এখন অনেক রাত। রাস্তা দিয়ে হাটছি। আমার চারপাশে একঝাক জোনাকী পোকা, ওরা আমার আধার পথের আলো হয়ে জ্বলছে যেন। সাদা কুয়াসা আর মায়াবী জোছনা মিলে একটি স্বপ্নময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
আমার আজ ভয়াবহ মন খারাপ।
কাছের মানুষের দুরে চলে যাওয়ার সেই বাজে দিন আজ। ক্রমাগত ভাবছি। কেন এমন হয়? কেন ভালোবাসা টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যায়!
আমি কবি নই, তবু কবিতারা আজ আমার মাথায় লাইন বেধে আসতে চাইছে কেন, আমি তা বুঝতে পারছি না।
হাটতে হাটতে আমি নদীর কাছে চলে এসেছি। অবশ্য এটা বড় কোন নদী না তাছাড়া এখন শিতকাল চলে আসায় এই নদিটা খালের মত হয়ে গেছে। সবুজ ঘাসে ছেয়ে যাওয়া পাড়ে আমি বশে পড়লাম। নদীর জ্বলে আকাশে পূর্নউদিত চাঁদের প্রতিকৃতি ভারী অদ্ভুদ লাগছে। এখন রাত কত হয়েছে আমি জানিনা। আমার হাতে কোন ঘড়ি নেই। কদিন যাবত মোবাইল টাও ব্যাবহার করছি না। একা থাকার মাঝে বিচ্ছিন্ন থাকার মাঝে যে সুখ আছে তা উপলোদ্ধি করছি।
এখন যে অনেক রাত তা বুঝতে পারছি। নদীর বুকের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রিজের উপর দিয়ে এখন আর হুট হাট করে গাড়ি ছুটে যাচ্ছেনা।
নিরলে ভাবনার রাজ্যে বার বার প্রতারক একজন অনাহুত আক্রমন চালাচ্ছে। সব ভুলে থাকার আজ বোধকরি এক বছর পূতি হতে যাচ্ছে।
হটাৎ করেই ঝপাৎ করে শব্দ হল। মনে হল কেউ একজন ব্রিজ হতে নদীতে লাফিয়ে পড়লো। গভির রাত বলে কিছুটা ভয় পেলাম। তারপরও দৌড়ে গিয়ে দেখি কেউ একজন নদীতে ডুবছে আর উঠছে। লাফিয়ে নদীতে পড়লাম। অনেক কষ্টে তাকে টেনে হিচড়ে তাকে নিয়ে পাড়ে উঠলাম। শরিরে আমার তখন একবিন্দু শক্তি ও অবশিষ্ট নেই।
হাপাচ্ছিলাম খুব। যাকে টেনে ডাংগায় উঠালাম তার দিক তাকিয়ে আমিতো পুরো থ! এ যে অপরুপ সুন্দরী এক নারী। নানান কসরত করে মেয়েটার মুখ দিয়ে কিছু পানি বের করলাম বটে কিন্তু তার জ্ঞান ফেরার কোন লক্ষনই দেখলাম না। আশে-পাশে কোন বাড়ী ঘড় ও নেই। কিযে করি? দিশাহারা অবস্থা।
ঠান্ডা হাওয়ায় দাতে কাঁপুনি লাগছে। মেয়েটাকে জোরে ঝাকুনি দিলাম। সে চোখ খুলে তাকালো। এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার চোখ বন্ধ করে ফেললো। আমি তাকে বোকার মত নানান প্রশ্ন করে গেলাম। যার একটারও উত্তর সে দিলনা। রাত বাড়তে ছিল। কি করবো বুঝতে পারতে ছিলাম না। শেষে খানিকটা বিরক্ত হয়ে বললাম আমার মনে হচ্ছে আপনি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন, দয়া করে উঠুন সামনের ঐ সদর রাস্তা পেরুলেই আমার বাসা। এই শিতের রাতে এখানে আরো কিছুকক্ষন থাকলে আমরা দুজনই তির্ব শিতে মারা পড়বো।
আমার কথা শুনে মেয়েটি উঠে বসলো। তাকে বিধস্ত লাগতে ছিল। সে কেপে কেপে বললো সরি আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। দয়াকরে ব্রিজের উপর থেকে আমার ব্যাগটা একটু এনে দিবেন।
