৯ম পর্ব - Click This Link
আকাশ বসে ছিল উত্তরার র্যাব হেডকোয়ার্টারের একটা বদ্ধ রুমে। এটা কি ওদের ইন্টারোগেশন সেল? মনেমনে ভাবলো। একটা বড় টেবিল মাঝে রাখা। সংলগ্ন একটা চেয়ারে আকাশ বসা। ওর উল্টা দিকে আরো কয়েকটা চেয়ার। একটা পানির গ্লাস এবং বোতলও আছে। এটা পানি খাওয়ার জন্য, নাকি বেহুস হয়ে যাওয়ার পর মুখে পানির ছিটা দেয়ার জন্য, ঠিক বোঝা গেল না।
আকাশ ভেবে বের করার চেষ্টা করছিল ওকে কেন ধরে আনা হয়েছে এবং সেটা কার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে। কিছুতেই ব্যপারগুলো গুছিয়ে আনতে পারছিল না। ওরা ওকে কি করবে? জিজ্ঞাসাবাদ করবে? নাকি মারবে? এমন কোন আপরাধ আকাশ করেছে বলে মনে হলো না যার জন্য এভাবে ধরে আনা লাগতে পারে। তার পরও কেন ধরে আনলো। চিন্তা করতে করতে এক সময় আকাশ দেখলো অফিসের চারদেয়াল যেন আকাশকে চেপে ধরছে। এভাবে একা একটা বন্ধ রুমে বসিয়ে রাখাটাও কি একটা মানসিক যন্ত্রনা দেয়া নয়? হয়তো ইচ্ছা করেই এটা করা হচ্ছে। ব্যপারটা অনেকটা ইদুর-বেড়াল খেলার মত। খেলা শুরুর আগেই ইদুরকে দূর্বল করে ফেলার একটা কৌশল। কিম্বা এ খেলার এটাও একটা অংশ।
আকাশের অসহ্য লাগছিল চিন্তা করতে। ইচ্ছা করছিল একটা চিৎকার দিয়ে লোক জড়ো করে ফেলতে। কিন্তু তাতেও কোন কাজ হবে না। এই অফিসটা কি এয়ারটাইট? সেটা না হলেও সমস্যা নেই। এই অফিসের কোন শব্দ বাহিরে গেলেও কেউ শুনবে না। মানুষের কানই হয়তো এদের ব্যপারে এয়ারটাইট।
খট করে একটা শব্দ হলো। আকাশ তাকালো। সাথে সাথেই বুঝতে পারলো ওকে ধরে আনার মূল কারন। হোটেল রিজেন্সির সেই লোক। কালো পোষাকে আজ যেন তাকে ভয়ঙ্কর লাগছে। নাকি আকাশের স্নায়ু অতিরিক্ত ভয়ের কারনে মস্তিষ্ককে সাধারন বিষয়গুলোকেও ভয়ঙ্কর করে দেখাচ্ছে?
“তোমার নাম আকাশ?” টেবিলের উপর বসতে বসতে মনিকার পরিচিত সেই র্যাব অফিসার আকাশকে জিজ্ঞেস করলো। আকাশ ক্ষিন স্বরে হ্যা জানালো।
“আমি আসিফ। মনিকার খালাতো ভাই।” তারপর আকাশের সাথে হ্যান্ডশেক করে বললো, “চা নাকি কফি?”
কি বলবে আকাশ ভেবে পেলো না। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে আসিফ পাশের আরেকজনকে তিনটা কফি পাঠাতে বললো। আসিফ ছাড়াও রুমে তখনও আরেকজন ছিল। সেও বেশ হাসিহাসি মুখ নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
র্যাবের ব্যবহারে আকাশ রীতিমত মুগ্ধ। মানুষ কেন এদের নিয়ে এত খারাপ কথা বলে? কি চমৎকার ব্যবহার। আসিফ এমন ভাবে আকাশকে কফির কথা জিজ্ঞেস করলো যেন আকাশ যদি বায়না ধরে সে র্যাডিসনের টমি মিঞার রান্না খেতে চায়, তাহলে হয়তো এখনই একটা র্যাবের গাড়ি র্যাডসনের দিকে ছুটবে।
আকাশের চিন্তায় ছেদ পড়লো আসিফের প্রশ্নে। “তোমার এবং মনিকার মাঝে সম্পর্কটা কেমন?”
আকাশ বুঝলো সময় এসেছে সাবধান হবার। “আমরা ভালো বন্ধু।”
“শুধুই ভালো বন্ধু?”
“হ্যা তাই।” আমতা আমতা করে আকাশ বললো।
“কত দিনের পরিচয়?”
“মাস তিনেক।”
“তিন মাসে ভালো বন্ধু হয়ে গেলে? তোমাদের জেনারেশন দেখি অনেক ফাস্ট।” আসিফ হাসছে। আকাশ বুঝতে পারছে না এই কথাবার্তা ঠিক কোন দিকে মোঢ় নিতে পারে। টেবিলের দিকে তাকিয়ে আকাশ চিন্তা করছিল, লোকটা ওর ব্যপারে কতটা জানে? মিথ্যা বলতে হলে অপর পাশের মানুষের জানার গভীরতা সম্পর্কে ধারনা থাকতে হয়। তা না হলে মিথ্যা বলে ধরা খাবার সম্ভাবনা থাকে বেশি। কিন্তু সমস্যা হলো এই লোকটাকে আকাশ ঠিক পড়তে পারছে না। আকাশের চিন্তা জগতে পনের মিনিট আগেও এই লোকটা ছিল না। আকাশকে এই অফিসে ধরে আনার পেছনে অনেক ধরনের সম্ভাবনার কথা আকাশ ভেবেছে, কিন্তু এই লোককে কল্পনাতেও আনেনি।
“মনিকার পরিবার চায় আমার এবং মনিকার বিয়ে হোক।” আসিফ বললো। “কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মনিকা এই মুহুর্তে বিয়ে করতে চায় না। এই না চাওয়ার পেছনে অন্য কারো উপস্থিতি আছে কি না, ব্যপারটা একটু ঘেটে দেখছি।”
আসিফ হাসছে। এখন আর হাসিটা আগের মত সুন্দর লাগছে না। আকাশ কিছু বললো না। আসিফ আবার বললো, “তুমি জানো মনিকার কোথাও এ্যাফেয়ার আছে কি না?”
