সমাজের কেউ কেউ নিজেদের সুশীল সমাজের সদস্য বলে ডাকে, পরিচয় দিতে পছন্দ করে। আমরাও কাউকে সুশীল বলি। প্রথম ক্ষেত্রে বক্তার সুশীল শব্দটার ব্যবহার ইতিবাচক অর্থে আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে একই সুশীল শব্দের ব্যবহার নেতিবাচক অর্থে; তবে এখানে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, ঠাট্টাচ্ছলে ইতিবাচক শব্দটা ব্যবহারের কারণে অর্থ হয়ে গেছে নেতিবাচক। কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই সুশীল শব্দটা গালাগালির শব্দ নয়।
কাউকে খারাপ বলা যেমন গালাগালি নয় তেমনি কাউকে সুশীল বলাও গালাগালি নয়, হওয়ার কোন কারণ নাই। এবং অবশ্যই শব্দটা ‘খারাপ’ শব্দের মতই নেতিবাচক। পাঠক নিশ্চয় মানবেন, নেতিবাচক শব্দ আর গালাগালির মধ্যে একটা বড় ফারাক আছে; মনের ভাব প্রকাশের জন্য কখনও আমাদের নেতিবাচক শব্দের দরকার হয়, দরকার আছে। এতে পাঠক-শ্রোতাও বক্তার মনের ভাব বুঝতে পারে ও মেনে নেয়; কিন্তু একই কথা গালাগালি শব্দ দিয়ে বললে বুঝতে পারে বটে, কিন্তু মানতে, শুনতে গিয়ে পাঠক-শ্রোতা একটা অস্বস্তিতে ভুগে। তাই অপছন্দ করে।
‘সুশীল’ আমাদের ভাষার জগতে ঘোরতর ইতিবাচক শব্দ, শব্দের অরিজিন হিসাবেও এর অর্থ ইতিবাচক; এর অর্থ - ভাল রকমভাবে শালীন, ভদ্র ইত্যাদি। কিন্তু গত তিন বছরে বাংলাদেশ যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে তাতে আমাদের ভাষার জগতে সুশীল শব্দটা মুলত ইতিবাচক হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক ভাষা হিসাবে অর্থ দাড়িয়েছে নেতিবাচক। কারণ বিদেশী স্বার্থের সাথে নিজের চিন্তায় গাঁটছাড়া বেধে মঈন-ফকুরুদ্দিনের সরকারের স্থানীয় প্রকাশ্য সমর্থক হিসাবে সমাজের কিছু ব্যক্তি-এলিমেন্ট নিজেদেরকে নামকরণ করেছিল সুশীল সমাজ, ইতিবাচক অর্থেই; দাতাদের ডকুমেন্টে যাকে ইংরাজীতে সিভিল সোসাইটি বলা আছে ওটার বঙ্গকরণ করে এরা নিজেদেরকে আমাদের কাছে নিজেই সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বলে দাবি করেছিল, এখনও করে। অন্যদিকে এই ‘সুশীল’ ভাবনার যারা ক্রিটিক তাঁরাও একইভাবে সুশীল শব্দ ব্যবহার করে কিন্তু বুঝিয়ে দেয় এরা বাংলাদেশের জন্য খারাপ, নেতিবাচক, ক্ষতিকর চিন্তা।
