রেডিও কমিউনিকেশনঃ আমাদের সামাজিক অর্থনীতিতে ও অবকাঠামোয় ২০১০ সালেও এখানে ডিজিটাল বাংলাদেশের মেরুদন্ড হতে পারে রেডিও কমিউনিকেশন। রেডিওর সাথে এ জাতির আছে গভীর পরিচয়। ১৯৭১ এ একটা স্বাধীন বাংলা বেতার সাতকোটি মানুষকে যুদ্ধের কথা শুনিয়েছ আজ কয়েকশ রেডিও চাই জীবনের কথা বলতে।
এটাই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালি ইনফর্মেশন আউটপুট কারন এই টেকনোলজিটা সবচেয়ে পুরাতন। সবার জানা ও সবচেয়ে সহজ। একেবারে বিনা পয়সায় তথ্য। এ দেশে মোট জনগোষ্ঠির কম বেশি সত্তুর শতাংশ মানুষ গ্রমের কৃষক এ সকল মানুষদের আগামী ২০ বছরেও তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে কম্পিউটার লেপটপের ব্যবহারের প্রয়োজন এবং সামর্থ্য কোন টা নাই।
তবে তথ্যের প্রয়োজন এদের অপরিহার্য, সারাদিন অজস্র তথ্য লাগবে। লোকাল পত্রিকার গরম খবরটা জানতে হবে, একই ভাবে ছেলে হউক মেয়ে হোক দুটি সন্তানই যথেষ্ট এরকম তথ্য থেকে শুরু করে কোন নির্দিষ্ট এলাকায় কয় তারিখের মধ্যে বোর রোপন করতে হবে, চাপাশে বাজার দর কোথায় কেমন ? আর এসবই সম্ভব হবে রেডিও গুলি যদি উপজেলা থেকে প্রচার করা হয়। কেননা প্রতিটি উপজেলাই সবচেয়ে ভালো জানে তার সীমানার কোথায় কি লাগবে। আর এক্ষেত্রে আমাদের উদ্দেশ্য যদি থাকে গ্রামে তথ্য দেয়া তবে সেটা হতে হবে ফ্রী তথ্য। ৩০ হাজার টাকার একটা লেপটপ নিয়ে ৫০,০০০ হাজার মানুষকে ব্যবহার করার সেটআপ দিতে হবে। যেন কোন উপজেলার সবচেয়ে রিমোট লোকেশন থেকেও একজন কৃষক উপজেলা সদরে খোলা একটা লেপটপে ক্লিক করে জেনে নিতে গুটি ইউরিয়ায় কি লাভ হয়। আর সারাদিন হাজরো কথাতো থাকবেই। এখন আর স্টার হতে ঢাকা যেতে হবে না, নিজের এলাকায়ই হওয়া যাবে।
যেদিন দেশের যে কোন লোকেশনে দাড়িয়ে অন্তত ১০ (দশ) টি এফএম রেডিও শোনা যাবে সেদিন ডিজিটাল বাংলাদেশ সত্যি সহজ হয়ে যাবে। অর্ধেকেরও বেশী মানুষকে লাইভ সংযোগ করে ফেলা যাবে উপজেলার যে কোন লোকেশন থেকে । কয়েকটা নির্ধারিত নম্বরের একটিতে কলে করে এক কলের পয়সায় পুরো উপজেলার জনগনকে তথ্যটা শেয়ার করতে পারবে কোন হিডেন কস্ট ছাড়াই।দেখার হাওরের বাঁধ ভাঙ্গার উপক্রম তা সবার আগে শোনা যাবে রেডিও দক্ষিন সুনামগঞ্জে। আর বছর খানেক সময় দিলে এমন ছোট্টো স্টেশনই ইন্টারনেট রেডিও এড করে সারা দুনিয়াতে চলে যাবে। আজ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও প্রত্যান্ত অঞ্চলেও উপজেলাগুলির শতাধীক প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে ক্লাস ও দৈনন্দিন কর্মকান্ডে নির্দেশনা দিচ্ছে উপজেলা শিক্ষা অফিসার।
আর কৃষির মত শতভাগ শারীরিক শ্রমের কাজ যেখানে ইনফর্মেশন ও মোবিলাইজেশনই আসল কথা যেমন সঠিক বাজারে উৎপাদিত পন্যটি নিতে পারা তেমনি কোন নদীতে পানি কতটুকু বেড়েছে, ট্রলার কোন পর্যন্ত চলা শুরু হয়েছে, কোন গ্রামে এবছর পাটের ফলন ভালো হয়েছে, কোন ইউনিয়নে বোরো কাটা শুরু হয়েছে, কৃষি অফিসার বেগুন চাষ সম্পর্কে কি বলছে, সারের ট্রলার বা ট্রাক ফ্যাকট্রি থেকে কখনযাত্রা শুরু করেছে, উপজেলায় কৃষকের কার্ড তৈরীর কাজ কবে শুরু করেছে ইত্যাদি হাজারো তথ্য। সে দেশে গরীব কৃষকদের এই সস্তা কমিউনিকেশন টা ব্যাহার করতে দেয়া ন্যায় সংঙ্গত।
