১
আমি সাদ। আমার বয়স ১৭ বছর। আমি ক্লাস টেনের ছাত্র। আমার ক্লাসের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বয়স ১৫ বা তার আশপাশে। আমারও ১৫ বছর বয়সে ক্লাস টেনে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমার বাবার কারণে তা হয়ে ওঠেনি।
আমার বাবা একজন মটর মেকানিক। এই ছোট মফস্বল শহরে আমাদের গাড়ি সারায়ের একটা গ্যারেজ আছে। সেই আয় দিয়ে আমাদের পাঁচ জনের সংসার চলে। বাড়িতে আমার দাদী, মা আর ছোট একটা বোন আছে। আমার মা আর দাদী বাড়ির আঙ্গিনায় হাস, মুরগী আর গরু পালন করে।
আমার বাবা খুব বেশি দিন স্কুলে যেতে পারেননি। অভাবের কারণে বেশি দিন তার স্কুলে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কিন্তু তার আছে এক দারুণ বিবেচনা বোধ । আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি বাবা একদিন আমার পড়া ধরলেন। আমি মোটামুটি উত্তর দিতে পারলাম। এতে বাবা মোটেও খুশি হলেন না। তিনি বললেন, তুমি পড়তে পার, পড়া শেষে প্রশ্নের উত্তরও দিতে পার। কিন্তু কোন বিষয়কে বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা করার মতো বুদ্ধি এখনও তোমার তৈরি হয়নি। তুমি বরং ক্লাস টু-তে গিয়ে বস!
বাবা সাধারণত আমার পড়া ধরতেন না। কখনো মারধোর বা বকাঝকাও করেননি। তাই তিনি যখন ক্লাস ফোর থেকে ক্লাস-টু তে ফিরে যেতে বললেন আমি তা করলাম। ভাবলাম, নিশ্চয় এতে ভালো কিছু আছে। আমার প্রথম কিছুদিন খুব খারাপ লাগত। মনে মনে অনেক কষ্ট হত। কিন্তু ক্লাস-টু তে ছিল আমার চাচাত ভাই আরমান। সে থাকায় আমার অনেক হালকা লাগত।
এদিকে ক্লাস-ফোর এর এক ছাত্র ক্লাস-টু তে নেমে আসায় শিক্ষকরা নানান কথা বলা শুরু করলেন। প্রধান শিক্ষক একদিন তার অফিসে ডাকলেন। বললেন, কি হে! কী কারবার! তোর বাপ তো আমার সাথে কথাও বলল না। ক্লাস টু-তে নামায় দিল? ক্লাস ফোর এর এক শিক্ষক এটা শুনে বললেন, স্যার! ওর পড়া বুঝতে দেরী হয়। ও অন্যদের মতো ঠিকমতো ধরতে পারে না। অনেক স্লো, স্যার! তো ওর আব্বা একটু আপনার সাথে পরামর্শ করে নিলে ভালো হতো!
শিক্ষকদের মতো আমি আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম যে আমি চালাক বা চটপটে নই। শুধু পড়াশোনা নয়, চারদিকের অনেক কিছু বুঝতে আমার দেরী হয়ে যায়। অনেক সময় অনেক কিছু বুঝতেও পারি না। এটা বুঝতে পেরে আমি কোনো কিছু বোঝার প্রতি মনোযোগী হলাম। পড়া হোক, সমাজ সংসারের কোনো কিছু হোক আমি বিষয়গুলো বোঝার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে শুরু করলাম। এভাবে ৭/৮ বছর পেরিয়ে গেল। আমি মোটামুটিভাবে পাশ করে ক্লাস নাইনে উঠে গেলাম।
২
বাবা আমাকে ক্লাস-টু তে ফিরে যেতে বললে আমি মা-র কাছে গেলাম। বললাম, আমি পিছিয়ে যাব না? মা হেসে বললেন, দূর বোকা! কেউ যদি না বুঝে ওপরের ক্লাসে ওঠে তাহলে সে পিছিয়ে যায়। আর কেউ যদি বোঝার জন্য নিচের ক্লাসে যায় তাহলে আসলে সে তার ঘাটতি পূরণ করতে পারে। এতে সে পিছিয়ে না, বরং এগিয়ে থাকে। এছাড়া তোর আব্বা কি আর তোর খারাপ চায়?