কেন ক্ষতিকর? কারণ একটা সমাজে সুশীল চিন্তার সবচেয়ে বিপদজনক দিকটা হল এরা রাজনীতিবিমুখ। এরা সমাজের জন্য বিপদজনক এপলিটিক্যাল এলিমেন্ট হয়ে থাকতে চান এজন্য রাজনীতিবিমুখ বলা। আমার রাজনীতিবিমুখ কথাটার মুল পয়েন্ট হলো যারা রাজনৈতিক পার্টি বিমুখ। আরও ব্যাখ্যা করে বললে, সমাজে রাজনৈতিক চিন্তা চর্চায় সামাজিক রাজনৈতিকতার (polity) মাত্রা বাড়িয়ে সচেতন সক্রিয় রাজনৈতিক দলে সংগঠিত হয়ে ক্ষমতা দখল করে - এটা তাদের পথ নয়। ক্ষমতা ধরতে গেলে, সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ধারণ করতে চাইলে রাজনৈতিক দল বা পার্টি লাগবেই, এর বিকল্প নাই; ঐ দল আবার রাজনৈতিকভাবে চিন্তায় সংগঠিত হবার জায়গাও বটে, সক্রিয় রাজনৈতিকতায় সংগঠিত। কোন দল সক্রিয় চিন্তা চর্চার কেন্দ্র না হওয়ার মানে আওয়ামী বিএনপির মত একটা দলবাজীর দল হবে হয়ত কিন্তু সক্রিয় চিন্তা চর্চার রাজনৈতিক দল হবে না, র্যাডিক্যাল বিপ্লবী কোন রাজনৈতিক দল হওয়া অনেক দুরের কথা। এই কষ্টকর পথ সুশীলদের নয়। সুশীলদের পথ রাজনীতিবিমুখতার, সক্রিয় রাজনৈতিক দলের ছায়া মাড়াতেও তাঁরা রাজি নয়; এই অর্থে এটা রাজনীতিহীনতার পথও বটে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল এই রাজনীতিবিমুখতাও নিজে একটা রাজনীতি, রাজনৈতিক ধারা – তবে দল বা পার্টি ছাড়া; পার্টিবিহীন থেকে এরা এই রাজনীতি করতে চায়। আবার, ক্ষমতাকে ছুয়ে থাকবার ওদের আকাঙ্খাও থাকে পরিপূর্ণ।
সমাজে অনেকেই রাজনৈতিক অর্থে সক্রিয় থাকে না, স্বাভাবিক। কিন্তু আমি সুশীলদের রাজনীতিবিমুখতাকে নেতিবাচক, ক্ষতিকর চিন্তা বলছি কেন? অথবা সমাজে এসব রাজনীতিবিমুখ এলিমেন্ট জাগবার শর্ত কখন কেন তৈরি হয়?
সমাজে সামাজিক রাজনৈতিকতার মাত্রা, চিন্তা-চর্চা খুবই করুন দশায় থাকার আর এক অর্থ হল, ঐ সমাজে রাজনৈতিক দল বলতে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি ধরণের দলবাজীর রাজনৈতিক দলই দেখা যাবে, যেটা সক্রিয় রাজনৈতিক চিন্তা চর্চার কেন্দ্র হিসাবে দল নয়। এই পরিস্থিতির আর এক গুরুত্ত্বপূর্ণ প্রকাশ হল ব্যাপক রাজনীতিবিমুখ শহুরে মধ্যবিত্ত দেখা দিবে। সমাজে রাজনীতিবিমুখ এলিমেন্ট জাগবার প্রথম শর্ত এটা। সমাজে সক্রিয় রাজনৈতিক চিন্তা চর্চার কেন্দ্র হিসাবে কোন দল নাই বরং আওয়ামী লীগ বা বিএনপি ধরণের দলবাজীর রাজনৈতিক দল দেখে এর কাজকারবার ও এর দুর্নীতির দিকে আঙুল তুলে এরা একে নিজের রাজনীতিবিমুখতার রাজনীতির পক্ষে থাকার একটা বড় অজুহাত মনে করে। অথচ সমাজে সামাজিক রাজনৈতিকতার মাত্রা, চিন্তা-চর্চা বাড়াবার, কেন্দ্র গড়ার কর্তব্য তাঁরও কম নয়। দলবাজীর রাজনৈতিক দল ও এদের দুর্নীতি তাঁর জীবনকে দুর্বিষহ, কষ্টসাধ্য করে তোলার