ক্লাস সিক্সে পড়ি, হাফ প্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট পরার বয়স হয়নি তখনও। স্কুলের হেড স্যারের রুমে ডাক পড়ল, একে একে ক্লাসের ছয় সেরা বান্দরের। বান্দরামিতে ক্লাশে স্যারদের অতিষ্ট করে রাখলেও হেডস্যারের রূম ছিল আমাদের কাছে মূর্তিমান আতংক। স্যারের আড়ায় হাত লম্বা একটা বেত ছিল, যে ওটার স্বাধ একবার পেয়েছে জীবনেও তা ভুলতে পারবে না। ওটার একটা বাড়ী খেলে একসপ্তাহ ওই হাত একেরারে ওকেজো হয়ে যেত। যাহোক আমার আগের দু’জনের চোখ মুছতে মুছতে স্যারের রূম থেকে বের হওয়া দেখে ভয়ে আমার প্রায় প্যান্ট নষ্ট অবস্থা। কাঁপতে কাঁপতে স্যারের সামনে দাড়ালাম, স্যার এক টুকরো কাগজ দেখিয়ে হুংকার ছাড়লেন ‘এটা কার হাতের লেখা, এই চিঠি তুই লিখেছিস’? ক্লাসের সেরা সুন্দরী (!!) বর্ণা তার বেঞ্চের নিচে এটা পেয়ে হেডস্যারের কাছে নালিশ দিয়েছে, সাথে সন্দেহের তালিকায় আমাদের নাম বলে এসেছে। আমরা কেঁদে কেটে, কছ্ম-টছম খেয়ে সে যাত্রায় মাফ পেলাম, তবে বলা হলো আমাদেরকে এখন থেকে কঠিন নজরদারীতে রাখা হবে, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটলে সাথে সাথে টিসি দেওয়া হবে! স্যাররা অবশ্য আর জানতে পারেননি চিঠিটা কার লেখা ছিল, তবে ক্লাশ এইটে উঠে ওই ছয় বান্দরের এক বান্দর ‘হাছান’ স্বীকার করেছিল যে ওটা তার কাজ ছিল।
আমার চিঠি লেখার হাতেখড়ি কিভাবে হয়েছিল মনে নেই। সম্ভাবত বাংলা ২য় পত্রের ‘পিতার নিকট টাকা চাহিয়া পত্র’ বা ‘গ্রীষ্মের ছুটি কেমন কাটাইয়াছ জানাইয়া বন্ধুর নিকট পত্র’ দিয়েই শুরু হয়েছিল। প্রথম ডাকে চিঠি পাঠিয়েছি সম্ভবত মামাদের কাছে মার চিঠির সাথে এক খামে। তার পর এস এস সি দিয়ে যখন খুলনা বি এল কলেজে চলে গেলাম তখন থেকে চিঠির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে লাগলাম। চিঠি ছিল বাড়ির সাথে যোগাযোগের একমাত্র বাহন। প্রতি সপ্তাহে মা কমপক্ষে একটা করে চিঠি দিতেন। চিঠির পুরা পাতা জুড়ে থাকত মার উপদেশমালা, তার অর্ধেক নামাজ কালাম বিষয়ক। কাছে না থেকেও চিঠির মাধমে মা’র সেই নির্দেশনায় মনে হয় আমাকে পথভ্রষ্ট হতে দেয়নি। এক সপ্তাহ আগের অনুভুতি বা বাড়ির কোন ঘটনা কত জীবন্ত লাগত চিঠি পড়ে! আব্বা খুব একটা লিখতেন না, উনার চিঠি বলতে মানিওর্ডার ফরমের নিচে ২/৩ লাইন। আমি প্রচুর চিঠি লিখতাম, বাডীতে, বন্ধুবান্ধবদের, আত্মীয় স্বজনদের, স্বাভাবিক ভাবে পেতামও প্রচুর। ইউনিভারসিটি পর্যন্ত কেটেছে এমন করে। প্রতি দিন আমি আশা করে থাকতাম রুমের দরজা খুলে একটা চিঠি পাওয়ার। আমার একটা মজার অভ্যাস ছিল, কোন চিঠি পেলে প্রথমেই পড়তাম না, সামনের উপর রেখে দিতাম, ঘুরতাম ফিরতাম আর কল্পনা করতাম চিঠির ভিতর কি লেখা থাকতে পারে। উইনিভার্সিটির শেষের দিকে মোবাইলের আগমনে বুঝতে পারলাম চিঠির দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই মার কিছু চিঠি যত্ন করে কালেকশনে রেখেছি, এখনও মাঝে মাঝে পড়ি সেগুলো। শেষ কবে চিঠি লিখেছি সঠিক মনে নেই, তবে চিঠি নিয়ে সুখ-দুঃখের সৃতি গুলো ভোলার না।