মা-বাবা দুজনে একই কথা বলায় এটা নিয়ে আমি আর মন খারাপ করিনি। রেজাল্ট নিয়ে বেশি চিন্তা না করে ক্লাসের বইগুলো সব বুঝে পড়ার জন্য আমি মনোযোগ দিই। এভাবে আমি ক্লাস নাইনে উঠি।
ক্লাস নাইনে পড়ার সময় এক বিকেলে প্রধান শিক্ষক ক্লাস-নাইন আর ক্লাস-টেন কে একসাথে করলেন। বললেন যে তোমরা যারা এ এলাকায় থাক তারা অনেকে আকরাম স্যারকে চেন। কেউ কেউ বলল, জি, স্যার— চিনি। আকরাম স্যার একজন চল্লিশ পেরিয়ে যাওয়া মানুষ। তিনি অনেক নামী প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করেছেন। চাকরি-বাকরি না করে এলাকায় এসে তিনি নিজেদের বিষয়-সম্পত্তি দেখাশোনা করেন। এর পাশাপাশি বেশ কয়েকটা স্কুলে বিনামূল্যে পড়ান।
হেড স্যার আকরাম স্যারকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর আকরাম স্যার বললেন, প্রতি শনিবার আমি এই স্কুলে তোমাদের সাথে কিছু সময় কাটাব। মনে রেখ, কোনো ক্লাস না। ওই একটু গল্প-সল্প করা আরকি। একজন বলল, তাহলে কি বইপত্র কিছু আনা লাগবে না, স্যার? স্যার বললেন, বইপত্র লাগবে না। শুধু খাতা আর কলম আনলেই হবে। তবে এটা বাধ্যতামূলক কিছু না। যারা পারবে তারা এসো । আমার মনে কর এক শনিবার বাদ গেল – এরকম হলে পরের শনিবার আসবে। মোট কথা আসার চেষ্টা করবে।
ক্লাসের ছেলেরা বলাবলি করছে যে তারা আসবে কী না। কেউ কেউ বলল যে তাদের বাড়ি দূরে— ছুটির দিন তারা আসতে চায় না। কেউ বলল, আমার বাড়ি দূরে না কিন্তু আসব না— ছুটির দিন একটু ঘুরে টুরে বেড়াব। আমার চাচাত ভাই আরমান আমাকে বলল, ভাই, তুমি কী করবা? আমি বললাম, আমি এমনি একটু কম বুঝি। আমি আসব। দেখি যদি নতুন কিছু বুঝতে বা জানতে পারি। আরমান বলল, তাহলে আমিও আসব। এভাবে আমরা ৫-৭ জন আসার কথা ভাবলাম।
প্রথম শনিবার এসে দেখি আমাদের ক্লাসের চার জন, ক্লাস টেনের তিন জন আর অন্য স্কুলের পাঁচ জন উপস্থিত। এই বারো জনকে নিয়ে আকরাম স্যার তার গল্পের ক্লাস শুরু করলেন। প্রথম দিন সবাইকে তিনি পাঁচ মিনিট করে কথা বলতে দিলেন। নিজের পরিচয়, পছন্দ-অপছন্দ, স্বপ্ন-সম্ভাবনা এসব নিয়ে সবাই বলল। এরপর স্যারও তার নিজের কথা বললেন। তারপর বললেন, তোমরা যে যা বললে ওটা একটু লিখে ফেল। ... এভাবে আমাদের প্রথম শনিবার কাটল।
