somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্পঃ শহুরে মৃত্যু

১০ ই জুন, ২০১০ বিকাল ৫:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ওভারব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে আকাশকুসুম কল্পনায় নিজেকে দ্বিতীয় আসমানে উড়িয়ে বেড়াচ্ছি আর পায়ের বিশফুট নিচে দেখছি নির্বোধ ভিড়ে মিশে যাওয়া ঘাম ও ধুলোর গন্ধের। আশপাশ দিয়ে ধাতব শব্দে পা ফেলে দৌড়াচ্ছে সময় এবং ব্যস্ত কর্মমূখী মানুষগুলো। কালো ধোঁয়ায় ভুতুড়ে স্বপ্নের দেশের দিকে জড়োসড়ো এগিয়ে যাচ্ছে আটটি শিশু। রাস্তার ধারে রেস্টুরেন্টে খাবার গিলছে একমনে কয়েকটি তরুণ। এসব কিছুর মাঝখানে আমি পোড়াচ্ছি সিগারেট কিন্তু টেনে নিচ্ছি ট্রাফিক জ্যামের কালো ধোঁয়া।

এইরকমই সহজ একটা দিন এই দিনটি। নিত্যকার মতোই কোন এক শাদা প্রাইভেট কারের ড্রাইভার সিগন্যালে আটকে চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছে নিস্পাপ সকালের; টুং টাং শব্দে কাঁদছে বেমানান রিকশাগুলো; কতগুলো ইউনিফর্ম পরা শিশু নিপুণ পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে স্কুলের দিকে; একই রেস্টুরেন্টে খাবার গিলছে কয়েক প্রবীণ এবং এত ভীড়েও আমি কেন জানি খুঁজে পাচ্ছি নৈঃশব্দ্য।

যদিও আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা ছায়া বরাবরের মতই; ওরা আমাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে মেতে আছে খোশগল্পে নিজেদের মাঝে। সবচে’ বাচাল ছায়াটা বকে যাচ্ছে আপনমনে,

“...এই শহর, এই যে শহরটা! কি ছিল আর এখন কি! এত দ্রুত বদলাচ্ছে...”, কোনরকম নি:শ্বাস না ফেলেই আবার শুরু করে দিল,
“ব্যাঙের ছাতার মত গজাচ্ছে সব দালান আর রাস্তাগুলো......প্রত্যেকটা দিন মাথার ভেতর শহরের ম্যাপটা আপডেট করা লাগে...”, খানিক বিরক্তির সাথে ঘাড় নাড়াই আমি এবং পরক্ষণেই স্বস্তিবোধ করি। কারণ এই কথক মৃত, আর মৃত ছায়াদের প্রলাপ পাত্তা দেবার মত সময় কোনকালেই ছিলো না এই শহরের। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে মাথা দুলিয়ে বাচালকে সায় দিলো সবচে’ বিষণ্ণ ছায়াটা; শুধু বলল,
“হুম...”, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। লম্বা চুলের মৃত এই ছায়াটা সবচে’ বীভৎসভাবে মারা গিয়েছিল বলে জানা যায়। কবি ছিল সে; তার লেখা একটা কবিতা পড়ে ক্ষেপে গিয়েছিল একদল কাক, নিপুণ ক্রোধে ওকে পুরো শহর তাড়া করে ফিরেছিল। ছুটতে ছুটতে শেষ পর্যন্ত কবি হাল ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লে কাকেরা একে একে ঠুকরে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল তার সমস্ত শরীর, উপড়ে ফেলেছিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো। মনে পড়তেই গা শিরশির করে উঠল আমার। চিন্তার স্রোত অন্যদিকে ফেরাতে নজর দিলাম রাস্তার ভীড়ে আর একবার।

সিগন্যালে সবুজ বাতি জ্বলছে এখন। ক্রসিংয়ের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন মা ও শিশু। মায়ের চোখেমুখে একরাশ উদ্বেগ এবং শিশুর চোখে উজ্জ্বল আলো, স্কুলে পৌছাতে হবে সময়মত! আমি কেন জানি গভীর উৎসাহ নিয়ে দেখতে থাকি ব্যাপারটা। সিগন্যাল পেরিয়ে যাচ্ছে যানবাহনগুলো খুব দ্রুত, যেন একটু দেরী করলেই কেউ ওদের চিরকালের জন্য আটকে ফেলবে এই কংক্রীটের নিষ্ঠুর অরণ্যে। এটা ভাবতেই আপনমনে হেসে উঠলাম আমি। আমরা সবাই এই অরণ্যের মায়ায় জড়িয়ে গেছি চিরকালের মত; এমনকী মরে গিয়েও লাভ নেই। এই নরকে ফিরে আসতেই হবে ছায়া হয়ে; বিভিন্ন দালানের ছাদে, ওভারব্রীজের ছায়ায়, ডাষ্টবিনের দুর্গন্ধে আশ্রয় নিতে হবে তারপরে।

