সপ্তম পর্ব - Click This Link
“কি খবর? কেমন আছেন?”
ফারজানা ম্যাসেঞ্জারে নক করেছে। আকাশের কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। অনিচ্ছা স্বত্বেও কথা বলল।
“এইতো ভালো। আপনি?”
“আমিও ভালো। এত রাতে কি করছেন? দেশেতো এখন তিনটার বেশি বাজে।”
“আমি নিশাচর প্রানী। রাতে জেগে থাকি, আর দিনে ঘুমাই।”
“আরে বাহ! ক্লাসটা কে করে দেয়? স্যার নিজেই?”
খোঁচাটা আকাশ সম্পূর্ন অগ্রাহ্য করলো। সুন্দরী মেয়েরা খোঁচা দিতেই পারে, এটা তাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে। যদিও ফারজানা নামক এই অদেখা নারী সুন্দরী কি না সেটা এখনও জানা যায়নি। সজীবকেও কোন দিন জিজ্ঞেস করা হয়নি। আসলে কেন যেন এই মেয়েটার প্রতি তেমন কোন আকর্ষন বোধ করছে না আকাশ। হয়তো সজীবের বলা সেই কথাটাই সত্য, “ফারজানাকেতো আর বেডে নেয়া যাবে না।”, মনে মনে ভাবছিল আকাশ।
হঠাৎ ভাবনায় ছেদ পড়লো। ফারজানা আবার লিখেছে, “কি হলো চুপ করে আছেন কেন?”
আকাশ লিখলো, “ভাবছি আমরা কয়েকদিন হয়ে গেল কথা বলছি, কিন্তু এখনও তুমিতে আসতে পারলাম না।”
“কেন? তুমিতে আসাটা কি খুব জরুরী?”
“তা না হলে কেমন যেন পর পর মনে হয়। বন্ধুত্বটা ঠিক জমে না।”
“তাই নাকি? আর যাদের তুমি করে বলেন, তাদের সবাইকেই কি খুব আপন মনে হয়?”
“মেয়েটার সমস্যাটা কি? প্রত্যেকটা কথায় খোঁচা দিচ্ছে।” মনেমনে ভাবলো আকাশ। তার পর লিখলো, “‘তুমি’ হচ্ছে বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসার প্রথম পদক্ষেপ।”
ফারজানা ভেংচিকেটে লিখলো, “আমাকে ভালোবাসতে কে বলেছে আপনাকে?”
আকাশও সাথে সাথে একহাত নিল, “আমার এত খারাপ দিন আসে নাই যে আপনাকে ভালোবাসতে হবে। আমি বন্ধু হবার প্রথম পদক্ষেপের কথা বলছিলাম।”
আকাশ এখন বেশ প্রফুল্যবোধ করছে। দুইদুইটা খোঁচা খাবার পর ইটের জবাবে একটা পাটকেল মারতে পেরেছে। তবে ফারজানাকেও বেশ চটপটে দেখা গেল। সাথে সাথেই লিখলো, “আপনার হৃদয়ে এত নারী আছে যে আপনি চাইলেও আমাকে ভালোবাসতে পারবেন না। জায়গা হবে না তো!”
“তাই নাকি? আমার খবর বেশ ভালই জানেন দেখছি? কে দিল এত তথ্য? সজীব?”
“কেন সজীব ছাড়া কি আর খবর জানার মানুষ নেই? মনে রাখবেন, পৃথিবীটা গোল। কখন যে কে কার পরিচিত বের হয়ে যায়, আপনি নিজেও বুঝে উঠতে পারবেন না।” এর পর রহস্য করে বললো, “হয়তো আপনার কোন এক গার্লফ্রেন্ড-এর বান্ধবী আমি।”
আকাশ একটু চিন্তায় পড়ে গেল। মেয়েটা কি মজা করছে, নাকি সিরিয়াস? এই মেয়েকে যতটা সোজা মনে হয়েছিল, আসলেতো সে ততটা সোজা নয়।
আকাশকে কিছু লিখতে না দেখে ফারজানা আবার লিখলো, “এই যে মি. নিশাচর। এত কি ভাবছেন? চিন্তা করেন না, আমি আপনার নীলা-লোলিতা-নিরুপমাদের বান্ধবী না।” তার পরপরই প্রসঙ্গ পাল্টে লিখলো, “আচ্ছা, এত মেয়ের সাথে যে প্রেম-প্রেম খেলা খেলেন, কি মজা পান আপনি? বোর লাগে না?”
আকাশ একটা হাসি দিয়ে লিখলো, “বোর কেন লাগবে? এই খেলা আমাকে এ্যানার্জি দেয়।”
“আরে ধুর। আমি সিরিয়াস। সত্যি করে বলেনতো, আপনার খারাপ লাগে না এমন করতে?”
হঠাৎ করে আকাশের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। লিখলো, “খারাপ লাগার কি আছে? আমি যা করছি, তারাও তাই করছে। সবাই তাই করে।”
“কিন্তু আপনি যা করছেন, সেটা যে ঠিক না, সেটা কখনও মনে হয়নি?”
