
পাকিস্তানের জঙ্গি গোষ্ঠী লস্কর-ই-তৈয়বার সহযোগী সংগঠন জামাত-উদ-দাওয়ার কয়েকজন নেতা দাবি করেন, হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই জঙ্গি সংগঠনটির নেতা সাইফুল্লাহ কাসুরি বলেন, তারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাঙার প্রতিশোধ নিয়েছে। মুজাম্মিল হাশমি নামের আরেক জঙ্গি নেতাও একই দাবি করেন।
২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ বলেন, পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে ১৯৭১-এর প্রতিশোধ নিয়েছে।
দাবিগুলো থেকে লক্ষণীয় যে, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় তাদের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। '৭১-এ পাকিস্তানের পরাজয় শুধু ভূখণ্ড হারানোর পরাজয় ছিল না; এটি ছিল তাদের আদর্শগত পরাজয়। পাকিস্তানের এই আদর্শের ভিত্তি ছিল ধর্মকে ব্যবহার করে উগ্রবাদী মতাদর্শকে রাষ্ট্রনীতির অংশ করা। জঙ্গিবাদ, জিহাদ, রাজনৈতিক ইসলাম - যে বিষয়গুলো সারা পৃথিবীজুড়ে মুসলমানদের দুর্ভোগের কারণ, তার আঁতুড়ঘর এই পাকিস্তান।
১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাকিস্তান রাজনৈতিক অস্থিরতা, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং পরিচয়ের সংকটের মুখোমুখি ছিল। এসব সংকটের অন্তর্নিহিত কারণ দূর করার বদলে, শিক্ষা, সমতা ও ন্যায়বিচারভিত্তিক গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথে না নিয়ে তারা জিহাদ এবং জঙ্গিবাদকে ব্যবহার করতে থাকে। এই নীতি পরে সুসংগঠিত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি ইসলামপন্থি পরিকল্পনা বা গ্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজিতে পরিণত হয়। জিহাদি ধারণা তাদের আদর্শিক ভিত্তি, আর সশস্ত্র জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো তাদের হাতিয়ার।
জিহাদ ও জঙ্গিবাদকে পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার করেছে। জাতিগত, ভাষাগত ও আঞ্চলিকভাবে বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীকে অভিন্ন পরিচয়ের অধীনে রাখার উপায় হিসেবে তারা ইসলামকে ব্যবহার করে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের ইসলামপন্থী নীতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বিশেষ করে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ার মতো অঞ্চলে জাতিগত জাতীয়তাবাদকে দমন করতে ইসলামি জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করা হয়।
বৈদেশিক ক্ষেত্রে জিহাদ ও জঙ্গিবাদের ব্যবহার আরও ভয়ঙ্কর, মর্মান্তিক এবং রক্তক্ষয়ী। বাংলাদেশের পর এর বড় সাম্প্রতিক উদাহরণ আফগানিস্তান ও কাশ্মীর।
পাকিস্তানি লেখক তারিক আলী আফগান যুদ্ধের জন্য পাকিস্তানের আইএসআই কর্তৃক জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষণ সম্পর্কে লিখেছেন: "সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধের জন্য জেনারেল জিয়াউল হকের অংশগ্রহণ ছাড়া পশ্চিমের কাছে তার অন্য কোনো গুরুত্ব ছিল না। আফগান যুদ্ধে অর্থায়নের জন্য হেরোইন বিক্রির ব্যাপারটি সিআইএ না দেখার ভান করে।
১৯৭৭-৮৯ এই সময়ে পাকিস্তানজুড়ে মাদ্রাসার একটি নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। শুরুতে বিভিন্ন বৈদেশিক উৎস থেকে পাওয়া সাহায্যে এর অর্থায়ন হয়েছিল। আবাসিক স্কুলগুলো নতুন ধাঁচের ধর্মীয় প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। বিনা মূল্যে শিক্ষা ও আবাসনের সুবিধা থাকায় কেবল দরিদ্র আফগান শরণার্থীদের সন্তানরাই মাদ্রাসায় ভর্তি হয়নি, পাকিস্তানের দরিদ্র কৃষক পরিবারগুলোও মাদ্রাসায় তাদের একটি পুত্রকে পাঠাতে খুব আগ্রহী ছিল। তারা ভেবেছিল, বাড়িতে একজন খাওয়ার লোক কমবে এবং ছেলেটি শিক্ষিত হয়ে শহরে চাকরি পাবে।
