প্রথম পর্ব - Click This Link
দ্বিতীয় পর্ব - Click This Link
তৃতীয় পর্ব - Click This Link
আকাশ বসে বসে দেখছিল চারপাশের মানুষগুলোকে। রিজেন্সির একটা বিশেষত্ব হলো এখানে যারা আসে কেউ কারো দিকে নজর দেয় না খুব একটা, অথবা ভাব দেখায় দিচ্ছে না। যে যে যার যার মত নাচছে, কেউ কেউ বয়ফ্রেন্ডের কোলে বসে দুষ্টামী করছে, কেউবা আরো একটু বেশি! কিন্তু সবাই সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত। আকাশকে বসিয়ে রেখে শ্রাবনী গিয়েছে ওর এক বান্ধবীর সাথে কথা বলতে। সেই সামান্য সুযোগেরও সদ্বব্যবহারে ব্যস্ত আকাশ।
“একটা মেয়েও কি সিঙ্গেল নাই নাকি?” মনে মনে ভাবলো সে। “কি আজব দুনিয়া। দেশে এত ছেলে কোথা থেকে আসলো?” নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো। তার পর ভাবলো সে নিজেইতো এখন আটটা মেয়ের সাথে চালিয়ে যাচ্ছে এই খেলা। আগে ডাবল-টাইমিং বলে একটা শব্দ ছিল। এখন এ শব্দ আকাশদের দেখে লজ্জা পায়। মোবাইলের যুগে আটটা প্রেম করা খুবই সম্ভব। এখন এক্সপোনেনশিয়াল-টাইমিং এর সময়। স্কয়ার-টাইমিং, কিউবিক-স্কয়ার-টাইমিং ইত্যাদির।
হঠাৎ আকাশের চোখ পড়লো ডান দিকের ছেলেটার দিকে। ছেলে না বলে ‘লোক’ বলাই ভালো। বয়স ত্রিশের উপরে হবে। দেখে মনে হয় ডিফেন্সের অফিসার। অন্তত চুলের ধরন তাই বলে। এই লোককে বিশেষ ভাবে দেখার পেছেনে একটা কারন আছে। একে আকাশ গতকাল মনিকাদের বাসায়ও দেখেছিল। এক ঝলক দেখা, অতঃপর দুজনের চোখাচোখী। কিন্তু তাতেই আকাশ বুঝে নিয়েছিল এই লোক অন্য ধাতুতে গড়া। আকাশকে একা বসে থাকতে দেখে লোকটা বারবার তাকাচ্ছে। হয়তো বোঝার চেষ্টা করেছে কে এসেছে আকাশের সাথে। আকাশ উঠে হলরুমের অন্য প্রান্তে চলে আসলো। লোকটার হাবভাব আকাশের সুবিধার লাগছে না। পরে মনিকাকে গিয়ে বলে দিলে আরেক ঝামেলা।
শ্রাবনীকে খোঁজার চেষ্টা করলো আকাশ। দেখলো পাশের করিডোরে দাড়িয়ে ওর বান্ধবীর সাথে গল্প করছে। আকাশকে বের হয়ে আসতে দেখে শ্রাবনী বলল, “কী, আর অপেক্ষা সয় না।” আকাশ হাসলো। কিছু বললো না। শ্রাবনী আকাশকে পরিচয় করিয়ে দিল রিয়া, অর্থাৎ ওর বান্ধবীর সাথে। কথা সবে শুরু হতে যাচ্ছিল, তখনই রিয়ার মোবাইলে মিস কল আসলো। বোঝা গেল বয়ফ্রেন্ড মিস কল দিচ্ছে। রিয়া ওদেরকে সরি বলে চলে গেল।
আকাশ শ্রাবনীকে জড়িয়ে ধরে বলল, “বান্ধবীকে পেয়ে আমাকে ভুলে গিয়েছ, তাই না?”
শ্রাবনী ওর শরীরের ভার আকাশের উপর ছেড়ে দিয়ে বলল, “তাই মনে হয়? আজ এমন মজা বোঝাবো তোমাকে, সারা জীবন মনে থাকবে।” শ্রাবনীর দুচোখে দুষ্টামী। তার পরপরই বলল, “আমি টাকিলা খাবো।”
আকাশ হাসতে শুরু করলো। বলল, “টাকিলা তোমাদের জন্য না। আমি বিয়ার নিয়ে আসছি।”
“নাহ। আমি টাকিলাই খাবো। আমাকে রিয়া বলেছে দশটা শট যদি মারতে পারি, তাহলে নাকি পৃথিবীটা অন্য রকম লাগে।” শ্রাবনী হাসছে। হাসিতে খানিকটা মাতাল ভাব চলে এসেছে।
“টাকিলার নামেও কি নেশা হয় নাকি?” মনে মনে ভাবলো আকাশ। তার পর বারের দিকে দেখিয়ে বলল, “ঐ যে ছোট ছোট গ্লাসগুলো দেখছো, ওটার এক শট মারলে তুমি তোমার পায়ে দাড়াতে পারবে না। তখন বাসায় কে নিয়ে যাবে?”
