somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চলতি পথের গল্পঃ দুই

১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু সাদৃশ্য ও বৈপরীত্য

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দেখা ঘটনাবলী প্রকাশ করার সময় আমাদের কথায় এবং লেখায় আমরা প্রায়ই দু’টি বিপরীতার্থক শব্দ একত্রে ব্যবহার করে থাকি; যেমনঃ রাত-দিন, সাদা-কালো, আঁধার-আলো, ইত্যাদি। আজ সকালে কিছু রুটিন পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সম্মুখের প্রবেশ পথে না থেমে পেছনের ‘মরচুয়ারী গেইট’ দিয়ে প্রবেশ করার সময় ‘মরচুয়ারী’ লেখাটার পেছনের দৃশ্যাবলী দেখে তা আমার কাছে ‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে বৈপরীত্যের বদলে সাদৃশ্যময় মনে হলো। অর্থাৎ দুটোই নীরব, শান্ত, কোলাহলহীন। একটি ‘মরচুয়ারী’ বা শবাগার সাধারণতঃ একটি নীরব এলাকাই হয়ে থাকে। কেননা এখানে যারা শায়িত থাকেন, তাদের কণ্ঠ নীরব এবং দেহ নিথর থাকে। কেউ এখানে থাকেন মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য, অন্যের দ্বারা শেষ গোসল সম্পন্ন হবার পর তারা বাহিত হন তাদের এ ইহজগতের শেষ গন্তব্যস্থলে, শায়িত হন ক্ববরে। কেউ কেউ তাদের নিকটাত্মীয়দের অনুরোধে হিমঘরে হয়তো কয়েকদিনের জন্য থাকেন, প্রবাস থেকে কোন প্রিয়জনের আগমনের অপেক্ষায়। ‘মরচুয়ারী’ কে বাংলায় ‘শবাগার’ বলে। এর চেয়ে সুন্দর কোন শব্দ থাকলেও থাকতে পারে, তবে এ মুহূর্তে তা আমার মনে পড়ছে না। ইংরেজিতে ‘মরচুয়ারী’ ছাড়াও এর একটি আলংকারিক নাম আছেঃ ‘ফিউনারেল পার্লার’। এখানে একটি প্রাণহীন দেহকে সাফসুতরা করে তার শেষ ইহজাগতিক গন্তব্যের জন্য প্রস্তুত করা হয়, প্রয়োজনে সংরক্ষণও করা হয়। সংরক্ষণের নিমিত্ত দেহসমূহ অতি শীতল তাপমাত্রায় রাখা হয়, ফলে সেগুলো শক্তকঠিন হয়ে যায়। তাদেরকে সাধারণতঃ নীরব ও নিরিবিলি একটা কক্ষে রাখা হয়ে থাকে। তবে মাঝে মাঝে শোক সহ্য করতে না পারা কোন প্রিয়জনের বুকফাটা ক্রন্দন তথা বিলাপের কারণে সে নীরবতা ভঙ্গও হয় বটে, কিন্তু সেটা ব্যতিক্রম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আজকাল প্রিয়জনেরা কান্না করলেও তারা অশ্রুপাত নীরবে করেন, আঁচলে কিংবা রুমালে মাঝে মাঝে চোখ-মুখ মুছে নিজেকে সামলে রাখেন।

‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম। সুন্দর এই সাদৃশ্যটুকু ক্যামেরাবন্দী করে রাখার জন্য যেই না আমার সেলফোনের ক্যামেরা তাক করলাম, অমনি দেখি কোথা থেকে যেন একটা পাখি ফুরুৎ করে উড়ে গেল। লক্ষ্য করে দেখলাম, ‘মরচুয়ারী’ শব্দটার প্রথম অক্ষর ‘ম’ এর উপরে বাম কোণা থেকে কিছু খড়কুটো বের হয়ে আছে। বুঝলাম, পাখিটি সেখানেই দুই দেয়ালের ফাঁকে কোনমতে তার নীড় বেঁধেছে, এবং হয়তো সেখানে ডিম পেড়ে সেটি তা’ দিচ্ছিল। এতে ইমারতের সৌন্দর্যের কিছুটা হানি হয়তো হয়েছে, কিন্তু প্রাণের সৃষ্টির চেয়ে বড় সৌন্দর্য তো আর কিছু নেই। এজন্য তার এ সাময়িক ব্যবস্থাপনাটা মেনে নেয়া যায়। পাখিটি উড়ে বেশিদূর যায়নি। কাছেরই একটা গাছের ডালে বসে সে আমার কার্যাবলীর উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিল। নাগরিক জীবনের কোলাহলপূর্ণ কর্মযজ্ঞ ও হৈ-হুল্লোরের মাঝে সে হয়তো বিশাল ইমারতের ঐ ছোট্ট ও সরু একটি কোণাকেই তার সৃষ্টি্কর্মের জন্য নিরাপদ ও উপযোগী মনে করেছিলঃ
"তাহারে জড়ায়ে ঘিরে
ভরিয়া তুলিব ধীরে
জীবনের ক'দিনের কাঁদা আর হাসা;
ধন নয়, মান নয়, এইটুকু বাসা
করেছিনু আশা"!

জগতের সকল সৃষ্টিরই সূত্রপাত হয় নিভৃতে নীরবে। কি এক অপূর্ব প্রাকৃতিক চক্র আমাদের অগোচরে আমাদের চারপাশে ক্রিয়াশীল রয়েছে! একই ইমারতের একপাশে প্রাণ চলে যায়; প্রাণহীন দেহ নীরবে পড়ে রয়, অপর দিকের এক কোণায় প্রাণ সৃষ্টির ঐকান্তিক প্রয়াসও চলে, দুটোই নীরবে নিভৃতে। এসব সাদৃশ্য আর বৈপরীত্য নিয়েই চলমান আমাদের জাগতিক জীবন। ব্যতিক্রম বাদে জন্ম ও মৃত্যু নীরবে ঘটে না, কিছুটা হলেও সেখানে কোলাহল কলরব হয়। কিন্তু জীবন সৃষ্টির সূত্রপাত যেমন নীরবে ঘটে, জীবনাবসানের পরের সময়টাও তেমনই নীরব হয়ে যায় ক্রমান্বয়ে এবং এক সময় বিলীন হয়ে যায় স্মৃতির গর্ভে।


ঢাকা
১১ জুন ২০২৬
শব্দ সংখ্যাঃ ৫১৩




লক্ষ্য করে দেখলাম, ‘মরচুয়ারী’ শব্দটার প্রথম অক্ষর ‘ম’ এর উপরে বাম কোণা থেকে কিছু খড়কুটো বের হয়ে আছে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৩
১১টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিএনপি’কে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল বলার কোনো কারণ নাই!!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৩



জাতীয় সন্মাননা কি কোনো গোপন বিষয় । একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা’কে গার্ড অফ অনার দিতে এত অনীহা কেনো বর্তমান সরকারের ‼️

আজ বারবার আমার গোআ’র কুপুত্রের একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মঞ্চনাটক: "এনিমেল ফার্ম"

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৭


আজ সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় দেখে এলাম জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নাটক "এনিমেল ফার্ম"। পরিবেশনায় ছিল রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ। নির্দেশনা দিয়েছেন ড.... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাড়ে হাজার বিজ্ঞানী এবং একটি স্ক্যামের গল্প

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২৮


জুলাইয়ের কোটা আন্দোলনের পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। সেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের অংশ হিসেবে পাকিস্তান বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘নলেজ করিডোর’-এর আওতায় আল্লামা ইকবাল বৃত্তি চালু করে। ২০২৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৫৮


হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত

জাপানের এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের একটি পোস্ট নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হাসাহাসি চলছে। আমার মনে হয়, হাসির আড়ালে আসল প্রশ্নটা চাপা পড়ে যাচ্ছে।

ঘটনাটা কী
প্রধানমন্ত্রী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচন।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:২৯


এখন পর্যন্ত প্রকাশিত এক্সিট পোল অনুযায়ী, কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন ৬১টি নিশ্চিত করতে পারেনি।
নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট, প্রায় ৫১–৫২ আসন।
গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট: প্রায় ৪৯–৫১ আসন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×