আমি ভাবতে থাকি দুপুরের বিষয়গুলো নিয়ে। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে যাই একসময়। বিকেলের দিকে হঠাৎ সালমান ফোন করে। দুপুরের ঘটনাটা নিয়েই কি??...কনফিউজড হই। ... ফোন ধরবো কি ধরবো না, ভাবতে থাকি। শেষ মুহুর্তে গিয়ে ফোনটা ধরেই ফেলি। সালমান প্রথমেই জিজ্ঞেস করে,
- তুই কি লিপন কে পছন্দ করিস?
- মানে??
- তুই ওকে মেসেজে যেসব কথা লিখসিস তা কি সত্য?
- না!
- মানে কি?
- মানে ওইগুলো ফাজলামি ছিলো। ওর সাথে তো আমার এই জাতীয় কথাগুলো ফাজলামি ছাড়া আর কিছু না!...[ প্রচণ্ড বিব্রত হয়ে আমি কথা ঘুরিয়ে ফেলি। স্বীকার করতে পারি না কথা গুলো সত্য ছিলো। ]
- সত্যি তাই?...
- হা...
[পেছনে লিপনের গলা শুনি। মনে হতে থাকে ও পাশ থেকে কিছু বলছে, আর তারপর সালমান কথা বলছে। আমি সালমানকে জিজ্ঞেস করি-]
- লিপন কি তোর সাথে আছে?
- না [ স্পষ্ট মিথ্যা বলে ও ]
- ও
- দেখ, এই মুহুর্তে ও পড়াশোনা, ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে চায়, অন্য আর কিছু না। এই মুহুর্তেই ও কোনো সম্পর্ক নিয়ে ভাবছে না...। তুই কি বুঝতে পারসিস আমার কথা?
- বললাম তো আমি কথাগুলো ফাজলামি করেই বলসি। সিরিয়াসলি না...।
[ ফোন রেখে দেই আমি। বেশ অপমানিত বোধ করি। রাগ ওঠে সালমানের ওপর, লিপনের ওপর, নিজের ওপর...]
বিকেলটা একটা ধুসর দীর্ঘশ্বাসে কেটে যায়। সুতোর উন্মুক্ত প্রান্ত খুঁজে বেড়াই। কোথায় যেন সুতোয় টান পড়েছে। ছিঁড়ে যায় যদি, তাই ভাবি ভয়ে ভয়ে। ভাবতে থাকি কীভাবে হাল্কা করা যায় সবকিছু। ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, রাগ বিন্দু বিন্দু করে বাড়ে। সন্ধ্যায় ছেলেটাকে বলি,
- বিরক্ত, বিব্রত যাই তোমার অনুভূতি হোক, তোমার আমার সাথে কথা বলা উচিৎ ছিলো। তুমি যা যা লিখেছো আমি তার কাট টু কাট জবাব দিয়েছি। এখন কোনোকিছুর জন্য তুমি আমাকে ব্লেম করতে পারোনা। কেন তুমি ব্যাপারটা ফান হিসেবে নিতে পারছো না? আমি নাহিয়ান সংক্রান্ত কথাবার্তা থেকে বের হয়ে আসতে চাইছিলাম, তাই তোমার মেসেজগুলোর ওরকম উত্তর দিয়েছি। এই তো!...তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য আমি কথাগুলো বলিনি। আই অ্যাম সরি!
- আই, হঠাৎ ক্ষেপে গেলা কেন?...আবার কি হইলো?
- আমি তো সবসময়ই ক্ষ্যাপা!...এই তো আমার মফিজের বাপ আবার নরমাল হয়ে গেছে!...তুমিই যদি অ্যাবনরমাল হয়ে যাও, তাহলে আমাকে কে নরমাল করবে বলো!