টেক্নোলজিটা কত সহজ ? ১৮৯৬ সালে মারকুনির Patent 1203, সেই থেকে একশত চব্বিশ বছরে টেকনোলজিটা আজ হাউজহোল্ড হয়ে গেছে। দেশের অসংখ্য টেকনিকেল কলেজের সবচেয়ে কোমল মতি ছাত্র টাও হাতে বানিয়ে সারা উপজেলার সাথে সংযুক্ত হয়ে যেতে পারবে।
টেরেস্টারিয়াল টেলিকাস্টঃ মানে হলো এআইয়র টিভি বা Air টেলিভিশন যা আমারা বিটিভি নমে চিনি। টেরেস্সারিয়াল টেলিভিশন এই কমপিউটার ইন্টারনেটের যুগেও পৃথিবীতে সবচেয়ে শক্তিশালি ডিজিটাল কমিনিকেশনের অবস্থানেই আছে। কারন হলো এই টিভি দেশের যেকোন প্রান্তে শুধু একট এন্টেনা তুলেই দেখা যায়। দেখতে পয়সা লাগে না। আর আমাদের দেশের ৭০ ভাগ মানুষ এখনও বাধ্য হয়ে বি-টিভি দেখছে, আর বিটিভি এক জরিপে বলেছে আমাদের ৯০ শতাংশ মানুষর টেলিভিশন এক্সেস আছে। টেরস্টারিয়াল টেলিকাস্ট গন মানুষের কাছে যেতে পারে বিধায় এটা গনশিক্ষায় ইডুকেশন সামাজিক শিক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
কিছু দিন আগে চ্যানেল আই এর এগার তম জন্ম দিনে লক্ষ্য করলাম সারাদেশের বিভাগ ও জেলা পর্যায় সহ রাজধানী ঢাকায় বিশাল বিশাল সব অনুষ্ঠান হলো। এই অনুষ্ঠানে দেশ বরেণ্য সব বিশাল মাপের লোকজন এসে যোগ দিলেন। হৃদয়ে মাটি ও মানুষ কৃষকের ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠানগুলোর ভুয়শি প্রশংসা হলো। গ্রাম থেকে কৃষকও আনা হলো। অথচ দেখলাম কেউ কেউ এটাই জানেনা চ্যানেল আই কেন একমাত্র বিটিভি ছাড়া অন্য কোন চ্যানেল এদেশের আশি ভাগ লোকের কাছে যেতেই পারে না যদিও সারা দুনিয়ায় চলে গেছে এরই মধ্যে। এটা আমরা আইন করে বন্ধ করে রেখেছি, আদেশটা হলো টেরেস্টারিয়াল টেলিকাস্ট শুধু বিটিভির জন্য সংরক্ষণ করা হলো। এমন একটা কালো আইন ডিজিটাল বাংলাদেশে থেকে মুছে দিতে হবে।
চলুন দেখি আমাদের কত শতাংশ লোক চ্যানেল আই সহ অন্যান্য সেটেলাইট টিভিগুলি দেখছে। পুরো রাজধানী সহ সকল জেলা শহরে ক্যাবল নেটওয়ার্ক আছে। আর রাজধানী সহ ৬৪ জেলা সদরে আমাদের মোট জনগষ্ঠির ২০% এর কম জনগন বসবাস করে,বাকি প্রায় আশি ভাগ লোক গ্রামে থাকে।
দেশে মোট ৪৮০ টির মত উপজেলা আছে। ঢাকার আশেপাশে হাতে গোনা কয়েকটি উপজেলায়, উপজেলা সদরের বাইরে দু-একটি বাজারে ২০০ থেকে ৩০০ কানেকসনের কেবেল নেটওয়ার্ক থাকলেও সারা দেশে শুধু উপজেলা সদরে অল্প কিছু কেবেল নেটওয়ার্ক আছে তার মধ্যে হাওর সহ দুর্গম উপজেলা গুলোর অবস্থা সত্যিই করুন।
১. উপজেলাঃ আমতলি
জেলাঃ বরগুনা
মোট জনসংখ্যঃ ২৪৪৪৩৮
উপজেলা সদরে জনসংখ্যাঃ ১৪২৭৬
স্যাটালাইট চেনেল দর্শকঃ ১৭%
২. উপজেলাঃ লোহাগড়া
জেলাঃ চট্টগ্রাম
মোট জনসংখ্যঃ ২০৩৪৫৩
উপজেলা সদরে জনসংখ্যাঃ ২২২৯৪
স্যাটালাইট চেনেল দর্শকঃ ০৯%
৩. উপজেলাঃ হাতিবান্ধা
জেলাঃ লালমনির হাট
মোট জনসংখ্যঃ ২০১৫৯১
উপজেলা সদরে জনসংখ্যাঃ ১৭৮৬৮
স্যাটালাইট চেনেল দর্শকঃ ১১%
