“বাঙালী মানুষ নয় জন্তু, গাধা সে লেজ নাই কিন্তু”। আমার স্কুল জীবনের এক শিক্ষক অবাধ্য ছাত্রদের অপমান করার জন্যে বলতেন। আমি কথাটা কখনই আমোলে আনি নি। আমার সব সময় দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, বাঙালী একটা ভীষণ আত্মমর্যাদা সম্পন্ন সংবেদনশীল জাতি। তাদের স্বাধীনতার যে অপরিসীম মূল্য দিতে হয়েছে, তার পরে তারা শুধু স্বার্থের জন্যে অন্যকে অপদস্থ করতে পারে না।
কিছুদিন আগে গাড়ি চালিয়ে বাসায় ফিরছি। রেডিওতে চলছে আমেরিকার নিউজ চ্যানেল NPR (national Public Radio)। মনটা কিছুটা অন্যমনস্ক। হঠাৎ রেডিও থেকে স্পষ্ট শুনলাম, বাংলাদেশ। শব্দটা বাড়িয়ে কান খাড়া করলাম। খবর পাঠক, ব্যাংলাডেশ না বলে, বাংলাদেশ বলল বেশ কয়েকবার। খুবই যত্ন করে শুনতে লাগলাম, বাংলাদেশ নিয়ে কি বলে। যা শুনলাম, তা আমার কান পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারল না। তারা বলতে থাকলো, বাংলাদেশে সরকার নোবেল প্রাইজ বিজয়ী ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস কে, তার পদ থেকে ফায়ার (বরখাস্ত) করেছে। সাথে সাথে মনে আসলো, যেই লোক বিশ্বকে বাংলাদেশ শব্দটা সঠিক উচ্চারণ করতে শেখাল, তাকে তার হাতে গড়া প্রতিষ্টান গ্রামীণ ব্যাঙ্ক থেকে তার দেশের সরকারই তার দায়িত্ব থেকে জোর করে সরিয়ে দিয়েছে। ধরনী যদি দ্বিধা হতো, তা হলে সেখানে যেয়ে মুখ লুকাতাম।
বাংলাদেশের বয়স আজ চল্লিশ। বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার মত আমাদের তেমন অর্জন নাই বললেই চলে। বন্যা, দুর্নীতি, ক্ষরা ইত্যাদি দঃখজনক খবরগুলো আমাদের দুর্বলতা বারে বারে সবার সামনে প্রকাশ করে দেয়। কিন্তু সারা পৃথিবীকে বিস্মিত করে বাঙ্গালিরা ছিনিয়ে এনেছিল বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটি। যুদ্ধের সময় তাদের অঙ্গীকার ছিল, “মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি”। তাই বিশ্ববাসীর ধারনা ছিল বাংলাদেশ আর অন্য পাঁচটা দেশ থেকে আলাদা হবে। আর যাই হোক, দেশটায় ভালবাসা, সহনশীলতার কোন অভাব হবে না, একে অপরকে সম্মান করবে আর গুনী মানুষ তার যোগ্য স্থানে থাকবে।
ডঃ মুহাম্মদ ইউনূস প্রথম বাংলাদেশী নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ। তিনি ক্ষুদ্রঋণ (Microcredit) ধারণার প্রবর্তক। অধ্যাপক ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করে। ইউনূস বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার সহ আরও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছেন। মুহাম্মদ ইউনূস ১৯৭৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন গরীব বাংলাদেশীদের মধ্যে ঋণ দেবার জন্য। তখন থেকে গ্রামীণ ব্যাংক ৫.