এভাবে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কথা, গল্প, আলোচনা আর সেসব লিখে আমাদের শনিবারগুলো পার হলো। এর মধ্যে চার মাস পেরিয়ে গেল। আমরা ক্লাস-টেন এ উঠলাম। গল্প-ক্লাসে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১২ থেকে ২০-এ গিয়ে পৌঁছল। আকরাম স্যার একদিন এসে বললেন, আজ লেখা আগে, গল্প পরে। তিনি বললেন, তোমাদের কাছে যে জিনিসটা সবচেয়ে কঠিন লাগে সেটা নিয়ে লেখ। ক্লাসের সবচেয়ে বয়সী ছেলে শামীম বলল, স্যার কোনটা পড়তে কঠিন, সেটা? স্যার বললেন, না। যে কোন জিনিস। যেমন মনে কর, কারও কাছে বই-পড়া কঠিন। কারও কাছে বাজার-করা কঠিন। কারও কাছে আবার সকালে ঘুম থেকে ওঠা কঠিন! যার কাছে যেটা কঠিন লাগে সে সেটা নিয়ে লেখ।
৩
লেখা শেষে আমরা স্যারের কাছে লেখাগুলো জমা দিলাম। স্যার এক এক করে প্রত্যেকের লেখার ওপর আলোচনা করলেন। প্রথম লেখাটা আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয় কামরুলের। স্যার লেখাটার শিরোনাম পড়লেন জোরে, ‘মা-বাবাকে খুশি করা সবচেয়ে কঠিন’। বাকি লেখাটা পড়ে কামরুলকে বললেন, এবার এটার ব্যাখ্যা বল। কামরুল বলল, স্যার! আমি সব পরীক্ষায় ফার্স্ট হই কিন্তু আমার মা-বাবা তাও বলেন, পড়! পড়! যেন লেখাপড়া ছাড়া এ দুনিয়ায় আর কিছু নেই!
স্যার হেসে বললেন, আরে ব্যাপারটা তা না। তোমার মা-বাবা চান যেন তোমার যে সক্ষমতাটা আছে সেটাতে তুমি বেস্ট হতে পার! এরপর স্যার পড়লেন শামীমের লেখা।
শামীম আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ। ওর বয়স ১৮-১৯ হবে। এমনকি বিশও হতে পারে। ও ক্লাস টেনে ওঠার পর দুই বছর স্কুলে আসেনি। গত বার এস.এস.সি পরীক্ষার আগে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল। এবার ওর মা হেড স্যারকে এসে বললেন, স্যার! আমি ওরে পরীক্ষা পর্যন্ত সময় দিছি, ও যদি এসএসসি পাশের সার্টিফিকেট নিয়ে বাড়ি আসতে পারে—আসবে। না হলে বাড়িতে ওর আর জায়গা হবে না! যাই হোক, স্যার পড়লেন শামীমের লেখার শিরোনাম: মেয়ে মানুষের মন বোঝা সবচেয়ে কঠিন। স্যারের পড়া শেষ না হতে ছেলেপেলেরা সব হো হো করে হাসতে শুরু করল। গত ছয়-সাত মাসে আকরাম স্যারের সাথে আমরা অনেক ফ্রি হয়ে গেছি। আমাদের হাসি দেখে স্যারও মুচকি হাসলেন। তারপর শামীমের পুরো লেখাটা পড়লেন।
শামীমের লেখা পড়ে স্যার বললেন, প্রেম-ট্রেম করিস নাকি? প্রেমপত্র লিখিস? শামীম লাজুক মুখে বলল, স্যার! চিঠি এ পর্যন্ত ৪-৫ টা লিখছি। কিন্তু একটা শুধু দিতে পারছি। প্রেম-ট্রেম করার সুযোগ হয়নি, স্যার!