৪. উপজেলাঃ ঈশ্বরগঞ্জ
জেলাঃ ময়মনসিংহ
মোট জনসংখ্যঃ ৩০৬৯৭৭
উপজেলা সদরে জনসংখ্যাঃ ২৫১০৮
স্যাটালাইট চেনেল দর্শকঃ ১০%
অর্থাৎ দশ কোটি গ্রামের মানুষের ১০% সেটেলাইট টিভি দেখছে।
বাকি লোকজন যাদের জীবনে টেলিভিশনই একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম
আপনাদের অবশ্যই মনে আছে সরকারের অনুমতি পেয়ে ২০০১ সালে সারা দেশের লোকজন একুশে টিভি দেখেছিল। এর মানে বাংলাদেশে ২টা ভিএইচএফ চ্যানল আছে। এরা এত শক্তিশালী যে ১৫ কোটিমানুষকে সংযুক্ত করতে পারে। একটা বিটিভি চালাচ্ছে আর একটা বন্ধ আছে। এটা ডিজিটাল বাংলাদেশে সময়উপোযযী সিদ্ধান্ত না।
সুপারিশ মালাঃ আমাদের সুপারিশমালার আগে আমরা এক নজরে দেখে নেই ভিশন 2021 এর রুপকল্পে ডিজিটাল অবকাঠামোয় আমাদের সোপানগুলো কি কি হবে তবেই উপলব্ধি করতে পারবো কোথায় আমাদের অগ্রাধীকার এবং কি ভাবে লক্ষ্য অর্জন করা যাবে। ডিজিটাল বাংলাদেশে মূলত আমরা কতগুলো সিসটেম/এপলিকেশন ডেভলপ করবো যেমনঃ ই-সরকার ব্যবস্থা(e-governance), ই-ব্যাবসা (e-business), ই-শিক্ষা (e-learning), ই-স্বাস্থ ( e-health), ই-পরিবেশ (e-environment), ই-কর্মসংস্থান (e-employment), ই-কৃষি (e-agriculture), ই (লেক্ট্রনিক)-বিজ্ঞান (e-science).
উপরের এই এপলিকেশন গুলি চালাতে এখন দেখা যাক কি কোথায় ও কিভাবে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
১. ডিজিটাল বাংলাদেশ ভাবনা ও বাস্তবায়ন দুটোই দেশের গ্রাম অঞ্চল থেকে শুরু হতে হবে।
২. ডিজিটাল বাংলাদেশ রুপকল্প বাস্তবায়নে প্রথম পর্যায়ে সময়ের উপর বিশেষ সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে কেননা বর্তমান প্রযুক্তির যুগে আর যুগ শতাব্দী দিয়ে হিসেব করার সুযোগ নেই এখন মাস আর বছর হলেই অনেক বেশি এদিকে ডিজিটালাইজেশনের পৃথিবীতে প্রবেশের ক্ষেত্র আমরা অলরেডি দশ বছর (অন্তত) পেছনে পড়ে আছি, সেটা অতিক্রম করতে হবে স্বল্পতম সময়ে।
৩. ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন সমন্বয়ন ও সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্র মডেল টুলস ও বিহেভআওয়ার উদ্ভাবন প্রনয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য একটি আলাদা মন্ত্রনালয় স্থাপন করতে হবে।
উপসংহারঃ ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে আমরা বুঝেছি একটা জীবন্ত বাংলাদেশ যেখানে মানুষ মানুষের সাথে, মানুষ রাষ্ট্রের সাথে, মানুষ বাকি পৃথিবীর সাথে একটা সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে তার অবস্থান থেকে সামর্থ ও চাহিদা অনুযায়ী সংযুক্ত হবে দেশের সাথে এবং দেশ পৃথিবীর সাথে। এক কথায় বললে অন্ন বস্ত্র বাসস্থান এবং কমিউনিকেশন/ব্রডব্যান্ড হবে আমাদের মূলনীতি। আর এর চুড়ান্ত লক্ষ্য হলো দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্যমুক্ত দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০১০ দুপুর ২:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



