে আছে বিকৃত লুসিফারের বিষাক্ত নীল হাতে! তাই বুঝি এমন হয়! কোথাও প্রবেশের পথ না পেয়ে নিরবে গুমরে কেঁদে উঠি আমি। এই সেদিনের কথাই ধরো - বিবাহিত তরুণীটি যখন আরো একটু বেশি ভোগের আশায়, আরো একটু বেশি পানের নেশায় তার নিষ্পাপ স্বামীটির ভালোবাসাভরা দুচোখের গভীর সমুদ্রকে অবলীলায় উপেক্ষা করে তার বন্ধুবরের সাথে মেতে উঠলো নিয়ত অর্থপূর্ণ ইশারা-খেলায় তখন আমি তীব্র কটাক্ষে বারবার ধবংস করতে চেয়েছি তার ওই সর্বনাশা নেশায় মত্ত দৃষ্টিকে! যুবকটি তো জানে না আজ রাত্রে যখন সে গভীর বিশ্বাসে তার প্রিয়তমা স্ত্রীর ললাটে চুম্বনরেখা এঁকে দিয়ে সারাদিনের কর্ম-ক্লান্তিতে গভীর শান্তির ঘুমে ঢোলে পড়বে তখন তার প্রিয়তমা হয়ে যাবে তার নয়, অন্য কারো বাহুলগ্না! আমি তরুণীটির হৃদয়ে কষাঘাত করতে চেয়েছি বহু বহুবার- পারিনি! যখন সে তার প্রণয়ীর কাঁধে মাথা রেখে বিস্রস্ত চুলে আলতো হাত বুলাচ্ছিল তখন নয়, যখন তারা দুজনে মিলে নিষ্পাপ যুবকটির জীবনরেখায় চিরসমাপ্তি টেনে দেবার পরিকল্পনা সম্পন্ন করেছিল তখনো নয়। এমনকি যখন তরুণীটি ওই ভালবাসাভরা চোখের সমস্ত বেদনাকে - যে চোখে দিবারাত্রির সকল মুহূর্ত অস্তিত্ব ছিল শুধু তার, প্রতীক্ষা ছিল তার, আকুলতা ছিল শুধু তারই জন্য - সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পটাশিয়াম সায়ানাইড মিশ্রিত চায়ের কাপটি এগিয়ে দেয় যুবকটির দিকে,তার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি গুমরে মরেছি তার অস্তিত্বে আঘাত হানার জন্য! কেন যেন পৌঁছানোর পথই হারিয়ে ফেলেছিলাম সেদিন! যুবকের বিষে নীল হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে তরুণীর আদিম উল্লাসনৃত্যের মাঝে সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এসেছিল পৃথিবীর বুকে। কিন্তু রাতের রং বদলায়নি একটুও, বদলায়নি পূর্নিমার চাঁদের চোখ ঝলসানো আলো - সেই রাত,সেই চাঁদ আজও ঠিক তেমনি আছে যেমন ছিল সেদিন!
কিংবা সেদিনের কথাই বা ভুলি কি করে আমি- সন্তান নয় কন্যা জন্ম দেবার অপরাধে যেদিন অবর্ণনীয় পাশবিক নির্যাতনের পর শ্বাসরোধ করে সামিনার যন্ত্রণাময় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছিল তারই প্রিয়তম স্বামী? দুটি কন্যা যার গর্ভে আগেই জন্ম নিয়েছে তার কি করে দুঃসাহস হয় তৃতীয় কন্যাটিকে জন্ম দেবার কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেনি হয়ত রহিম মিয়া- সামিনার স্বামী! ওগুলো যে সন্তান নয়, ওগুলো তো কন্যা- বিষাক্ত পরগাছা কীট! সর্বাবস্থায় ত্যাজ্য ও অগ্রহণযোগ্য! রহিম মিয়া এক মায়ের দুঃসাহসের মাজেজা বোঝেনি, যেমন আমি বুঝতে পারিনি পিতৃত্ব শব্দের কি অর্থ বহন করে এই মাটির পৃথিবী! আমি কেবল অবুঝের মত মাথা ঠুকরে ঠুকরে মরেছি তার পাষানতর হৃদয়ে কড়া নাড়বার ব্যর্থ চেষ্টায়! যখন তার আরো একটা নির্মম আঘাতে সামিনার শরীরের আরো এক টুকরো মাংসপিন্ড উঠে এলো - যখন আরো এক দলা রক্ত তার মাথা বেয়ে বেয়ে গড়িয়ে পড়ল মাটিতে - তখন আমি প্রাণান্তকর চেষ্টায়ও তার মস্তিষ্কে আঘাত হানতে পারিনি! অবশেষে যখন সামিনার শেষ নিঃশ্বাসটুকু রুদ্ধ হয়ে পৃথিবীর বুকে থেমে গেল তার হৃদস্পন্দনের শব্দ - তখন সবে ভোরের আলো ফুটেছে। তার অসহায় শিশুকন্যারা যখন আতঙ্কে বাকরুদ্ধ নির্বাক দৃষ্টিতে মায়ের নিথর মৃতদেহটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল তখন পৃথিবীর বাতাস কি তাদের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিয়েছিল? নাকি সদ্য ফোটা ভোরের আলো তাদের সেদিন অভয় দিতে পেরেছিল যে তাদেরও বরণ করতে হবে না তাদের স্নেহময়ী মায়ের মতই পরিণতি? আমি জানি না! তোমরা হয়ত জেনে থাকতে পার!
