৮ম পর্ব - Click This Link
আওয়াজটা প্রথমে খুব সামান্য ছিল। কিন্তু সময়ের সাথে ধীরেধীরে বাড়তে লাগলো। আকাশ আওয়াজের উৎসটা বোঝার চেষ্টা করছিল। ধুপধুপ করে শব্দ হচ্ছে। সাথে যেন কারা চিৎকার করছে। অনেকটা আফ্রিকার জঙ্গলের মানুষখেকো উপজাতীদের মত। আকাশ সমস্ত ইন্দ্রীয় এক করে বোঝার চেষ্টা করছে এখনও। কিন্তু পারছে না। শব্দ হয়েই চলেছে।
হঠাৎ ধড়ফড় করে আকাশ উঠে বসলো। ততক্ষনে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে ওর কাছে। লাল হয়ে থাকা চোখ দুটো খোলার সাথে সাথেই মনে হলো সমস্ত শরীর ব্যাথায় জড়িয়ে আসছে। সারা রাত ঘুমায়নি, কিন্তু আকাশ জেগেও ছিল না। ইয়াবার এই এক অশ্চর্য ক্ষমতা। না ঘুম, না জাগা – একটা অন্যরকম জগৎ। আকাশের দরজায় এতক্ষন ধরে ওর মায়ের ধাক্কা দেয়ার শব্দই আকাশ নেশার জগতে অন্যরকম ভাবে শুনছিল। কোনক্রমে উঠে দরজাটা খুলে দিল। তখনও দাড়াতে পারছিল না। আকাশের মা নিজের ছেলেকে দেখেও যেন চিনতে পারছিলেন না। কর্ডলেস রিসিভারটা ছেলের হাতে দিয়েই চলে আসলেন রুম থেকে। ধীরেধীরে নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে ছেলেটা। তিনি মা হয়েও কিছু করতে পারছেন না। এখন তার একটাই মাত্র ভরসা। মনেমনে বিধাতার কাছে প্রর্থনা করলেন, এই শেষ ভরসাটাও যেন শেষ হয়ে না যায়।
ফোনটা ধরে আকাশ শুয়েশুয়েই কথা বলল, “হ্যালো…”
“তোর কি হয়েছে? মোবাইল কোথায়?” উদ্বিগ্ন ভাবে সজীব জানতে চাইলো।“আমি কম করে হলেও বিশবার ফোন দিয়েছি।”
আকাশের মনে পড়লো, কাল রাতে মোবাইল সাইলেন্ট করে রেখেছিল। সেটটা হাতে নিয়ে দেখলো সত্যিই সজীব একুশটা কল দিয়েছে। বলল, “কি হয়েছে সেটা বল, ইতিহাস শোনা লাগবে না তোর।”
“তোর ইতিহাস বলতেও হবে না। দুদিন পর তুই নিজেই ইতিহাস হতে যাচ্ছিস।” আকাশ হাসলো। সজীব ইদানিং কথা শিখেছে। গুছিয়ে কথা বলছে। প্রেমেট্রেমে পড়েছে নাকি?
সজীব তখনও বলে চলেছে, “হাস, বেশি করে হাস। পরে হাসারও আর সময় পাবি না। সকাল থেকে তিনবার র্যাবের লোকেরা আকাশ নামে একজনকে খোঁজ করে গিয়েছে। যে বর্ননা দিয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নাই এটা তুই।”
“হুমম।” যেন কিছুই হয়নি এমন ভাবে বললো আকাশ।
ওপাশ থেকে সজীব চিৎকার করে উঠলো, “তুই সব কিছুতে এতটা নির্লিপ্ত থাকিস কি করে? তোর কোন ধারনা আছে র্যাব সম্পর্কে? আজকে যাদের র্যাব খোঁজ করে, কাল তাদের হয় হার্ট এ্যাটাক হয়, না হলে দুই-তিনটা এ.কে. ৪৭ সহ ক্রসফায়ারের পর ডেড বডি উদ্ধার হয়।”
সজীবের কথা শুনে আকাশ হাসতে হাসতে বলল, “আমি এমন কিছু করিনি যে আমার পরিনতি তোর বর্ননার সাথে মিলবে। ওরা হয়তো অন্য কাউকে খুঁজছিল।”
“তাই যেন হয়।” কিন্তু সজীবের গলায় খটকাটা রয়েই গেল। “তবুও তুই একবার ক্যাম্পাসে আস। ব্যপারটা মীমাংসা করে যা।”
“ক্যাম্পাসে আসাতো দূরে থাক। আমার পক্ষে এখন বিছানা থেকে ওঠাও সম্ভব না।” আকাশ হাসছে এখনও।
হতাশ ভাবে সজীব বলল, “নেশা করতে পারিস, কিন্তু হ্যাংওভার কি করে কাটায় সেটা জানিস না? তুই আসলেই একটা…।”
“আমি কি?”
“বাদদে। উঠে এক গ্লাস পানিতে দুইটা এ্যাসপিরিন ছেড়ে খেয়ে ফেল। দশ মিনিটে হ্যাংওভার গায়েব হয়ে যাবে।”
পরিহাসের সুরে আকাস বলল, “তাই নাকি? তুইতো নেশা করিস না। তুই জানলি কি করে?”
