অনেকদিন পর আজ স্কুল আর কলেজ জীবনের কথা মনে পড়ে গেল। বেশ অনেক আগেই সে সময় পার করেছি। স্কুল-কলেজে যখন পড়তাম তখন স্বপ্ন দেখতাম বাস্তব জীবনের, বড় হয়ে কি হতে পারি বা কি হতে চায় ইত্যাদি ইত্যাদি সেসব রঙিন স্বপ্ন ঘেরা স্মৃতিগুলো এখন শুধুই সময়ের আক্ষেপ।
আক্ষেপ বলেছি তার একটা যুতসই কারণ ছিল। এখনও আছে। তবে সমেয়র সাথে সে আক্ষেপ উত্তোরণের চেষ্টা চলছে তাই আপাতত আক্ষেপ নিয়ে কোন বাড়তি অনুতাপ করার ইচ্ছে তো নেই বরং অন্য কিছু উপভোগ করা যাক।
এই লেখার শিরোনাম ‘ইউনিভার্সিটি’। স্কুল – কলেজের গন্ডি পেরুলেই একজন শিক্ষার্থীর বড় স্বপ্ন থাকে একটা ‘ইউনিভার্সিটি’ । লেখাটার এ পর্যায় যদি একটা প্রশ্ন তোলা হয়, আপনার শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে আনন্দময় আর বিশেষ মুহুর্তের সময় ছিল কোনটা ? নি:সন্দেহে ব্যক্তি পার্থক্যে উত্তরের তারতম্য খেয়াল করা যাবে, এখানে সন্দেহের অবকাশ নেই। আমার উত্তরটাই বলি, ইউনিভার্সিটি লাইফ বলে কিছুই ছিলনা, ইন্টারমিডিয়েট লাইফ’টা কেটেছে ছন্নছাড়ায় আর স্কুল জীবন’টা পার করেছি বোঝা-না বোঝার আনন্দময়তায়।
স্কুল জীবনের একটা ঘটনা প্রায়শই মনে পড়ে, :
বৃষ্টিতে ভিজেঁ ফুটবল খেলার আনন্দটাই অন্যরকম আর বয়স’টা যদি হয় ১২ কিংবা ১৩ তাহলে কি আর কিছু বলার অবকাশ আছে ? যে বয়সে দূরন্তপনার সীমাহীন কোন উচ্ছাসে সব বাধাকেঁই উপেক্ষা করা যায়, এমন সময়ে স্কুলের মাঠে ঝুম বৃষ্টিতে এক ফুটবল পায়ে নিয়মের তোয়াক্কা ছাড়াই ১৫-১৫ = ৩০জনে মিলে খেলার আনন্দ স্মৃতি কি কখনো ভোলা যায় ? না যায় না ? আরো ভোলা যায়না যদি সবকিছুকে ছাপিয়ে স্কুলের হেডমাষ্টার স্যারের হাতে বৃষ্টিতে খেলার অপরাধে কড়া শাষনের মুখোমুখি হতে হয়।
খেলেছিলাম যখন, তখন এক বিন্দুই মনে হয়নি কিছু বাদেই আমাদের ভাগ্যে কি ঘটতে যাবে। পক্ষ – বিপক্ষ কোন দলের গোল করার উল্লাস চিৎকার যখন মাঠ পেরিয়ে হেডমাষ্টার স্যারের কানে গেলো, তার কিছু পরেই সাড়ি বেধে স্কুলের বারান্দায় ভেঁজা শরীরে আমরা ২০ কি ২২ জন দাড়িয়ে। অপেক্ষা শাস্তির। বাকীরা পালিয়েছিলো। সবার উৎসুক চোখের কেন্দ্রবিন্দুতে আমরা। স্যারের সেনাবাহিনী নির্দেশ “কানে ধর”, পিটি – প্যারেডে অভ্যস্ত আমরা কালবিলম্ব করিনি সেদিন। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। এবার “উঠবস” সেটাও শুরু হল। থামার কোন লক্ষণ ছিলোনা। একজন ভেজা বারান্দায় পা পিছলে গেলে উঠবস থামিয়ে আবার সোজা হয়ে দাড়িঁয়ে থাকা। স্যারের পুন: নির্দেশ “রুকু দে” এবার সত্যিই আমার হতভম্ব, এরকম শাস্তি কখনো পেয়েছি বলে মনে পড়ছিলোনা তাই অনভ্যস্ত এ শাস্তির প্রারম্ভিক প্রস্তুতি নিতে দেরী হতেই ঝপাৎ ঝপাৎ করে যখন বেতের বাড়ি পড়ল, স্যার তখন চেঁচিয়ে বললেন “এই তোরা নামাজ পরিসনা, যেভাবে রুকু দেয় সেইভাবে হ” আল্লাহ’র নাম ছাড়া তখন আর কাউকে মনে পড়েনি, ক্ষণিকের জন্য আব্বার নামও বোধহয় ভূলে গিয়েছিলাম। রুকু অবস্থায় সাড়িতে দাড়িয়ে দ্বিতীয় দফা শাস্তির অপেক্ষা। কিছু বাদেই যখন ‘ঝপাৎ-তপাৎ’ আর সাথে সাথে ‘উহ-আহ’ , ‘স্যার লাগছে’, ‘ওরে আল্লাহ মরে গেলাম’ এমন আকুতি বাক্য সুর কর্ণগহ্বরে প্রবেশ করলো বুঝতে বাকী থাকেনি সাক্ষাৎ কেয়ামত দেখা সময়ের ব্যপার মাত্র। ঠিক তখনই “স্যার .. উহ আহ , স্যার লাগছে স্যার” পশ্চাতদেশের ব্যাথায় তখনও কাতরাচ্ছি, তবুও নিস্তার ছিলোনা। স্যার তখন হুংকার দিয়ে “আজ তোদের যে শাস্তি দিলাম তা শুধু তোরাই দেখতে পারবি, কাউকে দেখাতে পারবিনা, যা এবার” এক দৌড়ে সোজা টয়লেটে, ২০-২২ কি জায়গা হয়? তবুও ঠেলাঠেলি করে একে অপরের দু:খগুলোর ভাগাভাগির পর্ব তখন।