“আমি জানি না। আমি খাব, খাব, খাব।”
“আরে কি বিপদ।” আকাশ এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “ঠিক আছে, তবে এক শট।”
শ্রাবনী বাচ্চাদের মত হেসে বলল, “আচ্ছা, এক শট।”
“প্রমিস?”
“প্রমিস।”
বার টেন্ডারকে টাকিলা অর্ডার করে আকাশ যখন ঘুরেছে শ্রাবনীর দিকে, তখন দেখলো সেই লোকটা হলরুম থেকে বের হয়ে এদিকে আসছে। আকাশকে দেখেনি তখনও। পথে একটা লোকের সাথে কথা বলছে। সম্ভবত এখানেই আসবে।
এর মাঝে আকাশদের টাকিলা চলে আসলো। শ্রাবনী সেটা নিয়ে ঢং করেতে শুরু করলো। আকাশের সেদিকে লক্ষ্য নাই। লোকটা আবার এদিকে আসতে শুরু করেছে। এবার আকাশকে দেখেছে। কি করবে দ্রুত চিন্তা করলো আকাশ। তার পর বারটেন্ডারকে বললো আরো আটটা টাকিলা দিতে। শ্রাবনী অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকালো। আকাশ চোখেমুখে দুষ্টামী এনে বলল, “দেখি তোমার তেজ কত।” শ্রাবনীও হাসছে, বেশ মজা পেয়েছে সে। তবে ঘুনাক্ষরেও বোঝেনি হঠাৎ করে আকাশের এই পরিবর্তন কেন।
লোকটা যখন বারটেন্ডারকে ড্রিংস্ অর্ডার করছে আকাশ তখন শ্রাবনীর হাতে একটার পর একটা টাকিলার গ্লাস ধরিয়ে দিচ্ছে। দশ মিনিটের মধ্যে শ্রাবনী নিজের পায়ে দাড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেললো। আকাশ আঁড় চোখে দেখলো লোকটা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। আকাশ শ্রাবনীকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় একটু জোরেই বলতে লাগলো, “তোমার বয়ফ্রেন্ড অথবা আমার গার্লফ্রেন্ড যদি আমাদের এভাবে দেখে, কোন দিনও বিশ্বাস করবে না আমরা শুধুই কাজিন, তোমার জোরাজুরিতে পার্টিতে আসা। ভাববে আমাদের মাঝে চক্কর আছে।” বলাইবাহুল্য আকাশের একটা কথাও শ্রাবনীর কানে যাচ্ছে না তখন। শ্রাবনী হাসছে। উন্মাতাল হাসি।
লোকটার চেহারায় একটা হতাশা লক্ষ্য করলো আকাশ। যেন সে অন্য কিছু আশা করেছিল। ড্রিংস শেষ করে লোকটা যখন চলে যায় তখন আকাশ শ্রাবনীর মোবাইলটা বের করে প্লে-লিস্টটা দেখে। যা আশা করেছিল, ঠিক তাই। রিয়ার নাম্বারটা সেইভ করা হয়েছে। রিয়াকে একটা ফোন দিল আকাশ। রিয়া তখনও পাশেই ছিল। আকাশ দ্রুত রিয়াকে বারে আসতে বলল।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই রিয়া বারে আসলো। শ্রাবনীর অবস্থা দেখে রিয়া হা হয়ে গেল। বলল, “কি হয়েছে ওর?”
“কে নাকি ওকে বলেছে দশ শট টাকিলা মারলে পৃথিবী অন্য রকম লাগে। আমি অনেক মানা করলাম। শুনলো না। তোমার বান্ধবী। জিদতো তুমি জানই।”
আকাশ ঘুনাক্ষরেও এটা রিয়াকে বুঝতে দিল না যে সে জানে দশ শট টাকিলার কথাটা রিয়ার থেকেই শুনেছিল শ্রাবনী। রিয়াও কিছু বললো না। তবে ওষুধে কাজ হয়েছে বোঝা গেল। রিয়ার মধ্যে অনুশোচনা হচ্ছে এখন। সে পানির ছিটা দিয়ে শ্রাবনীকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। আকাশ রিয়ার হাতে শ্রাবনীকে ছেড়ে দিয়ে করিডোরে বের হয়ে এলো। তার পর একটা সিগারেট ধরিয়ে এয়ারপোর্ট রোডের দিকে তাকিয়ে রইলো। গাড়ির লাল-সাদা আলোয় শহরটা রঙিন হয়ে আছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে তখন নয়টার বেশি বাজে। রিয়ার সাহায্যে শ্রাবনীকে বাসায় পৌছে দিয়ে আকাশের বাসায় যেতে যেতে হয়তো আরো দুই-আড়াই ঘন্টা।
“আজও অনেক রাত হয়ে যাবে ফিরতে ফিরতে।” ক্লান্ত এবং অবসন্ন আকাশ হতাশ ভাবে আধ খাওয়া সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে মনে মনে ভাবলো।
২০ জুন ২০০৮
ডাবিলন, আয়ারল্যান্ড।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



