অধ্যাপক জাফর ইকবালকে নিয়ে সমাজে বিশেষত এই ব্লগে আলোচনা সমালোচনার শেষ নাই। তাঁর সম্পর্কে কথা উঠলে আমরা সহজেই দুটো বড় ভাগে ভাগ হয়ে কথা বলতে দেখি। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। আসলে ভেবেছি মূলত সমাজে ব্যক্তির ভুমিকা কী হতে পারে তা নিয়ে। সমাজে ব্যক্তির ভুমিকা অর্থাৎ ব্যক্তি যে কাজটা করে সমাজের কথা ভেবে, নিজের লাভ লোকসান টাকাপয়সা কামানো ওখানে একেবারেই গৌণ; পুরানো দিনের ভাষায় বললে, যখন আমাদের সমাজে এনজিওর দৌরাত্ম শুরু হয়নি তখন, আমরা বলতাম দাতব্য বা জনহিতৈষীমূলক কাজ। মূলত এগুলো ভলিনটিয়ারি কাজ, এনজিও আবির্ভাবের আগে আমাদের সমাজে এগুলো তাই ছিল, এখন এনজিও এলোমেলো করে দিয়েছে তবু তারপরেও এখনও অনেক কিছু জীবিত সচল আছে।
এসব সামাজিক জনহিতৈষীমূলক কাজকে আবার দুইভাগে ভাগ করে দেখতে পারি: সরাসরি রাজনীতি বা রাজনৈতিক কাজ ও সামাজিক কাজ। সামাজিক কাজ মানে জনসচেতনতামূলক, যেমন ডা. ইব্রাহিমের ডায়াবেটিক সচেতনতা আন্দোলন, লাইব্রেরি বা বই পড়া, স্বাস্হ্য আন্দোলন, বাচ্চাদের টীকা খাওয়ানো ইত্যাদি।
অনেকের ধারণা হতে পারে রাজনীতি বা রাজনৈতিক কাজের সাথে তুলনায় সামাজিক কাজগুলো নিরামিশ ধরণের এর কোন রাজনৈতিক মানে নাই। কথা ঠিক সত্যি না; সব কাজেরই একটা রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকে, সে হিসাবে সামাজিক কাজেরও একটা রাজনৈতিক মানে, চাইলে ওর রাজনৈতিক রংও জানা সম্ভব; তা সত্ত্বেও এগুলো অপ্রত্যক্ষ, সামাজিক গঠনমূলক কাজের দিকটাই ওখানে মুখ্য পরিচয়।
এখন ব্যক্তি ভলিনটারিলী সামাজিক ভুমিকা রাখতে রাজনৈতিক বা সামাজিক যেকোনটা বেছে নিতে পারেন, আমরা তাই হতে দেখি। অনেকের ধারণা, সমাজে রাজনৈতিক ভুমিকাটা সামাজিক ভুমিকামূলক কাজের চেয়ে বেশি অবদানমূলক। এধারণা সত্যি না। সমাজের প্রয়োজনের দিক থেকে কোনটার চেয়ে কোনটা খাটো না, একেবারেই না। তবে রাজনৈতিক কাজের প্রভাবটা যতটা ঢাকঢোল পিটিয়ে হাজির হয়, সামাজিক কাজের প্রভাবটা যেন ততটাই সঙ্গোপনে সমাজের গঠন তন্তুতে হাজির থাকে, টের পেতে চাইলেই কেবল বুঝা সম্ভব।
তবে আমাদের সমাজে একই ব্যক্তির ভিতরে এই দুই ভুমিকাও দেখি এবং দুই ভুমিকাকে আলাদা আলাদা করে চেনাও সম্ভব।
সমাজে ব্যক্তির ভুমিকা নিয়ে এই আলাপের আলোকে অধ্যাপক জাফর ইকবালকে নিয়ে আমার নিচের কথাগুলো সাজিয়েছি।
________
অধ্যাপক জাফর ইকবাল দীর্ঘদিন বিদেশে শিক্ষা, চাকরি সহ নানা কিছু অর্জনের পর দেশে ফিরেছেন। সচরাচর ঘটে না এমন একটা ঘটনা বটে এটা। সমাজে ব্যক্তির ভুমিকা কী হতে পারে বা কী ভুমিকায় তিনি নিজেকে নিজের সমাজে দেখেন -
এ নিয়ে তিনি কী তখন ভেবেছিলেন আমরা একেবারে স্পষ্ট না জানলেও এটা আজ পরিস্কার যে সে ভাবনা বড় অগোছাল রেখেছিলেন তিনি। অথচ দেশে ফিরে তাকে সবার আগে ঠান্ডা মাথায় নিজের সাথে বসে ঠিক করতে হত তিনি ঠিক কী করতে চান, কি পরিচয় তিনি সমাজকে দিতে চান: সামাজিক গঠনমূলক কাজের কর্মী, না রাজনৈতিক কাজের কর্মী।
