somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

'এক বুক অপরাহ্ন'...(২)

২৯ শে মার্চ, ২০০৮ দুপুর ১:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

'এক বুক অপরাহ্ন'...(১)

কবিতা পড়ে ভীষন নার্ভাস হয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এসে বন্ধুদের মাঝে দাঁড়াতেই হঠাৎ দুটি মেয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো। একজন বল্ল- "বাহ। আপনি তো দারুন কবিতা লিখেন!" আরেকজন বল্ল- "আপনার আবৃত্তিও খুব চমৎকার।" সরাসরি প্রশংসায় হতচকিয়ে গেল কাব্য। মিন মিন করে শুধু বল্ল "জ্বি,ধন্যবাদ"।

প্রথম মেয়েটি বল্ল আমার নাম "তন্দ্রা। ফিজিওলজি ডিপার্টমেন্ট। ও আমার ক্লাসমেট, মৃন্ময়ী।"

এতক্ষনে ভাল করে তাকাল ও মেয়েটার দিকে। অপরুপা দেখতে। আর খুবই ভদ্র। কিভাবে কিভাবে যেন ওদের পরিচয়টা আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল।হঠাৎ একসময় আবিস্কার করল, ওরা দুজনই দুজনের প্রেমে পড়ে গেছে।

এরই মাঝে ২৬ শে মার্চের কাল রাতে পৃথিবী স্তম্ভিত হয়ে গেল। দেশের যুব সমাজ প্রতিশোধের আগুনে ঝলসে উঠল।

আচমকা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। দেশের বিভিন্ন জাগা থেকে খবর আসতে লাগলো মুক্তিরা পাকিদের অমুক অমুক ঘাটিঁ উড়িয়ে দিয়েছে। প্রতি খবর শোনার পর বুকে আনন্দের বান ডেকে যেত ওর। হঠাৎ ও সিদ্ধান্ত নিল পাকদের তাড়াতে ও-ও অংশগ্রহন করবে। মৃন্ময়ীকে এটা জানাতেই দুহাতে প্রচন্ড ধরে ওকে চেপে ধরে চেচিয়ে বলতে লাগল না, তুমি কোথাও যাবে না, তুমি আমার কাছে থাকবে।"

কি ছেলেমানুষ ছিলো মেয়েটা!

একরোখা কাব্যকে মেয়েটা থামাতে পারেনি। শেষবার বিদায়ের সময় ও এসে দাঁড়াল সামনে। লম্বা চুল বড় খোপা করে বাধা। চোখে কাজল, ঠোটে লিপস্টিক, কপালে ছোট্ট একটি লাল টিপ। অদ্ভুত সুন্দর একটি শাড়ী পড়েছিলো মৃন্ময়ী।
কাব্য মুগ্ধ স্বরে বল্ল - "এ তো দেখছি স্বর্গের দেবী। আমার মৃন্ম কই?"

শুনে হু হু করে কেঁদে ফেল্ল মৃন্ময়ী। কাজল ধোয়া অশ্রু গাল বেয়ে পড়ছিলো। সেটা তর্জনি দিয়ে মুছে দিয়ে ও বল্ল- "আমাকে হাসিমুখে বিদায় দাও মৃন্ম, কাঁদলে তোমার এই কান্নামাখা মুখ হয়ত সারা জীবন মনে থাকবে আমার। দেখ না আমি হাসছি, যাতে আমার হাসি হাসি মুখটা তোমার মনে সবসময় গেথেঁ থাকে।"

মৃন্ময়ী বাধ ভাঙ্গা কান্নায় ঝাঁপিয়ে পড়ল কাব্যর বুকে। - "তুমি ধরেই নিয়েছো আমাদের আর কোনদিন দেখা হবে না, তাই না?" কান্নার দমকে শেষের কথাগুলো বোঝা গেল না। আসলে কাব্য ভেবেছিলো ও নিজে মারা যাবে। মৃন্ম নয়।

যুেদ্ধর মাঝে একবার আজিমপুরে ওদের বাসায় গিয়েছিলো কাব্য। ওরা যে দালানে থাকতো, দেখলো কামানের গোলার আঘাতে তার একপাশ ধসে পড়েছে। পুরো দালানটাই খা খা করছিলো। মৃন্মদের বাসায় ঢুকে দেখল ঘরের সব আসবাব পত্র ছড়ানো ছিটানো। দেয়ালে দলা দলা রক্তের ছোপ। মেঝেতেও, তাতে কাউকে টেনে নেবার চিহ্ন। মৃন্মর ঘরের মেঝেতে ওর বই পত্রগুলো ছড়ানো ছিটানো। একটি ডায়রির ছেড়া পাতা, একটা জামার ছেড়া অংশ, একটি চুলের ফিতা, একটি ভাঙ্গা চুরি মেঝেতে পড়ে ছিলো এসবও। অতিরিক্ত শোকে পাথর হয়ে গেল কাব্য। সব একটা একটা করে একটা কাপড়ের ব্যাগে ভরে রাখলো। এই অমূল্য ব্যাগটা আর শেষতক ওর সাথে থাকেনি। পাকিদের হামলার শিকার হয়ে সেটা হারিয়ে ফেলে। শুয়োরেরা ওর মৃন্ম আর মৃন্মর স্মৃতি, দুটোকেই ওর কাছ থেকে নিয়ে গেছে।