কারণ – কিন্তু উল্টা এই পরিস্থিতিটাকেই সে ব্যবহার করে নিজের রাজনীতিবিমুখতার রাজনীতির পক্ষে থাকার একটা ন্যায্যতা হিসাবে। এটাই সমাজে সুশীল চিন্তা জাগবার মৌলিক দিক। মধবিত্তের বিরুদ্ধে আমার কোন ক্ষোভ নাই। সমাজের রাজনৈতিকতার(polity) কোন পরিস্হিতিতে মধবিত্ত কী রকম আচরণ করে সেদিকে নজর ফেলার চেষ্টা করছি আমি। ভিন্ন এক পরিস্হিতিতে এই একই মধ্যবিত্ত হয়ত বড় ইতিবাচক ভুমিকা রাখতে পারে।
আমাদের উপস্হিত পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত সুশীল চিন্তার ভুমিকা সমাজের জন্য খুবই বিপদজনক, রাষ্ট্রের জন্য এক ভালনারেবল দুস্থ অবস্থা। কারণ, প্রথম শর্ত পূরণ করে মধ্যবিত্ত সুশীল চিন্তা নিয়ে সমাজে হাজির থাকলে এরপর রাষ্ট্রের বাইরের কোন স্বার্থ দাতাদের সহযোগিতায় রাজনীতিবিমুখ শহুরে মধ্যবিত্তের সাথে খুব সহজেই একটা শ্রেণী সমঝোতা গড়ে নিতে পারে, এই অর্থে এটা বিপদজনকভাবে পোটেনশিয়াল; এতে রাষ্ট্রের বাইরের ঐ স্বার্থ রাজনীতিবিমুখ শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে নাজিল হয় ত্রাতার ভুমিকায়। উপস্থিত রাষ্ট্রের দলবাজির শাসনে অতিষ্ঠ শহুরে মধ্যবিত্তে নিষ্পেষিত জীবনের কারণে দিক-বেদিক না বুঝে ত্রাতার ভুমিকাকে বরণ করেও নেয়। এবার, শক্তি পেয়ে রাজনীতিবিমুখ শহুরে মধ্যবিত্ত কেবল ভোকাল হতে চায়। ভোকাল সরব হওয়াটা দোষের নয়। কিন্তু সক্রিয় রাজনৈতিক চিন্তা চর্চার কেন্দ্র হিসাবে কোন দল গড়ার কর্তব্য ছাড়া এই সরব ভুমিকা কাউন্টার প্রডাকটিভ। সুশীল কেউ কেউ তাকে ভোটার আইডি কার্ড ঠিক নাই কিংবা দলবাজ রাজনৈতিক দলের দুর্নীতির করছে বলে এসবের বিরুদ্ধে ভোকাল সোচ্চার হবার তাগিদ, নিরুপদ্রব দলবিহীন কার্যকলাপ বলে মধ্যবিত্ত তা পছন্দ করে। পাঠক, ২০০৬ সালে CPD এর দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের এধরণের সুশীল তৎপরতার কথা মনে করে দেখুন।
ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটেছিল ২০০৭ সালের ১/১১ বা ১১ জানুয়ারিতে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাকে দড়ি লাগিয়ে কর্ত্বত্ত্বের দড়ির অপর প্রান্ত বাইরের কারও হাতে আর স্থানীয়ভাবে ব্যাপক শহুরে মধ্যবিত্ত এই বিদেশী ক্ষমতার সমর্থক - সবকিছু রাজনীতিবিমুখ স্হানীয় সুশীল সমাজের হাতের মুঠোয়, তাদের দাপটে – এমন একটা অবস্থায় তখন তৈরি হয়েছিল।