কোরআনের আয়াত মুখস্থ করা এবং ধার্মিক জীবনযাপন করার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি, মাদ্রাসার শিক্ষার বিষয়বস্তুতে শিশুদের সহজাত সব প্রশ্ন দূর করতে শেখানো হয়েছিল।...ইমামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অর্থ ছিল আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা।...মাদ্রাসাগুলোর একমাত্র কাজ ছিল শিশুদের ধর্মোন্মাদে পরিণত করা। উদাহরণস্বরূপ, তাদের আদর্শলিপি ছিল উর্দু অক্ষর "জিম" দিয়ে "জিহাদ", "তায়" দিয়ে তোপে বা কামান, "কাফ" দিয়ে কালাশনিকভ রাইফেল এবং "খায়" দিয়ে খুন বা রক্ত।
বয়স বাড়লে এই শিশু-কিশোরদের আইএসআই এজেন্টদের তত্ত্বাবধানে অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তাদের শেখানো হতো কিভাবে বোমা তৈরি করতে ও বোমা পুতে রাখতে হয়। এজেন্টরা নিষ্ঠাবান ছাত্রদের তালেবান সৈনিক হিসেবে বাছাই করতো। তারপর আফগানিস্তানে "কাফেরদের" বিরুদ্ধে "জিহাদের" লড়াইয়ে প্রস্তুতি নিতে গোপন সেনাক্যাম্পে বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য পাঠাতো।"
ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ হলে পাকিস্তানের পক্ষে পূর্ব ও পশ্চিম - দুই দিকের চাপ সামলানো কঠিন হবে। ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের সামরিক ক্ষমতা সীমিত। তাই পাকিস্তান চাইত আফগানিস্তানে এমন সরকার থাকুক, যা ভারতের ঘনিষ্ঠ না হয়ে পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষা করবে। আফগানিস্তানে ভারতের রাজনৈতিক বা সামরিক প্রভাব বৃদ্ধিকে পাকিস্তান নিরাপত্তা ঝুঁকি মনে করে। সে কারণে, পাকিস্তানি সামরিক ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান আফগান জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে।
কাশ্মীরেও পাকিস্তান একই কৌশল প্রয়োগ করে ভারতবিরোধী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করেছে। লস্কর-ই-তৈয়বা, জইশ-ই-মোহাম্মদ ও হরকত-উল-মুজাহিদিনের মতো গোষ্ঠীগুলোর উত্থান ও কার্যক্রম পাকিস্তানি সামরিক ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়েছে।
তারিক আলী লিখেছেন: "...ভয়ংকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইএসআই এর সৃষ্টি হয়েছে। এর রাজনৈতিক শাখা "আহলে হাদিস" রাজতন্ত্র বাদে পুরো সৌদি মডেলটি পাকিস্তানে প্রবর্তন করতে চায়। ব্রিটেন এবং আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে তাদের সমর্থক এবং মসজিদ রয়েছে। বিশ্বব্যাপী জিহাদের জন্য জনবল ও অর্থ সরবরাহ করা তাদের লক্ষ্য। এটি সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে সবচেয়ে গোঁড়া সংখ্যালঘু একটি দল। দেশের রাষ্ট্রপতি তাদের সমর্থক ছিলেন এবং সরকারের মন্ত্রীরা তাদের সভায় যোগ দিতেন। তখন লাহোরের ৫ চেম্বার লাইন রোডে তাদের একটি শাখা অফিস ছিল। তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার আগ্রহে আমি সেখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু প্রায় ত্রিশজন ভারী অস্ত্রধারী প্রহরী দেখে আর এগোতে সাহস করিনি।
সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া লস্কর-ই-তৈয়বার মত সশস্ত্র জঙ্গি বাহিনীর অস্তিত্ব সম্ভব ছিল না। ভারতীয় কাশ্মীরকে মুক্ত করার জন্য জিহাদে অংশগ্রহণকারী প্রায় পঞ্চাশ হাজার জঙ্গির এই দলটি পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীরের আটটি বিশেষ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। সৌদি আরব ও পাকিস্তান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সেনাবাহিনী এর পদাতিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয়।
দরিদ্র পরিবার থেকে আসা কিশোরদের এই যুদ্ধে নিয়োগ করা হয়। কাশ্মীরের যুদ্ধে এই কিশোরদের শত শত সদস্য প্রাণ হারায়। লাশ ফেরত দেওয়ার সময় পাকিস্তান সরকার তাদের পরিবারের জন্য ৫০,০০০ রুপি বরাদ্দ করে। এর মধ্যে "শহিদ" পরিবার পনেরো হাজার রুপি পায়, আর বাকি টাকা লস্কর-ই-তৈয়বার ফান্ডে যোগ হয়।"
আফগানিস্তান ও কাশ্মীরে পাকিস্তান যে জঙ্গিবাদকে অনুসরণ করেছে, বাংলাদেশেও এই একই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রভাব বিস্তার করা এবং জঙ্গি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা পাকিস্তানের উদ্দেশ্য। এ কাজে রাজনৈতিক নেতা, বরখাস্ত সামরিক কর্মকর্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারক, পত্রিকার সম্পাদকদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
এদের কাজ বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়কে ইসলামপন্থী বা উগ্রবাদী জিহাদি পরিচয়ে রূপান্তর করা। এমন একটি জনগোষ্ঠী ও প্রজন্ম তৈরি করা, যারা ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনীতির ভিত্তি হিসেবে দেখবে এবং জঙ্গিবাদী প্রচারণার অনুসারী হবে। এরা পাকিস্তানি জঙ্গি মতাদর্শের সমর্থক হবে এবং ইসলামপন্থী দলগুলোর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে। জিন্নাহর পুনরাবির্ভাব, পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তন, শিবিরের ক্যাম্পাসে প্রত্যাবর্তন, জামাতের রাজনৈতিক উত্থান এবং ভারতবিরোধী ও হিন্দুবিদ্বেষী প্রচারণা এই উদ্যোগের অংশ।
তবে পাকিস্তানের মূল লক্ষ্য হতে পারে সামরিক ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতায় লস্কর-ই-তৈয়বা, জইশ-ই-মোহাম্মদ ও হরকত-উল-মুজাহিদিনের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করা। এসব গোষ্ঠীকে শুধু অভ্যন্তরীণ কাজে নয়, ভারতকে চাপের মধ্যে রাখা এবং কাশ্মিরের মতো প্রক্সি যুদ্ধে ব্যবহার করাই মূল উদ্দেশ্য হতে পারে। বাংলাদেশকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে এসব গোষ্ঠীকে সীমান্তকেন্দ্রিক জিহাদি কর্মকাণ্ড ও ভারতের বিরুদ্ধে যুক্ত করা হতে পারে এর প্রধান লক্ষ্য।
বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীকে সামরিক ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজে লাগানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা পাকিস্তানের রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে, ৫ আগস্টের পর জঙ্গিদের মুক্তি, ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান, ধর্মীয় প্রচারণার বিস্তার, জঙ্গিবাদী বইপুস্তক ছড়িয়ে পড়া, উগ্রপন্থিদের ফিরে আসা এবং পাকিস্তানের সাথে সামরিক যোগাযোগের ঘটনাগুলো এই আশঙ্কা জোরালো করে যে, বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
জঙ্গিবাদের বিস্তারের জন্য আগে প্রয়োজন আদর্শিক প্রস্তুতি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষার দুর্বল ভিত্তি, মানুষের মধ্যে প্রবল ঘৃণা ও ধর্মান্ধতা এবং ধর্মীয় উগ্র প্রচারণার বিস্তারের ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা জঙ্গি কর্মী সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ এবং সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