বিরক্ত সজীব অন্যপ্রান্ত থেকে শেষ কথাটা বলেই ফোন রেখে দিল, “ত্রিশ মিনিটের মধ্যে ক্যাম্পাসে আস। আর এটাও জেনে রাখিস মৃত্ত্বু নিয়ে গল্প লিখতে হলে লেখককে একবার মরে আসতে হয় না।”
মোবাইলটা হাতে নিয়ে আকাশ মনে মনে ভাবছিল। সজীব কবে থেকে এত গুছিয়ে কথা বলা শিখলো? নির্ঘাৎ প্রেমে পড়েছে। সম্ভবত ওদের তিনতালার ঐ মেয়েটার। কি জানি নাম ছিল? কিছুতেই নামটা আকাশের মনে আসছে না। হঠাৎ মনে পড়লো মেয়েটা অনিন্দিতার বান্ধবী। তারপরই মেজাজটা আবার খারাপ হতে শুরু করলো। অনিন্দিতার কথা মনে হলেই এমনটা হয়। কিন্তু তারপরও কেন বারবার আকাশ অনিন্দিতার কথা মনে করে? এ প্রশ্নের উত্তর সম্ভবত পৃথিবীর কোন আকাশের কাছেই নেই!
হ্যাংওভার কাটানোর জন্য সজীবের দেয়া বুদ্ধিটা মন্দ ছিল না। দশ মিনিটের মধ্যে আকাশ বেশ ফ্রেশ অনুভব করলো। আকাশ মনেমনে ভাবলো যারা নেশা করে, তারা এই পদ্ধতি গ্রহন করে না কেন? সাথে সাথেই বুঝলো, আকাশকে এখনও নেশাটা পুরো গ্রাস করে নিতে পারেনি, তাই ওর উপর এ্যাসপিরিন কাজ করেছে। কিন্তু যারা পুরোপুরি আসক্ত, তাদের হ্যাংওভার কেবল ওভারে হ্যাং করলেই, অর্থাৎ মৃত্ত্বুতেই সম্ভব। সবই আকাশ বুঝে তবুও বের হয়ে আসতে পারে না। এ যেন জেনে শুনে মৃত্ত্বুকে গ্রহন করা।
একটা হট শাওয়ার নিয়ে আকাশ যখন বাসা থেকে বের হলো তখন সজীবের বেধে দেয়া ত্রিশ মিনিটের সীমাটা ঘন্টা পেরিয়ে গিয়েছে। ক্যাম্পাসে এসে আকাশ একটু অবাক হলো। সবাই কেমন করে যেন ওর দিকে তাকাচ্ছে। হঠাৎ করে নিজেকে কোরবানির ছাগল মনে হতে লাগলো। সবার চোখে যেন একটা সহানুভুতি। যেন একটু পরেই বেচারাকে জবাই করা হবে।
সজীব বটতলায় বসে ছিল। আকাশ গিয়ে পাশে বসলো।
“কি হয়েছে রে?”
“কোন র্যাব অফিসারের মেয়ের সাথে টাঙ্কিবাজী করেছিস এর মধ্যে?” সজীব সিরিয়াস ভাবে জিজ্ঞেস করলো।
“আরে কী আজব! টাংকি মারার সময় মেয়ের বাপের পরিচয় জেনে মারি নাকি?”
“এর পর থেকে দয়া করে সেটাই করিস। সম্ভবত র্যাবের মেয়ের সাথে কিছু করেছিস। তাই তোকে খুঁজছে।”
আকাশ চিন্তা করতে শুরু করলো। ওর সুদির্ঘ্য প্রেয়সী লিস্টে কেউ র্যাব কন্যা আছে কিনা। কিন্তু তেমনটাতো মনে পড়ছে না। তাছাড়া সেটা থাকলেতো মেয়েরা গলা ফাটিয়ে আগেই জানাতো।
আকাশকে বেশি চিন্তা করতে হলো না। তার আগেই আবার একটা র্যাবের গাড়ি দেখা গেল। সম্ভবত কোন সোর্স রেখে গিয়েছিল। আকাশের ক্যাম্পাস আগমনের খবর অফিস পর্যন্ত পৌছাতে সময় লাগেনি।
র্যাবের একটা বিশেষত্ব হচ্ছে তাদের প্রতিটা কথাই যেন আদেশ। গাড়ি থেকে একজন নেমে এসে আকাশকে যখন বলল আপনাকে আমাদের সাথে একটু যেতে হবে, তখন আকাশের মনে হলো এখানে কিছু বলা নিতান্তই শব্দের অপচয়। যেতে হবে বলা হয়েছে, অতএব ওকে যেতেই হবে। বিনা বাক্য ব্যয়ে আকাশ গাড়িতে উঠলো। ক্যাম্পাসের সবাই ওর দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে রইলো যেন এই ছেলেটাকে কসাইরা জবাই করতে নিয়ে যাচ্ছে। সাবার চোখের ভাষা পড়েই যেন প্রথমবারের মত আকাশের একটু ভয় ভয় লাগতে শুরু করলো। (চলবে)
২৮ জুন ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।
১০ম পর্ব - Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০০৮ রাত ২:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