পরের অপারেশন গুলোতে ওর মাথার রক্ত টগবগ করে ফুটেছে। পাকি আর্মি দেখলেই মৃন্মর ঘরের এলোমেলো দৃশ্যের কথা মনে পড়ে। ওর তখন ইচ্ছে করত পুরো পৃথিবীটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড় খার করে দিতে।

কয়েকটা রাজাকার কে সেবার ধরে এনেছিলো ওদের সেক্টর কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার আতাহার ভাই। প্রচন্ড শীতের ভেতর খালি গায়ে সারারাত বেঁধে রেখেছিলো। ভোরে ওদের পেটের সাথে ডিনামাইট বেঁধে মুখে কাপড় গুজে একটা গ্রামের বড় একটা ব্রীজের নীচে বেঁধে রাখা হল। উপর দিয়ে একটা আর্মি জীপ যেতেই ডিনামাইট দিয়ে কাব্যরা ব্রীজটা উড়িয়ে দেয়। এক ঢিলে তিন পাখি মারল। পাকি মরল, রাজাকার মরল, আর ব্রীজ না থাকাতে আর কোন আর্মি কনভয় গ্রামে ঢুকতে পারেনি। অপারেশনের এই প্লানটা করেছিলো কাব্য নিজে। আতাহার ভাই কি যে খুশী হয়েছিলেন!

যুদ্ধ তখন শেষের পথে, জীবনের শেষ একটা গেরিলা অপারেশনে ওর উরুতে ৪ ইন্চি একটি বুলেট এসে বিধেঁ। আসলে বার বার মৃন্মর কথা মনে পড়াতে এ্যামবুশ করার সময় প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলো ও। পাকি ক্যাম্পের ভিতরে গিয়ে ওরা তিনজন একসাথে শত্রুসেনা লক্ষ্য করে ব্রাশ ফায়ার করল। অর্তকিতে আক্রমনে সেনারা হতবিহ্ববল হয়ে পড়ল। ১০/১২ জন সেনা স্পট ডেড। গুরুতর আহত হলো প্রচুর। ওদের মিশন ছিলো শত্রুসেনার এ্যামিউনেশন ছিনিয়ে নেয়া। কারন ওদের স্টক প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিলো। কয়েক শ কার্টুন গোলা বারুদ দেখে কাব্যর চোখ চকচক করে উঠল। যে মজুদ আছে তাতে অনায়াসে আরো ৩০/৪০ টা অপারেশন করা যাবে। এমন সময় হঠাৎ একটা আহত সেনা পিস্তল দিয়ে ওকে গুলি করল। জবাবে ঐ সেনার খুলি উড়িয়ে দিল কাব্য।

গত ৩৮ বছরে এই সব স্মৃতি মনে করে ও যে কতবার কেঁদেছে তার ইয়ত্তা নেই। আজও কাঁদল।

হঠাৎ পৃথ্বাকে চেঁচিয়ে ডেকে বল্ল- "আমাকে একটু ছাদে নিয়ে যাবি নানুভাই? প্লিজ!"

পৃথ্বার কাধে ভর করে ছাদে গেল কাব্য। বৃষ্টি ততক্ষনে অনেকটাই ধরে এসেছে। খুব শীত করতে লাগল কাব্যর। গায়ের পান্জাবী ভিজে চুপসে গেল। মৃন্ম এমন সময়ে থাকলে কি বলত ওকে?
---"এ্যাই, তুমি আবার বৃষ্টিতে ভিজছো? এই বয়সে ঠান্ডা বাঁধালে কে দেখবে তোমাকে? আর পাগলামি কর নাতো, সারাজীবন তোমার পাগলামী সহ্য করেছি। ও চলে যেতেই মৃন্ম ওর পান্জাবী ধরে টান দিয়ে নীচু স্বরে বলত--এ্যাই কোথায় যাচ্ছ, ভিজবে না বৃষ্টিতে?"

কাব্যর চোখ বেয়ে অঝরে জল.....বৃষ্টির কারনে পৃথ্বা বুঝতে পারল না।

হঠাৎ অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখতে পেল কাব্য। বৃষ্টির ক্রমাগত ধারায় ওর কিছুটা দূরে একটা হলোগ্রাফিক স্ক্রীনের মত ঝাপসা একটা পর্দার সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে একটি মুখ দেখা যাচ্ছে। চুল বড় খোপা করে বাঁধা। চোখে কাজল, ঠোটে লিপস্টিক, কপালে ছোট্ট একটি লাল টিপ। ওকে বলছে, "এ্যাই, কি দেখছো, ভিজবে না বৃষ্টিতে?"

(এই গল্পটি আমি ক্লাস টেনে পড়ার সময় লিখেছিলাম। লেখার সময় অত্যন্ত মন খারাপ ছিলো। আজ, এত বছর পর এই লেখাটি আমায় একটা বাচ্চা ছেলের মত কাঁদিয়েছে। কি র্বোড ভিজে গেছে চোখের পানিতে। লেখা শেষে ঘরের দরজা বন্ধ করে কেদেছিঁ। কিছুতেই কান্না থামাতে পারছিলাম না।)




সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে মার্চ, ২০০৮ দুপুর ১:৫৯
১৮টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চলতি পথের গল্পঃ দুই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২২


‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।

এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক

‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×