প্রথম পর্ব - Click This Link
দ্বিতীয় পর্ব - Click This Link
তৃতীয় পর্ব - Click This Link
চতুর্থ পর্ব - Click This Link
পঞ্চম পর্ব - Click This Link
ষষ্ঠ পর্ব - Click This Link
“এ আমি কি দেখছি!” পরিহাসের সুরে সজীব বলল। “লাভ-গুরু আকাশ আজ দিনে দুপুরে ক্যাম্পাসে? লাল গালিচা বিছিয়ে দিব?”
আকাশ বিরক্ত হয়ে হাতের ইশারায় সজীবকে থামালো। ওর ঘুম থেকে উঠতে উঠতে আজ দুপুর হয়ে গিয়েছে। যদিও এটা নুতন কিছু নয়। মাঝে মাঝেই এমনটা হয়। সকালের ক্লাসটা মিস হয়েছে। তিনটার সময় আরেকটা ক্লাস আছে। তাই ভাবলো যাই, করে আসি।
আকাশদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গলিতে একটা বটতলা আছে যেখানে বেশ কিছু ঘুন্টি চায়ের দোকান রয়েছে। মহাখালী এবং আসেপাশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কাছে এই জায়গাটা বেশ প্রিয়। মাঝেমাঝে এখানে জড়ো হয়ে আড্ডা দেয় তারা। একটা দোকানে বসতে বসতে সজীব বলল, “মামা, দুইটা চাফি পাঠাও”। চা এবং কফির সমন্বয়ে তৈরী এই চাফি। তার পর আকাশের দিকে ফিরে বলল, “সত্যি করে বলতো, কি মনে করে আজ তুই ক্লাসে আসলি? আমিতো ভেবে ছিলাম আজও আসবি না।”
“কেন আমি কি ক্লাস করি না?”
“করিস, তবে এই গৌন কাজটা তুই সাধারনত কোন মূখ্য কাজের সাথে করিস। তাই ভাবছি তোর মূখ্য কাজটা কি? মেয়ে বিষয়ক কিছু নাকি? এবারের ফ্রেশারদের মধ্যে বেশ কিছু ‘হটি’ আছে।”
“তোর কি ধারনা আমি সব সময় মেয়ে নিয়েই চিন্তা করি?” একটু বিরক্ত হয়ে আকাশ বলল।
“বাহ! তোর এত উন্নতি হয়েছেতো জানতাম না। এখন ছেলেদের নিয়েও চিন্তা করিস নাকি?” সজীব খোঁচাটা দিয়েই হাসতে লাগলো।
আকাশ বলল, “সমস্যাটা কি তোর? ইদানিং তুই বেশি স্মার্ট সাজার চেষ্টা করছিস। গত কিছুদিন ধরেই আমি এটা লক্ষ্য করছি। ঝেড়ে কাশতো এবার।”
সজীব আরো জোরে হেসে বলল, “না রে ভাই। তুই হলি লাভ-গুরু আকাশ। তোর থেকে বেশি স্মার্ট হবার সাধ্য আমার নাই।” তার পর প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, “শুনেছিস, অনিন্দিতার বাবা মারা গিয়েছেন?”
“হুম। মার কাছ থেকে শুনলাম কাল।”
“বেচারীর জন্য খারাপ লাগছে।”
“খারাপ লাগার কি আছে? ভালই হয়েছে।”
“আর ইউ আউট অফ ইওর মাইন্ড? একটা মেয়েকে যতই ঘৃনা কর, তার বাবা মারা গিয়েছে, এটা নিয়ে এরকম একটা কথা কি করে বললি?”
আকাশ দেখলো কথাটা এভাবে বলা ঠিক হয়নি। তাই তাড়াতাড়ি বলল, “আচ্ছা বাদদে না প্লিজ। স্বীকার করছি এভাবে বলা ঠিক হয়নি। আসলে এক জীবনে আমি এত ঘৃনা আর কাউকে করতে পারি না।” তার পর একটু থেমে বলল, “তুই কোথা থেকে শুনলি?”
“আমাদের এ্যাপার্টমেন্টের তিনতালার নাফিসা অনিন্দিতার বান্ধবী। নাফিসার কাছ থেকে শুনলাম।”
“কোন নাফিসা? ঐ যে সেক্সি করে মেয়েটা?”
