
‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।
এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক
‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু সাদৃশ্য ও বৈপরীত্য
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দেখা ঘটনাবলী প্রকাশ করার সময় আমাদের কথায় এবং লেখায় আমরা প্রায়ই দু’টি বিপরীতার্থক শব্দ একত্রে ব্যবহার করে থাকি; যেমনঃ রাত-দিন, সাদা-কালো, আঁধার-আলো, ইত্যাদি। আজ সকালে কিছু রুটিন পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সম্মুখের প্রবেশ পথে না থেমে পেছনের ‘মরচুয়ারী গেইট’ দিয়ে প্রবেশ করার সময় ‘মরচুয়ারী’ লেখাটার পেছনের দৃশ্যাবলী দেখে তা আমার কাছে ‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে বৈপরীত্যের বদলে সাদৃশ্যময় মনে হলো। অর্থাৎ দুটোই নীরব, শান্ত, কোলাহলহীন। একটি ‘মরচুয়ারী’ বা শবাগার সাধারণতঃ একটি নীরব এলাকাই হয়ে থাকে। কেননা এখানে যারা শায়িত থাকেন, তাদের কণ্ঠ নীরব এবং দেহ নিথর থাকে। কেউ এখানে থাকেন মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য, অন্যের দ্বারা শেষ গোসল সম্পন্ন হবার পর তারা বাহিত হন তাদের এ ইহজগতের শেষ গন্তব্যস্থলে, শায়িত হন ক্ববরে। কেউ কেউ তাদের নিকটাত্মীয়দের অনুরোধে হিমঘরে হয়তো কয়েকদিনের জন্য থাকেন, প্রবাস থেকে কোন প্রিয়জনের আগমনের অপেক্ষায়। ‘মরচুয়ারী’ কে বাংলায় ‘শবাগার’ বলে। এর চেয়ে সুন্দর কোন শব্দ থাকলেও থাকতে পারে, তবে এ মুহূর্তে তা আমার মনে পড়ছে না। ইংরেজিতে ‘মরচুয়ারী’ ছাড়াও এর একটি আলংকারিক নাম আছেঃ ‘ফিউনারেল পার্লার’। এখানে একটি প্রাণহীন দেহকে সাফসুতরা করে তার শেষ ইহজাগতিক গন্তব্যের জন্য প্রস্তুত করা হয়, প্রয়োজনে সংরক্ষণও করা হয়। সংরক্ষণের নিমিত্ত দেহসমূহ অতি শীতল তাপমাত্রায় রাখা হয়, ফলে সেগুলো শক্তকঠিন হয়ে যায়। তাদেরকে সাধারণতঃ নীরব ও নিরিবিলি একটা কক্ষে রাখা হয়ে থাকে। তবে মাঝে মাঝে শোক সহ্য করতে না পারা কোন প্রিয়জনের বুকফাটা ক্রন্দন তথা বিলাপের কারণে সে নীরবতা ভঙ্গও হয় বটে, কিন্তু সেটা ব্যতিক্রম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আজকাল প্রিয়জনেরা কান্না করলেও তারা অশ্রুপাত নীরবে করেন, আঁচলে কিংবা রুমালে মাঝে মাঝে চোখ-মুখ মুছে নিজেকে সামলে রাখেন।
‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম। সুন্দর এই সাদৃশ্যটুকু ক্যামেরাবন্দী করে রাখার জন্য যেই না আমার সেলফোনের ক্যামেরা তাক করলাম, অমনি দেখি কোথা থেকে যেন একটা পাখি ফুরুৎ করে উড়ে গেল। লক্ষ্য করে দেখলাম, ‘মরচুয়ারী’ শব্দটার প্রথম অক্ষর ‘ম’ এর উপরে বাম কোণা থেকে কিছু খড়কুটো বের হয়ে আছে। বুঝলাম, পাখিটি সেখানেই দুই দেয়ালের ফাঁকে কোনমতে তার নীড় বেঁধেছে, এবং হয়তো সেখানে ডিম পেড়ে সেটি তা’ দিচ্ছিল। এতে ইমারতের সৌন্দর্যের কিছুটা হানি হয়তো হয়েছে, কিন্তু প্রাণের সৃষ্টির চেয়ে বড় সৌন্দর্য তো আর কিছু নেই। এজন্য তার এ সাময়িক ব্যবস্থাপনাটা মেনে নেয়া যায়। পাখিটি উড়ে বেশিদূর যায়নি। কাছেরই একটা গাছের ডালে বসে সে আমার কার্যাবলীর উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল। নাগরিক জীবনের কোলাহলপূর্ণ কর্মযজ্ঞ ও হৈ-হুল্লোরের মাঝে সে হয়তো বিশাল ইমারতের ঐ ছোট্ট ও সরু একটি কোণাকেই তার সৃষ্টি্কর্মের জন্য নিরাপদ ও উপযোগী মনে করেছিলঃ
"তাহারে জড়ায়ে ঘিরে
ভরিয়া তুলিব ধীরে
জীবনের ক'দিনের কাঁদা আর হাসা;
ধন নয়, মান নয়, এইটুকু বাসা
করেছিনু আশা"!
জগতের সকল সৃষ্টিরই সূত্রপাত হয় নিভৃতে নীরবে। কি এক অপূর্ব প্রাকৃতিক চক্র আমাদের অগোচরে আমাদের চারপাশে ক্রিয়াশীল রয়েছে! একই ইমারতের একপাশে প্রাণহীন দেহ নীরবে পড়ে রয়, অপর দিকের এক কোণায় প্রাণ সৃষ্টির ঐকান্তিক প্রয়াসও চলে, দুটোই নীরবে নিভৃতে। এসব সাদৃশ্য আর বৈপরীত্য নিয়েই চলমান আমাদের জাগতিক জীবন। ব্যতিক্রম বাদে জন্ম ও মৃত্যু নীরবে ঘটে না, কিছুটা হলেও সেখানে কোলাহল কলরব হয়। কিন্তু জীবন সৃষ্টির সূত্রপাত যেমন নীরবে ঘটে, জীবনাবসানের পরের সময়টাও তেমনই নীরব হয়ে যায় ক্রমান্বয়ে এবং এক সময় বিলীন হয়ে যায় স্মৃতির গর্ভে।
ঢাকা
১১ জুন ২০২৬
শব্দ সংখ্যাঃ ৫১০

লক্ষ্য করে দেখলাম, ‘মরচুয়ারী’ শব্দটার প্রথম অক্ষর ‘ম’ এর উপরে বাম কোণা থেকে কিছু খড়কুটো বের হয়ে আছে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