কলেজ জীবনের আরেকটি ঘটনা বলি :
স্বাধীনতা দিবস সেবার। আমি ইন্টারমিডিয়েট পড়ি তখন। কলেজে অনেক আয়োজনের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। উৎসবমুখর এক পরিবেশ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা – বক্তৃতা আরো কি সব জানি। আমরা বেশ কজ’ন অনুষ্ঠানের বাইরে তখন। ভেতরে যাচ্ছি আবার বেরুচ্ছি এই আর কি। মেয়েদের অনন্যা লাগছিলো। ভিন্ন রঙের শাড়ীতে, আসলে সত্যি বলতে কি কলেজ ড্রেসে ওদেরকে যেভাবে সচারচর দেখে অভ্যস্ত ছিলাম সত্যি শাড়ীতে ওদের একদম আলাদা লাগছিলো। আসলে স্বাধীনতা দিবসে যেন নিজেদের মাঝেই এক অফুরন্ত স্বীধনতার স্বাদ পেতে চাইলাম, তাই কেউ কেউ তাদের প্রিয়জনকে নিয়ে খুব সহজেই সটকে পড়লো, পরে শেষ বিকেল অব্দি কলেজ চত্বরে আর কাউকেই তেমন পাওয়া যায়নি।
নিজের কথা বলি, আমি আরো বেশ ক’জন কলেজের মাঠে তখন। চারিপাশের আনন্দ নিজেদের করে নেবার ব্যস্ততায় মশগুল আমরা। দেখছিলাম ঠিক অদূরে দাড়িয়ে থাকা বেশ কজ’ন মেয়ে জটলা করে এদিকেই, মানে আমাদের দিকেই আসছিলো। কিছুটা চাঞ্চল্যতায় আমরাও উৎসুকী হলাম। সামনাসামনি দুটি ছেলে মেয়েদের দল, একটা মেয়েকে রেখেই বাকী মেয়েরা সবাই চলে গেল। আমার সামনে এসে মেয়েটি বাকী ছেলেদেরকেও চলে যেতে বললো। মুখোমুখি আমি আর ও। পেছনে রাখা ওর হাত থেকে একটা লাল গোলাপ সামনে নিয়ে আমাকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললো “তোকে আমি খুব ভালবাসি, কখনো বলিনি, তুইও বুঝতে পারিসনি, আজ বললাম, নে ফুলটা ধর” গলায় কাঁটা বিধলেঁ যেভাবে ঢোক গেলা যায়না, দম বন্ধ হয়ে আসে আমারও অবস্থা তাই, প্রচন্ড ঘামছি, হাতটা বাড়িয়ে যে ফুলটা নেব মনে হচ্ছিলো হাতে সে পরিমান শক্তিও নেই, চোখের সামানে সবকিছুকেই ঝাপসা লাগছিলো, ওর হাতের স্পর্শে সম্বিৎ ফিরে এলো “কিরে, ফুলটা নিতে বললাম, নিবিনা ?” ‘হ্যা, দে দে, কিন্তু দেখ আমি যে এগুলো নিয়ে এখন ভাবছিনা, কিছু মনে করিস না তুই, তোকে বন্ধু ভাবতে পারি এর বেশী কিছু না ?” অনেকক্ষণ দাড়িয়ে ছিলো ও, চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছিলো। নিষ্ঠুরের মত আমি ওর চোখের জল মুছে দেইনি, ভেবেছিলাম একবার আবেগ তাড়িত হলে সেখান থেকে নিজেকে ফেরাতে পারবো কিনা। কাঁদতে কাঁদতে ও চলে গেলো। ওর দেয়া ফুলটা তখনও আমার হাতে ছিলো।
এরপর অনেকটা সময় কলেজে একসাথে পড়েছি। কথা হত, কিন্তু বেশীক্ষণ না। অনেকদিন পর যখন শেষবারের মত কলেজে গিয়েছিলাম, শুনেছিলাম ওর নাকি বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ওই এলাকায় থাকতো। ভেবেছিলাম দেখা করবো। ইচ্ছে – অনিচ্ছের মাঝে আর কখনো দেখা হয়ে উঠেনি ওর সাথে। সত্যি বলতে আজ ওর নামটাও মনে করতে পারছিনা।
ই উ নি ভা র্সি টি
এবার আসি ইউনিভার্সিটি’র কথায়, ওহো , কিন্তু আগেই বলেছি ইউনিভার্সিটি পড়বার সুযোগ থেকেও হয়নি, ইউনিভার্সিটি জীবনের কোন অভিজ্ঞতাই নেই, নেই কোন জমানো স্মৃতিও । সেহেতু সে স্বাদ থেকে আমি বঞ্চিত সুতরাং ইউনিভার্সিটি পর্ব এখানেই স্টপ। ।
কিন্তু হ্যা এবার একটা সুযোগ হয়েছে । আর আজ ছিলো ইউনিভার্সিটির ওরিয়েন্টেশন
একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ’তে এডমিশান নিয়েছি । আগামী ২ অক্টোবর থেকে ক্লাস শুরু।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১০ সন্ধ্যা ৬:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