আমি চরমভাবে পরাজিত হয়েছি দশ বছর আগের সেই চৈত্রের দিনটিতেও। উদ্ভ্রান্ত,বিকারগ্রস্থ আদিবাসী যুবকটি যখন সর্পিল গতিতে একটু একটু করে ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছিল আত্মরক্ষার তাগিদে প্রাণান্ত দৌড়াতে দৌড়াতে অবশেষে ধুলোয় লুটিয়ে পড়া সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা যুবতী-মা'টির দিকে তখন আমি কী আপ্রাণ চেষ্টাই না করেছি তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করার! যখন সে তার শাণ দেয়া ধারালো ছোরার প্রথম আঘাতটি বসিয়েছিল অসহায় যুবতীটির পেটে - বিশ্বাস কর আমি তখনো একটানা আর্তচিত্কার করে গেছি আর কেবল গুমরে গুমরে মিনতি করেছি কিন্তু প্রবেশদ্বার খুঁজে পাইনি তবু। যখন সে অকল্পনীয় নৃশংসতায় যুবতী মায়ের পেট ছিঁড়েখুঁড়ে তার সাত মাস বয়সী অপরিণত ভ্রুণটিকে বের করে আনলো তখনো নয়। এমনকি যখন সে ওই মায়ের চোখের সামনেই তার সদ্য পৃথিবীর আলো দেখা অপরিণত শিশু সন্তানটিকে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে পুড়িয়ে ভষ্ম করলো তখনো নয়। তারপর যখন যুবতীটিকেও ছোরার শেষ আঘাতে পৃথিবীর অদ্ভুত মায়া থেকে চিরতরে দেয়া হলো নির্বাসন- তখন আমি অস্ত্র ফেলে দিয়ে নত মস্তকে পরাজয় স্বীকার করে নির্বাক দাঁড়িয়ে রইলাম। এই সবকিছুই ছিল কেবল দুই টুকরো জমি নিয়ে পারিবারিক শত্রুতার ফলাফল!কি অদ্ভুত দেখাচ্ছিল সেদিন দূরের ওই আকাশের রং,কি অদ্ভুত এই পৃথিবীর মাটি - সবকিছুই কেমন নিস্তব্ধ, নিরাসক্ত আর সুনসান! যেন কোনকিছুই ঘটেনি কখনো আকাশ আর মাটির মধ্যবর্তী এই স্থলে, ঘটবেনা কোনদিন। পরবর্তী দিন আবারও সূর্য উঠেছিল চিরাচরিত নিয়মেই, আঁধারে ঢেকে যায়নি পৃথিবীর এক ইঞ্চি চরাচরও। শান্ত নদী আগের মতই শান্ত স্থির স্রোতকল্লোলে বয়ে যাচ্ছিল আর আমি কেবল আকাশ বাতাস হাতড়ে উদ্ভ্রান্তের মত ঈশ্বরের অস্তিত্ব খুঁজে বেড়িয়েছি........কেবল খুঁজেছি আর খুঁজেছি আর খুঁজেছি...........কিন্তু তাকে পাইনি!
আজকাল আর আগের মত ধারালো হয়না আমার আঘাতগুলো কেন যেন! বড় অসহায় লাগে, বড় বিপন্ন লাগে নিজেকে যখন বারংবার তোমাদের হৃদয়্দ্বারে প্রবেশের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসি আমি! অতঃপর আর দশটা মৃত লাশের মতই তোমাদের বিকৃতির শিকার ওই মৃতদেহগুলির পাশে নির্বাক শুয়ে থাকি! আমারও যে মৃত্যু সেখানেই! শত শত বছর ধরে লুসিফারের দাসত্বে বন্দী যে তোমরা নিজেদের আত্মাকে বিকিয়ে দিয়েছ কিছু বিকৃতি ক্রয়ের বিনিময়ে- লুসিফারের কঠিন সীলমোহরে বদ্ধ সেই আত্মায় আমি এত সহজেই প্রবেশ করতে পারব এমনি কি অতলস্পর্শী ক্ষমতা আমার? না বোধহয়!
তাই হয়ত তোমাদের ডিফেন্স মেকানিজম খুব জোরালো হয়ে গেছে আজকাল। কিন্তু সেটা ঠিক কতটুকু সময়ের জন্য বল তো? কখনো না কখনো আমার কাছে ধরা তো দিতে হবে ঠিকই - জানোই তো তাইনা? অতএব পালিয়ে বেড়াও যতদিন পার - একদিন আমি তোমাদের বিকারগ্রস্থ মস্তকটা শরীর থেকে ছিন্ন করবই। তোমাদের চোখের সামনে মেলে ধরব তোমাদের অন্তর্সত্তার আয়না! তোমাদের সহস্র বছরের জমিয়ে রাখা পাপানুভূতির ঝকঝকে হিসেবনামা আর নিষ্ঠুরতার নির্মম পরিসংখ্যান!
সেদিন তোমাদের মানুষ হিসেবে পুনর্জন্ম হবে!
সেইদিন তোমরা মানুষ হবে!
আমি কেবল সেইদিনের অপেক্ষায় রইলাম!
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মে, ২০১০ রাত ৮:১৩
৩৭টি মন্তব্য ৩৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×