- হা হা!...আমাকে ক্ষ্যাপাইতে চাও?...এত সোজা না!...কিন্তু তোমার মেসেজগুলো ফান ছিলো এটা আমি বিশ্বাস করি না।...তুমি মন থেকে সত্যি করে বলো ওগুলো ফান ছিলো!...তুমি কি সালমানের কথায় রাগ করসো?...ও আমার মেইলবক্স থেকে মেসেজগুলো পড়েছে। ও তোমার সাথে কথা বলতে চাইসে, আমি বলসি তোর ক্লোজ ফ্রেন্ড তুই বলবি না তো কে বলবে?
আমি আটকে যাই!...মন থেকে বলা যে ওগুলো ফান ছিলো!...আসলে তো ফান ছিলো না কথাগুলো!...ওর প্রতি আমার দূর্বলতাটা তো সত্য...!!...নিজের মনকে তো মিথ্যা বলতে পারবো না!...সত্যিটাই বলে দেই...
- না, ওগুলো ফান ছিলো না। তুমি সত্যি কথা বলতে বললা, তাই বললাম। এখন, বাদ দাও এসব...আর সালমানের ওপর রাগ হইনি, কিন্তু ওর কথাগুলো আমাকে ডিস্টার্বড করেছে। ওর কাছ থেকে আমি রুডনেস আশা করি না...
- ...আমি মা’কে তোমার কথা বলসি...মা বলে ‘কাহি প্যায়ার না হো যায়ে’...আমি এখন ঘুমাতে যাবো...রাতে আবার কথা হবে......
আমি বুঝতে পারি না, ওর মা কে ও সত্যি সত্যি আমার কথা বলেছে, নাকি নিজের মনের কথাটা মা’র ভাষ্যে চালিয়ে দিয়েছে...বুঝতে চেষ্টা করি...অপেক্ষা করতে থাকি রাতের জন্য......রাতে ও-ই প্রথম কথা শুরু করে...
- কি করছো?...পরীক্ষার আর মাত্র ৩৪ দিন বাকি...উফ!
- পরীক্ষার কথা আর বলো না, ভয় লাগে!...আচ্ছা, তোমার ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্টগুলার মধ্যে সবচেয়ে প্রবলেমেটিক কোনটা বলে তুমি মনে করো?...
- আমি অনেক ইন্ট্রোভার্ট...তোমার?
- আমি জানি আমি অনেক কিছু করতে পারি, কিন্তু জানি না কোনটা আমার করা উচিৎ...এবং আমি যা ফিল করছি তা কখনোই সাহসীভাবে প্রকাশ করতে পারি না...
এর মধ্যেই সন্ধ্যা সময় আরেকটা ঘটনা ঘটে গেছে...একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসে। একটা ছেলে। আমাকে চায়। মা আমাকে দেয়। আমি কথা বলি। বুঝতে পারি না কে হতে পারে!...ছেলেটা পরিচয় দেয় তার নাম রাজন। নটরডেম এ পড়ে। আমি চিনতে পারি না। রাজন নামে ইনফ্যাক্ট আমি কাউকে চিনি না, এই কথা বলি। কিন্তু সে জোর করে যে আমাকে নাকি সে অনেক ভালোমত চেনে, আমিও নাকি ছেলেটাকে অনেক ভালো চিনি। সালমান আমার বন্ধু এটাও ও জানে। আমাকে বলে আমাদের নাকি দেখা হয়েছে...কথাও হয়েছে...আমরা নাকি বন্ধু!...আমি বিরক্ত হয়ে ফোন রেখে দেই। বাসায় মা আমাকে সন্দেহ করে, 'তুই কি সত্যি ছেলেটাকে চিনিস?'...আমার ভালো লাগে না...রাতে কথা বলার সময় লিপনকে জিজ্ঞেস করি ছেলেটার কথা...
- তুমি রাজন কে চেনো? তোমাদের কলেজের?...মহা জ্বালাচ্ছে!...চিনি না, জানি না, বলে আমরা নাকি ফ্রেন্ড...এটা কে বলো তো!
