আজ রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর। ২০০৬ সালের এই দিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনায় প্রাণ হারায় ১৩ জন। এদিন রাজধানীর পল্টনে রাজপথে আঘাতের পর আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যার পর লাশের বুকে দাঁড়িয়ে উল্লাস প্রকাশের নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। এই পৈশাচিক উল্লাসের ছবি দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ার পর সর্বত্র নিন্দা ও ধিক্কারের ঝড় বয়ে যায়। এর পথ ধরে বাংলাদেশে ঘটে অনেক পটপরিবর্তন।
রাজধানী ঢাকার পল্টনে নারকীয় এ ঘটনা ঘটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের এক দিন আগে। তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ দিন ঘোষণা করা হয় লগি-বৈঠা দিবস। এ দিন রাজধানীতেই জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের ছয়জন এবং ছাত্র মৈত্রীর একজন কর্মী প্রাণ হারান। লগি-বৈঠার নির্মম প্রহার, গুলিবর্ষণ আর ইটপাটকেলের আঘাতে রাজধানীর পল্টন এলাকায় নিহত হন ছয়জন। প্রকাশ্যে পিটিয়ে মানুষ হত্যার পরে লাশের ওপর উঠে নৃত্যের দৃশ্য সারাবিশ্বকে হতভম্ব করে দেয়।
অবরোধ কর্মসূচিকে ঘিরেই এই হতাহতের ঘটনা ঘটে। প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে রাস্তায় মহড়া দিতে দেখা যায় পেশাদার সন্ত্রাসীদের। এই সহিংস ঘটনায় যারা অংশ নিয়েছে, প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে এবং লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে যারা মানুষ খুন করেছে তাদের কেউই গত এক বছরে গ্রেফতার হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওইসব পেশাদার সন্ত্রাসী এখনো বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছবি দেখে তাদের নাম-পরিচয় বের করে নিহতদের স্বজনরা পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের অবহিত করেছে, এমনকি খুনিদের বাড়ি চিনিয়ে দেয়া হয়েছে; তার পরও তাদেরকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না।
২৮ অক্টোবর এখন পল্টন হত্যা দিবস হিসেবেই পরিচিত। ওইদিন ছিল ১৪ দলের অবরোধ কর্মসূচি। এই অবরোধ কর্মসূচিকে ঘিরেই সারাদেশে সহিংস ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি হিসেবে সকাল থেকেই লগি-বৈঠা নিয়ে রাজধানীর গুলিস্তান, জিপিও মোড়, পল্টন মোড়, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ও এর আশপাশ এলাকায় আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকে। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি হিসেবে তৎকালীন জোট সরকারের অংশীদার জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে এক সমাবেশের আয়োজন করে। দুপুর ১২টার দিকে হাজী সেলিমের নেতৃত্বাধীন একটি মিছিল থেকে প্রথমে জামায়াতের সমাবেশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। এরপর শুরু হয়ে যায় সংঘর্ষ। একপর্যায়ে মুক্তাঙ্গনে আওয়ামী যুবলীগের সমাবেশ থেকে মাইকে ঘোষণা দেয়া হয় জামায়াতের সমাবেশে হামলা করার জন্য। ১৪ দলের কয়েক হাজার নেতাকর্মী জামায়াতের সমাবেশ লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। একপর্যায়ে জামায়াতের কয়েকজনকে ধরে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হতাহত করা হয়। এতে পল্টন এলাকার ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছয়জন এবং ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্র মৈত্রীর একজন। জামায়াত-শিবিরের নিহত নেতাকর্মীরা হলেন মোজাহিদুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন (১), জসিম উদ্দিন (২), গোলাম কিবরিয়া শিপন, ফয়সাল ও হাবিবুর রহমান।
প্রকাশ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের উপস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষের সামনে তাদের লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। দুর্বৃত্তদের জসিম উদ্দিনসহ অনেককে বাঁশের লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করতে দেখা যায়। এরপর তারা নিহতদের লাশের ওপর উঠে উল্লাস করে। লাশের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে নৃত্য করে। পল্টন এলাকায় আহত সাইফুল্লাহ মোঃ মাসুম ঘটনার দু’দিন পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। একই ঘটনায় পল্টন মোড়ে নিহত হন ছাত্র মৈত্রীর খিলগাঁও থানা সাধারণ সম্পাদক রাসেল খান। সহিংস ঘটনায় পল্টন ও এর আশপাশ এলাকাতেই আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১ হাজার মানুষ।
এই হতাহতের ঘটনায় রাজধানীর পল্টন থানা ও শাহবাগ থানায় পৃথক পাঁচটি মামলা দায়ের হয়। পল্টন থানায় মামলা দায়ের করেন পল্টন থানা জামায়াতের আমীর এ টি এম সিরাজুল হক। পল্টন থানার মামলা নম্বর ৬১, তারিখ ২৯-১০-২০০৬। এই মামলায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল, তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিম, আবদুর রাজ্জাক, জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেননসহ ওয়ার্কার্স পার্টির ৪০ জনসহ সহস্ত্রাধিক আসামি করা হয়। আহত মাসুম মারা যাওয়ার পরে ৩ নভেম্বর আরেকটি এজাহার দাখিল করা হয়। এই এজাহারে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও যুবলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৩ জনসহ দুই শতাধিক লোককে আসামি করা হয়। এই অভিযোগপত্রটি দাখিল করেন মাসুমের ভাই মোঃ শামসুল আলম মাহবুব। অপর দিকে রাসেল খান নিহত হওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ মোট ১০ জনকে আসামি করে পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলার বাদি হয়েছেন ঢাকা মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান। মামলায় ৬১ নম্বর মামলার বাদি সিরাজুল হককেও আসামি করা হয়। এ ছাড়া সহিংস ঘটনায় আহত মিজানুর রহমান, রেজাউল করিম এবং অপর এক আহত আমানুর রহমান আমানের পক্ষে আবদুর রাজ্জাক বাদি হয়ে পল্টন থানায় আরো পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেন। আশরাফুজ্জামান নামের অপর এক আহত ব্যক্তি রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলার বর্তমান অবস্থা