ওরে কথা বলতে দেখে আমি হাফ ছেড়ে বাচলাম। দৌড়ে গিয়ে দেখি ব্রিজের উপর সত্যিই একটি বড় ব্যাগ পড়ে আছে। তবে চাকা লাগানো থাকায় স্বস্তি পেলাম। ব্যাগ আর অজানা নারী দুজনকে টেনে হিচড়ে যখন বাসায় ফিরলাম তখন রাত শেষের পথে। আমি পাশের ঘরে যাবার পূর্বে বললাম ভেজা কাপড় বদল করুন। সে ব্যাগ খুলে কাপড় বের করল।
বাসায় তখন বিদুৎ নেই, মোমের সিগ্ধ আলোয় তাকে দেখে আরেকবার মুগ্ধ হলাম। চাদের ও কলংক থাকে বলে শুনেছি, কিন্তু এই নারীর কোথাও কোন খুত নেই। এক কথায় অপরুপা। বেশ-ভুষা দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটা অনেক বড়লোক ফ্যমেলীর। আমি নিতান্ত্যই সাধারন একজন মানুষ। তাই ভেতরে ভেতরে যথেষ্ট বিচলিত। বুয়ার রান্না করা খাবার ছিল তাই তাকে খেতে দিলাম। সে বিনা দ্বিধায় খাবার খেলেন। তাকে ভারী অসহয় লাগতে ছিল। চোখে জ্বল টলমল করছিল। আমি বললাম আপনি বিশ্রাম নিন। অনেক ধকল গেছে আপনার মন আর শরিরের উপর দিয়ে।
সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম।
বেশ কিছুটা সময়
নিরবে কেটে গেল। তারপর সে বললো
-আপনাকে ধন্যবাদ। রাত বোধ করি বেশি নেই, এখন আর ঘুমুতে ইচ্ছে করছেনা। আপনাকে অনেক যন্ত্রনার মধ্যে ফেলে দিলাম।
আমি হাসলাম। বললাম এভাবে বোকার মত নদীতে লাফিয়ে পড়ার মানে কী? জীবনের প্রতি এতটা বিতৃষা জমলো কেন?
-আমিতো নদীতে লাফিয়ে পড়িনী! আমাকে ও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে!
বিস্ময়ে প্রায় চিৎকার করে বললাম কে? কে আপনাকে ধাক্কা দিলো?
বালির বাধের মতন তার হ^দয় যেন ভেংগে পড়লো। সে কান্না জড়ানো গলায় বললো ও ছিল আমার ভালোবাসার মানুষ। ফয়সাল।
ঃ কৈ আমিতো কাউকে দেখলাম না। ও ওড়না দিয়ে চোখ মুছে বললো আপনী হয়ত খেয়াল করেননী। ও দৌড়ে চলে গিয়েছে।
দির্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বাইরে তাকায় সে। ওর চোখের শূন্যতার এক সমুদ্র যেন। এমন রপবতী শুভ্র সুন্দর একজন নারীকে যে কেউ একজন নদিতে ধাক্কা মারতে পারে তা আমার বিশ্বাস হতে চাইছিলনা। বললাম অবিশ্বাস্য ঘটনা ! আপনার নামটা কিন্তু জানা হলনা।
সে এবার মৃদু হাসলো বললো আমার নাম মিথিলা। আর আপনী?
আমি নির্ঝর।
মিথিলা অন্যমনস্ক হয়ে বললো আপনারা পুরুষরা ভারী অদ্ভুদ। যার জন্য সব কিছু ছেড়ে-ছুড়ে চলে এলাম সে আমার গহনা আর টাকার বাক্স পেয়ে আমাকে ভুলে গেল। দুই বছরের ভালোবাসা যে তার নিখুত অভিনয় ছিল তা বুঝতে পারিনী। লোভের কাছে ভালোবাসার এমন লজ্বাজনক পরাজয় মানতে কষ্ট হচ্ছে। অপর দিকে আপনি জীবন বাজী রেখে আমায় পানি থেকে উঠালেন। মানস্মানের পরোয়া না করে নিজ ঘরে আশ্রয় দিলেন। কেন ফয়সাল এমন করলো?