ছেলেপেলেরা আরেক দফা হো হো করে হেসে নিল। স্যার বললেন, তা ব্যাখ্যা কর তো বিষয়টা! শামীম বলল, স্যার! আমার বাড়ির পাশের একটা মেয়েকে তো দেখতাম। সেও আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। তা ওকে দেখতে দেখতে আমার মনের মধ্যে কী একটা হয়ে গেল। আমি ওকে একটা চিঠি দিলাম। পরের দিন ওর বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করছি এমন সময় দেখি যে ও ওর বাপের সাথে বাজার থেকে আসছে। আমি কাছাকাছি যেতেই ওর বাপকে বলল, দেখ তো আব্বু! ওই ছেলেটা মনে হয় আমাদের ফলো করছে। ওর বাপ আমাকে চেনে, স্যার। আমাকে ডেকে ধমক দিলো। বুঝলাম না, স্যার! চিঠি নিয়ে সেদিন হাসল। পরের দিন আবার বাপকে দিয়ে ধমক খাওয়াল। অদ্ভুত ব্যাপার! কিছুই বুঝতে পারছি না। ক্লাসে আরেক দফা হাসির হিল্লোল বয়ে গেল।
স্যারের হাতে এবার আমার লেখাটা। তিনি জোরে পড়লেন, লেখার শিরোনাম: ‘যেকোন কিছু বোঝাই কঠিন’। স্যার লেখাটা পড়ে বললেন, এটা ব্যাখ্যা করতে হবে তোমার। আমি বললাম, স্যার! সেদিন আমাদের বাড়িতে কয়েকজন আত্মীয় আসেন। আমার আব্বা আর মা তাদের জোর করে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন। পরে আমি জিজ্ঞেস করলাম। আমাকে উনারা বললেন যে এটা নাকি ভদ্রতা! আমি অবাক হয়ে গেছি, স্যার। জোর করা কি ভদ্রতা হতে পারে? আম্মু বলল যে অনেক সময় মানুষ আত্মীয়-বাড়ি এসে লজ্জায় কম খায়। তাই জোর করা লাগে। আমার যতটুকু লাগে আমি ততটুকু খাই। এরকম আরও অনেক ব্যাপার আমি বুঝতে পারি না। আর লেখাপড়ার বিষয়ে যদি বলেন, স্যার, আমি সবসময় কম বুঝি।
আরেক ছেলে বলল, স্যার ও তো আদু ভাই! ওর বাপ ওরে ক্লাস-ফোর থেকে ক্লাস-টু’তে নামায় দিছিল! স্যার বললেন, তা তুই এত সুন্দর লিখলি কী করে? আমি বললাম, স্যার! আমি আসলে ছোটবেলা থেকে কম বুঝি। তাই ঠিকমতো সবকিছু বোঝার জন্য যা পাই তাই পড়ি। বই, খবরের কাগজ, পত্রিকার বিজ্ঞাপন, দেয়ালের লেখা, ওষুধের বাক্সে লেখা কথা — যা পাই সব কিছু আমি পড়ি, বোঝার চেষ্টা করি।
আমার কথা শুনে স্যার খুশি হয়ে গেলেন। বললেন, খুব ভালো লাগছে তোর কথা শুনে! তুই এই স্কুল থেকে পাশ করে গেলে তোর গল্প আমি অন্যদের বলব। এটা দারুণ এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প হবে। আমি বললাম, স্যার, আমি এখন যেকোনো লেখা পড়েই বুঝতে পারি লেখার বিষয়বস্তু কী, কী বোঝাতে চাচ্ছে এসব। কিন্তু মানুষের আচরণ আমি বুঝতে পারি না। মানুষ বলে এক করে আরেক। আমার কথা শুনে স্যার বললেন, বড় হলে আস্তে আস্তে সব বুঝতে পারবে।
এভাবে সবার লেখা পড়ে, তাদের বর্ণনা আর ব্যাখ্যা শুনে স্যার ক্লাস শেষ করলেন। বললেন, আগামী শনিবার কোন ক্লাস হবে না। আমরা সবাই শিক্ষা সফরে যাব। অন্য স্কুল থেকেও কয়েকজন আসবে। তোমাদের মাত্র ৫০০/- টাকা করে দিতে হবে। আসা-যাওয়া, খাওয়া-দাওয়া এসবের জন্য। কোন জোর নেই। যারা যারা যেতে চাও শামীমের কাছে টাকা জমা করে দিও। আমাদের ফার্স্ট বয় বলল, স্যার আপনারটা তো বললেন না! কোন জিনিস আপনার কাছে সবচেয়ে কঠিন লাগে? আমি বললাম, জ্বি স্যার! আপনার কথা শুনলে আমরা নতুন কিছু জানতে পারতাম। স্যার বললেন, অবশ্যই বলব। কিন্তু আজ নয়, আরেক দিন।
৪