তিনি এমনভাবে দুটোই করতে গিয়েছেন যে বিবাদের শুরু এখান থেকেই।
যদিও দুটোই একসাথে করা সম্ভব, যদি যোগ্য কর্তা হন।
আজকে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, সামাজিক গঠনমূলক কাজে তিনি যতটা স্বীকৃত, গ্রহণীয়, আদরণীয়, রাজনৈতিক কাজের জন্য ঠিক বিপরীতে তিনি নিজেকে বিতর্কিত, ম্লান করে ফেলেছেন।
সম্ভবত গোলমালের প্রধান কারণ হলো, রাজনীতিকে জ্ঞানের বিষয় হিসাবে সিরিয়াসলি একে তাঁর কখনই নেয়া হয় নাই। এটা তাঁর দোষের নয়, কারণ রাজনীতি তাঁর চর্চা বা পেশার বিষয় নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও আধাখেচড়া রাজনৈতিক ভুমিকা রাখতে গিয়ে সামাজিক গঠনমূলক কাজে যে পরিচয় তিনি গড়ে ছিলেন তাতেই কাদা মাখিয়ে ফেলেছেন।
আবার, রাজনীতি আর দলবাজি যে এক জিনিষ নয় - এই ফারাক বজায় রাখতেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, একেবারেই সতর্ক নন তিনি।। যদিও আবার তিনি ব্যাপারটা একেবারেই বুঝতেন না তা নয় বলেই আমার মনে হয়।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনী্তির নামে খাঁটি দলবাজি ও পেটিস্বার্থের লড়াই চলে, আমরা সবাই জানি; শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ করতে গিয়ে এব্যাপারে অসতর্কতার কারণে এমন ফ্যারে তিনি আটকে যান যে ও থেকে বের হতে গিয়ে কখন নিজের গায়ে বাজে রং লাগিয়ে বসে আছেন তিনি টেরও পাননি। তাঁর ব্যবহারিক সমস্যার শুরু এখান থেকে।
পত্রিকার কলাম তিনি লিখতেই পারেন তবে ওর বিষয় রাজনীতি - এটা বেমানান। কারণ রাজনীতিকে তিনি সিরিয়াস জ্ঞানের বিষয় হিসাবে কবুল করেন নি, সবাইকে করতেই হবে এমনও কোন কথা নাই। যে বিষয় নিয়ে যথেষ্ট ভাবেন নি, তৈরি নন, একে হাল্কা করে নিতে গেলে হিতে-বিপরীত হবারই কথা; ওর আঁচে, তার সামাজিক পরিচয় কাজের সঞ্চয় ধুলায় লুটানোরই কথা । দুঃখজনকভাবে তাই হয়েছে।
এটা আরও বেশি বিপদজনক হয়ে গেছে কারণ, আমাদের সমাজ গঠনের জন্য গুরুত্ত্বপূর্ণ এমন বহু বহু রাজনৈতিক বিষয়, আমরা না চাইলেও, সেগুলো অমীমাংসিত হয়ে আছে, ফলে সমাজ বড় বড় ধরণের বিভক্তিতে ডুবে আছে, সোজা লাইন টেনে এটা ভাগ হয়ে আছে। এই পরিস্হিতিতে কেউ যদি টের পায় তিনি রাজনীতিকে জ্ঞানের বিষয় হিসাবে সিরিয়াসলি নেননি, সবাইকে নিতে হবে এমনও কোন কারণ নাই - তাহলে রাজনৈতিক উঁকি দেওয়া কোন কাজ, পদক্ষেপ মারাত্মক হতে বাধ্য। কারণ, ওনার চিন্তা ও নিজের সামাজিক ভুমিকা সম্পর্কে ভাবনা, মানসিক প্রস্তুতি - এই পরিস্হিতির সাথে সামজ্ঞস্যপূর্ণ নয় বলে তাঁর এসব ফাঁদ এড়িয়ে নিজের সামাজিক ভুমিকায় মনোনিবেশ, কাজের জায়গা বের করে নেওয়া হত বুদ্ধিমানের কাজ। অথচ এই বৈপরীত্য নিয়েও তিনি হাটতে গিয়েছেন।