- রাজন?...এটা আবার কোন মফিজ? কোন গ্রুপ?...কোন স্কুল? চিনো না, আবার ফ্রেন্ড!...ইন্টেরেস্টিং! একটু ডিটেইল বলো তো!...আচ্ছা, কলেজে তোমার প্লেস কতো?
- থার্ড। তোমার? ... ছেলেটা দয়া করে শুধু নাম আর কলেজটাই বলসে। বাট হি নোজ এভরিথিং এবাউট মি...ও কার কাছ থেকে যে নাম্বার পাইসে!...আমাদের নাকি বহুবার দেখাও হইসে!...বাসায় তো আমাকে খুব ঝাড়তেসে!
- যাই হোক, আমার আরেকটা সতীন পাওয়া গেলো। আর যে কপালে কয়টা আছে!...থার্ড তাও আবার পরীক্ষা নিয়ে চিন্তা!...আমি ১১৯২ জনের মধ্যে ৬১।...তুমি সায়েন্স ছেড়ে আর্টস –এ গেলা কেন?
- নটরডেম এ ২০০ জনের মধ্যে থাকাই অনেক কিছু।...অই যে জেদ। আমাকে দিয়ে কমার্স শুরু হয়। পরে দুইটা মেয়ে সায়েন্স থেকে চলে আসে। আমাকে তখন সায়েন্স-এ ডাকলেও জিদ করে যাইনি। আমার কাছে ওটা করুণা মনে হয়েছিলো। কমার্স ভালো লাগেনি, তাই এখন আর্টস।
- তোমার সত্যি সত্যি আয়োডিনের অভাব আছে। বেশি বেশি আয়োডিন খাও নইলে পাবনা পাঠানো লাগবে। গরু এই জন্য কেউ সায়েন্স ছাড়ে। সিওর ফর দিস, ইউ হ্যাভ টু পে আ লট ইন ফিউচার।
- ...আমি জানি এইটা আমার বাজে দিকগুলোর একটা! আমি খুব জেদি + আবেগপ্রবণ, তাই সাফার করি বেশি।...কার্ড প্রায় শেষ। তাই এটা আমার লাস্ট। আবার ১৪ তারিখ কথা হবে। তবে আমার কথা মনে হলে রাত ১২ টার পর মিসকল দিও, আমিও দিবো!...বাই জানু!...
সেদিন আর কথা হয় না। আবার একটা ব্রেক নেই আমরা। নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার ব্রেক। সারাদিনের ঘটনাগুলো ভুলে যেতে চাই। ৭ দিন পর যখন আবার কথা হবে, তখন নিজের সব বোকামি ঝেড়ে ফেলে, আজকের দিনের সব কথা ভুলে গিয়ে আবার গতদিনে ফিরে যেতে চাই...।
পরদিন যায়। কথা হয় না সারাদিন। তারপর দিন...তারপর দিন...দুই দিন পরের রাতে আমি মিসকল দেই। তাকে বোঝাতে চাই, তার কথা আমার মনে হচ্ছে। ছেলেটা মেসেজ পাঠায়,
- আহারে! আমার কথা মনে হইসে?...তুমি কি এখন আমার সাথে কথা বলতে চাও?...মন ভালো না খারাপ?
- আমার তো সবসময়ই তোমার কথা মনে হয়! মনটা অবশ্য ভালো নাই। এত সবের পর কি আর সহজে মন ভালো হয়?...যাই হোক, বাই...শুভ রাত্রি...
অপেক্ষা করি আবার...১৪ তারিখ কবে আসবে...কবে ৭ দিনের বিরতি শেষে আবার কথা হবে ছেলেটার সাথে......স্তব্ধ আক্রোশে পিঁপড়ার পায়ে পায়ে সময় চলে...ধীরে...ধীরে...রাত ফুরোয় না...দিন যেন আগের চেয়ে অনেক লম্বা মনে হয়!...আমি অপেক্ষায় থাকি...
( চলবে)
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ২:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


