প্রগতি কো-অপারেটিভ ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড, সংক্ষেপে, প্রগতি ব্যাংক নিরেট একটি বাংলাদেশী ব্যাংক। যাত্রা শুরুর দিন থেকেই এই ব্যাংকের দাপ্তরিক ভাষা বাংলা। ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মোঃ সাইফুল ইসলাম মোল্লা একজন বাংলা ভাষার মানুষ। তাই তিনি ২০০৯ সালের ১০ জানুয়ারি ব্যাংকটি স্থাপনের দিনই সর্ব প্রথম যে অফিস আদেশটি জারী করেন তা ছিল বাংলা ভাষা প্রচলন সংক্রান্ত। তিনি সে পত্রে ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে দায়িত্ব দেন বাংলা ভাষায় http://www.progotibank.com.bd পোর্টালটি খোলার জন্য। সে পত্রে তিনি এও বলে দেন, “অত্র ব্যাংকের দাপ্তরিক ভাষা বাংলা, যার অধিক্ষেত্রে বাংলাকে অস্বীকার বা নিষ্ক্রিয় রেখে অন্য কোনো ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। ব্যাংকের সকল কার্যক্রম চলবে বাংলায়। অধিকন্তু, ব্যাংকটি অচিরেই এমন ব্যবস্থাদি গ্রহণ করবে, যাতে অন্যান্য ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সকল প্রতিষ্ঠান সর্বস্তরে ভাষাদূষণ রোধ করে পরিচ্ছন্ন বাংলা ভাষা প্রচলনে অনুপ্রাণিত হয়। সেসঙ্গে আমাদের ব্যাংক অপর ভাষার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকবে। বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনে ব্যাংকটি ইংরেজি কিংবা অন্য ভাষায় চলতে পারবে। তবে তার বাংলা ও ইংরেজি বা অন্য ভাষা পাঠের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাবে।” মাতৃভাষা বাংলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার জন্যই তিনি উদ্যোগটি তৎক্ষণাৎ গ্রহণ করেছিলেন।
বাংলা প্রসারের এই উদ্যোগ গ্রহণ করার পরপরই জনঅবহিতকরণ ও উদ্বুদ্ধকরণের জন্য দেশব্যাপী প্রচারণাপত্র বিলি করা হয়। পাশাপাশি Facebook, Linkedin সহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই সম্পর্কে জানানো হয়। এতে করে ব্যাংকটি তার বাংলা পোর্টাল বা ওয়েবসাইট এবং সার্বিক বাংলা ব্যবহার বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সুস্পষ্ট এবং সাড়া জাগাতে সমর্থ্য হয়। প্রগতি ব্যাংকের এসব প্রচারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পরে ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইটে বাংলা ভার্সন যুক্ত করাসহ দাপ্তরিক ভাষা বাংলা করার উদ্যোগ নেয়। এছাড়াও, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বাংলা অধ্যুষিত অঞ্চলে অনেক প্রতিষ্ঠান একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে থাকে।
এমতাবস্থায়, ২০১২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয়তে ‘ভাষাদূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নিবন্ধটি পরদিন আদালতের নজরে আনেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে ওই দিন আদালত স্বতঃপ্রণোদিত রুলসহ অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন। আদেশে বেতার ও দূরদর্শনে বিকৃত উচ্চারণ, ভাষা ব্যঙ্গ ও দূষণ করে অনুষ্ঠান প্রচার না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। রুলে বাংলা ভাষার দূষণ ও বিকৃতি রোধে কেন পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়াসহ কয়েকটি বিষয়ে রুল দেওয়া হয়। এ ছাড়া বাংলা ভাষার দূষণ, বিকৃত উচ্চারণ, সঠিক শব্দচয়ন, ভিন্ন ভাষার সুরে বাংলা উচ্চারণ ও বাংলা ভাষার অবক্ষয় রোধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নির্ধারণ করতে কমিটি গঠনের কথা বলা হয়।
ওই রুল আজ অবধি নিষ্পত্তি না হলেও তা জারীর দুই বছর পর সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রচলনের নির্দেশনা চেয়ে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। রিটে বলা হয়, সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদ এবং বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭-এর ৩ ধারা অনুসারে সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে (বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত) চিঠিপত্র, আইন-আদালতের সাওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগ কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে। ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ আইনটি পাস হয়। কিন্তু ২৬ বছরেও আইনটি অনুসরণ করা হচ্ছে না। শুনানি নিয়ে আদালত ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ তারিখে রুল জারির পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, এক মাসের মধ্যে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বর প্লেট, সরকারি দপ্তরের নামফলক (দূতাবাস, বিদেশি সংস্থা ও তৎসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্র ব্যতীত) এবং গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করে আদালতকে জানাতে হবে। রুলে সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রচলনের উদ্দেশ্যে অবিলম্বে কেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।
হাইকোর্টের গৃহীত ব্যবস্থায় হয়তো সর্বত্র দূষণমুক্ত পরিচ্ছন্ন বাংলা ভাষা প্রচলন হবে। কিন্তু ব্যাংকটি জন্ম নিয়েই এমন সময় বাংলা ভাষা বিকাশের জন্য আওয়াজ তুলে ছিলো যখন ব্যাংক ভূবনে বাংলার ব্যবহার প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিলো । সে সময় মায়ের ভাষা বাংলায় ব্যাংক পোর্টাল বা অফিসিয়াল ওয়েবসাইট চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং প্রাত্যহিক, দাপ্তরিক ও অন্যান্য কার্যাদি প্রবর্তনের মাধ্যমে ব্যাংকটি যে কৃতিত্ব ও সফলতা দেখিয়েছে এবং এর মাধ্যমে যে গণআস্থা অর্জন করেছে তা দেখে অনুপ্রাণিত হয় অন্যান্য ব্যাংক, বীমাসহ নানাবিধ প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিত্ব। ফলে আজ গোটা বাংলাদেশের সব জায়গায় স্বচ্ছ বাংলা ভাষা, যে ব্যবহার শুরু হতে চলেছে, এর পেছনে প্রগতি কো-অপারেটিভ ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (প্রগতি ব্যাংক) এর ভূমিকা কিছুটা হলেও রয়েছে। তাও তো সন্দেহাতীতভাবে সত্যি যে, এই ব্যাংকের আগে পৃথিবীর কোনো ব্যাংকই তার সকল কাজে বাংলা কার্যকর করেনি। সম্ভবতঃ সে কারণে বলা হয়ে থাকে, ব্যাংক জগতে বাংলা ভাষা প্রসারে এই ব্যাংক ও তার প্রতিষ্ঠাতার অবদান সবচেয়ে বেশি। কিন্তু আমরা মনে করি, ভাষাটির অগ্রযাত্রায় সকল ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানের পরিশ্রমের ঘাম এখনও লেগে আছে। প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে, সেই দিন হয়তো দূরে নয়, যখন জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা বাংলা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