আজ শনিবার। আমরা বিশ জন উপস্থিত। তিন জন অভিভাবক — দুই জনের সাথে তাদের মা আর এক জনের সাথে তার বাবা। মোট বিশ জন ছেলের মধ্যে এক জনের সাথে তার মা-ও আছে। স্যার সহ আমরা ২১ জন।
আমরা যাচ্ছি স্থানীয় একটা বিলে। আমাদের স্কুল থেকে বিলের দূরত্ব ৪০ কিমি মতো হবে। সকাল ৮-টার মধ্যে আমরা সবাই বাসে উঠে পড়লাম। গাড়ি ছাড়ার আগে আগে স্যার আমাদের একটি নতুন অ্যাসাইনমেন্ট দিলেন। বললেন, তোমাদের কাজ হবে বিলটা ঘুরে দেখা। ভালো ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখতে হবে বিলটা কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি! এছাড়া বিলের মতো একটা জলাশয় কী কী উপকারে আসে, কীভাবে এটা আরও ভালো ভাবে সংরক্ষণ করা যায় এসব নিয়ে ভাবতে হবে। তারপর আগামী শনিবার এগুলো নিয়ে লেখা তৈরি করবে। ওটা নিজ হাতে লিখতে হবে। এতে আমি বুঝতে পারব যে তোমরা কে কে কোন একটা বিষয় নিয়ে সুন্দর এবং বিশ্লেষণ করে লিখতে পার। ভুল হলে কোনো অসুবিধা নেই। তোমাদের ভুল থেকে আমি বুঝতে পারব যে কার কীরকম সাপোর্ট লাগবে।
সাড়ে আটটার দিকে গাড়ি চলা শুরু করল। আমরা আশায় আছি, কখন নাস্তা খাব। কিন্তু নাস্তার খবর নেই। গাড়ি চলছে। যে যেমন পারছে গল্প করছে। আমরা গন্তব্যের প্রায় কাছে চলে এসেছি। ভাবছি, তাহলে মনে হয় একেবারে গাড়ি থেকে নেমে খাবার ব্যবস্থা। এমন সময় হঠাৎ গাড়ির চাকা পাংচার। ড্রাইভার, হেলপার সব দেখে শুনে বলল, এটা ঠিক করতে কম সে কম ঘণ্টা দুয়েক লাগবে। সবার মধ্যে একটা অসন্তোষ ফুটে উঠল। স্যার বললেন, সবাই গাড়ি থেকে নেমে পড়। আমরা সবাই গাড়ি থেকে নেমে একটা ফসলের ক্ষেতের পাশে দাঁড়ালাম।
যে কয়েকজন অভিভাবক এসেছিলেন তারা বললেন, এটা বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে পারেননি, স্যার? এক ছাত্র বলল, স্যার, ক্ষিধে লাগছে তো, স্যার! নাস্তা কখন খাব?
স্যার এবার সবার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, আমাদের কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। আর, আমি খুব দুঃখিত যে নাস্তাটা আসলে আমরা আনিনি ভুলবশত। স্যারের এ কথায় আমাদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। একজন মা আঁতকে উঠলেন, এটা কী বলেন স্যার? নাস্তা না হলে বিল পর্যন্ত যাব কীভাবে? স্যার বললেন, এখান থেকে অল্প পথ। আমরা ভ্যানে চড়ে যেতে পারব। ইচ্ছা করলে ২০-২৫ মিনিট হেঁটেও পৌঁছতে পারব।
কিছুটা সামনে একটা ছোট মুদি দোকান দেখা যাচ্ছে। ওখান থেকে কেক-কলা-বিস্কুট এসব যার যা লাগে খেয়ে নিলাম। যে কয়েকজন মা এসেছিলেন তারা পানি আর হালকা খাবার এনেছিলেন। তারা গাড়িতে বসে খেতে শুরু করলেন। আরমান বলল, ভাই! আমার তো ক্ষুধা লাগছে অনেক— খাবার না হোক ওদের কাছে পানি চাইলে কি পাব? আমি বললাম, দূর বোকা! চাব কেন? আমরা একটু হেঁটে ওই মুদি দোকানে কিছু না কিছু পাব।
যে যতটুকু পারল কিছু খেল। এর মধ্যে অনেকের মেজাজ বেশ খারাপ। একজন মেয়ের বাবাও এসেছেন। তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, আপনি শিক্ষক নামের কলঙ্ক! ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন অথচ খাবার আনেননি। আবার ওদিকে গাড়ির চাকা পাংচার। আমি সাথে না থাকলে আমার মেয়ের কী যে হতো আজ!