“ কেন জানি মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছি...”,পাশ থেকে বলে উঠল কেউ। তাকিয়ে দেখি এই দলের বিপজ্জনক ছায়াটাকে, যে কিনা জীবিতকালে ছিল ভাড়াটে খুনি। মৃত্যুর আগমুহূর্তে সে দেখেছিল রিভলভারের নল, এখন তার কপালে দুইটি ফুটো দেখা যাচ্ছে। তার কথা ভুল হয়েছে খুব কমই। আমি খানিক শঙ্কা নিয়েই তাকালাম ব্যস্ত রাস্তাটার দিক।

কোন পূর্বাভাস ছাড়াই সিগন্যালের সবুজ বাতিটা হলুদ হয়ে গেল হঠাৎ করে। প্রাণপণে গতি বাড়িয়ে দিল একটা পিকআপ ট্রাক, আটকা পড়বার কোন ইচ্ছেই নেই তার। ছুটছে, ছুটছে......জ্বলে উঠলো লাল বাতিটা। ঠিক সেইসময়ে ক্রসিংয়ে পা বাড়ালো সেই মা ও শিশু, তীব্র হর্ন এবং লোকজনের চিৎকারে ভরে উঠলো চারপাশ,

ব্রেক ফেল করেছে সেই পিকআপ ট্রাকটার।
কর্কশ শব্দ করে উঠল রাবারের টায়ার পিচের রাস্তায় কালো দাগ ফেলে;
সোজা রাস্তায় বাঁক খেয়ে পাশ কাটালো সেই হতভম্ব মা ও শিশুকে;
ফুটপাত টপকে আছড়ে পড়লো একটা ল্যাম্পপোষ্টের গায়ে;
দুই মুহূর্তের জন্য চুপচাপ হয়ে গেলো সমস্তকিছু;
মৃত্যুর তীব্র গন্ধ এসে ধাক্কা দিল আমার মগজে।


এরপরই সম্বিৎ ফিরে পেলো সবাই, চেঁচামেচি করতে করতে দৌড়ে গেলো কাত হয়ে থাকা ট্রাকটার দিকে। ওটার উইন্ডশিল্ড ভেঙ্গে গেছে। বেকায়দায় বেরিয়ে আছে কারো অর্ধেক শরীর। টেনে হিঁচড়ে বের করা হল শরীরটাকে। কয়েকমহূর্তের জন্য যেন থরথরিয়ে কেঁপে উঠল শরীরটা; এরপরই সকলের অলক্ষ্যে নির্বিবাদে ঝিমিয়ে পড়ল মৃত্যুতে। খানিক পরেই সকল শব্দে থিতিয়ে এলো আমার মাথার ভেতর। এদিক ওদিক চেয়ে খুঁজতে লাগলাম সেই মা ও শিশুকে; পেলাম না।

এই সমস্ত শোরগোলের মাঝে দ্রুত কোথায় হারিয়ে গিয়েছে ওরা। আমি তবুও বারবার খুঁজলাম এই দু’জনকে; নাহ্‌, কোথাও নেই।
“খুঁজে লাভ নেই...”, আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে বলল সেই প্রাক্তন ভাড়াটে খুনি।

“বলেছিলাম না মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছি! এখনো ঠিক ঠিক টের পাই...।” শুনে আমি প্রচন্ড অবসাদ বোধ করি, এই নিয়ে তৃতীয় মৃত্যু দেখলাম এই ওভারব্রীজের উপর থেকে। প্রত্যেকবারই নতুন একটা ছায়া এসে জুটেছে এই দলটায়। একসময় আমি একাকী দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম এখানে, এখন আর নয়। মৃতরা জড়ো হচ্ছে আমার প্রিয় এই জায়গাটাতে। অভিশপ্ত আমি, মৃতদের দেখতে পাই, ওদের কথা শুনতে পাই। আমি নিজে অর্ধমৃত, এই শহরের বাতাস আমার সবটুকু জীবন শুষে নিয়েছে। বাকি রয়েছে এই খোলসটুকু শুধু।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হাজির হল আজকের দুর্ঘটনায় মৃত পিকআপ ড্রাইভার, এলোমেলো শরীরে যোগ দিল ছায়াদের সাথে। ওকে সানন্দে ঘিরে ধরল অন্যান্যরা। অনেক শীতল অভ্যর্থনা, কুশল বিনিময়, সমবেদনা প্রকাশ এসবের মাঝে আমি অনাহূত বোধ করতে লাগলাম। মৃতদের মাঝে অর্ধমৃতরা হয়ত কখনোই স্বাগত নয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরে ফেরার জন্য পা বাড়ালাম। তখনোও বকে যাচ্ছে সেই বাচাল ছায়াটা...


কি মনে করে ঘুরে দাঁড়ালাম। বাচাল ছায়াটার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
“তা আপনি মারা গিয়েছিলেন কিভাবে?”

মুচকি হাসলো ছায়াটা; খানিক ভেবে নিয়ে বলল,
“হৃৎপিন্ডটা বেঈমানী করেছিলো...”


(শেষ)



তারিখঃ ৭ই জুন, ২০১০
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ রাত ৯:২৪
৩৪টি মন্তব্য ৩৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাখি মন

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:১০



রাত গভীর হলে পাখিটা বারান্দায় এসে বসে। দূরের আকাশে তখনও কিছু আলো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু পৃথিবীর কোলাহল ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে। সেই নীরবতার মধ্যে বসে পাখিটার মনে হয়, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×