লালনের একটা কথা আমার মনে খুব ধরেছিল একবার। এখনও মনে ধরে আছে। সুযোগ পেলেই পেড়ে খাই। কথাটা হল, “যার মর্ম সে যদি না কয়, সাধ্য কার কে জানিতে পায়?” আমার ১০ম পোস্টের এই আত্মকথন অনেকেরই চোখে লাগবে তা আমার জানা আছে। অনেকেই নির্লজ্জ আত্মপ্রচারের অভিযোগ আনবেন আমার বিরুদ্ধে। আচ্ছা, আত্মপ্রচার না চাইলে তো লেখাগুলো MS-Word এ লিখে রেখে save করে রাখলেই পারতাম, তাই না? আমরা ব্লগে আত্মপ্রচার চাই, প্রশংসা চাই, প্লাস চাই, সহমত বা সমমনা মানুষের সমর্থন চাই আর তা সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমার আবার হাত বা মাথা কোনটাথেকেই সহজে লেখা বেরোতে চায় না! অনেকেই দেখলাম আমার সাথে বা আমার পরে শুরু করেও আমাকে ছাড়িয়ে গেছেন অনেক আগেই। অবশ্য এমনও অনেকে আছে, যারা একেবারেই কিছু শুরু করে নি। তারা অনেকেই আবার লেখার জন্য ব্লগে আসেন নি অথবা নিয়মিত ব্লগার নন। সুতরাং একজন নিয়মিত ব্লগার হিসেবে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ১০ম পোস্টে এসে এটাকে আমার একটা সেলিব্রেশনের যোগ্য মুহূর্ত বলেই মনে হচ্ছে! মনে হচ্ছে এই পোস্টে কিছু আত্মকথন চালানো যায়!
ব্লগে আমি যে পোস্টগুলো দিয়েছি, তার মধ্যে, “যার যা খুশি ভাবার স্বাধীনতা আছে” ট্যাগের লেখাগুলো আমার শুরু করার কথা অন্তত দেড়-দু’ বছর আগে থেকে। অনেককেই বলেছিলাম, ২০০৮ এর বই মেলায় লেখাগুলো ছাপাবো। উৎসাহও পেয়েছিলাম! কিন্তু আমার অলস-অনুর্বর মাথা থেকে সময় মত কিছু বেরোয় নি। আবার অনেক কথাই শুধু লিখতে হবে এই ভয়েই লেখা হয়ে ওঠে নি! এখন মনে হয়, অন্তত সাত-আটটা পোস্ট হতে পারতো সেসব লেখা নিয়ে! এভাবেই আমি অনেক কবিতাও হারিয়েছি গত সাত বছরে। হ্যাঁ, সাত বছর! আমার মার মৃত্যু থেকে সাত বছর! আমার লেখার ব্যাপারে তার আগ্রহ উৎসাহের কমতি ছিল না, অনেক সময় আমার চেয়ে বেশিই ছিল! এখন সে নেই, উৎসাহও নেই, তাই লেখাও নেই! ব্লগে প্রতিটা লেখার পেছনেই আপনাদের উৎসাহ আমাকে একটা লেখার পর আরেকটা লেখা দিতে অনেকটা লোভী করে তুলেছে বলা যায়! নইলে আজকে ১০ম পোস্টে আত্মকথনের এই সুযোগই তৈরি হত না!
সামহোয়ারইনে রেজিস্ট্রেশনের ২৪ ঘন্টার মধ্যে ফ্রন্ট পেজে এক্সেস পাবার ঘটনা সাধারণ নাকি রেয়ার সেটা জানা নেই। কমেন্ট করার সুযোগটা পেলাম সেটাই আসল! কালপুরুষ, নাজনীন খলিল, নুশেরা, ভাঙা পেন্সিল, কঁাকন, অচেনা সৈকত, রুহুল্লাহ, আশরাফ মাহমুদ, লিপিকার,ক-খ-গ - এদের লেখা পড়ে কমেন্ট করা যাবে না সাত দিন, ভাবা যায়? পরে দেখলাম নাপীষের ধাতব কোবতে, প্রতিফলনের বরুণায় প্রতিফলন, ফারুক আহসানের যুক্তির ফ্যালাসি........., ফ্রেড কুইম্বির জেরী(নাকি জেরীর ফ্রেড কুইম্বি?), ক্ষণে ক্ষণে রং বদলানো সাইফুর, স্বঘোষিত নরাধম- মনে হল কমেন্ট করার জন্যেই এদের ব্লগে বার বার ঢুঁ মারা উচিৎ! কিছু সময়ের জন্য আমার ব্লগে পাওয়া ব্লগার বিষাক্ত মানুষ, তোমার বৃষ্টিতে হাটি, ঝকমারী, বিষাক্ত আলো, মেঘাচ্ছন্ন, ছন্নছাড়ার পেন্সিল, নাঈম, অচন্দ্রচেতন, যীশূ, শয়তান, পারভেজ, অদ্ভুত আঁধার এক- এদের কাওকেই আমি ধরে রাখতে পারিনি আমার লেখায়। আমার ব্যর্থতা!
