somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: নতুন গান

২৯ শে অক্টোবর, ২০০৯ সকাল ১০:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ধরা যাক, কয়েকটি বালক একটি মেয়েকে ধাওয়া করছিল। মেয়েটির গ্রীবা থেকে আমাদের কবিদের চিত্রকল্পসমূহ একে একে বিদায় নিচ্ছে। ফলে ক্রমেই মেয়েটির 'মেয়েটি’ থেকে মেয়েসূচক অস্তিত্ব লোপ পাচ্ছিলো। এরকম একটি দৃশ্যকল্প মাথায় রেখে এবার আমরা একটি জনবিরল গ্রাম্য বাজারে প্রবেশ করি। বাজারটির একটি নাম দেওয়া যাক। ধরলাম বাজারটির নাম কালীবাজার। বেশ পুরোনো; দেশান্তরী হওয়ার আগে হিন্দুরা এখানে রক্ষাকালীর পুজা করতো বিধায় এই নাম দেওয়া হয়েছ। কয়েক বছর ধরে অবশ্য বাজারটির নাম পরিবর্তন করে কাশেম বাজার দেওয়া যায় কিনা এরকম একটা আলোচনা আলোচ্য বাজারের মধ্যবর্তী কালীগাছটির ডাল পালায় ওড়াওড়ি করছিল। ইতিমধ্যেই অশ্বত্থ পেঁচানো কালী গাছটির কয়েকটি শাখায় বটের পাতাও গজাতে শুরু করেছে।

এবার চোখ ফেরানো যাক বাজার সংলগ্ন গেইট অলা বাড়ীটির দিকে। গেইটের লালাটে স্পষ্ট আরবি হরফে ’আলাহু’র জ্বলজ্বলে ক্যালিওগ্রাফি শোভা পাচ্ছে। এই ক্যালিওগ্রাফী থেকে আধামাইল উত্তর পশ্চিমে ধাবমান বালিকার অবস্থান- এটা মাথায় রেখে আমরা বাড়ীতে প্রবেশ করবো। তার আগে বাড়ী এবং গেরস্থের একটা পরিচয় দেওয়া যাক। বাড়ীটির বর্তমান মালিক যথাযথ প্রক্রিয়ায় নামের আগে হাজী শব্দটি যুক্ত করেছেন সতের বছর হয়। অভিজ্ঞ পাঠকদের নিশ্চই মনে আছে আজ থেকে সতের বছর আগের সেই বিশেষ বছরটির কথা? সে বছর আমাদের ভারতীয় দাদারা রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দিয়েছিলেন। আর তার সুবাতাস এসে লেগেছিল আমাদের এই কালীবাজারেও। ধীমান পাঠকবৃন্দ, এটিকেও মাথায় রাখবেন। হাজি সাহেব পড়াশোনা করেছেন অবশ্য প্রবাসের মাদ্রাসায় (তখনো মাদরাসা শব্দটি প্রচলন শুরু হয়নি)। পাঠক, এখানে প্রবাস মানে কালীবাজারের বাইরের এলাকা। যেদিন তিনি প্রবাস থেকে গ্রামে প্রত্যাবর্তন করেন তার দুই দিন পর গনেশের দোকানে চা দিয়ে পরটা খেতে খেতে আমরা জানতে পারি, ছোবান মিয়া বৈদেশ থিকা হাফেজ হইয়া আইছে। লগে দুগা বিবি আর জমজমের পানিও আনছে। হেরে অহনত্থুন আজি (হাজী) সাব কই ডাইকতো অইবো। এখানে একটি কথা বলে রাখি, বেশী নয়, তিন পুরুষ আগে হাজি সাহেবের বাপের দিকের কোন এক মহিলা সম্ভ্রান্ত কায়েস্থ ঘরের কনিষ্ঠা কন্যা ছিলেন।