পল্টন থানায় দায়েরকৃত ৬১ নম্বর মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য বর্তমানে ডিবি পুলিশের হাতে ন্যস্ত রয়েছে। মামলাটির চারজন তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে ডিবি’র এসআই মনির হোসেন তদন্ত করছেন। এই মামলার প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন পল্টন থানার এসআই আশরাফ। পরে মামলাটি ডিবি পুলিশের হাতে ন্যস্ত হওয়ার পর এসআই এনামুল হক মামলাটির তদন্ত করে আদালতে শেখ হাসিনাসহ মোট ৪৩ জন এজাহার নামীয় আসামিকে অভিযুক্ত করে একটি চার্জশিট দাখিল করেন। তাদের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদসহ মোট ২০ জনকে চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তার অধিকতর তদন্তের আবেদনে পুনরায় মামলাটির তদন্তভার ডিবি পুলিশের ওপর ন্যস্ত হয়। আদালত থেকে সময় দেয়া হয় এক মাসের। এনামুল হকের পরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত হন ডিবি’র ইন্সপেক্টর রবিউল আলম। জানা গেছে, তিনি মামলা তদন্তের শেষ পর্যায়ে আসার পরে তাকে বদল করে মামলাটির তদন্ত দেয়া হয় মনির হোসেনকে। এভাবে মোট চারবার আবেদন করে সময় বাড়ানো হয়। কিন্তু এখনো মামলার তদন্ত শেষ হয়নি। মামলার বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা মনির হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, তিনি মামলাটির তদন্ত করে যাচ্ছেন। বাদির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করছেন এবং বাদিকে আরো সাক্ষী নিয়ে আসার জন্য বলা হয়েছে। ডিবি’র যুগ্ম কমিশনার আবদুল জলিল নয়া দিগন্তকে জানান, মামলাটির অধিকতর তদন্তের জন্য ডিবিতে ন্যস্ত রয়েছে এবং তদন্তের কাজ চলছে। ডিবি’র ডিসি গোলাম কিবরিয়ার অধীনে এই মামলাটির তদন্ত চলছে। তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, মামলার তদন্ত চলছে। কবে নাগাদ চার্জশিট দেয়া হতে পারে সে সম্পর্কে গোলাম কিবরিয়াকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, মামলাটির তদন্ত এখনো চলছে।
পল্টন থানায় মিজানুর রহমান, রেজাউল করিম ও আবদুর রাজ্জাকের দায়ের করা মামলায় ইতোমধ্যেই চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে। এই মামলা তিনটিতে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের কেন্দ্রীয় কোনো নেতাকে আসামি করা হয়নি বলে জানা যায়। শাহবাগ থানায় দায়েরকৃত মামলাটির তদন্ত করছেন এসআই মাহবুব। এই মামলায় হাজী সেলিম, এইচ বি এম ইকবাল ও সাঈদ খোকনসহ মোট ৩১ জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলাটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই মামলার চার্জশিট দেয়া হবে।
গ্রেফতার হয়নি সন্ত্রাসীরা
২৮ অক্টোবর যেসব সন্ত্রাসীকে আগ্নেয়াস্ত্র ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র উঁচিয়ে রাজপথে মহড়া দিতে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো সন্ত্রাসী গ্রেফতার হয়নি। যাদেরকে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা করে উল্লাস করতে দেখা গেছে, তারা এখনো প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুরানা পল্টনের ফারুকসহ অনেককে ঘটনার দিন অস্ত্র উঁচিয়ে সহিংস ঘটনায় অংশ নিতে দেখা গেছে। বাপ্পা দীপ্ত বসু নামের একজনকে মৃত মানুষের লাশের ওপর উঠে উল্লাস করতে দেখা গেছে। কিন্তু গত এক বছরে এই নৃশংস ঘটনার সাথে জড়িতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কেউ গ্রেফতার হয়নি।
পুলিশ সূত্র জানায়, মামলায় আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের শীর্ষ নেতারা জামিনে রয়েছেন। এদিকে পল্টন থানার ৬২ নম্বর মামলায় জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ মোট ১০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট প্রদান করা হয়েছে। জামায়াতের নেতারাও জামিনে রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই মামলার কার্যক্রমের ওপর উচ্চতর আদালত থেকে স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে। আসামিদের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী অ্যাডভোকেট এস এম কামাল উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেছেন, ৬২ নম্বর মামলার আসামি সিরাজুল হক হচ্ছেন ৬১ নম্বর মামলার বাদি। এ কারণেই ৬১ নম্বর মামলাটির চার্জশিট না হওয়া পর্যন্ত ৬২ নম্বর মামলার কার্যক্রমের ওপর স্থগিতাদেশ প্রদান করা হয়েছে।
লেখাটির সূ্ত্র।
"২৮ শে অক্টোবর: বর্বরতার একটি দিন" -সংশ্লিষ্ট আরেকটি লেখা পড়ুন এখানে ক্লিক করে।
'লাশে দাঁড়িয়ে উল্লাস করার ঘৃণ্য দিন আজ'-আবু সালেহ আকন
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
২৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন
বিএনপির আবালীপনা।


চলতি পথের গল্পঃ দুই

‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।
এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক
‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।