“কেন ঠিক হবে না? আমি যা করছি এটাই ঠিক।অল দ্যা গার্লস আর বিচেস।” হঠাৎ করে যেন আকাশের ভেতরে নিভে থাকা আগুনটা দপ করে জ্বলে উঠলো। মনে মনে বলল, “আমাকে ভালো-খারাপ শেখাতে এসেছে! সব মেয়েই আসলে একেকটা…।” আকাশের মাথায় ‘ম’ অদ্যাক্ষরের একটা গালি ঘুরছিল তখন।
আকাশের কথায় ফারজানা হয়তো একটু হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তাই বেশ কিছু সময় চুপ করে রইলো। তার পর লিখলো, “একটা সত্য কথা বলবেন?”
“কি?”
“আপনার ভেতরে কি কোন তিব্র কষ্ট আছে?”
“সেটা জেনে আপনার কি দরকার?” কথাটা বলেই আকাশ বুঝলো বেশি রুঢ় হয়ে গেল ব্যবহারটা। কিন্তু মেয়েটাই বা কেন এ সব কথা তুলছে? আকাশের ভেতরের ঘৃনার সমুদ্রে যে সে ঝড় তুলে ফেলেছে এরই মধ্যে।
ফারজানা কিছু লিখছে না দেখে আকাশ আবার লিখলো, “আমি সরি। আসলে এ ব্যাপারগুলো আমাকে প্রতিমুহুর্তে যন্ত্রনা দেয়। এ সব বিষয় উঠলে আমার মাথা ঠিক থাকে না।”
ফারজানা মনে হয় ততক্ষনে আকাশকে একটু একটু করে বুঝতে পারছে। তাই লিখলো, “যন্ত্রনাগুলো ভেতরে রাখলে আপনি আরো কষ্ট পাবেন। আমার সাথে শেয়ার করুন। হালকা বোধ করবেন।”
“কি শেয়ার করবো? এখানে শেয়ার করার কিছু নাই।”
“অবস্যই আছে। বুকের ভেতরে আপনি যন্ত্রনার সমুদ্র নিয়ে বসে আছেন। আর বলছেন শেয়ার করার কিছু নাই?”
“আমি সত্যিই জানি না এসব কষ্ট কি করে শেয়ার করে।” হতাশ ভাবে আকাশ বলল।
“আমি আপনাকে সাহায্য করছি। আপনি শুরু করুন। যেখান থেকে ইচ্ছা, শুরু করুন।”
“আপনি প্রশ্ন করুন। আমি উত্তর দিচ্ছি।”
“আপনার ভালোবাসার মানুষের কথা বলুন। যাকে আপনি সত্যি সত্যি ভালোবেসে ছিলেন। আমি নিশ্চিৎ, এমন কেউ না কেউ আপনার জীবনে অবস্যই ছিল।”
আকাশ প্রথমে একটু চুপ করে ছিল। তার পর যেন নিজের অজান্তেই লিখে ফেললো নামটা। “অনিন্দিতা। আদর করে আমি ডাকতাম – অনি।” বুকের ভেতরের জমে থাকা কষ্টগুলো হঠাৎ যেন একটু হালকা হয়ে এলো। গত দুবছর যে নামটাকে আকাশ জোর করে ঘৃনা করার চেষ্টা করছে, আজ কেন সেই নামটাই ওর কষ্টগুলোকে হালকা করে দিচ্ছে? আকাশ সর্বশক্তি দিয়ে আবারও ঘৃনা করতে চাইলো, কিন্তু আর পারলো না। তার পর আবার লিখলো, “আমাদের পরিচয় স্কুল থেকে। বন্ধুরা বলতো আমাদের মত জুটি নাকি আর হয় না। অদ্ভুত এক আবেগে অনি জড়িয়ে রাখতো সব সময় আমাকে। আমাদের ভালোবাসা ছিল নিঃশ্বাসের মত। একজন আরেকজনকে একমুহুর্ত না ভাবলে যেন বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে যেত। যখন অনির কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকতাম, তখন মনে হতো এই পৃথিবীর সবকিছু যদি কেউ আমার থেকে নিয়েও নেয়, তুবও আমি সবচেয়ে সুখি মানুষ হয়ে থাকতে পারবো। এক জীবনে একটা মানুষ এত ভালোবাসা দিতে পারে, অনিকে না দেখলে কোন দিন বিশ্বাস করতে পারতাম না।”
আকাশ একটু থামলো। ফারজানা লিখলো, “তার পর?”