আমি রাস্তায় হাঁটি, কারণ ঘরে আমি খুব দ্রুত হাঁপিয়ে উঠি। অনেকে আমাকে বিয়ে করার পরামর্শ দিয়ে ফেলেছেন! আমি এই ভুল করার আগে বহু বছর শুধু ভাবনার জন্যই রেখে দিতে চাই। আমি দেখেছি ঘরে ভালোবাসার অনেক মানুষের ভীড়েও একাকিত্ব আমাকে ঘিরে ধরে। আসলে পারিবারিক রীতিনীতি, প্রথাগত সামাজিকতার কথা আমার কাছে বেহুদা প্যানপ্যানানী ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। তোমাকে এটা করতে হবে ওটা করতে হবে, নইলে বংশের মান সন্মান থাকে না- শুধু অন্যের ইচ্ছা পূরণের জন্যই যদি বাঁচবো, তবে নিজের জন্য বাঁচবো কবে? আমার চারপাশের মানুষকে আমি দেখি, কত সহজেই অভিনয় করে চলেছেন নিজের এবং অন্যের সাথে! ভালোবাসার শর্তে গড়ে ওঠা বন্ধনে আমি তো কোন ভালোবাসা খুঁজে পাইনি কখনো! আমি দেখেছি সম্পর্ক টিকে থাকে শুধু স্বার্থের শর্তেই! আর বিনিময়ে চলে দীর্ঘ একঘেয়ে ভালোবাসার অভিনয়! এই অভিনয়কে আমি ভয় পাই, ঘৃণা করি! তাই রাস্তায় হারিয়ে যাই অচেনা মানুষের ভীড়ে, যাদের সাথে অভিনয় করতে হয় না! আমার মনে হয়েছে, ঘরের ভেতরে সুখ আর ভালোবাসার নাটকের স্থায়ীত্ব নির্ভর করে ঘরের বাইরে মানুষের সাফল্যের ওপর। মনে হয় সে কারণেই বাইরে মানুষ খুবই নির্দয়, খুবই লড়াকু এক যোদ্ধা! এক মুহূর্ত ছাড় দিতে প্রস্তুত নয় সে কাওকেই! মানুষের জীবনের হারানো অনেক টুকরো গল্প আমি খুঁজে পাই পথে, যার অনেকগুলোই পেতে পারতো একটা সুন্দর রূপ! প্রতিদিনের লড়াইয়ের মাঝে ঝরে যাওয়া সেসব গল্পের কিছু কিছু আমি তুলে আনি আমার পোস্টে। আমি জানি মুক্তি বা শান্তি আসলে কোনখানেই পাওয়া যায় না! তাহলে বেঁচে যাওয়া স্বাধীনতাটুকু ঘর বেঁধে হারাবো কেন?
স্বাধীনতা আমার ভালো লাগে। ভালো লাগে বেঁচে থাকতে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আমি আলাদা আলাদা ভাবে অনুভব করতে চাই এবং করিও। ভাঙাচোরা ঘুণেধরা এই সময়টা আমাকে ভাবিয়ে তুললেও আমাকে ছাপিয়ে যেতে পারে নি। আমার স্বপ্নকে কেড়ে নিতে পারে নি। লড়াইয়ের আশা নিয়ে, পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে তাই বেঁচে আছি গোঁয়ারের মত! আমার এই স্বপ্ন, এই অনুভূতির মৃত্যু শুধুই মৃত্যুর পরোয়ানায়!
ভালো থাকবেন সবাই!
***দুঃখিত এত লম্বা একটা পোস্টে আত্মকথনের জন্য! ধন্যবাদ আত্মকথন পড়ার জন্য!
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১২:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