৩ মিলিয়ন ঋণগ্রহীতার মধ্যে ৫.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ প্রদান করেছে। ঋণের টাকা ফেরত নিশ্চিত করার জন্য গ্রামীণ ব্যাংক "সংহতি দল" পদ্ধতি ব্যবহার করে। একটি অনানুষ্ঠানিক ছোট দল একত্রে ঋণের জন্য আবেদন করে এবং এর সদস্যবৃন্দ একে অন্যের জামিনদার হিসেবে থাকে এবং একে অন্যের উন্নয়নে সাহায্য করে। ব্যাংকের পরিধি বাড়ার সাথে সাথে গরীবকে রক্ষা করার জন্য ব্যাংক অন্যান্য পদ্ধতিও প্রয়োগ করে। ক্ষুদ্রঋণের সাথে যোগ হয় গৃহঋণ, মৎস খামার এবং সেচ ঋণ প্রকল্প সহ অন্যান্য ব্যাংকিং ব্যাবস্থা। গরীবের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গ্রামীণ ব্যাংকের সাফল্য উন্নত বিশ্ব এমন কি যুক্তরাষ্ট্র, সহ অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশগুলো পর্যন্ত গ্রামীণের এই মডেল ব্যবহার করছে। Banker to the Poor নামে তার লেখা একটা বই আছে।
আমরা সবাই তার কাজ আর অবদান সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা রাখি। এখানে সেটা আরেক বার নতুন করে বলার চেষ্টা বাহুল্য মাএ। উপরের বর্ণনা দেয়ার একমাত্র কারণ, তার সমালোচক থাকলেও, গরীব জনগণ নিয়ে এত সফল ভাবে কাজ করার উদাহারন পৃথিবীতে বেশী নেই। তবে এতোটুকু স্বীকার করতে কারোরই দ্বিধা নাই, তিনি আমাদের থেকে ন্যুনতম সম্মান আশা করতে পারেন। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা, তাকে তার পদ থেকে বহিষ্কার করা, তাকে সবার চোখে অপদস্থ করার চেষ্টা কোন বিবেকবান মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য না। তাই সারা বিশ্বে আজ নিন্দার ঝড় উঠেছে। টেকনাফ থেকে তেতুলীয়া, বোস্টন থেকে বার্লিন, ডালাস থেকে দুবাই সব মানুষের একই মত, “ডঃ ইউনূসকে অপমান করা বন্ধ কর”।
কেন এ রকম এক স্বনামধন্য মানুষকে নিয়ে এত টানাটানি। তার প্রকৃত কারন হয়ত কখনই জানা যাবে না। আমারা আসলে জানতেও চাই না। কারো মতে, সরকার পক্ষের কেও হয়ত ঈর্ষা করছিলেন, কেও বলেন অর্থনৈতিক বিষয় আছে, আবার কিছু লোকের তার এক সময়কার রাজনৈতিক অভিলাষ আর আন্তর্জাতিক খ্যাতি আর যোগাযোগকে কারন হিসাবে মনে করেন। তবে এত টুকু আমরা দূর থেকে বুঝি এখানে নিশ্চয়ই কোন ব্যাক্তিত্বের সংঘাত আছে। কিন্তু যে যেই কারণ বের করুক না কেন বাংলাদেশ, আর ডঃ ইউনূস একই সাথে গাঁথা। ডঃ ইউনূসকে যখন অপমান করার চেষ্টা করা হয়, তখন তা প্রতিটা বাংলাদেশীর লজ্জা, প্রতিটা বাংলাদেশীর মাথা হেঁট হওয়া, আর প্রতিটা বাংলাদেশীর হৃদয় বিদীর্ণ করা। উপরের দিকে যে যত জোরে যত টুকু থুথুই ফেলুক না কেন, সেটা তার দ্বিগুন জোরে তার মুখেই এসে পড়ে।