“না।” নিচের দিকে তাকিয়ে আকাশ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল।
“হুমম। সমস্যা হলো, আমার সোর্সরা তোমার ব্যপারে কোন ভালো তথ্য দিতে পারেনি। একাধিক মেয়ের সাথে তোমাকে ঘুরতে দেখা যায়। ড্রাগের এ্যাজেন্টের সাথেও দেখা গিয়েছে একদিন। বুঝতেই পারো, হবু বউ-এর সাথে এমন ছেলে ঘোরাঘুরী করলে শান্তির ঘুম আসেনা রাতে।”
আকাশ এবার সরাসরি আসিফের দিকে তাকালো। এই লোককে যতটা ভয়ঙ্কর মনে হয়েছিল সে দেখা যাচ্ছে তার থেকেও বেশি। রিজেন্সিতে আকাশকে দেখার পর থেকে মনে হয় এই লোক ওর পেছনে লোক লাগিয়ে রেখেছিল। এমনকি ফরিদের সাথে কথা বলার বিষয়গুলোও এড়িয়ে যায়নি।
আসিফ আবার বললো, “তোমার ব্যপারে আমি আরো একটু খোঁজ নিতে চাই। এই ধরো কার কার সাথে তুমি কথা বলো, কি বলো, এই সব আর কি।”
এবারও আকাশ কিছু বললো না।
“তোমার ফোন থেকে আমাকে একটা মিস কল দাও।”
আকাশ বুঝলো এবার সে তার সমস্ত থলের খবর বের করবে। সমূহ বিপদের সম্ভাবনা দেখতে পেয়ে শেষ বারের মত একটা চালাকি করতে চাইলো। নাম্বারটা মুখে বলতে গেল। আসিফ আবার বললো, “মিস কল দাও”।
“মিস কল দেয়া আর মুখে বলাতো একই, পার্থক্য কোথায়?”
কথাটা আকাশ শেষ করতে পারেনি, তার আগেই চড়টা ওর বাম গালে এসে পড়লো। মুহুর্তে মাথাটা ঘুরে গেল। চোখে যেন অনেক কিছু উড়তে দেখলো? একেই কি সর্ষেফুল বলে?
আকাশের দিকে তাকিয়ে আসিফ কাটাকাটা স্বরে বলল, “এখানে প্রশ্ন কেবল তারাই করে যাদের গায়ে কালো পোষাক থাকে। আজ এবং আজকের পর আবার তুই যখন এখানে আসবি, এই কথাটা মনে রাখবি।”
আকাশ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। পাঁচ মিনিট আগের আসিফ আর নেই। এখন আর শুধু ভয়ঙ্করই লাগছে না, রীতিমত হিংস্র লাগছে। নিজের অজান্তেই আকাশের হাতটা চলে গেল পকেটে। ফোনটা বের করে আসিফের দিকে তাকালো। আসিফ নিজেই মিস কলটা দিয়ে নাম্বারটা সেইভ করে রাখলো। তার পর বললো, “এই কালো পোশাকের মানুষগুলোকে এত বোকা ভাবার কোন কারন নেই। মুখে বললে যে নাম্বারটা তুই ভুল দিতি, এটা তোর চোখই বলে দিচ্ছিল।”
তারপর আসিফ উঠে আকাশের সামনে কফির কাপটা রাখলো। বললো, “আমাদের অফিসের কফিটা বেশ। ডোন্ট মিস ইট। আর হ্যা, পাশে রিফ্রেশরুম আছে। চিরুনী-টিরুনিও আছে। চুল আচড়ে, শার্টটা ঠিক করে তার পর যেও।”
আকাশ যখন র্যাব অফিস থেকে বের হয়ে আসছিল, সবাই তখন ওর দিকে তাকাচ্ছিল। সবাই কি জানে আকাশকে কি করা হয়েছে একটু আগে? সম্ভবত জানে। এটা হয়তো ওদের জন্য প্রতিদিনের নাটক। আকাশ হঠাৎ অনুভব করলো ওর চোখের কোনে পানি জমতে শুরু করেছে। দ্রুত র্যাব অফিস থেকে বের হয়ে আকাশ উত্তরার বড় রাস্তার দিকে হাটতে শুরু করলো। ওর তখন প্রচন্ড ভাবে অনিন্দিতাকে মনে পড়ছে। ইচ্ছে করছিল অনিন্দিতার কোলে আগের মত মাথা রেখে শুয়ে থাকতে। এই একটা জায়গা আকাশের মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিময়, যেখানে কেউ কোনদিন ওকে কষ্ট দিতে পারবে না।
অন্ধকার নিঃরব রাস্তায় আপমান আর সীমাহীন যন্ত্রনায় আকাশ তখন কাঁদছিল। (চলবে)
১১তম পর্ব - Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে অক্টোবর, ২০০৮ রাত ২:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