শহুরে মধ্যবিত্ত, সুশীল সমাজ, আর বিদেশী স্বার্থ - এদের সম্মিলিত এক ব্যাপক এবং বিপদজনক শ্রেণী এলায়েন্স। কারও পক্ষে যাবার আমাদের যো ছিল না; একদিকে গেলে - দলবাজীর রাজনৈতিক দলের দুর্নীতির সহযোগী বলে কাদা লাগে, মনে হয় মাইনাস থিওরির বিরোধিতা করা মানে সুশীলদের বি-রাজনীতিকরণের, সমাজের যেটুক রাজনৈতিকতাকে (Polity) আছে একে নির্বংশ উতখাতের বিরোধিতা নয়, যেন হাসিনা, খালেদার দুর্নীতির পক্ষে দাঁড়ানো; অন্যদিকে গেলে বিদেশী স্বার্থের পক্ষে সুশীল হতে হয়। মাঝখানে থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষে, আমাদের জনগোষ্ঠির পক্ষে দাঁড়ানো এক প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল; ধুলায় গড়াগড়ি গিয়েছিল খোদ রাষ্ট্র স্বার্থ, কর্ত্বত্ত্ব। সেই জের শেষ হয় নাই, এখনও চলছে। অথচ দলবাজীর দমবন্ধ রাজনৈতিক পরিস্হিতি থেকে যদি বাঁচতে চাই তবে রাজনৈতিক চিন্তা চর্চায় সামাজিক রাজনৈতিকতার (polity) মাত্রা বাড়ানো, সচেতন সক্রিয় রাজনৈতিক দলে সংগঠিত হওয়া এবং সেই ধারক পাত্র রাজনৈতিক পার্টি দিয়ে ক্ষমতা দখল - এভিন্ন আর কোন ভাবে সর্টকাটে আমাদের দলবাজী বা সুশীল রাজনৈতিক পরিস্হিতি বদলাবার আর কোন পথ নাই।
উপরে শহুরে মধ্যবিত্ত বলেছি বটে এটাকে মাস পিউপলের জনসমর্থন বলতে যা বুঝায় সেই চাঙ্ক সমর্থন এদের থেকে এসেছে – এই অর্থে বুঝাতে ব্যবহার করেছি। তবে রাজনীতিবিমুখ শহুরে মধ্যবিত্তই শুধু নয়, যেসব রাজনৈতিক ছোট দল নিজেদেরকে কমিউনিষ্ট মনে করে এরাও এক অদ্ভুত কম্বিনেশনে দাতাস্বার্থের সাথে নিজের ‘কমিউনিষ্ট’ স্বার্থের এক শ্রেণী এল্যায়েন্স হতে দেখেছিলাম আমরা। এরাও সুশীলদের হাতে হাসিনা খালেদার দলবাজীর রাজনৈতিক দলের নাকানিচুবানিটাই কেবল দেখেছিল, খুশি হয়ে সুশীল রাজনীতির সমর্থক হয়েছিল; কিন্তু খোদ রাষ্ট্রেরও নাকে যে দড়ি পড়েছিল এই নাকানিচুবানিটা চোখে পড়েনি। সাধারণভাবে চাঙ্ক সমর্থক যে শহুরে মধ্যবিত্তের কথা বলেছি এর সাথে এই ‘কমিউনিষ্টদের’ ফারাক এখানে এতটুকু যে একই মধ্যবিত্ত এখানে 'কমিউনিষ্ট' বা 'সমাজতান্ত্রিক' দল বলে দলের নামে সংগঠিত; চিন্তায়, মনোগাঠনিক দিক থেকে এরা রাজনীতিবিমুখ শহুরে মধ্যবিত্তের মতই। এজন্য সুশীল সমাজের সাথে এরা চিন্তার ঐক্য খুজে পেয়েছিল।
আজকের কালে, বিদেশী স্বার্থ রাজনীতিবিমুখ স্থানীয় সুশীল সমাজের সাথে এল্যায়েন্স করে নিচ্ছে কেন? অথবা একই কথা অন্যভাবে বললে, নিজের পছন্দসই কোন দলবাজ ধরণের রাজনৈতিক দলের বদলে একটা রাজনীতিবিমুখ সুশীল সমাজ খাঁড়া করে নিতে বিদেশী স্বার্থ পছন্দ করতে শুরু করল কেন?