এরপর মিথিলা আর কিছু না বলে কাঁদতে থাকে।
বাইরে ঝিঝি পোকা ডাকছে। ডাহুকের ডাকও শুনতে পেলাম। মিথিলা বলে আমার বাবা ঢাকার একজন বড় ব্যবসায়ী। তাই জীবনে যখন যা চেয়েছি তাই পেয়েছি। বাস্তবতা যে এতটা কঠিন আমি তা বুঝতে পারিনী। ফয়সালের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল মোবাইলে। একদিন হটাৎ করেই আমার মোবাইলে একটা সুন্দর মেসেজ আসে। এরপর প্রায়ই আসতে থাকলো, একদিন আমি কৌতুহলি হয়ে কল দিলাম। এভাবেই ওর সাথে আমার পরিচয়। দিন রাত সারন আমরা কথা বলতাম। এক সময় আমি ওর প্রেমে পড়ে গেলাম। ওর জন্যই আমি আমার সঞ্চিত সব কিছু নিয়ে চলে এসে ছিলাম। ওযে এতা নিখুত অভিনেতা আমি বুঝতে পারিনী। সব হয়ত ওর সাজানো ছিলো। প্রতারক!
মিথিলা আবার জ্ঞান হারালো। কিছুকখন পর তার জ্ঞান ফিরলো। সে প্রলাব করে বললো আপনী কেন আমাকে বাচালেন। আমার তো মরাই উচিৎ ছিলো। বাসা থেকে বের হবার সময় চিঠি লিখে এসে ছিলাম। এখন কোনমুখে আবার ওখানে ফিরে যাব।
আমি তাকে কি শান্তনা দিবো ভেবে পেলামনা। চুপ করে রইলাম। কিছুকক্ষন পর বললাম পৃথিবীটা ভারী অদ্ভুদ এখানে কেউ সারা জীবন ভালোবাসা খুজেও পায়না, আবার কেউবা ভালোবাসা পেয়েও তা চায়না! দুরের মসজিদ থেকে আজানের সুমধুর শব্দ ভেষে আসে। আমি টুপি পড়ে বলি আপনি বিশ্রাম নিন। আমি নামাজ পড়তে যাচ্ছি।
নামাজ শেষে হেটে আসছিলাম আর ভাবতে ছিলাম একটা নারীর ভালোবসার চেয়ে কি করে গহনার মূল্য বেশি হয়? ভালোবাসা কি তবে ইদানীং মূল্যহীন হয়ে পড়ছে? ধিরে ধিরে আলো বাড়ছে। পৃথিবীটা আালোকিত হয়ে উঠছে। এই আলো পারবে কি আমার জীবনের সকল আধার গুলোকে ঢেকে দিতে।
ঘড়ে ঢুকে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। কোথাও কেউ নেই। মিথিলার ব্যাগটাও খুজে পেলাম না। কেন জানিনা আমার মন অকারনেই খুব খারাব হয়ে গেলা। চারপাশটা কেমন শূন্য শূন্য মনে হলো। পড়ার টেবিলে একটা কাগজ খুজে পেলাম। মিথিলা লিখেছে
প্রিয় নির্ঝর,
আমি খুবেই দু:খিত আপনাকে না বলে অকৃতজ্ঞর মত চলে যাচ্ছি । আপনার সাথে কাটানো এই সময়টুকু আমার সারা জীবন মনে থাকবে। আপনী আমায় নতুন জীবন দিয়েছেন। আমি এখন বুঝতে পারছি কখনো কাউকে খুব বেশি ভালোবাসতে নেই তাতে মানুষ বোকা হয়ে যায় যেমনটা হয়ে ছিলাম আমি। আমি জানি সকাল বেলা যখন আপনার ঘরে লোকেরা আমাকে দেখতো তখন আপনাকে নিয়ে নানা বাজে কথা বলতো আমি তা চাইনী। আপনী ভালো থাকুন। জানিনা আমি কোথায় যাচ্ছি। তবে হয়ত কোন একদিন আমাদের আবার দেখা হয়ে যেতে পারে। অথবা নাও হতে পারে।
মনটা আরো বেশি খারাব হলো মিথিলার চিঠি পড়ে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