আকরাম স্যার সবার সামনে শান্ত গলায় বললেন, সরি! একটা ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু তাই বলে আমরা আমাদের দিনটা নষ্ট করব না। তোমরা মনে রাখবে জীবনে সব কিছু আমাদের আশা অনুযায়ী ঘটবে না। এটাকে মেনে নিয়ে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
স্যারের কথা মতো চারটা দলে ভাগ হয়ে বিলের চার দিকে আমরা পর্যবেক্ষণ শুরু করলাম। রাস্তা থেকে বিলের আসার জন্য গাড়ি চলাচলের কোনো ব্যবস্থা নেই। মাত্র দেড় কিমি রাস্তা। আমরা হেঁটেই এখানে পৌঁছালাম।
আমার দলে আরমান ছাড়া মা-সহ এক ছাত্রী, বাবা সহ এক ছাত্র আর দু'জন ছাত্র। আমরা বিলের চার পাশ হেঁটে একটু দাঁড়াচ্ছি। বসে বসে পদ্ম ফুল, কলমি লতা, শামুক এসব দেখছি। স্যার না বললেও আমি একটা নোটবুক এনেছি। তাতে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস টুকে রাখছি। এমন সময় শুনতে পেলাম ছাত্রীর বাবা বলছেন, দেখছ এই ৫০০ টাকা মেরে খাবে। স্যারের সম্পর্কে এমন কথা শুনে আমার মাথায় যেন আগুন ধরে গেল। আমি কয়েক কদম হেঁটে উনার কাছে গিয়ে বললাম, আপনি এসব কী বলেন! স্যার সেরকম লোক না যে ছাত্র-ছাত্রীদের টাকা মেরে খাবে!
আমার আক্রমণাত্মক ভাব দেখে তিনি বললেন, ফাজিল ছোকড়া! মুরুব্বীদের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় এসব তো শেখোনি। আপনিই শেখেননি, আমি বললাম। আরমান এক ছুটে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। আমার হাত ধরে টানতে লাগল। আমাকে এরকম রাগতে ও কখনও দেখেনি। আমি আবার বললাম, আপনি শিক্ষককে সম্মান দিতে শিখলে স্যারের সাথে ওভাবে কথা বলতেন না!
লোকটা বলা শুরু করল, দেখছেন, আপা? কী বেয়াদব সব ছেলেপেলে! ভাবেন একবার, আমরা না আসলে আমাদের ছেলেমেয়েদের কী হতো? আমি আবার ক্ষিপ্ত হয়ে গেলাম, আরও তিনটা মেয়ে আর তেরটা ছেলেও তো আসছে অভিভাবক ছাড়া। ওরা তো সব ঠিকমতো করছে। আপনাদের ছেলেমেয়েরাও সব করতে পারত।
লোকটা ফুঁসে উঠল এবার, তোমার সাথে কথা বলছে আমি? বেয়াদপ কোথাকার! আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আরমান আমাকে টানতে টানতে আরেক দিকে নিয়ে গেল। আমাদের দলের বাকি দু'জন ছেলেও চলে এল আমাদের এদিকে। আমরা চার জন আবার নতুন করে শুরু করলাম।
৫
ঘণ্টা তিনেক হেঁটে আমরা সবাই কম-বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। স্যার এবার সবার ফেরার কথা বললেন। এর মধ্যে যে যা পারল নোট নিলো, অনেকে ছবি তুলল। আমরা গাড়ির কাছে ফিরলাম।
ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে বাসে বসলাম সবাই। উঠে দেখি সবার সিটে একটা করে খাবার ব্যাগ আর পানির বোতল। দেখি যে আমাদের স্কুলের অফিস সহকারী প্রশান্ত মুখে বাসের পিছনের সিটে বসে আছে! বুঝলাম যে তিনিই এগুলো এনেছেন। বাসের হেল্পার বলল, স্যার গাড়ি একদম ফিট। কখন স্টার্ট দেব তাই শুধু বলবেন।