এখন আসি যে বছর রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতীয় দাদারা উন্মাদ হলো সে বছর এ গ্রামের এক দুপুরের ঘটনায়। শিবু ধরা পড়েছে। বেঁধে রাখতে হয়নি, সুযোগ থাকলেও সে পালায়না। শ্রীযুক্ত শিবুর পরিচয় হচ্ছে সে এ গ্রামের সবচেয়ে বর্ষিয়ান চোর। এটা উত্তরাধিকার সুত্রেই প্রাপ্ত। পাকা হাত। অবশ্য তার একটা নীতি আছে, মোচলমানের ঘরে সে কখনো চুরি করেনা। তার নাকি মুখে রোচেনা। পাঠক, স্বধর্ম মরনং শ্রেয়, পরধর্ম ভয়াবহ- বহুকাল আগে গীতামুখে কৃষ্ণ নাকি এ কথা বলে গিয়েছিলেন। যাক সে কথা। বিচার বসেছে। শান্তি বাবু সহ অন্যান্য সালিসদাররা এখনো এসে পৌঁছান নি। এরই মধ্য শিবুকে তৃতীয় বারে মতো উত্তমধ্যম হজম করতে হয়েছে। চতুর্থ বারের সময় প্রতিরোধ গড়ে তোলে সে। উৎসাহীরা কিঞ্চিত ভয় পেয়ে নিরস্ত হয়। ভীড় থেকে সহমর্মী একজন শিবুকে একটি কে-টু সিগারেট ধরিয়ে দেয়। সিগারেট টানতে টানতে শিবু এবং উৎসাহীরা সালিসদারদের অপেক্ষা করতে থাকে। প্রিয় পাঠক, দয়া করে ঐ বালিকাটির কথা ভুলে যাবেন না।

অনেক তো ধান ভানলাম, এবার নিজের পরিচয়টা দিই। আমি গান লিখি। প্রচলিত আছে ব্যর্থ কবিরাই নাকি গান লেখে। আমিও কবিতায় বিশেষ সুবিধা করতে না পেরে কিছু দিন হলো গান লিখতে শুরু করেছি। নিজে লিখি, নিজেই সুর করি। আমি অবশ্য কালীবাজার অঞ্চলের বাসিন্দা নই। থাকি ভিন্ন গাঁ এ। এমনকি গল্পের প্রথম থেকে যিনি রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছেন আমি তাঁর কেউ নই। অথবা যারা তাঁকে ধাওয়া করছে তাদের সাথেও আমার কোন পরিচয় নেই। আমি শুধু একটি গান লেখার অপেক্ষায় আছি। একটি নতুন গান। যে গানে কোন উপমা থাকবেনা। রাগ রাগীনির শৃঙ্খল থাকবেনা। সুর লয় তাল কিছুই থাকবে না। কিন্তু সেটা গান হবে এবং সমবেত ভাবে গাওয়া যাবে। আমার নিবাস আমারই নৈরাশ্যের মধ্যে।

পাঠক, আমি গল্পকে খুব বেশী দীর্ঘায়িত করতে ইচ্ছে হয়না, ভালোও লাগেনা। তাই সংক্ষিপ্তসারে শেষ করে দেই এ গল্পটিও। সেদিন সালিসদাররা কেন আসেনি জানেন? রাতেই তারা রেডিওতে খবর পেয়েছিল বিজেপি-শিবসেনার হনুমানেরা বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে ফেলেছে ফলে সারা ভারতে এবং বাংলাদেশে অনুমেয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে গিয়েছে। সঙ্গত কারণেই সেদিন সালিসি কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করা আর তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এদিকে সালিশের জন্য অপেক্ষারত শিবু চোরা এবং অন্যান্যরা কিছু বুঝে উঠার আগেই হাজী বাড়ীর ভেতর থেকে কালীবাজারের উপরে নরক নেমে এসেছিল। নায়ারে তকবির, আলাহু আকবর শব্দে রক্ষাকালীর আস্তানায় শেষবার রক্তের হলি খেলা চলেছিল ঠিক পৌনে এক ঘন্টাব্যাপী। আর হাজী বাড়ীর গেইট থেকে আধা মাইল উত্তর পশ্চিমে যে মুসলিম বালিকাটি ধর্ষিত হচ্ছিল তার কিছু দুরেই দাউদাউ জ্বলছিল একটি সম্ভ্রান্ত কায়েস্থ বাড়ী।

প্রিয় পাঠক, ধরে নিন বালিকাটি এখন তিন সন্তানের জননী। সব অতীত এখন, কালীবাজারও। আমি কাশেম বাজারের বাসিন্দা নই বলে আমার সাথে তার কোন সম্পর্ক তৈরী হয়নি- না রক্তে, না ধর্মে। এমনকি তার সাথে আমার কোনদিন দেখাও হয় নি। কিম্বা সে আমার প্রনয়িনীও ছিল না কোন কালে।

কিন্তু সতেরটি বছর ধরে আমি ঐ ধাবমান বালিকাটির জন্য একটি নতুন গান লেখার অপেক্ষায় আছি। কারন এখনো আমি তার চোখে ভয়কাতর হরিণের খুরের শব্দ শুনতে পাই।
১৬টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×