বাংলাদেশের বিশেষ পরিস্হিতিতে সামাজিক ভুমিকা রাখতে ও কার্যকর নিজের শ্রম অনুযায়ী সফলতা পেতে গেলে (যেমন গণিত আন্দোলন) রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে দূরে থাকতে হবে, আর না হলে রাজনীতিকে সিরিয়াস জ্ঞানের হিসাবে গ্রহণ করতে হবে; আমাদের মারাত্মক বিভক্ত সমাজে, মাঝামাঝি কোন পথ নাই, সমাজ রাখে নাই।
এজন্য যতদিন যাচ্ছে তিনি নিজেকে ম্লান করে ফেলছেন; আমরাও তাঁর সম্পর্কে আমাদের ভাল লাগা বোধগুলো ধরে রাখতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। শুধু আপনার পোষ্টেই নয়, জাফর ইকবালের প্রসঙ্গ উঠলেই আমাদের সবার এই দশা হয়।
এটা আজও অপরিস্কার এ থেকে আমরা মুক্তি পাব কিনা।
মানুষের সামাজিক কাজ, ভুমিকা আমাদের সমাজে রাজনৈতিক ভুমিকার চেয়েও বিশাল গুরুত্ত্বপূর্ণ হতে পারে - একথা কী আমরা তাকে বুঝাতে পারব? আমার জানা নাই!
ফুটনোট: এত জিনিষ থাকতে গণিত কেন তিনি বেছে নিলেন? কেন মনে হলো, গণিতে নতুন প্রজন্মকে আগ্রহী করা দরকার?
আমাদের সমাজে অনেকে মনে করেন, ধর্ম মানুষকে কুপমন্ডুক করে রেখেছে; এই কুপমন্ডুকতা মুক্ত করতে বিজ্ঞানের জুড়ি নাই। তাই সেখান থেকে ভাবনায় মিলিয়ে সমাজকে বিজ্ঞানমনস্ক করতে তাগিদ অনুভব করেন।
সাধারণভাবে বললে সমাজের তরুণ প্রজন্মকে ভাবনা চিন্তায়, বিজ্ঞানে আগ্রহী করার প্ররোচিত করার খুবই দরকার আছে, এছাড়া মুখস্ত বিদ্যার কালচার থেকে বের করে আনাও দরকার। এসবের প্রভাব হবে নিঃসন্দেহে খুবই ইতিবাচক।
কিন্তু একাজের উদ্যোক্তাদের যদি মনে হয়ে থাকে তাদের এই উদ্যোগের মুল লক্ষ্য হোল এই যে, সমাজকে ধর্ম বা ধর্মের কুপমন্ডুকতা মুক্ত করতে তাঁরা একাজ হাতে নিয়েছেন; ধর্মের বিপরীতে এজন্য বিজ্ঞানকে খাড়া করতে চান তাঁরা - ফলে তাদের শ্রমের অগ্রগতি মাপবেন এখান থেকেই - তবে দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, তাঁরা যে বড় রকমের হতাশ হবেন এটা আগেই বলা যায়। আমি স্পষ্ট জানি না এই ধরণের ভাবনা বা rationale তে তাঁরা ভুগছেন কি না? না ভুগলে সবচেয়ে ভাল; তাদের অবদান সমাজে অগ্রগতি আনবে, অবশ্যই। আমি তাদের প্রশংসা করি।
আর যদি সে ধরণের ভাবনা বা rationale তে ভুগেন তবে, জ্ঞানের জগতে ধর্ম ও গণিতের সম্পর্ক কী এসম্পর্ক কিভাবে কতটুকু তা টানা সম্ভব, নাকি আদৌ তা সম্ভব নয় একটা আর একটার পিঠে দাড়িয়ে আছে তাই - এসব বিষয়ে আগে ভাবনা চিন্তা করতে বলব। এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর সমাধান হাতে পাবার আগে ওসব ভাবনা আপাতত তুলে রাখাই ভাল। ওসব ভাবনা বা rationale না টানতে পারলেও তো সামাজিক কাজ করা যায় এবং তা সমাজের জন্য বিশাল গুরুত্তপূর্ণও বটে।
[এই লেখার মাঝের কিছু অংশ আগে অন্য এক পোষ্টের মন্তব্য হিসাবে লিখেছিলাম।]
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ১২:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