“সব মেয়েকেই তোর সেক্সি লাগে, তাই না? একটা মেয়ে যে কারো বোন হতে পারে, কিম্বা কারো ভালোবাসার মানুষ, এমনকি তোর নিজেরও, সেটা মাথায় আসে না কেন?” সজীব বিরক্তভাবে বললো।
আকাশ খোঁচা দিয়ে বলল, “ব্যাপার কি রে? এত গায়ে লাগছে কেন? নাফিসার সাথে তোর চক্কর চলছে নাকি? এরকম কিছু হলে আমাকে আগেই বলে রাখিস। বন্ধুদের গার্লফ্রেন্ডের দিকে হাত দেয়ার মত খারাপ সময় এখনও আকাশের আসেনি।” কথাটা বলেই আকাশ হাসতে লাগলো।
চাফির মাগদুটো দোকানের ছেলেটার হাতে দিতে দিতে সজীব বলল, “এতটুকু জেনে রাখিস, অন্তত বিয়ের আগে আমার বৌ-এর সাথে তোর কোনদিন পরিচয় করিয়ে দেব না।”
কথাটা আকাশ গায়ে মাখলো না এতটুকু। আসলে তখন সে ব্যস্ত অন্য বিষয়ে। গলির মুখে ফরিদকে দেখা যাচ্ছে। ফরিদ হলো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইয়াবা সাপ্লাই দেয়ার মূখ্য ব্যাক্তি। আগে ইয়াবা সম্রাট জুয়েলের নিকেতনের বাসা থেকেই সবাই ইয়াবা নিয়ে আসতে পারতো। এমনকি প্রথম দিকেতো জুয়েল পার্টি থ্রো করে ফ্রি ইয়াবা দিত। পরে টাকা নেয়া শুরু করে। একটা সময়ে ব্যাপারটা জানাজানি হতে শুরু করলে জুয়েল বিভিন্ন এ্যাজেন্টের মাধ্যমে ইয়াবা সাপ্লাই করা শুরু করে। বলাইবাহুল্য ফরিদ সে সব এ্যাজেন্টদের মধ্যে অন্যতম।
আকাশ উঠে গিয়ে ফরিদকে ডাক দিল। ফরিদ বিগলিত একটা হাসি দিয়ে বলল, “কি খবর আকাশ ভাই?”
“খবরতো সব তোমার কাছে। মাল কোথায়?”
“মালের কথা আর বইলেন না। RAB-এর কারনে মাল সাপ্লাইয়ে বহুত সমস্যা হইতাসে।”
“কেন RAB মালপানি নেয় না?”
“আসলে তাগো বুঝা মুশকিল। কার এত বুকের পাডা আছে তাগো লগে মালপানি নিয়া ক্যাচাল করতে যাইবো? কোন সময় ক্রসফায়ারে ফুট্টুস কইরা দিব।”
“ধুর, সব বাজে কথা। কাপড়ের রং খাকি থেকে কালো হলেই মানুষ পরিষ্কার হয় না।”
“চেষ্টা চলতাসে। জুয়েল ভাইতো এখনও লাপাত্তা। আমরাই দেখা পাই না। তয় ব্যবস্থা হইবো একটা না একটা।”
আকাশ দেখলো আসলেই অবস্থা বেশ খারাপ। সরকার ইয়াবার বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান নিয়েছে। যেন পলিথিলিন মুক্ত বাংলাদেশের মত এখন ইয়াবা মুক্ত বাংলাদেশ গড়বে। কিন্তু ওদের কি হবে? ইয়াবা যে ওদের অনেক কষ্টের বন্ধু। যখন প্রচন্ড হতাশ লাগে আকাশের, তখন ইয়াবাই যেন শেষ আশ্রয়। ইয়াবার আরেকটা বিশেষত্ব হচ্ছে, এটা অন্য ড্রাগের মত ঘুম পাড়িয়ে দেয় না বরং এটা জাগিয়ে রাখে। আকাশ ওর পরিচিত কিছু ছেলেমেয়েকে দেখেছে, ইয়াবা খেয়ে দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে জেগে আছে। চোখের নিচে কালি পড়ে গিয়েছে, চেহারা ভেঙ্গে গিয়েছে। তবুও তারা নিচ্ছে তো নিচ্ছে। যদিও আকাশ এতটা এ্যাডিকটেড না, তবে যখন পুরানো কষ্টগুলো জেগে উঠে বুকের মাঝে তখন ইয়াবা ওকে অনেক শান্তি দেয়।
আকাশ ফরিদকে বলল, “আমি অত কথা বুঝি না। আমাকে মাল দিতে হবে, এবং এখনই।”
“কিছু মাল আছে। তয়, ডবল দাম দিতে হইবো। বোঝেনইতো অবস্থা।”
আকাশ বিরক্ত হয়ে বলল, “আমার সাথে ধান্দাবাজি কর, তাই না? অবস্থার ফায়দা তুলছো?”