উপরে কম কথায় বলবার সুযোগ নিতে ‘বিদেশী স্বার্থ’ বলেছি, এখন ‘বিদেশী স্বার্থ’ কথাটা ভেঙ্গে বলতে হবে। ‘বিদেশী স্বার্থ’ মানে কেবল সুনির্দিষ্ট কোন এক বা একাধিক বিদেশী অপর রাষ্ট্র নয়। সাধারণভাবে বললে, ক্রমশ গ্লোবাল হয়ে উঠা পুঁজির স্বার্থ এটা; বিভিন্ন ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের ক্ষমতা ব্যবহার করে, বিশ্বব্যাঙ্ক ও আইএমএফের মত গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য দিয়ে যা প্রকাশিত। তবে মুলত সব ধরণের রাষ্ট্র ব্যবস্থা, রাষ্ট্রসীমানার উর্ধে গ্লোবাল পুঁজির বিচরণ, অস্তিত্ত্ব - এর এক সাম্রাজ্য বা এমপায়ার। এভাবে সে স্বস্তিবোধ করে; কোন রাষ্ট্র ব্যবস্থা, রাষ্ট্রসীমানাকে সে নিজের বিকাশ আত্মস্ফীতির পক্ষে বড় বাধা মনে করে। নিজের এই গ্লোবাল রাষ্ট্রবিহীন এমপায়ার স্বভাব খাসিলত হওয়ার কারণে আগেকার মত স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র, বিশেষ করে আমাদের মত প্রান্তদেশে কোন শক্তিশালী রাষ্ট্রের সে দেখতে চায় না। নিজ কর্তৃত্ত্বসম্পন্ন কোন রাষ্ট্রের বদলে রাষ্ট্র মানে একটা "গভর্নেস" বা সুশাসন ব্যবস্হা - এই অধপতিত অর্থে আমাদের মত প্রান্তদেশে নামেই এক রাষ্ট্র দেখতে চায় সে; এটাই গ্লোবাল পুঁজির নিজের রাষ্ট্রবিহীন এমপায়ার স্বভাবের সাথে সামজ্ঞস্যপূর্ণ।
ফলে রাষ্ট্রের অর্থ নামিয়ে এনে কেবল একটা ‘গভর্নেস’ বা ‘সুশাসন’ বলে মানে করতে চায় সে। অথচ রাষ্ট্র মানে এক পৌর ব্যবস্থাপনা নয়, মেয়রগিরি নয়। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতা, কত্বর্ত্ত্ব, স্বাবর্ভৌমত্ত্ব, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ইত্যাদি বলে ব্যাপার আছে। যার মধ্যে ‘গভর্নেস’ বা ‘সুশাসন’ ডেলিভারী ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনার মত একটা বিষয় মাত্র।
গ্লোবাল পুঁজি সাম্রাজ্যের এমপায়ার নিজের ইচ্ছা স্বার্থ বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের বদলে "গভর্নেস" বা সুশাসন ব্যবস্হার ধারণা পপুলার করতে বাস্তবায়ক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বেছে নিয়েছে গ্লোবাল এনজিও সংগঠনকে। গ্লোবাল পুঁজির এই নীতি সহজেই বুঝা সম্ভব যদি আমরা খতিয়ে দেখি গেল পাঁচ বছরে বাংলাদেশে এনজিওগুলোর নেয়া কর্মসুচিতে কোন খাতে সবচেয়ে বেশি টাকা এসেছে। দেখা যাবে এই খাতের নাম ‘গভর্নেস’ বা ‘সুশাসন’ কর্মসুচি। এই কর্মসূচিতে এদেশে টাকা বিতরণের মূল এজেন্ট সংগঠন হল 'মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন" নামের এনজিও। ওয়েব সাইটে এই সংগঠনের কর্মসূচি তৎপরতার খবর, কারা এর এক্সিকিউটিভ মেম্বার, পরিচালক; ‘গভর্নেস’ বা ‘সুশাসন’ নামে কী তাদের রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা ইত্যাদি - এগুলো জানা যেতে পারে।
এ তো গেল একদিকের কথা, অন্যদিকে আমাদের রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিরক্ষার দশা দেখুন। শান্তিমিশনের নামে অপর মুরুব্বী রাষ্ট্রের ভাড়া খেটে সেই বাহিনী দিয়ে নিজ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা করব – আমরা এই বকোয়াজীর মধ্যে পড়ে আছি! নিজ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সংস্কার এমনকি রাষ্ট্রের আইন বিভাগের সংস্কারের নামে রাষ্ট্রের কর্ত্বত্ত্ব বিশ্বব্যাঙ্কের হাতে সঁপে দিয়ে এই রাষ্ট্র নিজের বলে দাবি করার মত হাস্যকর এক কারবারে আমরা জড়িয়ে আছি। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা বলে দিক থাকে কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্র কারখানার মত গ্লোবাল পুঁজির মুনাফা কামানী প্রতিষ্ঠান নয়; রাষ্ট্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র মানেই রাজনৈতিক রাষ্ট্র; একদিকে বাইরের স্বার্থ, হাত থেকে নিজের ক্ষমতা ও কর্ত্বত্ত্ব রক্ষা করা; আবার আভ্যন্তরীণভাবে, স্বার্থ বিরোধ লড়াই মীমাংসার চেষ্টা করা আর এর অমীমাংসেয়তার ফলাফল –এই হল রাষ্ট্র।
সুশীল চিন্তা কাছে, রাষ্ট্র মানে নেহায়েতই গ্লোবাল পুঁজির খেদমতের জন্য লাগসই একটা ‘গভর্নেস’ বা ‘সুশাসন’ ডেলিভারী ব্যবস্থা, যেন এক পৌর ব্যবস্থাপনার মেয়রগিরি। এজন্য সে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক রাষ্ট্র - এই সব অর্থে রাজনীতিবিমুখ এবং গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের এক বিশ্বস্ত তাঁবেদার।
কাজেই "সুশীল" মানে রাষ্ট্রবিহীন, রাজনৈতিক দলবিহীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের স্বার্থে এক রাজনীতি। বাংলাদেশের আজ অথবা আগামী যে কোন রাষ্ট্রের জন্য যা ক্ষতিকর। এই পুরা ঘটনার প্রতীকি শব্দ হল "সুশীল"। "সুশীল" কোন গালাগালি শব্দ তো নয়ই।
বাংলাদেশের কোন র্যাডিক্যাল রাজনৈতিক চিন্তা, দলই শুধু নয়, আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মত দলবাজ রাজনৈতিক দলকেও "সুশীল" চিন্তা পছন্দ করে না। কারণ দলবাজ, দুর্নীতিগ্রস্হ হলেও শেষ বিচারে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির রাজনৈতিক দল; apolitical সুশীল চিন্তার সাথে সংঘাতের ফোকাস এখানেই।
শেষ কথা:
"সুশীল" নিয়ে এখানে পোষ্ট লিখতে বসার কারণ হলো, পাহাড়ী রাজনৈতিক ইস্যুতে ফজলে এলাহীর এক পোস্টে Click This Link এলাহীর চিন্তাকে আমি "সুশীল" পরামর্শ বলে মন্তব্য করেছিলাম। এটা দেখে ব্লগের কিছু বন্ধু আপত্তি তুলেছে যে আমি এলাহীকে "সুশীল" বলে গালাগালি করেছি। এর জবাব লিখতে গিয়ে আমার মনে হলো, প্রসঙ্গটার গুরুত্ত্ব বিচারে এবং দীর্ঘ জবাব নিজেই একটা আলাদা পোষ্ট হতে পারে। এটাই এই পোষ্টের জন্মসুত্র।
ফজলে এলাহী নিজে "সুশীল" বলার বিরুদ্ধে কোন কিছু প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে আমার নজরে পড়েনি। ফজলে এলাহীকে আমি একজন মনোযোগী পাঠক, চিন্তা করে এমনই একজন ব্লগার হিসাবেই দেখেছি। ব্যক্তি ফজলে এলাহীর বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নাই, প্রশ্নই উঠে না। আমার বিশ্বাস এলাহী বুঝবে তাঁর উপরে "সুশীল" রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাব পড়েছে - কেবল এটাই আমার কথার মূল বিষয়। এমনকি এলাহী - CPD, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ষ্টার বা প্রথম আলো মিডিয়া গ্রুপ, সুজন নামের এনজিও ইত্যাদি সুশীলদের প্রতিষ্ঠানের সাথে কোনভাবে জড়িত কি না সেটাও একেবারেই গৌণ বিষয়। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে কোনভাবে জড়িত না হওয়া সত্ত্বেও কেউ সৎ সরল বিশ্বাসে সুশীল" রাজনৈতিক চিন্তায় নিজে প্রভাবিত হতে পারে। ফজলে এলাহীর চিন্তা 'সুশীল" রাজনৈতিক চিন্তায় আচ্ছন্ন - এটাই আমার সার কথা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