আরেকটা বিষয় আমাদেরকে ব্যাথিত করে, আমরা স্বাধীন দেশের মানুষ হয়েও, বিদেশীদের সুযোগ করে দেই, আমদের নিজস্ব ব্যাপারে নাক গলাতে । অনেক পরাশক্তি আমাদেরকে এখন বলে দিচ্ছে, আমাদের কি করা উচিৎ। আমরা যে সবাই বাঙ্গালী, একই ভাষায় কথা বলি, আমরা যে একই পরিবারের সদস্য তা ভুলে যাই। আমাদের যদি আসলেও কোন সমস্যা থেকে থাকে তা আমরা নিজেরা সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করি না। বাড়ীর কথা রাষ্ট্র করি।
যেই বাঙ্গালী আমাদের সম্মানিত করল, যে সারা পৃথিবীকে “বাংলাদেশ” উচ্চারন করতে শেখাল,তাকে আমরা চূড়ান্তভাবে নাজেহাল করার চেষ্টায় আছি। প্রশ্নটা চলে আসে আমরা কি তা হলে লেজ বিহীন জন্তুতে পরিণত হচ্ছি? দুঃখজনক হলেও, একটা গল্প মনে পরে গেল। । নরক পরিদির্শনে গেলেন বিশিষ্ট কিছু মানুষ । দেখা গেল , প্রতিটা জাতির জন্যে একটা করে কড়াই । তার মধ্যে টগবগে তেলের মধ্যে পাপী মানুষদের পুড়তে হচ্ছে । প্রতিটা জাতির কড়াইর পাশে একজন করে প্রহরী । মানুষ মাথা তুলে বার হওয়ার চেষ্টা করলেই মাথায় বাড়ি । কিন্তু অবাক কান্ড, বাঙালী জাতির কড়াইর পাশে কোনো প্রহরী নেই । পরিদর্শকরা ভাবলেন , বাঙালীরা নরকে এসে অনিয়মের কোনো কাজ করছে না । যাই হোক মন্দের ভালো । কিন্তু পরে জানা গেল, মাথা তুলে কোনো বাঙালী পালানোর চেষ্টা করলে , অন্য বাঙ্গালীই তার পা ধরে টেনে নামায় । সে জন্যে কোনো প্রহরী লাগে না ।
বাঙালী হিসেবে আমাদের দাবী, ডঃ ইউনূসকে অপদস্থ করা বন্ধ হোক। এই মুহূর্তেই, ফিরিয়ে দেয়া হোক তার অর্জিত সম্মান। হয়ত আমাদের জগৎ কাঁপানো দাবীর কারনে এক পর্যায়ে, সরকার, ডঃ ইউনূসকে নাজেহাল বন্ধ করতে বাধ্য হবে। কিন্তু আমরা নিশ্চিত করতে চাই, একটি সভ্য জাতি হিসেবে আমাদেরকে, কখনই যেন আর না এরকম কোন ঘটনার পুনঃরাবৃতি দেখতে না হয়। হোক না সে নোবেল বিজয়ী কিংবা একজন সাধারন কোন মানুষ। শেষে রবী ঠাকুরের কয়েকটা লাইন উদ্ধৃত করিঃ
দুর্ভাগ্য দেশ হতে হে মঙ্গলময়
দূর করি দাও তুমি সর্ব তুচ্ছ ভয় ,
লোক ভয়, রাজ ভয়, মৃত্যু ভয় আর
দীন প্রাণ দুর্ব্বলের এ পাষান ভার.........
মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে,
উদার আলোক মাঝে, উন্মুক্ত বাতাসে
টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র
এপ্রিল ০৫, ২০১১
http://www.lekhalekhi.net
আলোচিত ব্লগ
চলতি পথের গল্পঃ দুই

‘মরচুয়ারী’ শব্দটার সাথে এর প্রবেশ পথের পেছনের গাছপালাগুলো দেখে শান্ত, নিরবিলি পরিবেশের মিল খুঁজে পেলাম।
এর পূর্বের পর্বটি পড়তে পারবেন এখানেঃ চলতি পথের গল্পঃ এক
‘মরচুয়ারী’র পথে দেখা কিছু... ...বাকিটুকু পড়ুন
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি
আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।