ফরিদ যেন খুব লজ্জা পেয়েছে এমন ভাবে বলল, “কি যে কন আকাশ ভাই। তয় কিছু করনের নাই।”
আকাশ বুঝলো এভাবে কাজ হবে না। তাই স্বর নরম করে বলল, “দেখো ফরিদ, আমিতো মাঝে মধ্যে মজা করে খাই। আমার থেকে ডাবল দাম নিয়ে কয় টাকা আর লাভ করতে পারবা? তোমাদেরতো রেগুলার কাস্টোমার আছে। ওরা না কিনে থাকতে পারবে না। আসল ব্যবসাতো ওদের থেকেই করতে পারো।”
ফরিদ কি যেন ভাবলো। তার পর বলল, “আইচ্ছা ঠিক আছে। আগের দামেই দিচ্ছি আপনারে।” তার পর একটা কাগজের প্যাকেট বের করে আকাশের হাতে দিয়ে দিল। আকাশও একটা পাঁচশ টাকার নোট ফরিদের পকেটে গুঁজে দিল।
বিদায় নেয়ার আগ মুহুর্তে ফরিদ আকাশকে বলল, “আকাশ ভাই, আপনারে ভালো পাই, তাই একটা কথা কই। আমাদের যারা রেগুলার কাস্টোমার আছে, তারা কিন্তু শুরুতে আপনার মত মজা কইরা খাইতো। তার পর এক সময় এমন হইছে যে আর না খাইয়া থাকতে পারে না। যদিও এইডা আমার ব্যবসা, তবুও আপনারে কমু, যদি পারেন ছাইড়া দিয়েন। জিনিসটা একদমই ভালো না।”
আকাশ কিছু বললো না। কিছুক্ষন ফরিদের দিকে তাকিয়ে থেকে চুপচাপ হেটে চলে আসলো বন্ধুদের মাঝে। কিন্তু এখানেও সেই একই আলোচনা, ইয়াবা। এক ছেলে নেতাদের মত ইয়াবা বিষয়ে মিডিয়ার বিভ্রান্তিকর প্রচারনা নিয়ে কথা বলছিল। কিছুদিন আগে দেশের কিছু দৈনিক পত্রিকা ‘ইয়াবা সুন্দরী ইয়ানা’ নামে একটা রিপোর্ট করেছিল। এই মেয়ে আকাশদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রী। আসৎ সঙ্গে পড়ে সে কিছুদিন ইয়াবা নিয়েছিল বটে, তবে এক সময় সে তার ভুল বুঝতে পেরে সরে আসে এ পথ থেকে। এখন সে সমাজের একজন সম্মানিত ব্যাক্তির স্ত্রী। অথচ তাকে নিয়ে যেভাবে উল্টাপাল্টা কথা ছড়ানো হচ্ছে, এটা তার পারিবারিক এবং সামাজিক শান্তি নষ্টের জন্য যথেষ্ট। শুধু এই মেয়েই নয়, অন্য যাদের নিয়ে হুটহাট মন্তব্য করে বসছে মিডিয়া, কতটুকু গভীরের খবর তারা জানে সেটা রীতিমত সন্দেহজনক।
ইয়াবা বিষয়ক বক্তব্য আকাশের আর একদমই ভালো লাগছিল না। তাই উঠে ক্লাসের দিকে হাটা দিল।
আকাশ চলে যাবার পর সজীব এবং আরো কিছু ছেলে ফরিদকে ঘিরে ধরেছিল। তারপর কাটাকাটা শব্দে জানিয়ে দিয়েছিল যদি তাকে আর একবারও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের আসেপাশে দেখা যায়, তাহলে তার বিশেষ অঙ্গের নিচে একটা ছোট অপারেশন করে দুটো রসুন ভরে দেয়া হবে। বলাইবাহুল্য, এর পর ফরিদকে স্বশরীরে অন্তত সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আর কখনও দেখা যায় নাই। (চলবে)
২২ জুন ২০০৬
ডাবলিন, আয়ারল্যান্ড।
অষ্টম পর্ব - Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুন, ২০০৮ ভোর ৬:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