আমাদের খাবারের ঠোঙা বা পানির বোতল যেন পরিবেশ নষ্ট না করে সেজন্য সবাইকে নির্দিষ্ট একটা পাত্রে ময়লা ফেলতে বলা হলো। অফিস সহকারী দবির ভাই সবার কাছ থেকে সব কিছু নিয়ে বড় একটা ব্যাগে ভরতে লাগলেন। এবার আমরা একটু স্বস্তির স্বাদ নিলাম। গাড়ি চলতে শুরু করল।
বিল থেকে ধেয়ে আসা শীতল হাওয়া আমাদের শরীর ও মন জুড়িয়ে দিল। স্যার এবার বাসের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, প্রথমে আমি সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি যে তোমাদের সকালের নাস্তার ব্যবস্থা করতে পারিনি! অবশ্য আমি এটা ইচ্ছা করে করেছি। এ-কথায় অনেকে ফিসফাস শুরু করল। আমরাও একটু অবাক হলাম। স্যার আমাদের সবাইকে আরও অবাক করে আনন্দের হাসি হাসলেন। বললেন, কিন্তু গাড়ির চাকাটা নিজে থেকে পাংচার হয়েছে। এতে আমার হাত ছিল না।
তোমাদের হয়ত মনে আছে যে তোমরা ‘সবচেয়ে কঠিন’ বিষয়ে নিজের নিজের চিন্তা ও অভিজ্ঞতা লিখেছিলে। কয়েকজন শিক্ষার্থী আমার চিন্তা ও অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছিল। তোমরা আছ? আমরা কয়েকজন হাত উঁচু করলাম। স্যার বললেন, আমার মতে, মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েও সব সময় মানবিক আচরণ করা সবচেয়ে কঠিন। সকালে নাস্তা না পেয়ে, হাঁটার কষ্ট পেয়ে আমরা অনেকে অনেক ধরনের খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছি। আমি বেশি-বকা সেই অভিভাবকের দিকে তাকালাম। মনে হচ্ছে না যে তিনি স্যারের কথা বুঝতে পারছেন। যাই হোক, স্যার বললেন, আমার মতামতটা তোমাদের প্র্যাকটিক্যালি দেখালাম। আশা করি, তোমরা বুঝতে পারছ যে ধৈর্য ধরা, অন্যকে শ্রদ্ধার চোখ দেখা এবং সবার সাথে সব সময় মানবিক আচরণ করা কত কঠিন।
এর মধ্যে দবির ভাই সবার হাতে একটা করে খাম ধরিয়ে দিচ্ছেন। কিছু বলার আগে স্যার বললেন, তোমরা সবাই ৫০০ টাকা করে জমা দিয়েছিল। সব খরচ বাদ কিছু টাকা তোমরা ফেরত পাবে। সবার ভাগে ১২০ টাকা করে আছে। আরমান বলল, ওই ফাউল লোকটারে আমার এখন ঝাড়ি মারতে মন চাইতেছে। ৩৮০ টাকা দিয়ে দুই জন ঘুরে আসল। বাকি টাকা ওরা এখনই দিক।
আরমান খুব উত্তেজিত হয়ে বলল, হালার পুতরে একটু অপমান করা দরকার। স্যারকে নিয়ে কী সব কথা বলল! ও বাসের সামনে গিয়ে এখনই বলতে চাচ্ছিল। আমি ওর হাত ধরে বসালাম। বললাম, যাদের বিবেক আছে তারা নিজের ভুল বোঝার চেষ্টা করে। আর যারা বিবেকহীন তারা অন্যকে ছোট করে শান্তি পায়। নিজের দোষ তাদের চোখে পড়ে না।
আমার মেজাজ এখন ঠান্ডা। স্যারের শেখানোর এই প্র্যাকটিক্যাল উপায় আমার খুব ভালো লাগলো। আমি বললাম, বাদ দে! যারা শিখতে চায় তারা শেখে। আর যারা অন্যের ভুল ধরতে ব্যস্ত থাকে তারা সব সময় নিজে নিজ নিজ ভুলে বন্দী থাকে।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