“তার পর? সব কিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। কিভাবে যেন আমাদের ভালোবাসায় নজর লেগে গেল। কলেজে ওঠার পর অনি বদলে যেতে শুরু করলো। একটু একটু করে দূরত্ব বাড়তে লাগলো। জিজ্ঞেস করলে বলতো পড়ালেখার ব্যস্ততার জন্য এমন হচ্ছে। কিন্তু মাঝে মাঝে আমার কানে আসতো, অনি আমাকে না জানিয়ে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাচ্ছে। যদিও মেয়ে বন্ধুই থাকতো বেশি, তবে তাদের মধ্যে দু’একজন ছেলে বন্ধুও ছিল। প্রথম প্রথম আমি স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলাম ব্যাপারগুলোকে। কিন্তু একটা সময় রায়হান নামে একটা ছেলের সাথে ওর ঘনিষ্ঠতা বাড়তে শুরু করে। জিজ্ঞেস করলে বলতো ভালো বন্ধু। কিন্তু এই তথাকথিত ভালো বন্ধুর সাথে অনেক জায়গায় অনিকে একা ঘুরতে দেখা যেতো। এক সময় আমার থেকে রায়হানের প্রতিই বেশি আগ্রহী হয়ে উঠলো অনি। আমাকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলতে শুরু করলো তখন। সময় কেটে যেতে লাগলো।…”
“তার পর…?” যেন সম্মোহিতের মত প্রশ্ন করলো ফারজানা।
“তার পর এক সময় সেই নির্মম সত্যগুলো বের হয়ে আসতে শুরু করলো। প্রকাশ হতে শুরু করলো রায়হানের সাথে অনির বিভিন্ন স্ক্যান্ডাল। রায়হানও যে অনিকে ভালোবেসে ছিল তা কিন্তু নয়। রায়হানও অনির সাথে প্রেম-প্রেম খেলাই খেলেছিল। রায়হান গোপন ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও করে রেখেছিল অনির সাথে ওর বিভিন্ন অভিসারের চিত্র। এই নিয়ে অনেক ঝামেলা শুরু হলো। থানা-পুলিশ পর্যন্ত হয়েছিল। রায়হানের পরিবারের সাথে অনির পরিবার মিটিং করলো। শেষ পর্যন্ত সবগুলো ভিডিও টেপ বাজেয়াপ্ত করার মধ্য দিয়ে রায়হানের সাথে মীমাংসা করলো অনির পরিবার।”
আকাশ একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলো, “কিন্তু ততদিনে হারিয়ে গিয়েছে আমার অনি। অনি তখন কেবলই অনিন্দিতা। এর পর অনি আর কলেজে যেতো না। এমন কি কারো সাথে কথাও বলতো না। আমি চেষ্টা করেছিলাম দেখা করার, কথা বলার। কিন্তু কোন ভাবেই আর অনি রাজী হয়নি আমার সাথে কথা বলতে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে দেশের সব কিছু বিক্রি করে ওরা অস্ট্রেলিয়া চলে যায়।”
আকাশ থামলো। ফারজানাও চুপ। যেন দুজনেই কথা হারিয়ে ফেলেছে। বেশ কিছু সময় চুপ থাকার পর ফারজানা আবার জিজ্ঞেস করলো, “তার পর আপনি আর অনিন্দিতার খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেননি?”
“নাহ। আমি আর যোগাযোগের কোন চেষ্টা করিনি। যে আমার সাথে এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা করলো, তাকে আমি কেবল দূর থেকে ঘৃনাই করতে পেরেছি। এর পর আমি যখনই কোন মেয়েকে দেখেছি, আমি তার মাঝে অনিন্দিতাকে দেখেছি। আমি যখনই কোন মেয়ের শরীরকে দেখেছি, আমি রায়হানের হাতে অনিন্দিতার নগ্ন শরীরকে কল্পনা করেছি। যখনই আমি কোন মেয়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি, আমি অনুভব করেছি, আমি যেন অনিন্দিতার উপর একটু হলেও প্রতিশোধ নিতে পেরেছি।”
আকাশ আর লিখতে পারছিল না। ওর হাত কাঁপতে শুরু করেছে। বুকের মাঝে উন্মাতাল ঝড় উঠেছে তখন। অনেক অস্থির লাগছিল। বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল টেবিলে রাখা প্যাকেটটার দিকে। আজকে দুপুরেই ফরিদের কাছ থেকে কেনা ইয়াবার ট্যাবলেটগুলো তখন ওকে আকর্ষন করছে তিব্র ভাবে। ওর রক্ত প্রবাহে বইতে শুরু করেছে একটা হাহাকার। নেশার হাহাকার।
ফারজানা আবার লিখলো, “কি হলো? কোথায় গেলেন?...হ্যালো… আছেন?” কিন্তু আকাশের দিক থেকে সে রাতে আর কোন জবাব পেলো না সে। অস্থির আকাশ তখন নেশার হাতে জিম্মী। প্রতিটা ইয়াবার ট্যাবলেট যেন আকাশের মাঝ থেকে একটু একটু করে মুছে দিচ্ছিল অনিন্দিতাকে। ধীরেধীরে এক আলো-আধারীর জগতে চলে গেল আকাশ। যেন এটাই একমাত্র জগৎ যেটা আকাশকে একমুঠো শান্তি দিতে পারে, একান্ত আরাধ্য শান্তি।
২৫ জুন ২০০৮
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।
৯ম পর্ব - Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০০৮ রাত ২:৫৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