এটাও মনে হয় স্কুল লাইফের নবম বা দশম শ্রেনীর ঘটনা, আমার এক মামাত বোন, আমার সমবয়সী খুব সুন্দর ছবি আকত। বই-খাতার মলাটের উপর ছবি একে রাখা তখন একটা ফ্যাশন। তার কাছে আবদার করেছিলাম কিছু ছবি একে দেওয়ার, সে আমার আবদার রক্ষা করতে কিছু ফুলের ছবি একে আমার ছোট ভাই এর হাতে আমাকে পাঠিয়েছিল, সাথে বোনাস হিসাবে একটা চিঠি। ওখানেই বিপত্তি, ছোট ভাই সেটা আমাকে দেওয়ার আগে মার হাতে পড়ল। মা আমাকে চিঠি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে আমি নাদান বাচ্চা সাজার চেষ্টা করলাম। উনি শুধু বললেন “কখনও ভেবনা মা-বাবার থেকে তুমি বেশি বুঝ”, লজ্জায় মনে হচ্ছিল ‘হে পথিবী তুমি ফাঁক হও আমি তোমার ভিতর ঢুনে যাই’।
কলেজ লাইফের আর একটা মজার ঘটনা বলি, ক’বন্ধু মিলে একবার ম্যাসের ঠিকানা লিখলাম টাকার উপর, মেয়ের নাম দিয়ে। কিছুদিন পরে যশোহরের এক মেয়ের কাছ থেকে চিঠি এল বন্ধুত্ব করার প্রস্তাব সহ। সন্দেহ হলো আসলেই মেয়ে না ছেলে? আমরাও উত্তর দিলাম মেয়ে হিসাবে তার প্রস্তাব গ্রহন করে। চিঠি চালা চালি শুরু হলো দুই পক্ষই মেয়ে সেজে, প্রায় এক বছর পর তারা স্বীকার করল যে আসলে তারা ছেলে। আমরা তখনও মেয়ে পরিচয়ে, তাকে জন্মদিনের দাওয়াত দিলাম খুলনা আশার জন্য। যথারীতি একগাদা রজনীগন্ধা নিয়ে সে আর তার বন্ধু হাজির। গেটের ভিতর ঠূকেই বুঝতে পারে এটা আসলে একটা ছাত্রাবাস, আর আমরা সবাই ছেলে। যাহোক, মজা শেষ হলো কিন্তু তাদের সাথে বন্ধুত্ব ছিল অনেকদিন।
প্রথম যৌবনে প্রেমে পড়েছিলাম একজনের, তিন লাইনের একটা চিঠি দিয়েছিল সে। এই ছিল আমার কাছে তার সৃতি। সেই চিঠি তিন বছর পর্যন্ত মানি ব্যগে নিয়ে ঘুরেছি, কতহাজার বার যে পড়েছি তার ঠিক নেই। বেরসিক পকেট মার একদিন আমার সেই ছেড়া-ময়লা অমুল্য সম্পদটা হাতিয়ে নিল!
আমার এক ফুফু তার পরিবার সহ চলে গিয়েছিলেন রাঙ্গামাটি, তখন রাঙ্গামাটি এক বিচ্ছিন্ন জনপদ। প্রায় ২/৩ বছর কোন খোজ ছিলনা, সবাই ধারনা করেছিলাম শান্তি বাহিনীরা মেরে ফেলেছে। হঠাত একদিন এল একটা চিঠি, আমার মনে আছে সবাই আনন্দে কেদে ছিল সেদিন। তার পর মাঝে মাঝে চিঠি আদান প্রদান হত কিন্তু রাঙ্গামাটি থেকে মাগুরা চিঠি আসতে সময় লাগত প্রায় ১ মাস।
মাত্র কিছুদিন আগেও চিঠি ছিল যোগাযোগের অন্যতম বাহন, আর এখনই তা ইতিহাস হতে বসেছে। আমাদের সন্তানেরা চিঠির কথা শুনে হাসবে হয়ত। আজ একজন কে একটা কথা বলব আর সে শুনবে ৩/৪ দিন পর, হাস্যকর! কিন্তু চিঠির মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশের গভিরতা কি তারা কোন দিন বুঝবে? চিঠির মাধ্যমে যেভাবে মনের ভাব প্রকাশ করা যায় মোবাইল, এস এম এস, ওয়েবক্যমে সেটা কখনো সম্ভব নয়। একটা ছবি যেমন কোন মূহুর্তকে ফ্রেমে আটকে দেয়, চিঠিও তেমন একটা সময়ের অনুভুতি কে আটকে দেয় সারা জীবনের জন্য।
আমি শেষ চিঠি লিখেছিলাম সম্ভাবত ৫ বছর আগে, আমার এংগেজমেন্টের পর বাগদত্তাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য। আপনি শেষ কবে চিঠি লিখেছেন মনে করতে পারেন
(এমনিতেই ভাল লিখতে পারিনা তারপর বাংলা টাইপিং এর যা অবস্থা; এত কষ্ট করে লেখার পর ১৫ মিনিটেই প্রথম পাতা থেকে গায়েব! গতকাল রাতে পোষ্ট করেছিলাম যারা একবার পড়েছেন ক্ষমা চাচ্ছি রিপোষ্ট করার জন্য। আর সামুতে প্রথম পাতায় আরো বেশি লেখা রাখার জন্য মডু দের কাছে আবেদন করছি)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



